images

মতামত

রামেক পরিচালকের ‘ফাঁসির রায়’ ও কিছু কথা

ঢাকা মেইল ডেস্ক

০৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৩০ পিএম

‘১১ দিনে ৩৩ জন শিশু মারা গেছে রাজশাহী মেডিকেলে। অথচ সেখানকার পরিচালক আমাদের জানাননি যে তার কাছে ভেন্টিলেটর নেই। তাকে ফাঁসির কাষ্ঠে চড়ানো উচিত।’ গত ২৮ মার্চ রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে আইসিইউ ভেন্টিলেটরের অভাবে শিশুদের মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে এই বক্তব্য দিয়েছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর কোনো প্রতিষ্ঠান প্রধানকে কোনো মন্ত্রী এমন মন্তব্য পূর্বে করেছেন বলে ইতিহাসের পাতা ঘেঁটে খুঁজে পেলাম না। এমনকি গুগল মামাও তার স্মৃতি আওড়িয়ে এমন কিছু খুঁজে দিতে পারলো না। তাহলে ধরে নেওয়া যায়, এমন কোনো মন্তব্য এর আগে কখনোই কোনো মন্ত্রী করেননি।

তাহলে স্বাধীনতার এত বছর পেরিয়ে কেন মন্ত্রী মহোদয় এমন মন্তব্য করলেন। এমন মন্তব্যের দুইটা কারণ হতে পারে-এই মৃত্যুর খবর মন্ত্রী মহোদয়ের হৃদয়ে এতটাই আঘাত করেছে যে, তিনি অবচেতন মনেই ফাঁসির কাষ্ঠে চড়ানোর রায় দিয়ে ফেলেছেন। দ্বিতীয় কারণটি হতে পারে সুপরিকল্পিতভাবে পরিচালককে টার্গেট করে তিনি এমন মন্তব্য করেছেন।

তবে আবেগমিশ্রিত বিবেক দিয়ে বিবেচনা করলে এটা স্পষ্ট হয় যে, তিনি বিষয়টিকে হৃদয় দিয়েই স্পর্শ করেছেন। কেননা সুপরিকল্পিতভাবে আঘাত করতে যে যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকা লাগে তা দৃশ্যমান নয়। তবে এখানেও কথা আছে, তেমন কিছু গোপনে থেকে থাকলে তা ভিন্ন কথা। দৃশ্যমান পর্যালোচনায় তা ধর্তব্য নয়।

এবার মূল আলোচনায় আসি, হামের প্রকোপ বৃদ্ধির পর আইসিইউর অপেক্ষায় থাকতে থাকতে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত ৯১ জন শিশু মারা গেছে। মন্ত্রী মহোদয়ের ‘মৃত্যু দণ্ডের রায় দেওয়ার পর’ মানে বক্তব্যের পর যখন বিষয়টি নিয়ে লিখতে বসেছি এরমধ্যে আরও ৫৮ জন শিশু মারা গেছে। ধুঁকে ধুঁকে। বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজনের চোখের সামনে বুকের ধন হারিয়ে যাচ্ছে। কল্পনা করুন, ওই শিশুর জায়গায় আপনি নিজেই, আপনি দিনে ১৬ ঘণ্টা পড়াশোনা করে সচিব হওয়া বড় আমলা, জীবনের বড় সময় রাজপথ কাঁপিয়ে হওয়া বড় রাজনৈতিক নেতা কিংবা বিরোধীদলীয় নেতা, সরকার দলীয় মিডিয়াম পর্যায়ের নেতা, (সরকার দলীয় বড় নেতাদের কথা বললাম না, কারণ তারা ৫ মিনিটেই হাজারো আইসিইউ ম্যানেজ করার ক্ষমতা রাখেন-এটা অতীত অভিজ্ঞতা থেকে ধারণামাত্র), কল্পনা করুন আপনি বেগম জিয়ার মতো বিরোধী দলীয় নেত্রী; কিন্তু এ কী বেহাল অবস্থা, ডাক্তার বলছেন, রোগীকে ইর্মাজেন্সি আইসিইউতে নিতে হবে। কিন্তু সিরিয়াল নম্বর ৯। এবার আপনাকে আইসিইউর ভেতরে থাকা অন্য রোগীর মৃত্যু কামনা করতে হবে, না হয় দ্রুত সুস্থতার-এর বাইরে সে সময় অন্য কিছু কামনা করা স্বপ্নদোষের মতোই।

এই দৃশ্য দেখার পর ওই শিশুর বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন কিংবা আপনি নিজে কার ‘মৃত্যুদণ্ড’ চাইবেন? আপনারা কী চাইবেন জানি না, তবে ওই হাসপাতালের প্রতিটি দেয়াল স্পর্শ করা এবং দেশের স্বাস্থ্যসেবার কিছুটা জ্ঞান থাকা মানুষ হিসেবে আমি ফাঁসি চাই, সিস্টেমের। যে সিস্টেম ওই ৯১ জন শিশুর লাশ দেখে উজ্জীবিত হয়, ধান্দা জমার অপেক্ষায়। মনে রাখবেন, আপনি মরলেই তাদের দোকান খোলে, জমে ওঠে, সমৃদ্ধ হয়।

আরও পড়ুন

বিগত দুই সরকারের ব্যর্থতায় হামের প্রকোপ বাড়ছে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

আমি ফাঁসি চাই সেই সিস্টেমের, যে সিস্টেম ডাক্তার-নার্সদের মানবিক গুণগুলো নষ্ট করে টাকার পেছনে ছুটতে বাধ্য করে। যে সিস্টেম শেখায়, নিজে বাঁচলে বাপের নাম, দুনিয়ার অন্য সব জাহান্নামে যাক। যে সিস্টেম শিখিয়েছে, ৩ হাজার টাকা সেলারিতে স্বাস্থ্যকর্মী রেখে ওই হাসপাতালের রোগীদের চৌদ্দগুষ্ঠির ষষ্ঠী করছে। যে সিস্টেম ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০০ শয্যাবিশিষ্ট পাশের বিশেষায়িত শিশু হাসপাতালকে তিন বছর আগে নির্মাণকাজ শেষ হলেও চালু হতে দেয়নি। যে সিস্টেম শিখিয়েছে, ওই হাসপাতাল চালু হলে রামেক হাসপাতালের ‘দোকান বন্ধ’ হয়ে যাবে। যে সিস্টেম শিখিয়েছে, শিশু হাসপাতাল রামেক হাসপাতলের অধীনে না থাকলে কর্তার ক্ষমতা কমে যাবে। যে সিস্টেম শিখিয়েছে, ওই হাসপাতাল সিভিল সার্জন কিংবা রাজশাহী মেডিকেল কলেজের অধীনে থাকতে হবে। যে সিস্টেম এই লড়াইয়ে স্বাস্থ্য বিভাগকে নীরবতা পালন করতে শিখিয়েছে। নতুন নতুন অজুহাত দাঁড় করাতে শিখিয়েছে।

যে সিস্টেম শিখিয়েছে, রামেক হাসপাতালের জনবলের সহযোগিতা ছাড়া ওই হাসপাতাল কখনোই দাঁড়াতে পারবে না। যে সিস্টেম শিখিয়েছে, ভিআইপি রোগী আসলে হার্ট  ফাউন্ডেশনের আইসিইউতে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় চিকিৎসা দেওয়া যাবে, যে সিস্টেম শিখিয়েছে, শিক্ষানবীশ নার্সরা রোগী ডিল করবে, আর সিনিয়র বসে থেকে ফোন টিপবে। শিক্ষানবীশদের ভুলে কেউ মরলে কে আর দেখবে? যে সিস্টেম শিখিয়েছে, সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার-নার্সরা সাধারণ রোগীদের জরুরি মুর্হূতেও টার্চ করবে না। ইনজেকশন দেবে ওর্য়াড বয়। যে সিস্টেম নার্সদের হাতে কাগজ ধরিয়ে রোগীর মৃত্যুর হিসাবে মগ্ন রাখে, সে নার্স কী সেবা দেবে? আদৌ কি দেবে? না কি মৃত্যুর প্রহর গুনবে কী মনে হয়?

Hospital
হামের প্রকোপ ঠাঁই মিলছে না হাসপাতালে। ছবি: সংগৃহীত

করোনা থেকে হাম; মনে রাখবেন, যত বড় মহামারি, যত লাশের মিছিল, তত সিস্টেম, তত টাকা, আর ততই লুট। অগোচরে, চিপাচাপায় কর্তারা যে অবৈধ লেনদেন করেন, সেই লেনদেনের পরিমাণ কম হলেও যে ছেলে বা মেয়ে ঘুষ দিয়ে মাসে ৩-৫ হাজার টাকা বেতনের চাকরি রামেক হাসপাতালে করে বা অন্য সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে করে, সে আর যাই হোক সেবক হতে পারে না। আর তার মনের মধ্যে পোষা ক্ষোভ, সব উপচে পড়ে সাধারণ রোগীদের ওপর।

এখানেই শেষ হলেও পারতো। কিন্তু শেষ হয়নি। কিছুদিন আগে, এক জুনিয়র চিকিৎসক বলছিলেন, রাজশাহী মেডিকেলে একটা ওয়ার্ড বয় দিনে যা আয় করে, তা আমার তিন গুণ। এই তামাশাময় হতাশা নিশ্চয় অন্য জুনিয়র ও ইন্টার্ন ডাক্তার এবং নার্সদের মধ্যেও আছে। আপনি কি জানেন, এই হাসপাতালে রোগীদের সরাসরি ডিল করে মূলত এসব জুনিয়র ও ইন্টার্ন ডাক্তার-নার্স। আপনি সাধারণ রোগী হলে হারিকেন দিয়েও সিনিয়রদের লেজ খুঁজে পাবেন না। এবার বলুন তো, ফাঁসিটা কার হওয়া উচিত? আর কে বা নিশ্চিত করবে সে রায়? সে মহাবিচারকের কি জন্ম হয়েছে এ দেশে?

আপনি কি জানেন, ইউনিয়ন পর্যায়ে ওষুধের সাপ্লাই অধিকাংশ সময় থাকে না। এ চিত্র এখনকার না। ওই প্রতিষ্ঠানগুলো তৈরি হওয়ার পর থেকে প্রায় একই চিত্র। কিন্তু আপনি কি জানেন করোনা মহামারিকালে স্বাস্থ্যে প্রকল্পের নামে কী লুটপাট হয়েছে। এগুলো আমার কথা নয়। সরকারের নিজের পর্যবেক্ষনেই সে ভয়াবহ চিত্র নথিবদ্ধ আছে।

আরও পড়ুন

বাংলাদেশ ছাড়াও যেসব দেশের মানুষ হামে আক্রান্ত হচ্ছে

এই ক্রান্তিকালেও পরিকল্পনা কমিশনে নতুন বিল্ডিং তৈরির হাজার কোটির প্রকল্প তৈরি হচ্ছে। বিল্ডিংয়ের মাটি পরীক্ষার ব্যয়ও অর্ধশত কোটি। আর পরামর্শ দিলে তো শতকোটি কোনো কথা ছাড়া।

স্বাস্থ্যসেবা নেই, মানে এত এত ভবন, তাও কন স্বাস্থ্যসেবা নাই! অনেক সেবা। অমুক নেতার উদ্যোগ, স্বাস্থ্য সেবার বিপ্লব। ব্লা ব্লা। মনে রাখবেন, মৃত শিশুরা কিন্তু সৃষ্টিকর্তার আদালতে এরইমধ্যে ৯১টা মামলা করেছে। মামলা সামনে আরও জমবে।

শেষ কথা, মৃত্যু হয় তো পূর্ব নির্ধারিত, কিন্তু মৃত্যুর আগে চিকিৎসা নিয়ে এমন তামাশার প্রতিটি হিসেব কিন্তু একদিন দিতেই হবে। শুধু সময়ের অপেক্ষা। আর এ হিসেব শুধু রামেক হাসপাতালের পরিচালক একা নয়, নাগরিক হিসেবে, নেতা হিসেবে, পলিসি মেকার হিসেবে, পলিসি বাস্তবায়নকারী ও সমর্থনকারী হিসেবেও আপানাকে দিতে হবে। ফাঁসির দড়ি আপনার কতদূর? আমি শুধু নিজের দায়িত্বটুকু পালন করলাম। আশা করি, আপনার দায়িত্বটুকুও অনুধাবন করতে পেরেছেন।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী