images

মতামত

নতুন সংসদ, নতুন এমপি: সংসদের ভেতরের বাস্তবতা ও করণীয়

০১ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৩৬ পিএম

বাংলাদেশের চলমান ত্রয়োদশ সংসদ অধিবেশন এমন এক বাস্তবতার প্রতিফলন, যেখানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নতুন সংসদ সদস্য (এমপি) প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদের কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন। নতুন মুখ, নতুন প্রত্যাশা এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা, সব মিলিয়ে এটি গণতন্ত্রের জন্য যেমন একটি সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে, তেমনি কিছু কাঠামোগত দুর্বলতাও স্পষ্ট করে তুলেছে। প্রশ্নটি তাই কেবল নতুন এমপিদের দক্ষতা নিয়ে নয়; বরং সংসদকে একটি কার্যকর, জবাবদিহিমূলক এবং নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করার সক্ষমতা নিয়েও।

সংসদ এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি আচরণ এবং প্রতিটি সিদ্ধান্ত রাষ্ট্র পরিচালনার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব তৈরি করে। কিন্তু চলমান অধিবেশনের বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়- সংসদীয় ভাষা, আচরণ, প্রক্রিয়া এবং নীতিগত বিতর্ক সব ক্ষেত্রেই এখনও একটি শেখার প্রক্রিয়া চলছে। নতুন এমপিদের জন্য এটি স্বাভাবিক হলেও, সমস্যা তখনই তৈরি হয় যখন এই অনভিজ্ঞতা সংসদের সামগ্রিক কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করতে শুরু করে।

প্রতিবেশি ভারতে নবীন পার্লামেন্ট সদস্য ও রাজ্য বিধান সভাগুলোর সদস্য, বিশেষ করে যারা প্রথমবার নির্বাচিত হন, তাদের প্রশিক্ষণের জন্য পার্লামেন্টের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক ইন্সটিটিউট ও ব্যুরো রয়েছে, যেখানে সদস্যরা সংসদ বিশেষজ্ঞ, অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান, সাবেক ও বিদ্যমান মন্ত্রী, সাংবিধানিক আইন বিশেষজ্ঞ, সিনিয়র ব্যুরোক্রেটস, গণমাধ্যমের সম্পাদক ও বহু বছর পার্লামেন্ট কভার করে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন, তারা রিসোর্সপারসন হিসেবে আসেন, তাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন, হাতেকলমে আইন প্রণয়ন কার্যাবলী শেখান। শুধু নবীন পার্লামেন্টারিয়ানরাই নন, পার্লামেন্টের নবীন ও মাঝারি পর্যায়ের অফিসাররা, ভারতীয় ও বিদেশি সাংবাদিকরাও এসব প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করেন।

এসবের মধ্যে রয়েছে ‘পার্লামেন্টারি এন্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ রিসার্চ ইন্সটিটিউট (পারি), ‘ইন্সটিটিউট অফ কন্সটিটিউশনালা এন্ড পার্লামেন্টারি স্টাডিজ (আইসিপিএস), ‘ব্যুরো অফ পার্লামেন্টারি স্টাডিজ এন্ড ট্রেনিং এবং পার্লামেন্টারি রিসার্চ এন্ড ট্রেনিং ইন্সটিটিউট ফর ডেমোক্রেসিস’ (পিআরআইডিই)। প্রতিষ্ঠানগুলো নয়াদিল্লিতে পার্লামেন্ট কমপ্লেক্স এলাকায় অবস্থিত এবং লোকসভা সচিবালয় কর্র্তৃক পরিচালিত। কিন্তু বাংলাদেশ এসব প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট এবং প্রশিক্ষণ অনুপস্থিত। 

প্রথমেই আসা যাক সংসদীয় ভাষা ও আচরণ প্রসঙ্গে। সংসদে বক্তব্য রাখা মানে কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য প্রদান নয়; এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব। ত্রয়োদশ সংসদে দেখা যাচ্ছে, বিতর্কের উত্তাপে ব্যক্তিগত আক্রমণ, অসংসদীয় শব্দের ব্যবহার কিংবা স্পিকারকে যথাযথভাবে সম্বোধন না করার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে। এটি শুধু শালীনতার প্রশ্ন নয়, বরং সংসদের মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্ন। মনে রাখতে হবে, সংসদের প্রতিটি বক্তব্য হ্যানসার্ড (Hansard) -এ সংরক্ষিত হয়, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি রেফারেন্স। সুতরাং আবেগ নয়, যুক্তি ও শালীনতাই হওয়া উচিত সংসদীয় বক্তব্যের মূল ভিত্তি।

সংসদীয় কার্যপ্রণালী সম্পর্কে সীমিত ধারণাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। পয়েন্ট অব অর্ডার (Point of Order), পয়েন্ট অব ইনফরমেশন (Point of Information), রাইট অব রিপ্লাই (Right of Reply), কলিং অ্যাটেনশন নোটিশ (Calling Attention Notice), অ্যাজার্নমেন্ট মোশন (Adjournment Motion)- এসব টুল কেবল নিয়ম নয়, বরং কার্যকর সংসদীয় হস্তক্ষেপের মাধ্যম। কিন্তু বাস্তবে অনেক এমপি এসব ব্যবহারে দ্বিধাগ্রস্ত বা অনভিজ্ঞ। ফলে জরুরি জাতীয় ইস্যুগুলো সঠিকভাবে সংসদে উত্থাপিত হচ্ছে না, অথবা অপ্রাসঙ্গিকভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে। 

কোয়েশ্চন আওয়ার (Question Hour) বা প্রশ্নোত্তর পর্বের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা যাচ্ছে। অনেক প্রশ্নই হয় সাধারণ, প্রস্তুতিহীন বা প্রাসঙ্গিকতার অভাব রয়েছে। ইন্টারপেলেশন (Interpellation)-এর মতো গভীর অনুসন্ধানমূলক প্রশ্নের ব্যবহার খুবই সীমিত। অথচ একটি সুপরিকল্পিত প্রশ্ন মন্ত্রণালয়কে জবাবদিহিতার মুখোমুখি করতে পারে, নীতিগত দুর্বলতা তুলে ধরতে পারে এবং প্রশাসনিক সংস্কারের পথ খুলে দিতে পারে। নতুন এমপিদের এখানে গবেষণাভিত্তিক প্রস্তুতির উপর গুরুত্ব দিতে হবে।

বাজেট ও আর্থিক প্রক্রিয়া সংসদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। জাতীয় বাজেট, ডিমান্ড ফর গ্রান্টস (Demand for Grants), কাট মোশন (Cut Motion), অ্যাপ্রোপ্রিয়েশন বিল (Appropriation Bill), ফাইন্যান্স বিল (Finance Bill)-এসব বিষয় শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং রাজনৈতিক অগ্রাধিকার ও উন্নয়ন কৌশলের প্রতিফলন। এখনো এই সংসদের বাজেট অধিবেশন শুরু না হলেও, বাস্তবে বাজেট আলোচনায় বেশীরভাগ সময় গভীরতা ও বিশ্লেষণের অভাব দেখা যায়। পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি (Public Accounts Committee - PAC) এবং অডিট ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকারি ব্যয়ের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার সুযোগ থাকলেও তা পুরোপুরি কাজে লাগানো হয় না।

সংসদের ভেতরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো ফ্লোর সিস্টেম ও দলীয় রাজনীতি। হুইপ সিস্টেম (Whip System) দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখে, কিন্তু একই সঙ্গে ব্যক্তিগত মত প্রকাশের ক্ষেত্র সংকুচিত করে। গভর্নমেন্ট (Government) ও অপোজিশন (Opposition) -এর মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ ও গঠনমূলক বিতর্কের পরিবর্তে অনেক সময় একপাক্ষিকতা বা অনুপস্থিতি দেখা যায়। কোরাম (Quorum) সংকট, ভয়েস ভোট (Voice Vote) -এর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং ডিভিশন (Division) -এর সীমিত ব্যবহার সংসদের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া নতুন এমপিদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু জটিল ক্ষেত্র। একটি বিলের ফার্স্ট রিডিং (First Reading), সেকেন্ড রিডিং (Second Reading), থার্ড রিডিং (Third Reading) এবং স্ট্যান্ডিং কমিটি রিভিউ (Standing Committee Review) -এসব ধাপ কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়; এগুলো আইনের গুণগত মান নিশ্চিত করার প্রধান মাধ্যম। কিন্তু বাস্তবে অনেক বিল পর্যাপ্ত আলোচনা বা সংশোধন ছাড়াই পাস হয়ে যায়। প্রাইভেট মেম্বার্স বিল (Private Member’s Bill) -এর সুযোগ প্রায় অপ্রয়োগিত থেকে যায়, যা নতুন এমপিদের সক্রিয় অংশগ্রহণের একটি বড় ক্ষেত্র হতে পারে।

সংসদের কমিটি সিস্টেম -বিশেষ করে স্ট্যান্ডিং কমিটি (Standing Committee) এবং পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি (PAC) -সংসদের নীরব কিন্তু শক্তিশালী স্তম্ভ। এখানে বিস্তারিত আলোচনা, বিশ্লেষণ এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে কমিটির বৈঠকে উপস্থিতি কম, প্রস্তুতি অপর্যাপ্ত এবং সুপারিশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি সীমিত।

এদিকে একজন এমপির বাস্তবতা সংসদের বাইরেও বিস্তৃত। নির্বাচনী এলাকার উন্নয়ন, ভোটারদের প্রত্যাশা, জনঅভিযোগ নিষ্পত্তি -এসব সামলাতে গিয়ে অনেক এমপি সংসদে উপস্থিতি ও সক্রিয়তায় পিছিয়ে পড়েন। কিন্তু একজন এমপির মূল দায়িত্ব দ্বিমুখী—সংসদে নীতি নির্ধারণ এবং এলাকায় জনগণের প্রতিনিধিত্ব।

এই প্রেক্ষাপটে নতুন এমপিদের জন্য নিম্নোক্ত বিষয় কিছু মৌলিক করণীয় হতে পারে- 

প্রথমত, সংসদীয় নিয়ম-কানুন ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে গভীর ধারণা অর্জন করতে হবে। নিয়মিত প্রশিক্ষণ, ওরিয়েন্টেশন এবং অভিজ্ঞ এমপিদের কাছ থেকে শেখার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
দ্বিতীয়ত, প্রতিটি বক্তব্য, প্রশ্ন বা প্রস্তাবের আগে গবেষণাভিত্তিক প্রস্তুতি নিতে হবে। এভিডেন্স-বেইজড পলিসি মেকিং (Evidence-based Policy Making) ছাড়া আধুনিক সংসদে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব নয়।
তৃতীয়ত, সংসদীয় ভাষা ও আচরণে শালীনতা বজায় রাখতে হবে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও তা যেন কখনো ব্যক্তিগত আক্রমণে পরিণত না হয়।
চতুর্থত, কোয়েশ্চন আওয়ার (Question Hour)-কে গুরুত্ব দিয়ে ব্যবহার করতে হবে। সুনির্দিষ্ট, তথ্যভিত্তিক এবং অনুসন্ধানমূলক প্রশ্নের মাধ্যমে মন্ত্রণালয়গুলোকে জবাবদিহিতায় আনতে হবে।
পঞ্চমত, বাজেট আলোচনায় সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে হবে। ডিমান্ড ফর গ্রান্টস (Demand for Grants), কাট মোশন (Cut Motion) -এর মতো টুল ব্যবহার করে বাস্তবিক প্রভাব তৈরি করা সম্ভব।
ষষ্ঠত, কমিটি সিস্টেমকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। এখানে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাস্তব পরিবর্তন আনা সম্ভব।
সপ্তমত, প্রাইভেট মেম্বার্স বিল (Private Member’s Bill) ও অ্যামেন্ডমেন্ট প্রোসিডিউর (Amendment Procedure) ব্যবহার করে আইন প্রণয়নে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
অষ্টমত, দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রেখেও জনগণের স্বার্থে গঠনমূলক সমালোচনা করতে হবে।
নবমত, সংসদ ও নির্বাচনী এলাকার মধ্যে সময় ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা অর্জন করতে হবে।
দশমত, কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট (Conflict of Interest) এড়িয়ে স্বচ্ছতা ও নৈতিকতা বজায় রাখতে হবে।
একাদশত, ডিজিটাল টুল, ডাটা ও গবেষণা ব্যবহার করে নীতিনির্ধারণে আধুনিকতা আনতে হবে।
দ্বাদশত, হ্যানসার্ড (Hansard) নিয়মিত পর্যালোচনা করে নিজের বক্তব্যের মান উন্নত করতে হবে।
ত্রয়োদশত, আন্তর্জাতিক সংসদীয় চর্চা—বিশেষ করে ওয়েস্টমিনস্টার মডেল (Westminster Model) থেকে শেখার চেষ্টা করতে হবে।
চতুর্দশত, জনগণের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রেখে তাদের সমস্যাগুলো সংসদে তুলে ধরতে হবে।
পঞ্চদশত, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারেও দায়িত্বশীলতা বজায় রাখতে হবে, যাতে সংসদের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকে।

সবশেষে বলা যায়, নতুন সংসদ এবং নতুন এমপিদের এই যাত্রা একদিকে যেমন চ্যালেঞ্জিং, অন্যদিকে তেমনি সম্ভাবনাময়। সংসদের ভেতরের বাস্তবতা যতই জটিল হোক না কেন, সঠিক দিকনির্দেশনা, দক্ষতা এবং সদিচ্ছা থাকলে একটি কার্যকর, জবাবদিহিমূলক এবং জনগণমুখী সংসদ গড়ে তোলা সম্ভব।
গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি সংসদের মধ্যেই নিহিত। আর সেই শক্তিকে কার্যকর রূপ দিতে হলে নতুন এমপিদের কেবল রাজনৈতিক নেতা নয়, বরং দক্ষ আইনপ্রণেতা, দায়িত্বশীল নীতিনির্ধারক এবং সচেতন জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই নতুন সংসদ সত্যিকার অর্থে নতুন আশার প্রতীক হয়ে উঠবে।

লেখক: নির্বাহী পরিচালক, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স এন্ড ডেভেলপমেন্ট - সিজিডি
সিন্ডিকেট সদস্য, রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়