ঢাকা মেইল ডেস্ক
২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০২:৪৭ পিএম
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় পাক গুপ্তচর সংস্থা আই এস আই ও ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থা ‘র’ নিয়ে কিছু কথা মনে পড়ল। বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় প্রতিরক্ষা ও গুপ্তচরবৃত্তি নিয়ে ভিন্ন ধারার সূত্রপাত আমার হাত দিয়েই হয়েছে। এনিয়ে যতটুকু পারি পড়াশোনা করা ও জানার চেষ্টা এখনো করি। আফগানিস্তানে পাকিস্তানের নিজ হাতে তৈরি দানবকে কীভাবে ভারতের গুপ্তচর সংস্থা কাজে লাগাচ্ছে অবাক হয়ে সেটা দেখছি গত ক’মাস হলো।
গত কয়েক দিন আগে পাকিস্তান আফগানিস্তানের ভেতরে বিমান আক্রমন করেছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, তেহরিকে তাালিবান পাকিস্তান-টিটিপি’র কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসীর বাড়ি বা আস্তানা লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়। এতে যেসব বাড়িতে পরিবার পরিজন নিয়ে টিটিপি’র সন্ত্রাসীরা থাকতো সেখানে বেসামরিক মানুষও প্রাণ হারায়। এখন তো রীতিমতো যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। আফগানিস্তান পাকিস্তানের পশ্চিম সীমান্তের কয়েকটি পোস্টে হামলা চালিয়েছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী তো বটেই বিমানবাহিনীও কাবুল, কান্দাহারসহ কয়েকটি জায়গায় সামরিক স্থাপনায় বোমা বর্ষণ করেছে। গোলাবারুদাগার উড়িয়ে দিয়েছে। তালিবানের আঞ্চলিক হেডকোয়ার্টারও ধ্বংস করেছে।
এই ঘটনাগুলোকে আবার ভারতীয় মিডিয়া তো বটেই বাংলাদেশের কয়েকটি মিডিয়া এমনভাবে প্রচার করেছে যে, রমজান মাসে একটি ইসলামি দেশে হামলা চালিয়েছে পাকিস্তান। ভারতের মিডিয়া যে কথাগুলোকে বিশ্বাস করাতে চায় অদ্ভুতভাবে সেই কথাগুলোই গিলছে অনেকে। স্বভাবতই এমন কোনো হামলা দুটি মুসলিম দেশের মধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত ও মেনে নেওয়ার মতো নয়। কিন্তু ঘটনা তো ঘটছে।
বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, বেশির ভাগ মিডিয়ায় বলা হচ্ছে না যে কেন পাকিস্তান এই ভয়াবহ হামলা চালালো আফগানিস্তানে? এর প্রেক্ষিত কী?
তবে তা আলোচনা করার আগে এক কথায় বলা যায়, নিজের তৈরি ফ্রানকেনস্টাইনের থাবার মুখে পড়েছে পাকিস্তান। এখন সেই দানবকে শেষ করার জন্য যুদ্ধও করতে হচ্ছে। আর পাকিস্তানের তৈরি দানবকে খুব সুন্দরভাবে কাজে লাগাচ্ছে ভারত নিরাপদ দূরত্বে বসে।
একসময় যে তালেবানকে কথিত স্ট্র্রাটেজিক এসেট হিসেবে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা তৈরি করেছে সেই তালেবানই পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তার এখন সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২১ সালে ক্ষমতায় আসার পর নিজেরা সরাসরি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে না জড়িয়ে ব্যবহার করেছে তেহরিকে তালিবান পাকিস্তানের মতো সংগঠনকে।
টিটিপি আফগানিস্তানকে বেশ ধরে সেখানে অবস্থান করে, প্রশিক্ষণ নেয় ও পশ্চিম সীমান্তে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীই শুধু নয়, সিভিলিয়ানদেরও টার্গেট করে যখন তখন হামলা পরিচালনা করে থাকে। গত ৬ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে জুমার নামাজের সময় একটি মসজিদে আত্মঘাতী বোমা হামলা করে ৪০ জন মুসল্লিকে হত্যা করা হয়। ওই আত্মঘাতী বোমারুর ট্রেস পাওয়া যায় আফগানিস্তানে। এরপর অব্যাহতভাবে খাইবার পাখতুনখোয়ার বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ সব হামলা চালায় টিটিপি যাতে সেনাবাহিনীর একজন লেফটেন্যান্ট কর্নেলসহ কয়েকজন অফিসার ও সৈনিক নিহত হয়। গত ২২ ফেব্রুয়ারিও দুই এলাকায় হামলা করে সীমান্ত রক্ষী ফ্রন্টিয়ার কন্সটাবুলারি-এফসি’র চারজনকে হত্যা করে। এরপর আরো কয়েক জায়গায় পুলিশসহ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর অফিসার, সৈনিকরাও নিহত হয়। এদের মধ্যে ধরা পড়ে কয়েকজন আত্মঘাতী বোমা হামলাকারী যার মধ্যে একজন নারী সদস্যও পাওয়া যায়।
ভারত কীভাবে তালেবান সরকারকে প্রক্সি হিসেবে কাজে লাগাচ্ছে তা বুঝতে হলে হয়ত সবচেয়ে বড় উদাহরণ হতে পারে গত বছরের ৭ মে’র একটি ঘটনা। সেদিন পাকিস্তান ভারতের সাথে ভয়াবহ যুদ্ধ লড়ছে। আর একইসময় পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে টিটিপির কয়েকশ’ সন্ত্রাসী পাক বাহিনীর ওপর আক্রমণ করে বসে। এর ফলে পাক সেনাবাহিনীর পুরো একটি মেকানাইজড ব্রিগেডকে দিনভর যুদ্ধ করতে হয়। ওই যুদ্ধে নিহত হয় ৫৪ জন সন্ত্রাসী যার মধ্যে একজন বাংলাদেশিও ছিল। ওই ঘটনায় স্পষ্ট হয়ে যায় যে, পূর্ব সীমান্তে পাক বাহিনীর আক্রমণের চাপ কমাতে ভারতীয় ইন্ধনেই টিটিপি’র সন্ত্রাসী সময়, ক্ষণ ধরে ওই দিনই পাকিস্তান আক্রমণ করে। এটাকে প্রক্সি ওয়ার বলা যায়। টিটিপি হলো ভারতের প্রক্সি যাদের আফগানিস্তানে নিরাপদে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছে তালেবান সরকার। তালেবানের শীর্ষ নেতা অবশ্য এর মাঝে ভারতেও সফর করেন ও প্রকাশ্যে তাদের পাকিস্তান বিরোধিতার কথা জানিয়ে দেন।
এখন প্রশ্ন হলো, তালেবান কেন এমন আচরণ করছে? একসময় সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর আফগানিস্তানে যখন কমিউনিস্ট শাসনবিরোধী ‘জিহাদ’ শেষ হয় তখন ব্যাপক শূন্যতার সৃষ্টি হয়। তখন রাশিয়ার আগ্রাসনবিরোধী যুদ্ধে সহায়তাকারী শক্তিগুলো সেখানে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা আশা করেছিল। কিন্তু তখন আই এস আই-এর মহাপরিচালক লে. জেনারেল হামিদ গুল তার এক ইউটোপিয়ান চিন্তা থেকে মুজাহিদদের সংগঠিত করে একটা ধর্মীয় জোট গঠন করেন ও সেখানে উগ্রবাদী শাসনব্যবস্থা কায়েমের উদ্যোগ নেন।
রাশিয়াবিরোধী যুদ্ধ চলাকালে সিআইএ সকল প্রকার অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তা দিলেও অন গ্রাউন্ড সব কিছুর নিয়ন্ত্রণ ছিল আই এস আইয়ের হাতে। জেনারেল জিয়াউল হক বেঁচে থাকতে আই এস আইয়ের ডিজি ছিলেন লে. জেনারেল আকতার আবদুর রহমান। তিনিও ছিলেন উগ্র চিন্তার সমর্থক। এরা এক অলীক কল্পনা করতেন যে আফগানিস্তানে রাশিয়ার বাহিনী পরাজিত হওয়ার পর মুজাহিদদের সম্মিলিত বাহিনী নিয়ে তারা তাজিকিস্তানের আমু দরিয়া পর্যন্ত দখল করে এক জমহুরিয়া কায়েম করবেন। সেসময় সোভিয়েত রাশিয়াকে শত্রু বিবেচনা করে তারা অমন চিন্তা করতেন। মার্কিন প্রশাসন এনিয়ে কয়েকবার পাকিস্তানকে সতর্ক করে দিলেও আই এস আইয়ের কর্তা ব্যক্তিদের তখন মাথা গরম অবস্থা। হাতে জবাবদিহিতা বিহীন কোটি কোটি ডলার, আবার সেসব ডলার তারা গোপনে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগও করেছেন ব্যবসায় যাতে লাভের টাকা দিয়ে তাদের সেই কাল্পনিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা যায়!
জেনারেল জিয়াউল হক নিহত হওয়ার পর লে. জে. হামিদ গুল প্রধানমন্ত্রী বেনজীর ভুট্টোকে নানা বিভ্রান্তকর তথ্য দিয়ে আফগানিস্তানে উগ্রবাদী গ্রুপগুলোকে শক্তিশালী করে গড়ে তোলেন। সেখান থেকেই মূলত পরবর্তীতে তালেবানের ভিত্তি স্থাপিত হয়। আইএসআই ও পাক সেনাবাহিনীর জেনারেলরা সরকারকে বলতে থাকেন ওই গোষ্ঠীগুলো হতে পারে কৌশলগত এসেট। ভারত পূব সীমান্তে আক্রমণ করলে ওই এসেটগুলোকে তারা কাজে লাগাবেন। এতে পাকিস্তানের স্ট্র্যাটেজিক ডেপথও নিশ্চিত হবে। এই হামিদ গুল পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আসা মুজাহিদদের পুনর্বাসন ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে নিতে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো এক ভয়াবহ প্রক্সি বাহিনীতে রূপান্তর করেন। সেসময় মিশর, জর্দানসহ কয়েকটি দেশের সরকার বারবার হুঁশিয়ারি দিলেও হামিদ গুল কোনো কথা শোনেননি। বরং বিভিন্ন দেশে আই এস আইয়ের অর্থ বিনিয়োগ করে গোপন সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। তৈরি হয় এক ছায়া আই এস আই যারা আজ অব্দি নানা দেশে কাজ করে চলেছে। অথচ এদের কোনো সরকারি অনুমোদন নেই এবং আই এস আই পরবর্তী সময়ে বহু চেষ্টা করেও এই চক্রের নেটওয়ার্ক ছিন্ন করতে পারেনি। গত কয়েক বছর আগে সুইজারল্যান্ড সরকার পাক সরকারকে অফিসিয়ালি জানায় যে হামিদ গুল ও আকতার আবদুর রহমানের নামে তাদের ব্যাংকে বড় অংকের টাকা জমা আছে। এই খবর পাক সরকারকেও হতবাক করে দেয়।
এদিকে যে ছায়া গ্রুপ তৈরি করে রেখে গেছেন হামিদ গুল সেটাকে পরবর্তীতে আরও শক্তিশালী করেন আরেক ডিজি লে. জেনারেল জাভেদ নাসির, যিনি ১৯৯২ সালে নিযুক্ত হন। তিনি মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গোপন উগ্রবাদী গ্রুপ তৈরি করতে থাকেন। বিষয়টি কয়েকটি মুসলিম দেশ ও আমেরিকা পাকিস্তান সরকারের নজরে আনলে ১৯৯৩ সালে তাকে অবসরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তী ডিজি লে. জেনারেল জাভেদ আশরাফ কাজি দায়িত্ব নিয়ে দেখেন আই এস আইয়ের ভান্ডার প্রায় শূন্য, সব টাকা অজানা খাতে ব্যবহার করা হয়েছে যার কোনো নথি প্রমাণ নেই!
এর মাঝে ১৯৯৬ সালে পাকিস্তানের এক মাদরাসায় পড়ুয়া মোল্লা ওমরের নেতৃত্বে তালেবান বাহিনী আফগানিস্তানে সরকার গঠন করে। সেসময় পাকিস্তান, সৌদি আরব ও আরব আমিরাত- মাত্র এই তিনটি দেশ তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দেয়। আই এস আইয়ের কর্তাদের কথিত এসেসমেন্টের বদৌলতেই এই স্বীকৃতির ঘটনা ঘটে। এর সুযোগে বিভিন্ন ধরনের সন্ত্রাসী গোষ্ঠী পাকিস্তানের পশ্চিম সীমান্তের দুর্গম এলাকাগুলোতে জড়ো হয় ও সন্ত্রাসী তৎপরতা শুরু করে। আই এস আই শুধু এদিকে নজর দিয়েই বসে থাকেনি বরং তারা আরও কয়েকটি চরম ডানপন্থী ধর্মীয় গ্রুপকে সরকারের অনুমোদনের বাইরে সংগঠিত করে ওই একই স্ট্র্যাটেজিক এসেট হিসাবে। নন স্টেট এক্টর এসব গোষ্ঠী কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই আর নিয়ন্ত্রণে থাকেনি। পাকিস্তানের সরকারি পলিসির বাইরে গিয়ে এরা অনেক অঘটন ঘটিয়েছে। ২০০৮ সালে মুম্বাইতে এমনি একটি গোষ্ঠী তাণ্ডব চালায় যা দুই দেশকে যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে আসে।
দেখা গেছে যে, আইএসআই বহুবার এসব গোষ্ঠীর ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেছে চাপের মুখে পড়ে। কিন্তু ওই যে হামিদ গুল, আকতার আব্দুর রহমান যে গোপন অবকাঠামো দাঁড় করিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন সেগুলোর ধামাকা থেকে তারা আর কখনোই বের হতে পারেনি।
পরবর্তীতে আবার আইএসআইয়ের একজন ডিজি ঠিক হামিদ গুলের ধারায় আবার বড় ধরনের ক্ষতি করে বসেন। তিনি হলেন লে. জেনারেল ফয়েজ হামিদ যিনি এখন জেল খাটছেন। ইমরান খান সরকারের বিশ্বস্ততা অর্জন করে এই কর্মকর্তাও সরকারকে বিপথে পরিচালিত করেন বলে অভিযোগ আছে। ২০২১ সালে আফগানিস্তান থেকে আমেরিকা ও ন্যাটো সৈন্য প্রত্যাহার নিয়ে দোহায় বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে আলোচনা চলছিল যাতে ইমরান খান ব্যক্তিগতভাবে একটি রাজনৈতিক সমাধানের পক্ষে ছিলেন। কিন্তু আই এস আই ডিজি অতি গোপনে তার নিজ চিন্তা বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যান। তিনি দোহা চুক্তি ভঙ্গ করে তালেবানদের এমনভাবে সহায়তা দেন ও উস্কানি প্রদান করেন যাতে তারা ভারতের স্বাধীনতা দিবস ১৫ অগাস্টেই কাবুল দখল করতে পারে। তালেবানরা আইএসআইয়ের সহায়তা নিয়ে চুক্তির বাইরে গিয়ে কাবুল দখল করে যাতে আমেরিকাসহ অন্যান্য ন্যাটো বাহিনী হতবাক হয়ে পড়ে। ভারতের স্বাধীনতা দিবসে কাবুল দখল করেছে আই এস আই সমর্থিত তালেবান এমন একটি উদ্ভট উল্লাস থেকে লে. জেনারেল ফয়েজ হামিদ ওই সিদ্ধান্ত নেন। এরপর তিনি তালেবানদের সহায়তা দিয়ে পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী দিবস ৬ সেপ্টেম্বর কান্দাহার দখল করেন। নিজে কাবুলে যান মধ্যযুগের জয়ী রাজা বাদশাহ’র মতো বিজয় উদযাপনের জন্য। এই ঘটনাগুলো ঘটে ইমরান খানের অনুমোদন ব্যতিত। অথচ দুনিয়া বিশ্বাস করতে থাকে ইমরান খান সরকার এভাবে চুক্তি ভঙ্গ করে উগ্রবাদীদের সহায়তা প্রদান করেছে। চাপটা সামাল দিতে পারেননি ইমরান খান। পাকিস্তানের যা ক্ষতি হওয়ার তা ততক্ষণে হয়ে গেছে। পাক সেনাবাহিনী নিজেই পরে বহু কষ্টে ফয়েজ হামিদকে সরিয়ে দেয় ও তাকে গ্রেফতার করে। তারা হতবাক হয়ে দেখতে পায় একজন জেনারেল শুধু তার নিজ ইউটোপিয়ান ধারণা বাস্তবায়নের জন্য কীভাবে জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থাটিকে ব্যবহার করেছে।
এদিকে তালেবানরা যখন দেখলো ফয়েজ হামিদ নেই, সহায়তাও বন্ধ তখন তারা চলে গেল পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। টিটিপি’কে আশ্রয় দিল। আই এসকে দেখেও না দেখার ভান করলো। শুরু হলো পাকিস্তানের অভ্যন্তরে স্মরণকালের ভয়াবহ জঙ্গি তৎপরতা।
অনেকেই হয়তো জানে না যে, পৃথিবীতে জঙ্গিদের হাতে সবচেয়ে বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে পাকিস্তানে। নারী, শিশুসহ এযাবত প্রায় আশি হাজার আদম সন্তানকে হত্যা করা হয়েছে কথিত ধর্মীয় উন্মাদনা থেকে। মসজিদে জুমার নামাজের সময় বোমা মেরে হত্যা করা হয়েছে শত শত মুসল্লিকে। মাদরাসা, কলেজ, স্কুলে বোমা মেরে শিশুসহ ছাত্রদের হত্যা করেছে টিটিপি’র হিংস্র জানোয়ারেরা। এই দানব কিন্তু ওই আই এস আইয়ের মাথামোটা কয়েকজন জেনারেলরই তৈরি।
অস্বীকার করার উপায় নেই স্পেশাল অপারেশন্সে আইএসআই বিশেষভাবে পারঙ্গম একটি গুপ্তচর সংস্থা। এরা পুরো পৃথিবীর চোখকে ফাকি দিয়ে পারমানবিক বোমা বানানোর সরঞ্জাম সংগ্রহ করেছে। বসনিয়ার স্বাধীনতা ও সার্বদের পরাজয়ের মূল কারিগরও ছিল আই এস আই। শত শত বসনিয়ান মুসলমানকে গোপনে ট্যাংক বিধ্বংসী মিসাইলের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে পাকিস্তানে। তারপর অতি গোপনে পাকিস্তানে তৈরি ট্যাংক বিধ্বংসী মিসাইল বখতার শিকান পৌঁছে দেওয়া হয়েছে বসনিয়ায়। সিআইএসহ কেউই জানতে পারেনি এসব তৎপরতার কথা। সার্ব বাহিনী পরাস্ত হয়েছে পাকিস্তানিদের এই অপারেশনের কারণেই। স্বাধীন হয়েছে ইউরোপের একটি মুসলিম রাষ্ট্র বসনিয়া।
কিন্তু আই এস আইয়ের কতগুলো উগ্র মস্তিষ্ক জেনারেলের কাজ কারবার পাকিস্তান তো বটেই পুরো মুসলিম বিশ্বের জন্য এক ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে। তৈরি করেছে ফ্রানকেনস্টাইন। এখন এই দানব নিয়ন্ত্রণ ছাড়া। তারা যোগ দিয়েছে পাকিস্তানের শত্রু ভারতের সাথে।
ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ কে ক্রেডিট দিতেই হয়। তারা মাথামোটা নয়। ধীর স্থিরভাবে কাজ করে কীভাবে উদ্দেশ্য হাসিল করতে হয় সেটা তারা দেখিয়ে দিয়েছে আবারো। দৃশ্যপটে নিজেরা নেই। তাদের কোনো যুদ্ধও করতে হচ্ছে না। পাকিস্তানের নিজের তৈরি মনস্টারকেই লাগিয়ে দিয়েছে ‘র’ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। স্ট্র্যাটেজিক এসেট খাইয়ে দিয়েছে সুনিপুণভাবে। ‘র’ কীভাবে এসব করলো? সিজনড, ঠান্ডা মাথার সিভিলিয়ান কর্তারা ‘র’ চালায়। তারা জানে কোন জাতির কী বৈশিষ্ট্য, তাদের কোথা দিয়ে আঘাত হানতে হবে। তারা মাথা গরম করে না। ‘র’ এর কোনো প্রধান চাইলেই নিজ থেকে কিছু করতে পারেন না। সরকারের অনুমোদন লাগে। আর সরকার তাদের পুরো কৌশলগত বিষয়াদি বিচার বিবেচনা করে ঠিক করেন। ‘র’ সেখানে মাতব্বরি করতে পারে না আই এস আইয়ের জেনারেলরা যেমন পাক সরকারের উপর করে থাকেন। আই এস আইয়ের ডিজি মানে পাকিস্তানের রাজা। ‘র’ এর প্রধান কিন্তু তা নয়। যা ইচ্ছে তা করতে পারেন না তিনি। এখন ঠান্ডা মাথায় খেলাটা খেলছে ‘র’। নেচে বেড়াচ্ছে পাকিস্তান! দৌড়াচ্ছে আফগানিস্তান! বাংলাদেশেরও কতিপয় উগ্র মস্তিষ্ক ছুটছে অলীক স্বপ্নের পেছনে!
লেখক: সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক