ঢাকা মেইল ডেস্ক
০৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:০৩ পিএম
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার বলরামপুরে ‘সাহাপাড়া খাল’ খননের মাধ্যমে দেশব্যাপী নদী-নালা-খাল, জলাধার খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচির উদ্বোধন করেছেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তার জীবদ্দশায় দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচি চালু করেছিলেন। এই কর্মসূচি বাংলাদেশের উন্নয়নের একটি মাইলফলক যা গ্রামীণ অর্থনীতি ও কৃষি উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। এই পদক্ষেপের কারণে একটি দুর্ভিক্ষপূর্ণ অবস্থা থেকে বাংলাদেশ সেই সময় খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছিল।
বর্তমান সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ছিল শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সেই খাল খনন কর্মসূচি পুনরায় চালু করা। সেই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী, নালা, খাল ও জলাধার খনন ও পুনঃখননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগের বাস্তবায়ন দেশের সেচব্যবস্থার উন্নয়ন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং জলাধার সংরক্ষণে যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। তবে বাস্তবায়নের সময় স্থানীয় ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ও বাস্তব বিষয়গুলো বিবেচনায় আনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ তা না হলে অঞ্চল বিশেষ সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক কমে যাবে।
আমাদের দেশে দেখা যায়, সরকার প্রধান বা জনপ্রিয় কোনো ব্যক্তি কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করলে আমলা, রাজনীতিবিদসহ সকলে মুখস্থভাবে তার বাস্তবায়ন শুরু করে। আর এক সময় দেখা যায়, টাকাও খরচ হয় অথচ কাজের কাজ কিছু হয় না। খাল খনন কর্মসূচি শুরু করার সময় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ভূপ্রাকৃতিক, আর্থ-সামাজিক ও বাস্তব সমস্যাগুলো সনাক্ত করা বিশেষ প্রয়োজন। এই অঞ্চলের সংকট জিইয়ে থাকার মূল কারণ হচ্ছে প্রাকৃতিক উপায়ে সমাধান না খোঁজা। কারণ, কপোতাক্ষসহ এ এলাকার নদীগুলো সাগরের সঙ্গে সংযোগ ও জোয়ার–ভাটার সম্পর্ক। জলবায়ু পরিবর্তন বা সাগরের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রভাবের বিষয়টাও এখন জড়িত হয়ে গেছে।
ভাগীরথীও পদ্মা দুই নদীর পলি জমে তৈরি হয়েছিল দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল। ইউনেস্কো স্বীকৃতি বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন এই অঞ্চলে অবস্থিত। বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী এই প্রশস্ত সুন্দরবন যেমন বিশ্বের প্রাকৃতিক বিষয়াবলির অন্যতম, তেমনি এর পার্শ্ববর্তী এলাকার জীব-বৈচিত্র্য ও জনপদ এক সময় তেমন সমৃদ্ধ ছিল। তবে বিগত কয়েক দশক বা তার আগে যে বিশেষ প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীবনধারা ছিল, বর্তমানে তা আর নেই। আগের নদী, খালবিল, নৌকা, কৃষিপণ্য, মাছ, পশুপাখির দেখা মেলে না। সুন্দরী, গেওয়া, কেওড়া, গোলপাতাসহ ম্যানগ্রোভ গাছ ও ঝোপঝাড় দেখা যায় না। জোয়ার-ভাটার খেলা, গয়না নৌকা, টাবুরে নৌকা, পাল নৌকা, ভাটিয়ালি সুরে গান আর নেই। একসময় নদীতে পণ্যবাহী জাহাজ দেখা যেত। ঘাটে ঘাটে ভিড়ত স্টিমার, লঞ্চ। কিছুটা প্রাকৃতিক কারণে আর অধিকাংশটা মনুষ্যসৃষ্ট কারণে সবই নষ্ট হয়ে গেছে।
উল্লেখ্য, এই অঞ্চল অসংখ্য নদী ও তার শাখা-প্রশাখা দিয়ে গঠিত, যার পানি বঙ্গোপসাগরের লবণাক্ত পানিতে মিশে যেত। কপোতাক্ষ, বেতনা, শালতা, মরিচাপ, গোয়ালঘেশিয়া, খোলপেটুয়া ইত্যাদি একসময় প্রবহমান ও গতিশীল ছিল, জনপদের জন্য আশীর্বাদ বয়ে আনত; কিন্তু এখন এগুলো মানুষের জন্য ভয়ঙ্কর হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পলি পড়ে নাব্যতা হারিয়েছে। এখন ঠিকমতো পানি নিষ্কাশিত হয় না। অন্যদিকে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে এই সরু নদীগুলো দিয়ে সাগরের পানি উপরে উঠে আসছে। উপরের উজান প্রবাহ না থাকায় পলি জমে নদী ভরাট প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করছে।
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নদী মৃত্যুর পেছনে প্রধান দুটি কারণ দেখছেন পানি বিশেষজ্ঞরা। প্রথমত, এই অঞ্চলের নদী এবং এর উপনদীগুলো পদ্মা নদী এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য কয়েকটি নদীর সাথে যুক্ত ছিল। পশ্চিমবঙ্গে ফারাক্কা ব্যারেজ এবং আরও কিছু বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে ভারত পানি প্রত্যাহার করায় এ অঞ্চলের নদীগুলো উজানের পানির প্রবাহ ও উৎস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। উজানের পানির অভাবে নদীগুলোর তলদেশে পলি জমে গতি হারিয়েছে।
দ্বিতীয়ত, নদী ও তার পার্শ্বে অপরিকল্পিত বাঁধ ও স্থাপনা নির্মাণ যা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করেছে। বিশেষত, ‘সবুজ বিপ্লব’ নামে ১৯৬০ সালের দিকে শুরু হয় উপকূলীয় এলাকায় বাঁধ নির্মাণের কাজ। ১৯৫৪ এবং ১৯৫৫ সালের উপর্যুপরি ভয়াবহ বন্যার পর বন্যার ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে খাদ্য উৎপাদন বাড়ানের লক্ষ্যে ১৯৫৭ সালে জাতিসংঘের অধীনে গঠিত ক্রগ মিশন’র সুপারিশক্রমে উদ্যোগটি গ্রহণ করা হয়। এই পানিনীতিতে এ অঞ্চলের ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য, নদীর গতি প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য ও জীবনযাত্রার প্রণালীর বিষয়টি বিবেচিত হয়নি। সবুজ বিপ্লব লবণাক্ততা, বন্যা এবং ক্ষয় থেকে নদীর পার্শ্ববর্তী জমিগুলো রক্ষা করতে সক্ষম হলেও নদীগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। আগে জোয়ার-ভাটার সময় পলি নদীর পার্শ্ববর্তী জমিতে ছড়িয়ে পড়ত এবং উর্বরতা বৃদ্ধি করত। কিন্তু বাঁধগুলোর কারণে পলি পার্শ্ববর্তী জমিতে না ছড়িয়ে নদীর তলদেশে জমা করতে থাকে। একসময় দেখা যায়, আশপাশের অববাহিকার চেয়ে অনেক জায়গায় নদীর তলদেশ উঁচু হয়ে গেছে।

এরপর ১৯৮০ এবং ১৯৯০ এর দশকে বাস্তবায়িত খুলনা-যশোর ড্রেনেজ পুনর্বাসন প্রকল্প (কেজেডিআরপি) পরিস্থিতি আরও খারাপ করেছে বলে অনেকে মনে করেন। বিভিন্ন সময়ে অপরিকল্পিতভাবে পোলডার, বাঁধ, বেড়িবাঁধ তৈরি, নদী ও নদীর সাথে সংযুক্ত খালগুলো দখল হয়ে যাওয়ার বিষয়গুলো নদী ভরাটের প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুততর করেছে। কপোতাক্ষের ওপর সেতু রয়েছে ১৬টি। এর মধ্যে ১৫টি সেতু নির্মাণ করা হয়েছে অপরিকল্পিতভাবে। ফলে, এ অঞ্চলের নদী ও তার শাখা প্রশাখাসমূহ মরে গেছে বা যাচ্ছে। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে সুন্দরবনে কোনো নদী থাকবে না বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলা, তালা, কলারোয়া, যশোরের অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুর, খুলনার ডুমুরিয়া, ফুলতলা ও পাইকগাছার মানুষ প্রতি বছর পানিবন্দী হয়ে পড়ছে। একটু ভারি বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা। আর প্রায় দুই যুগ ধরে চলা জলাবদ্ধতার দুঃখ স্থায়ী রূপ পেতে যাচ্ছে। ২০০০ ও ২০১১ সালে এ অঞ্চলে এমন বড় ধরনের বন্যা ও জলাবদ্ধতা হয়েছিল। এর পর থেকে প্রায় প্রতি বছর একই অবস্থা। কপোতাক্ষ, বেতনাপাড়ের ও ভবদহের জনপদের অনেক এলাকা বছরের ৬ মাসেরও বেশি সময় ধরে পানির নিচে থাকে। ফসলের মাঠ, মাছের ঘের, খাল-বিল ও লোকালয় সবই পানিতে একাকার । স্কুল-কলেজ, মাদরাসা বা সরকারি ভবনে আশ্রয় নিয়ে থাকে অনেকে।
জীবন বাঁচানোর মতো খাওয়া-দাওয়াটুকু থাকে না। রান্না করার মতো শুকনো জায়গা থাকে না। কোনো মতে খাবার যোগাড় করতে পারলেও টয়লেট করা বিশাল ঝামেলার। অনেকে উঁচু স্থানে পলিথিন ব্যাগে টয়লেট করে। ঠিকমত না ফেললে, তা আবার ভাসতে ভাসতে ঘরবাড়িতে চলে আসে। মানুষ নিজেরাই যখন মহাবিপদে তখন তাদের গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি নিয়ে আরও এক ঝামেলায়, কোথায় রাখবে তাদের। বিষাক্ত পানির সঙ্গে বসবাসের ফলে অনেকেই চর্ম রোগসহ পানিবাহিত নানা রোগে আক্রান্ত হয়। কৃষি জমি পানির নিচে, বিষাক্ত পানিতে মাছও মারা যায়, কাজকর্মও থাকে না, চারদিকে হাহাকার। অনেকে ভিটেমাটি ছেড়ে আশ্রয় নেয় ভিন্ন কোনো স্থানে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে বা শহর-বন্দরে। এমন যখন অবস্থা এলাকার মানুষের তখন মরেও শান্তি নেই। সব জায়গায় পানি, মাটি খুঁড়ে মরদেহ দাফন করা বা শ্মশানে তোলার কোনো সুযোগও থাকে না। মনে হয় শুধু মানুষের চোখের পানিটুকুই বিশুদ্ধ, আর বাকি সব বিষাক্ত।
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লাখ লাখ মানুষকে রক্ষার জন্য বিভিন্ন সময়ে সরকার নানা প্রকল্প হাতে নিলেও কোন সুফল মিলছে না। বিগত কয়েক দশকে ভবদহ এলাকায় প্রায় এক হাজার কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ২০২০ সালে বেতনা ও মরিচ্চাপ নদীর ভরাট রোধ এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে চার বছর মেয়াদী ৪৭৫ কোটি ২৬ লাখ ১৪ হাজার টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়।

সবচেয়ে বড় হচ্ছে, কপোতাক্ষ নদের জলাবদ্ধতা দূরীকরণ প্রকল্পের ১ম পর্যায় ও ২য় পর্যায়। স্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতা নিরসনে বিগত চারদলীয় জোট সরকার একটি প্রকল্পের উদ্যোগ নেয়। সেই উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় ড. ফখরুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ১৪০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করে। পরবর্তী সময়ে ২০১১ সালে শেখ হাসিনা সরকার প্রকল্প ব্যয় বাড়িয়ে ২৬১ কোটি ৫৪ লাখ ৮৩ হাজার টাকা করে এবং নাম দেওয়া হয় ‘কপোতাক্ষ নদের জলাবদ্ধতা দূরীকরণ প্রকল্প (১ম পর্যায়)’। প্রকল্পটি ২০১৭ সালের জুনে শেষ হয়। প্রকল্পটির প্রধান দুটি বিষয় ছিল নদী খনন এবং টিআরএম বাস্তবায়ন। খনন কাজ ও টিআরএম বাস্তবায়নে পাখিমারা বিলে পলি অবক্ষেপিত হয়ে কপোতাক্ষ কিছুটা গতিশীল হলেও তা আবার পূর্বের অবস্থায় ফিরে যাচ্ছে।
প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের অগ্রগতি অব্যাহত রাখার স্বার্থে ৫৩১ কোটি ৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়ে জুলাই ২০২০ থেকে জুন ২০২৪ পর্যন্ত প্রকল্পের ২য় পর্যায় গ্রহণ করে সরকার। প্রকল্পের ২য় পর্যায়ের বিষয়টি খাতা কলমে থাকলেও, অর্থ ছাড়সহ নানা জটিলতার কারণে বাস্তবায়নের আর কোন লক্ষণ দেখা যায়নি।
উল্লেখ্য যে, নদী খনন, পেরিফেরিয়াল বাঁধ সংস্কার, টিআরএম চালু করাসহ এই প্রকল্পের নানা কাজ নিয়ে অনেক প্রশ্ন দেখা যায়। প্রথম থেকে বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় লোকদের দাবি ছিল, যেহেতু বিষয়টি এই এলাকার মানুষের জীবনমরণ সম্পর্কিত; অতএব প্রকল্পটি যথাযথ বাস্তবায়ন করতে হবে। কোনও প্রকার নয়ছয় সহ্য করা হবে না। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় সেটাই ঘটেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের নামে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল ও ঠিকাদারসহ একটি স্বার্থবাদী চক্রের অবৈধ অর্থ উপার্জনের ক্ষেত্রে পরিণত হয়।
প্রথম থেকে অভিযোগ ওঠে, কপোতাক্ষ নদের মূল ডিজাইন অনুযায়ী খনন, পলি অপসারণ ও অন্যান্য কাজ করা হয়নি। খননে খননযন্ত্র ব্যবহারের কোনও অবকাশ ছিল না, ম্যানুয়ালি করার কথা ছিল, কিন্তু তা মানা হয়নি। ঝুড়ি-কোদাল দিয়ে নদ খননের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল, কিন্তু সেটাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করা হয়। প্রকল্পের বছর অনুযায়ী কাজ ঠিকমত শুরু ও শেষ না করা ছিল স্বাভাবিক ব্যাপার।
দখলকৃত জমি পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে নদীর সীমানা চিহ্নিত করে, কাদা এবং পলি নদের তলদেশের পরিবর্তে সঠিক সীমানায় রাখার কথা ছিল। অনেক জায়গায় গেছে কোনমতে খনন করে মাটি নদের মধ্যেই রাখা হয়েছে। ফলে বৃষ্টিতে মাটি আবার নদে এসে পড়ছে। না হয় কৃষকের জমি নষ্ট করছে। কোথাও যতটুকু খননের কথা, সেটা না করারও অভিযোগ রয়েছে। অপরিকল্পিত সেতুর কারণে অনেক স্থানে খনন করা যায়নি। কচুরিপানা পরিষ্কারের কথা থাকলেও তা সরানো হয়নি। বৃক্ষরোপণের কথা থাকলেও অনেক স্থানে নদের তীরে কোথাও গাছ লাগাতে দেখানো যায়নি। আর এই সব অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে আইএমইডি প্রতিবেদনে। ইস্কার্ফ কনসালটিং সার্ভিসেস নামের একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান প্রতিবেদনটি তৈরি করে। তাছাড়া বিষয়গুলো নিয়ে দেশের গণমাধ্যমগুলো অসংখ্য প্রতিবেদনও প্রকাশ করেছে।
কপোতাক্ষ প্রকল্পের সুফল না পাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হল সমন্বয়হীনতা। একটা প্রকল্প তৈরি করা, কিছু কাজ করা আর টাকা ছাড়-উত্তোলন করাই প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, দফতর, অফিস, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সংগঠন ও স্থানীয় ব্যক্তিদের মধ্যে সমন্বয় ছিল না। একদিকে কোটি কোটি টাকা খরচ করে নদী খনন করা হচ্ছে, অন্যদিকে সেই নদীর প্রাণ ছোট ছোট খালগুলোকে ইজারা দেওয়া ও দখলের মহোৎসব।
অনেকের মতে, উজানের সাথে কপোতাক্ষের সংযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। পদ্মার পানি পেলে নদী স্বয়ংক্রিয়ভাবেই খনন হয়ে যাবে। মাথাভাঙ্গা নদীর সাথে ভৈরব নদীর একটি সংযোগ তৈরি করে উজানের পানি ভৈরব এবং কপোতাক্ষে নিয়ে আসার প্রস্তাবটি সরকারী দপ্তরে ফাইলবন্দী রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। আবার উৎপত্তিগত কারণে পদ্মার সাথে কপোতাক্ষের সংযোগ দেওয়া বেশ জটিল। কপোতাক্ষ নদ ভৈরব নদীর একটি শাখা নদী। এখানে আবার যুক্ত আছে ইছামতী আর মাথাভাঙ্গা নদী। মাথাভাঙ্গা নদী দর্শনা থেকে ভারতে চলে গেছে। ভারত তাদের অংশ বন্ধ করে দিয়েছে। আবার অর্থ খরচ করে প্রকল্প করে পদ্মার সাথে সংযোগ দিলেও উজানের পানি পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। ফারাক্কা বাঁধের কারণে পদ্মা শুষ্ক মৌসুমে এমনিতেই পানি পায় না। যে কারণে দেশের বৃহত্তম গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পের পাম্পগুলো অচল হয়ে পড়ে আছে।
ইজারা দেওয়া হয় দেশে এমন জলমহালের সংখ্যা ৩৮ হাজারের কিছুটা বেশি যার মধ্যে রয়েছে অসংখ্য খাল ও ছোট নদী। এসব জলমহালের ইজারার ক্ষেত্রে স্থানীয় ও রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের প্রভাব খাটানোর অভিযোগ রয়েছে। মাছ চাষ সুবিধা ও লাভজনক হওয়ায় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে প্রভাবশালী ও সিন্ডিকেটের তৎপরতা বেশি দেখা যায়।

খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, সাতক্ষীরা জেলায় ২০ একর আয়তনের উর্দ্ধে জলমহলের সংখ্যা রয়েছে ৪০টি, যার মোট আয়তন ১৫৮৬.১৪ একর। আর ২০ একরের নীচে জলমহলের সংখ্যা ৩৪৯টি, যার মোট আয়তন ২৭৩৩.৩৭ একর। তাছাড়া রয়েছে অনেক খাস জমি। অভিযোগ রয়েছে, সরকারের ভুলনীতি, অবহেলা ও ব্যক্তিস্বার্থের কারণে এগুলোর অনেকটা বেদখল হয়ে গেছে। পুরো অঞ্চলব্যাপী গড়ে উঠেছে নদী-খাল-জলমহাল-খাস জমি জালিয়াতি ও দখলকারী চক্র। খাল বা নদী কারোর ব্যক্তিগত সম্পত্তি হতে পারে না। তবে দেখা যায়, অনেকে বিভিন্ন জাল কাগজপত্র তৈরী করে দীর্ঘদিন ধরে ভোগদখল করে আসছে। আর একবার আদালতে উঠাতে পারলে যুগের পর যুগ মামলা চলে, সরকার আর ফিরে পায় না। আর দেশে একটা কথা প্রচলিত আছে, সরকারবাদী মামলায় সরকার জিততে পারে না। অনেকে রাজনৈতিক প্রভাবে বা টাকার বিনিময়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের অফিস বা সচিবালয় থেকে নদী-খাল-জলমহাল দীর্ঘমেয়াদী, ৯৯ বছরের জন্য বা চিরস্থায়ীভাবে ইজারা নিয়ে আসে। সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে নামমাত্র মূল্যে এসব জলমহাল ডেকে নেয়। পরে আবার অন্য মানুষের কাছে সাব লিজ দিয়ে বড় অংকের টাকা আদায় করে। ইজারা নেওয়ার পর সেগুলো অনেকে আবার খণ্ড খণ্ড করে বা স্থায়ী স্থাপনা তৈরি করে একেবারে পৈতৃক সম্পত্তিতে পরিণত করে।
জেলা ও উপজেলা পর্যায় থেকে ইজারা দেওয়া হয়। তবে রাজনৈতিক প্রভাবশালী, মাস্তান বাহিনী ও দুর্নীতিবাজদের কারণে সাধারণ কৃষক ও প্রান্তিক মৎস্যজীবীরা ইজারা প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে পারে না। আর অংশগ্রহণ করলেও প্রভাবশালীদের পাশ কাটিয়ে জলমহাল ইজারা নেওয়ার ক্ষমতা তাদের থাকে না।এমন বাস্তবতা থেকে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার এক সময় ‘জাল যার জলা তার’ এমন নীতি গ্রহণ করলেও প্রকৃত মৎস্যজীবী ও সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাছাড়া জলমহালের ইজারা পেতে অনলাইনে আবেদন ও মৎস্যজীবী সমিতির নামে ইজারা দেওয়ার নিয়ম করলেও ভাল ফল মেলেনি। বিশেষ করে মৎস্যজীবী সমিতির নিয়মটি একটি কাগজে সার্টিফিকেটে পরিণত হয়।
এটাই এই অঞ্চলের বাস্তবতা যে, ইজারা দেওয়ার সময় সাধারণ মানুষের স্বার্থে সরকার বেশকিছু নিয়ম-কানন বেঁধে দেয় তবে প্রভাবশালীরা এক সময় সব কিছু উল্টায়ে দেয়। পানি সেচ ও নিস্কাশনের জন্য সাধারণ কৃষকরা এসব খাল ও নদীর ধারে কাছে যেতে পারে না। এসব নিয়ে অনেক সময় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে থাকে।
মোট কথা এই অঞ্চলের শতশত খাল, ছোট নদী ও জলমহালের উপর কোন সময় সাধারণ কৃষক ও প্রান্তিক মৎস্যজীবীদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এমন বাস্তবতায় শুধু খাল খনন করলে কৃষকের কোন উপকারে আসবে কিনা সেটা নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে। এ সব বিষয়ের সমাধান না করলে দেখা যাবে জনগণের টাকা দিয়ে খননকৃত খালে মাছ চাষের জন্য প্রভাবশালী ও মাস্তান বাহিনীর দৌরাত্ম্য বেড়েই চলেছে।
অতএব খাল খনন কর্মসূচি শুরু করার সময় দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের ভূপ্রাকৃতিক, আর্থ-সামাজিক ও বাস্তব সমস্যাগুলো বিবেচনায় আনা এখন সময়ের দাবি। বিদ্যমান সংকট সমাধানে গবেষণাভিত্তিক ও যথাযথ মনোযোগ দিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করা প্রয়োজন।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী