images

মতামত

পহেলা বৈশাখ: ঐক্য, সংস্কৃতি ও নবজাগরণের চিরন্তন প্রতীক

১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১১:০১ এএম

পহেলা বৈশাখ বাংলা সনের প্রথম দিন, বাঙালির প্রাণের উৎসব—বাংলা নববর্ষ। আজ এটি শুধু একটি উৎসব নয়; বরং বাঙালির ঐক্য, সংস্কৃতি ও নবজাগরণের প্রতীক। এই দিন আমাদের অতীতকে স্মরণ করায়, বর্তমানকে উদ্‌যাপন করতে শেখায় এবং ভবিষ্যতের জন্য নতুন স্বপ্ন দেখতে অনুপ্রাণিত করে। 

শুধু বাংলাদেশেই নয়, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরাসহ বিশ্বজুড়ে বসবাসকারী বাঙালিরাও উৎসবমুখর পরিবেশে বাংলা নববর্ষ উদ্‌যাপন করেন। তাই পহেলা বৈশাখ কেবল একটি তারিখ নয়; এটি বাঙালির সর্বজনীন লোকউৎসব ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ।

বাংলা নববর্ষের সঙ্গে প্রকৃতি, কৃষি ও মানুষের জীবনযাত্রার রয়েছে গভীর সম্পর্ক। বাংলা সনের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো—এর সূচনা হয় সূর্যোদয়ের সঙ্গে। যেখানে হিজরি সন শুরু হয় চাঁদের হিসাব অনুযায়ী সন্ধ্যায় এবং খ্রিস্টীয় সন শুরু হয় মধ্যরাতে, সেখানে বাংলা সনের সূচনা হয় ভোরের প্রথম সূর্যের আলোয়। তাই শিশিরভেজা ভোরে নতুন সূর্যকে বরণ করেই শুরু হয় পহেলা বৈশাখের উৎসব।

এই উৎসবের ইতিহাস মোগল আমলের সঙ্গে জড়িত। ঐতিহাসিকদের মতে, সম্রাট আকবর রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। তার নির্দেশে পারসিক বহুবিদ্যাবিশারদ ও জ্যোতির্বিদ আমীর ফতেহউল্লাহ সিরাজী স্থানীয় সৌর সন ও আরবি হিজরি সনের সমন্বয়ে একটি নতুন বর্ষপঞ্জি প্রণয়ন করেন। ১৫৮৪ সালে চালু হওয়া এই ‘ফসলি সন’ পরবর্তীতে বাংলা সন হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

তবে শুরুতে পহেলা বৈশাখ আজকের মতো আনন্দঘন উৎসব ছিল না। একসময় এটি ছিল কৃষকদের জন্য খাজনা পরিশোধের দিন। জমিদারদের ‘হালখাতা’ অনুষ্ঠানে প্রজাদের আমন্ত্রণ জানানো হলেও সাধারণ মানুষের কাছে দিনটি ছিল দায়মুক্তির প্রতীক, উৎসবের নয়। সময়ের বিবর্তনে এটি আজ সর্বজনীন আনন্দোৎসবে পরিণত হয়েছে।

দেশভাগের পর বাংলা পঞ্জিকার সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৫২ সালে বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহার নেতৃত্বে সংস্কার কার্যক্রম শুরু হয় এবং পরে ১৯৬৩ সালে বাংলা একাডেমি ড. মুহম্মদ শহিদুল্লাহর সভাপতিত্বে একটি সংস্কার কমিটি গঠন করে। ১৯৮৮ সালে সরকারি ব্যবহারে বাংলা সাল লেখার রীতি চালু হলে এর ব্যবহার আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।

বঙ্গাব্দের ১২ মাসের নামকরণ করা হয়েছে নক্ষত্রের অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে। সূর্যসিদ্ধান্ত গ্রন্থ থেকে নেওয়া এসব নাম—বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, অগ্রহায়ন, পৌষ, মাঘ, ফাল্গুন ও চৈত্র—বাংলা সনের বৈজ্ঞানিক ভিত্তিকেও নির্দেশ করে। ফলে বাংলা সন শুধু সংস্কৃতির অংশ নয়; এটি জ্ঞান-বিজ্ঞানের ঐতিহ্যেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারক।

সময়ের সঙ্গে পহেলা বৈশাখ পেয়েছে নতুন মাত্রা। নগরজীবনে এই উৎসব এখন আরও বর্ণিল ও জাঁকজমকপূর্ণ। ভোরে উদীয়মান সূর্যকে স্বাগত জানাতে মানুষ জড়ো হয় খোলা প্রান্তর ও উদ্যানগুলোতে। শিল্পীদের কণ্ঠে ভেসে ওঠে নববর্ষের গান। লাল-সাদা শাড়ি, পাঞ্জাবি-পাজামা ও ফুলের সাজে তৈরি হয় এক অনন্য উৎসবের আবহ। 

খাবারের ক্ষেত্রেও এসেছে বিশেষ বৈশিষ্ট্য। পান্তা-ইলিশ এখন নববর্ষের প্রতীকী খাবার হিসেবে পরিচিত। যদিও ইতিহাস বলে, একসময় শ্রমজীবী মানুষের উৎসব ছিল ভিন্নধর্মী। তবুও সময়ের সঙ্গে পান্তা-ইলিশ বাঙালির ঐতিহ্যের অংশ হয়ে উঠেছে।

পহেলা বৈশাখের আরেকটি বড় দিক হলো এর সর্বজনীনতা। একসময় কৃষক ও ব্যবসায়ী সমাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও আজ এটি সমাজের সব স্তরের মানুষের উৎসবে পরিণত হয়েছে। শহর-গ্রাম, ধনী-গরিব—সবাই এই দিনে একসঙ্গে মিলিত হয়। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ এই উৎসবকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

পার্বত্য অঞ্চলের জনগোষ্ঠীও তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য অনুযায়ী নববর্ষ উদ্‌যাপন করে। ‘বৈসাবি’ উৎসবসহ তাদের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজন নববর্ষের সার্বজনীনতাকে আরও বিস্তৃত করে তোলে।

কালের বিবর্তনে নববর্ষের সঙ্গে যুক্ত অনেক পুরোনো গ্রামীণ উৎসব হারিয়ে গেলেও কিছু ঐতিহ্য এখনো টিকে আছে। যেমন—চট্টগ্রামের বলীখেলা বা রাজশাহীর গম্ভীরা—যা আমাদের সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতাকে স্মরণ করিয়ে দেয়।

বর্তমানে নববর্ষের সকালে উদীয়মান সূর্যকে স্বাগত জানানোর মধ্য দিয়েই উৎসবের মূল আয়োজন শুরু হয়। উদ্যান, লেকপাড় কিংবা বড় বৃক্ষতলে মানুষের সমাগমে তৈরি হয় প্রাণবন্ত পরিবেশ। ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সজ্জিত তরুণ-তরুণীরা উৎসবের সৌন্দর্যকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে। 

তবে পান্তা-ইলিশের জনপ্রিয়তার সঙ্গে একটি উদ্বেগও রয়েছে। অতিরিক্ত জাটকা নিধন ভবিষ্যতের ইলিশ সম্পদের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে। ইলিশ সংরক্ষণে সরকার ‘জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ ২০২৬’ পালন করছে এবং নির্দিষ্ট সময়ে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করেছে। নববর্ষের আনন্দের পাশাপাশি এ বিষয়ে সচেতন হওয়াও জরুরি।

এদিকে পহেলা বৈশাখ উপলক্ষ্যে ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় কৃষকরা আর্থিক সহায়তাসহ বিভিন্ন সুবিধা পাবেন, যা কৃষকদের জন্য একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।

নতুন বছরের প্রারম্ভে আমাদের প্রত্যাশা—দেশ ও জাতির কল্যাণ, মানুষের মধ্যে দেশপ্রেমের জাগরণ এবং সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচন। বিশ্বদরবারে বাংলাদেশ আরও দৃঢ়ভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াক—এই হোক পহেলা বৈশাখের অঙ্গীকার  শুভ নববর্ষ।

লেখক: মো: মামুন হাসান 
সিনিয়র তথ্য অফিসার 
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়

এমআর/এআরএম