images

মতামত

বাংলা সনের প্রবর্তন বিতর্ক ও সমসাময়িক প্রসঙ্গ 

ঢাকা মেইল ডেস্ক

১৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৪২ পিএম

বাংলা ভাষার উৎপত্তির ইতিহাস নিয়ে এক সময় বিতর্ক ছিল, যেটা বর্তমানে শেষ হয়েছে। ব্রিটিশ আমলে অনেক কিছু ঔপনিবেশিক ও পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে ব্যাখ্যা করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। ল্যাটিন ভাষা থেকে ইতালীয়, স্প্যানিশ ও ফরাসি ভাষার উদ্ভব। এই ব্যাখ্যার আলোকে সাধারণীকরণ করা হয় সংস্কৃত থেকে বাংলা, হিন্দি, উর্দু ও উপমহাদেশের অন্যান্য ভাষা এসেছে। তবে আধুনিক গবেষণায় এটা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। সংস্কৃত ভাষা থেকে বাংলার উদ্ভব হয়নি। এটা বলা যেতে পারে সংস্কৃত শব্দ ও সাহিত্য দ্বারা বাংলা ভাষা সমৃদ্ধ হয়েছে। বাংলা ভাষার রয়েছে নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্য এবং পৃথিবীর প্রতিষ্ঠিত ভাষাগুলোর অন্যতম।  

বাংলা সনের উদ্ভব ও প্রবর্তন সম্পর্কে প্রায় সবাই একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল। তবে গত প্রায় এক দশক ধরে বঙ্গাব্দ সূচনার কৃতিত্ব মোগল সম্রাট জালালউদ্দিন মোহাম্মদ আকবর ও টোডরমলের পরিবর্তে সপ্তম শতাব্দীর গৌরাধিপতি শশাঙ্ককে  করার এক ধরনের তৎপরতা লক্ষণীয়। অধিকাংশ পণ্ডিত, ইতিহাসবিদ ও গবেষক সুস্পষ্ট তথ্য-প্রমাণ ও উপাত্তের ভিত্তিতে এই মর্মে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে বাংলা সনের প্রবক্তা মোঘল সম্রাট আকবর। তবে ভারতের বিজিপি সরকার সব কিছুতে একটা ধার্মিকীকরণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসাবে পশ্চিমবঙ্গ বিজিপি বঙ্গাব্দ সূচনার প্রবর্তক  হিসাবে শশাঙ্ককে প্রতিষ্ঠিত করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।  ইতিহাসে পাথুরে প্রমাণ না থাকলেও তারা নানা ধরনের তৎপরতা ও কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছে।

এটা স্বীকৃত সত্য যে, সম্রাট আকবরের পূর্বে বাংলা সন সম্পর্কে কোনো তথ্য-প্রমাণ বা নিদর্শন পাওয়া যায় না। তবে আকবরের শাসনামলের পূর্ব থেকে বেশ কয়েকটি সন বা অব্দ প্রচলিত ছিল। রাজকীয় সন হিসাবে প্রচলিত ছিল ‘হিজরি’।  তাছাড়া বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের বর্ষপঞ্জি প্রচলিত ছিল যেমন- বিক্রমাব্দ, শকাব্দ, লক্ষণাব্দ, ফার্সি পঞ্জিকা, আমনি মন, বিলায়িতি অব্দ, মল্লাব্দ ইত্যাদি। আবুল ফজলের প্রখ্যাত আইন-ই-আকবরি অনুসারে প্রচলিত রাজকীয় সন হিজরি চন্দ্রসন হওয়ায় প্রতি বছর একই মাসে খাজনা আদায় সম্ভব হত না। যে কারণে খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য সৌরবর্ষ-নির্ভর ইলাহি সন  চালু করেন।  অর্থাৎ হিজরি চন্দ্র সনকে ফসলি সৌর সনে রূপান্তরিত করেন। যা পরে ‘বাংলা সন’ বা ‘বঙ্গাব্দ’ হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

ইতিহাসে দেখা যায়, খ্রিস্টাব্দের সাথে খ্রিস্টের আবার মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর সাথে হিজরি সনের সম্পর্ক রয়েছে। এছাড়া ভারত উপমহাদেশের কিছু উদাহরণ বিবেচনায় কেউ কেউ শশাঙ্ককে বঙ্গাব্দের প্রবর্তক বলে মনে করেন। তবে গবেষকরা এখানে শশাঙ্কের টেনে আনাকে অযৌক্তিক ও ভুল মনে করেন। দেখা যায়, শশাঙ্কের শাসন ছিল ৬০০ থেকে ৬২৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত, মতান্তরে ৬৩৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। অন্যদিকে বঙ্গাব্দের সূচনা ৫৯৩-৯৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে। অনেকটা সমসাময়িক হলেও এই দাবি মানার অনেক সমস্যা আছে। প্রথম সমস্যা হল, ৫৯৩-৯৪ থেকে পরবর্তী প্রায় এক হাজার বছর বঙ্গাব্দের নথিবদ্ধ কোন দলিল বা তথ্য পাওয়া যায় না। আকবরের মসনদে আসীন হন হিজরি অনুসারে ৯৬৩ বা ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে । অন্যদিকে ইলাহি অব্দ বা ফসলী সনের  চালু হয় ২১ মার্চ, ১৫৮৪ থেকে, আর শুরুটা করা হয়েছিল ১৫৫৬ সালের ১৪ এপ্রিল (সম্রাট আকবরের ক্ষমতা গ্রহণের তারিখ) থেকে। তবে সে দিন (১৫৫৬ সালের ১৪ এপ্রিল) ফসলী সনের শুরুর দিনটা ১ সাল ছিল না, ছিল ৯৬৩ সাল। ১৫৫৬ থেকে চান্দ্র-হিজরি সন ৯৬৩-কে বিয়োগ করলে ফল দাঁড়ায় ৫৯৩-৯৪ খ্রিস্টাব্দ। এটা হয়ে ছিল হিজরি চান্দ্রবর্ষকে সৌরবর্ষে রুপান্তিত করার কারণে। হিজরি সনের সাথে বাংলা সনের বেশ কিছু বছরের পার্থক্য রয়েছে কারণ সৌরবর্ষের চেয়ে চন্দ্রবর্ষ ১১ দিন ছোট।

গবেষকদের মতে, বঙ্গাব্দের সূচনাকাল ৫৯৩-৯৪ সালে শশাঙ্ক বঙ্গাব্দ প্রবর্তন করতে পারেন না। তিনি স্বাধীন রাজা হন ৬০০ খ্রিস্টাব্দের পর। স্বাধীন শাসক না হলে নতুন অব্দ জারি করার সুযোগ এবং বৈধতাও থাকে না। বিহারে পাওয়া তার প্রথম দিকের একটি সিলমোহরের ছাঁচ অনুসারে দেখা যায় তিনি ছিলেন মহাসামন্ত (অধীনস্থ শাসক)। এ বিষয়ে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসের প্রাক্তন অধ্যাপক রণবীর চক্রবর্তীর মতে, ‘শশাঙ্ক তাঁর নিজের রাজত্বকালে তাম্রশাসনে অন্তত পাঁচটি নিষ্কর ভূদান করেছিলেন। তিনি যদি বঙ্গাব্দ জারি করেই থাকবেন, তা হলে তো এই দানে সেই বঙ্গাব্দের উল্লেখ থাকত! কিন্তু কোথাও তা নেই। এমনকি তাঁর অধীনস্থ রাজাদের ভূসম্পদ দানের ক্ষেত্রেও গুপ্তাব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।’  সম্রাট আকবরকেই বাংলা সনের প্রবর্তক হিসেবে ইতিহাসবিদ রমেশচন্দ্র মজুমদার, ইতিহাসবিদ কাশীপ্রসাদ জয়সোয়াল, বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা, নোবেলবিজয়ী অর্থনীতিবিদ-সমাজচিন্তক অমর্ত্য সেন প্রমুখ একমত।

Boishakh

কেউ কেউ মনে করেন, আকবর বা টোডরমল কখনও বাংলায় আসেননি। কিন্তু বাংলায় আসা বা না আসার প্রশ্ন কোন বিষয় হতে পারেনা। ইতিহাসে স্বীকৃত যে, মোগলদের নীতি ও পদক্ষেপের কারণে ভারত তথা বাংলার আর্থিক-সামাজিক চারিত্র্যের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। তাছাড়া সন শব্দটি আরবি আর সাল শব্দটি ফার্সি। অতএব, বাংলা সন বা বঙ্গাব্দ প্রবর্তনের সঙ্গে যে মুসলিম সুলতান বা সম্রাটদের সম্পর্ক আছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আবার কেউ যুক্তি দেখান, শশাঙ্ক প্রাচীন জ্যোতির্বিজ্ঞানবিষয়ক প্রাচীন গ্রন্থ ‘সূর্যসিদ্ধান্ত’ অনুসরণ করে সৌরবর্ষের ভিত্তিতে বছর গণনা শুরু করেন। তবে সেই গ্রন্থটির রচনাকাল শশাঙ্কের শাসনকালের পাশপাশে ছিল না। 

শোভাযাত্রা নিয়ে বিতর্ক

বাংলা সনের প্রথম দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ উৎসব উৎযাপন আমাদের সংস্কৃতির অংশ। এটি একটি স্থানীয় ও সর্বজনীন উৎসব। যুগ যুগ ধরে এ দেশের মানুষ ধর্মীয়-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মিলিতভাবে পালন করে আসছে। পৃথিবীর বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও দেশের লোক বিভিন্ন উৎসব উপলক্ষ্যে নানা ধরনের বর্ণাঢ্য কার্নিভাল বা শোভাযাত্রা বের করে।  আর এ সব গুলোতে মুখোশ পরা, নাচ, গান এবং প্রচুর ভোজসহ নানা রকম আয়োজন থাকে। শিয়া মুসলমানেরা আশুরার দিনে তাজিয়া মিছিল বের করে। একই ধর্মের লোক হলেও অন্যরা করেনা। হজরত আলীর উপর বেশি ভক্তির কারণে শিয়ারা মিছিল বের করে। দল বেঁধে যাওয়া, মিছিল করে যাওয়াও এ দেশের মানুষের বৈশিষ্ট্য। তাইতো তারা দল বেঁধে ঈদগাহে যায়, পূজার অনুষ্ঠানে যায়, বিয়েসহ বা অন্যান্য সামাজিক অনুষ্ঠানে যায়। 

হাজার বছরের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরার জন্য ১৯৮৯ সাল থেকে ঢাকা থেকে শোভাযাত্রা বের করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। নাম দেওয়া হয় ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’।  তবে বেশ কিছু কারণে বিগত বছর গুলোতে এই ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নিয়ে এক ধরনের বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। যে কারণে গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে এর নামকরণ করা হয় ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’। আর এ বছর বিতর্ক এড়াতে নামকরণ করা হয়েছে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’।

‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’র মঙ্গল নিয়ে অনেকের আপত্তি আছে, যদিও আমাদেরকে প্রতিনিয়ত মঙ্গলবার, মঙ্গলগ্রহ বলতে হয়। তাদের মতে, এই শব্দে রয়েছে ধর্মের গন্ধ। তবে অনেকের মতে, মঙ্গল মূলত দ্রাবিড়দের শব্দ যা বাংলা ভাষার পৈতৃক। কেউ কেউ মনে করে, এটি ফার্সি শব্দ, মঙ্গল থেকে মোঘল হয়েছে। অন্য দিকে আনন্দ একটি সংস্কৃত শব্দ। মঙ্গল শব্দটির যে দোষ দেওয়া হয় আনন্দ শব্দটিও সে দোষের বাইরে নয়।  বৈশাখী শব্দ নিয়েও আবার অনেকের আপত্তি রয়েছে। কেননা বৈশাখ শব্দটা এসেছে ‘বিশাখা’ নক্ষত্র থেকে। পুরাণ মতে, বিশাখা হলেন দক্ষরাজের কন্যা এবং ব্রহ্মার নাতনি। আবার পহেলা শব্দটি উর্দু শব্দ যা পেহেলী শব্দের রুপান্তরিত রুপ। সব মিলায়ে বেশ জটিল অবস্থা। 

আসলে শব্দ একটা জটিল প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে তৈরি হয় এবং এ নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে শুধু বাংলা নয়, সব ভাষাই সমস্যাই পড়বে। এ বিষয়ে ভারতের প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ইরফান হাবিবের একটি উক্তি আছে, ‘মোদি সরকার তো সবই পাল্টাচ্ছেন, তবে ‘হিন্দু’ শব্দটা কি পাল্টাতে পারবেন, কেননা এটা আরবদের শব্দ।’

সম্প্রতি সময়ে একজন মন্ত্রী ‘ইনকিলাব’ শব্দ নিয়ে আপত্তি করে ছিলেন এবং বিষয়টি নিয়ে অনেক বিতর্কও হয়েছে। তবে ফ্যামিলি কার্ড, ফারমার কার্ড, হেলথ কার্ড, ফুয়েল কার্ড, প্লানসহ অনেক শব্দ যে ভাবে দেশে জনপ্রিয় করা হচ্ছে তাতে দেশীয় ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চা নিয়ে অনেকের আস্থায় ভাটা পড়েছে।

ভাষা গবেষকদের মতে, বাংলা ভাষার উৎপত্তি বা সূচনাকালে এদেশে আর্য ও বৌদ্ধ ধর্মের ব্যাপক প্রভাব লক্ষণীয়। যে কারণে বাংলা ভাষায় অনেক সংস্কৃত শব্দ এসেছে। অন্যদিকে, বাংলা ভাষার সুগঠিত রূপ বা বিকাশ শুরু হয় দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতকের দিকে এবং এই সময় শুরু হয় মুসলিম শাসন। মিশতে থাকে ফার্সি-আরবি শব্দ। রীতিমত পারস্যকরণ বলা যেতে পারে। ১৯৬৬ সালে শেখ গোলাম মাকসুদ হিলালি ফার্সি উৎসের ৯ হাজারের বেশি বাংলা শব্দ ও অভিব্যক্তির একটি অভিধান প্রকাশ করেন। এদেশে এসেছে পর্তুগিজ, ওলন্দাজ, ফরাসি, ইংরেজসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী এবং তাদের ভাষার অসংখ্য শব্দ মিশেছে বাংলা ভাষায়।

শোভাযাত্রার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত এদেশের মানুষ ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরা, অন্যকে আঘাত করা নয়। অভিযোগ আছে শোভাযাত্রার সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের আকৃতির পাখি, মাছ ও বিভিন্ন প্রাণীর ছবি থাকে। আপত্তি থাকলে এড়িয়ে যাওয়া উচিত। বেশি আপত্তি থাকলে শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ না করে অন্য ভাবে বাংলা নববর্ষ পালন করা বা না করার  স্বাধীনতাও আছে। আবার বাংলায় যা আছে যাদের দেখা যায় তাদের ছবি নিয়ে এদেশের মানুষ মিছিল করবে সেটাই স্বাভাবিক, সেটাও মানতে হবে।

এদেশে বিভিন্ন সম্প্রদায়, জাতিগোষ্ঠী ও মতের লোক রয়েছে, অতএব সবাই একইভাবে পহেলা বৈশাখ ও শোভাযাত্রা পালন করবে এমনটা আশা করা ঠিক নয়। আমাদেরকে গণতান্ত্রিক চেতনা ও সুস্থ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির চর্চার উপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। কে কীভাবে পহেলা বৈশাখ পালন করছে, এটা আমাদের দেশের মূল সমস্যা নয়। সুস্থ গণতন্ত্র চর্চা ও ন্যায় বিচারের অভাব, দুর্নীতি, দারিদ্রতা, বেকারত্ব  ও বিদেশে টাকা পাচার আমাদের প্রধান সমস্যা। তাছাড়া আমরা একটা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যে আছি। ভিন্ন ভিন্ন মত, কণ্ঠ, মূল্যবোধ, দ্বন্দ্ব-বিতর্ক গণতান্ত্রিক রীতির মধ্যে পড়ে।

অপব্যাখ্যা

অনেক পূর্ব থেকেই আমাদের দেশের কেউ কেউ মনে করে পহেলা বৈশাখ পালন ও বাংলা সংস্কৃতির অনেক কিছুর কারণে ধর্মের ক্ষতি হতে পারে। তবে এই অপব্যাখ্যাও কোন দিন টেকেনি। কেননা বর্তমানে বাংলা ভাষায় যারা কথা বলে, তাদের অধিকাংশ ইসলাম ধর্মের অনুসারী, যা আরবের পর পৃথিবীর ২য় সর্বোচ্চ জনগোষ্ঠী। ইসলাম একটি বিশ্বজনীন ধর্ম। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ, ভৌগোলিক অঞ্চল বা এলাকা, জীবনপ্রণালী বা উৎপাদন ব্যবস্থার, সংস্কৃতির, ভাষাভাষী ও খাদ্যাভ্যাসের লোক ইসলামের অনুসারী। প্রতিটি জনপদের মানুষ নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি বজায় রেখে ইসলামের বিধান মেনে চলবে এটাই নিয়ম। আর পবিত্র কুরআনেও এ বিষয়ে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, ‘আর তাঁর [আল্লাহর] নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে মহাকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। নিশ্চয়ই এতে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।’ [সুরা রুম : আয়াত ২২]

পারস্য তথা ইরানে প্রতিবছর জাতীয়ভাবে নওরোজ উৎসব ব্যাপক জাঁকজমকভাবে পালিত হয়। শুধু ইরান নয় ইরাক, তুরস্ক, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, উজবেকিস্তান, আজারবাইজান, তাজিকিস্থানসহ অনেক দেশের মুসলিমরাও এটা পালন করে। প্রাচীন পারস্যের পরাক্রমশালী সম্রাট জমশীদ খ্রিস্টপূর্ব ৮০০ সালে নওরোজ প্রবর্তন করেছিল। তবুও ঐতিহ্যগত কারণে মুসলমানেরা এটি পালন করে। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সব দেশে তাদের উৎপাদন ব্যবস্থা ও জীবন প্রণালীর ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে অনেক উৎসব পালন করা হয় যেগুলোকে শরিয়তের অংশ করা হয়নি, কেননা সেগুলো ছিল স্থানীয়। ইন্দোনেশিয়ার মুসলিমরা অনেক স্থানীয় উৎসব পালন করে।

Boishakh2

এ বিষয়ে এটা বলা যেতে পারে, খ্রিষ্টান ধর্ম কখনো ইউরোপে বিকশিত হত না, যদি না তা ইউরোপের স্থানীয় সংস্কৃতিকে আত্মস্থ করে না নিত। ইসলাম ও বাংলার ক্ষেত্রে এটা কম সত্য নয়। ধর্ম যদি সমাজের সাথে খাপ খাওয়াতে না পারে তবে তা শুধু জাদুঘরে বা পুস্তকে টিকে থাকে। ইসলাম প্রথম থেকে বাংলার ভূমি ও স্থানীয় মানুষের সংস্কৃতির সাথে খাপ খাওয়ায়ে নিয়ে ছিল এবং স্থানীয়রাও ইসলামকে নিজেদের আপন করে নিয়ে ছিল।

আত্মপরিচিতির সংকট

নিজে কী, নিজের পরিচয় কী হওয়া উচিত— এমন চিন্তা এ দেশের মানুষ খুব কমই করেছে। এ মাটিতে জন্মগ্রহণ করেও এ মাটি ও তাদের নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতিকে নিজের মনে করতে সবসময় দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ও হীনমন্যতায় ভুগেছে। আত্মপরিচিতির এই সঙ্কট নতুন কিছু নয়। এক সময় হিন্দু সমাজব্যবস্থায় লক্ষণীয় ছিল, যারা উচ্চ বর্ণের ব্রাহ্মণ অর্থাৎ যারা কনৌজ-মিথিলা বা উত্তর ভারত থেকে এসেছে, এমন ভাব যারা দেখাতে পারত, তারাই ছিল সমাজে বেশি সম্মানিত। আর মুসলিম সমাজে ভাবখানা এমন ছিল ঐ যে গানে আছে, ‘ইরান-তুরান (মধ্য এশিয়া) পার হয়ে এসেছি’। মুসলিমরা নিজেদের ইরান-তুরান–আরব-বাগদাদের পীর-ফকির, রাজাবর্গ ও তাদের অনুচর ও সিপাহীদের বংশধর প্রমাণে মহাব্যস্ত ছিল। তবে, সম্প্রতিকালে হাড়গোড় ও অন্যান্য আধুনিক নৃতাত্ত্বিক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দেখা গেছে, এদেশের ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর। বাইরের জনগোষ্ঠীর তাদের খুব কমই মিল রয়েছে।

বাংলার নিভৃত পল্লীতে আমাদের যে পূর্ব-পুরুষরা বাস করত তাদের থেকে এসেছে আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতি। এটা ইতিহাস স্বীকৃত যে, বাংলায় শাসন কার্য, ব্যবসা ও ধর্ম প্রচারের জন্য বহিরাগতরা এসেছে। তবে বাংলা এতই দুর্গম ও সুযোগসুবিধা এতই কম ছিল যে অনেকে চাকরি ও ব্যবসা শেষে নিজেদের দেশে ফিরে যেত। আর বহিরাগতরা যারা বাংলায় থেকে গিয়েছিল তারা বাংলা সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করেছে কিন্তু পরিবর্তন করতে পারেনি। এক সময় নিজেরাই বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে যায়। উত্তর ভারত, ইরান, মধ্য এশিয়া ও আরব থেকে যারা বাংলায় এসেছিলেন তারাও সবাই বউ বা স্ত্রী সাথে করে নিয়ে এসেছিলেন এমন তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায় না। স্থানীয় মেয়েদের বিয়ে করে এখানেই ঘর সংসার শুরু করতেন। এ থেকে প্রমাণ হয় যে, বাংলায় যারা মা হয়েছে তারা সবাই স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ছিল। আর ভাষা ও সংস্কৃতিতে মায়েদের প্রভাব থেকেই যায়। আমরা মাতৃভাষা বলি, পিতৃভাষা বলি না।

আশা করা হয়েছিল ১৯৭১ সালের পর অন্য কিছু ভাবার প্রবণতা শেষ হবে, কিন্তু সেটা হয়নি। বিশেষ করে উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তের চরিত্রে পরিবর্তন আসেনি। পাকিস্তান আমলে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে কান্নাকাটি করলেও পরে গুরুত্বহীন হয়ে ওঠে। তাদের এখন ‘গরিবের ঘোড়া রোগ’ দেখা দিয়েছে। তাদের কাছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইংল্যান্ডসহ পশ্চিমা দেশে বা অন্য কোনও দেশে বসবাস, ব্যবসা করা বা আসা-যাওয়া অনেক সম্মানের ও আভিজাত্যের ব্যাপার। আত্মপরিচয়ের এই সংকট তৈরি হয়েছে দেশের সম্পদ পাচার হওয়ার প্রবণতা। দুর্নীতি করে হোক আর সহায় সম্পত্তি বিক্রি করে হোক বিদেশে টাকা নিয়ে যাচ্ছে। ইংরেজরা এক সময় জাহাজ ভর্তি করে এদেশ থেকে ধনসম্পদ নিয়ে যেত। আর এখন আমরা নিজেরাই বহন করে তাদের দিয়ে আসছি। আমরা এখনও ঔপনিবেশিক মনজগতের মধ্যেই আছি। একে বলা যায় ‘Self colonization’ অর্থাৎ নিজেরাই দাসে পরিণত হওয়া।

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বাংলা বর্ষপঞ্জির গুরুত্ব দিন দিন কমছে। এ কথা ঠিক আধুনিক বিশ্বের সব বাণিজ্যিক, অর্থনৈতিক তথা জাগতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় গ্রেগরিয়ান বা খ্রিস্টীয় ক্যালেন্ডার অনুযায়ী। আমরা প্রতি বছর জাঁকজমক সহকারে বাংলা নববর্ষ পালন করি অথচ বাংলা সন আর মাসের খবর রাখিনা। এটা লজ্জার বিষয়। ইরান ও চীনের লোকেরা তাদের নিজস্ব বর্ষপঞ্জির অনুসরণ ধরে রেখেছে।

মানুষের দৈনন্দিন জীবন, ভাষা, সংস্কৃতি, সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধ ওপর বিশ্বায়ন ও  বিজ্ঞান-প্রযুক্তি প্রভাব ব্যাপক। অনেকের ভাষা ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য এখন বিপন্ন। অদূর ভবিষ্যতে এই মহামারি থেকে আমাদের সংস্কৃতি কতটা টিকে থাকবে সেটাই বিবেচনার বিষয়।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী