images

মতামত

চাপ নয়, প্রয়োজন সঠিক মূল্যায়ন: শিশুদের ভর্তি পদ্ধতি নিয়ে ভাবনা

১৮ মার্চ ২০২৬, ০৭:০৯ এএম

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় কারিকুলাম পরিবর্তন এবং ভর্তি পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ২০২১ সালে প্রাথমিক স্তরে নতুন কারিকুলাম প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত চালু করা হয়। পরবর্তীতে একই কারিকুলাম বহাল রেখে ২০২৬ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে তা সম্প্রসারণ করেছে। এর মধ্যেই নির্বাচিত সরকার ২০২৭ সালে আবারও কারিকুলাম পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছে।

বারবার এই পরিবর্তনের মধ্যেও একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—শিক্ষানীতি চূড়ান্তভাবে প্রণয়ন ও অনুমোদন ছাড়া নতুন কারিকুলাম চালু করা কতটা যৌক্তিক? একটি সুস্পষ্ট নীতিমালার অনুপস্থিতিতে কারিকুলাম বাস্তবায়ন দীর্ঘমেয়াদে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়।

এদিকে প্রাথমিক স্তরে ভর্তি পরীক্ষার সম্ভাব্য পুনঃপ্রবর্তনের আলোচনা নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রাথমিক শিক্ষা একটি মৌলিক ও সর্বজনীন অধিকার হিসেবে স্বীকৃত। অধিকাংশ উন্নত দেশে এই স্তরে ভর্তি পরীক্ষার প্রচলন নেই; বরং সকল শিশুর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই বাস্তবতায় প্রাথমিক স্তরে প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি পরীক্ষা চালুর উদ্যোগ আন্তর্জাতিক প্রবণতার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা ভেবে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।

শিশু মনোবিজ্ঞানের আলোকে দেখা যায়, ৬ থেকে ৮ বছর বয়সী শিশুদের মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ সমান হয় না। এই বয়সে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে “মেধা” নির্ধারণ করা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। এতে পিছিয়ে থাকা শিশুরা আরও পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়ে এবং শিক্ষায় বৈষম্য বাড়তে পারে। ফলে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

একইসঙ্গে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নের বিষয়টিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক ছাড়া কোনো কারিকুলামই কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। উন্নত দেশগুলোতে প্রাথমিক স্তরে অভিজ্ঞ ও উচ্চশিক্ষিত শিক্ষক নিয়োগ এবং শিশু-কেন্দ্রিক প্রশিক্ষণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই দিকটি আরও জোরদার করা জরুরি।

ভর্তি প্রক্রিয়া একটি শিশুর শিক্ষাজীবনের সূচনা নির্ধারণ করে। তাই এই প্রক্রিয়াকে হতে হবে বয়সোপযোগী, মানবিক এবং বাস্তবসম্মত। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যায়ের শিশুদের ক্ষেত্রে ভর্তি পরীক্ষার পরিবর্তে লটারি পদ্ধতি তুলনামূলকভাবে চাপমুক্ত ও ন্যায়সংগত ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এতে অল্প বয়সে প্রতিযোগিতার অপ্রয়োজনীয় চাপ এড়ানো সম্ভব হয়।

তবে শুধুমাত্র লটারির ওপর নির্ভর করাও যথেষ্ট নয়। লটারিতে নির্বাচিত শিশুদের জন্য একটি প্রাথমিক মূল্যায়ন বা অ্যাসেসমেন্ট চালু করা যেতে পারে, যা প্রতিযোগিতামূলক নয়; বরং পর্যবেক্ষণমূলক। এর মাধ্যমে শিশুদের ভাষা বোঝা, মনোযোগ, সামাজিক আচরণ ও শেখার প্রস্তুতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে এবং শিক্ষকরা সেই অনুযায়ী পাঠদান পদ্ধতি নির্ধারণ করতে পারবেন।

অন্যদিকে, উচ্চতর প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে (তৃতীয় থেকে নবম শ্রেণি) একটি স্বচ্ছ ও পাঠ্যবইভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষা বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে প্রশ্নপত্র অবশ্যই নির্ধারিত পাঠ্যক্রমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা প্রয়োজন, যাতে কোচিং নির্ভরতা কমে এবং শিক্ষার্থীরা মূল পাঠ্যবইয়ের ওপর গুরুত্ব দেয়।

শিক্ষার্থী-শিক্ষক অনুপাত কমিয়ে আনা, পর্যাপ্ত অবকাঠামো নিশ্চিত করা এবং মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগ—এসব বিষয়ও সমান্তরালভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। তা না হলে কোনো ভর্তি পদ্ধতিই কাঙ্ক্ষিত ফল বয়ে আনবে না।

সর্বোপরি, একটি টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে ভর্তি প্রক্রিয়ায় ভারসাম্য আনতে হবে। ছোটদের জন্য চাপমুক্ত পদ্ধতি এবং বড়দের জন্য স্বচ্ছ ও পাঠ্যক্রমভিত্তিক মূল্যায়ন—এই সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গিই হতে পারে সময়োপযোগী সমাধান।

লেখক: শিক্ষক ও শিক্ষা আন্দোলনকর্মী