images

মতামত

‘চোখের পানি ছেড়ে কাজী হুজুর বললেন, তোরে আমি সন্তানের মতোই ভালোবাসতাম’

১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৩০ এএম

প্রকৃত নাম আলহাজ্ব মাওলানা কাজী আতহার উদ্দিন। পেশায় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক ছিলেন। ইসলাম শিক্ষা বিষয়ে সুবিদখালী রহমান ইসহাক পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয় হতে অনেক বছর আগে অবসরে গেছেন তিনি। ছিলেন মির্জাগঞ্জ উপজেলার নিকাহ রেজিস্ট্রার (কাজী)। যে কারণে সবার কাছে তিনি কাজী হুজুর নামেই বেশি পরিচিত।

শরীরিক গঠন আর লম্বা দাড়ি দেখে আমি একদিন কাজী হুজুরকে বললাম, আপনাকে দেখতে একেবারে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ'র মতো লাগে। মুচকি হাসি দিয়ে তিনি সেদিন বলেছিলেন যে, তুই যদি বলিস তাহলে আমি তাই! আগেকার শিক্ষকেরা শুধু পড়াশোনাই করাতেন না, পিতামাতার মতোই ভূমিকা নিয়ে ছাত্রদের পাশে দাঁড়াতেন, যাতে শিক্ষার্থীরা ঝড়ে না পড়ে। আমার বেলায় যেসব শিক্ষক এমন গুরুদায়িত্ব পালন করেছিলেন তাদের মধ্য মাধ্যমিক স্তরে কাজী হুজুর শুধু অন্যতমই ছিলেন না, তিনি সবার চেয়ে আগানো ছিলেন। আমার প্রতি হুজুরের দয়ামায়া আর মমতার কথা আমি এ মুহুর্তে গুছিয়ে লিখতে পারছি না। আমার চোখ এখন পানিতে ভিজে আছে, লেখা দেখতে অসুবিধা হচ্ছে। 

আমরা ক্লাস নাইনে যখন উচ্চতর গণিতসহ সায়েন্স নিলাম, তখন অনেকেই যেমন মাসুদ কবীর, শামীম আহসান সকাল ৭টা থেকে স্কুল শুরুর আগ পর্যন্ত প্রাইভেট পড়তাম। স্কুল ছুটি হতো সেই বিকেল ৪টায়। টিফিন টাইমে কেন্দ্রীয় মসজিদে জোহরের নামাজ পড়তাম, আর নামাজ বাদে এক টাকার মুড়ি আর এক টাকার চানাচুর বা বিস্কুট খেতাম। হুজুর তখনও গ্রামের বাড়ি চতরা হতে স্কুলে আসতেন। তাই, তিনিও নামাজ বাদে একই খাবার প্রায়ই খেতেন আর আমাকে দিয়ে দোকান হতে আনাতেন আর আমাকেও খাওয়াতেন।

একদিন আমি স্কুল বিরতিতে নামাজে যাইনি আর হুজুরের সঙ্গে দেখাও করিনি। তখন তিনি অফ টাইমে ক্লাস রুমে আমাকে খুঁজতে এলেন। দেখলেন যে, আমি বমি করছি। জিজ্ঞাসা করলেন যে, সকালে কি খেয়েছিস? বললাম যে পান্তা ভাত, মরিচ পোড়া আর ডিম। হুজুর তখন বাবার হোটেল (তখন সুবিদখালীর কাঠের পোলের নিচে একটা হোটেল) হতে ভাত আর পোয়া মাছ এনে খাবার খাওয়ালেন।

দিনটার কথা এখনো চোখে ভাসে। মনে পড়লে আবেগাপ্লুত হয়ে যাই। অন্তত ২৫ বছর পরে একদিন সে কথাটুকু হুজুরকে আমি বললাম। তিনি চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে বললেন যে ‘তোরে আমি আমার সন্তানের মতোই ভালোবাসতাম।’

আমার বাবাকে নিজে হাত ধরে ধরে তিনি হজ করিয়েছেন। সঙ্গে মো. আব্দুল জলিল স্যারও ছিলেন। তারা দুজন না থাকলে আমার বাবার পক্ষে হজ করা সম্ভব হতো কিনা জানি না। ২০২৪ এর ৩০ ডিসেম্বর আব্বা মারা যাওয়ার দিনেও হুজুর আমাদের বাড়িতে অনেক কষ্ট করে এসেছিলেন। আমার হাত ধরলেন। শক্ত করে। কোলের ভেতরে নিয়ে বললেন যে, বাবার জন্য অনেক কিছু করেছিস। আফসোস করিস না।

হুজুরের ছেলেদের মধ্যে ওয়ালী ভাই আমাদের সমসাময়িক। ওয়ালী ভাইয়ের কলেজের প্রভাষক পদের এমপিওভুক্তি আর কাজী হিসেবে নিয়োগ লাভের জটিলতা নিয়ে হুজুর আমাকে মাঝেমধ্যে ফোন দিয়ে কথা বলতেন। তিনি বলতেন যে, তোর সঙ্গে কথা বলে শান্তি পাই, ভরসা পাই। মনে হয় যে ওর চাকরিটা স্থায়ী হবে।

একবার হুজুরের সঙ্গে সুবিদখালীতে দেখা করতে গিয়েছিলাম। আমাকে তখন বললেন যে, আল্লাহর নিরানব্বই নাম মুখস্থ পারি কি-না। বললাম যে, না হুজুর। হুজুর জিহ্বা কামড়ে বললেন যে, এটা অবশ্যই মুখস্থ করবি। তুই পারবি।

হুজুর এখন কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে আছেন। তার ছোট ছেলে বোরহান উদ্দিনের সঙ্গে কথা বলে যা জানলাম তার অর্থ একমাত্র আল্লাহই ভরসা, আর মানুষের দোয়া।

আমার জীবনে যদি কোনো ভালো কাজ করে থাকি, যেটা আল্লাহর কাছে পৌঁছেছে তার বিনিময়ে হুজুরের সুস্থতা কামনা করি। আর হায়াত না থাকলে আল্লাহ যেন আছানে ও ঈমানের সঙ্গে মৃত্যু দান করেন। আমিন।

লেখক: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট