২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:৩২ পিএম
বাংলাদেশের উন্নয়নের মূল ভিত্তি স্থানীয় সরকার। গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে শহরের প্রতিটি সেবা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব এই প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঁধে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পানি ও স্যানিটেশন, অবকাঠামো উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা- এগুলো প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই স্থানীয় সরকার ভূমিকা পালন করে। তাই টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (SDGs) অর্জনে স্থানীয় সরকারের কার্যকারিতা ছাড়া কোনো উন্নয়ন কার্যক্রম পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না।
এই বাস্তবতা উপলব্ধি করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে গঠিত স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ দিয়েছে। এসব সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান শুধু সেবা প্রদানকারী নয়, বরং একটি শক্তিশালী পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন কেন্দ্র হিসেবে কাজ করতে পারবে। তবে বর্তমান বাস্তবতা ও সুপারিশের মধ্যে বিশাল ফারাক রয়েছে, যা টেকসই উন্নয়নের পথকে বাধাগ্রস্ত করছে।
বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার কাঠামোতে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশন অন্তর্ভুক্ত। প্রতিটি স্তরেই উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মূল দায়িত্ব থাকে এই স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহ। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান পর্যাপ্ত ক্ষমতা, অর্থ এবং মানবসম্পদ ছাড়া দায়িত্ব পালন করছে। ফলে কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর নির্ভরতা বেড়ে যায় এবং স্থানীয় সমস্যাগুলো স্থানীয় পর্যায়ে সমাধান হওয়া ব্যাহত হয়।
স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন যে সুপারিশগুলো করেছে, মোটাদাগে সেগুলো হলো :
১. প্রশাসনিক ও আর্থিক বিকেন্দ্রীকরণ:
স্থানীয় সরকারকে প্রকৃত অর্থে প্রশাসনিক ও আর্থিকভাবে স্বাধীন ও ক্ষমতাশালী করার মাধ্যমে দ্রুত ও কার্যকর সেবা নিশ্চিত করা।
২. স্বশাসন:
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে নিজেদের পরিকল্পনা, বাজেট ও প্রকল্প নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং মৌলিক বিষয়ে নিজেরাই পরিচালিত হতে পারে।
৩. জনগণের অংশগ্রহণ:
স্থানীয় পর্যায়ে পরিকল্পনা প্রণয়ন থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
৪. স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা:
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সেবা প্রক্রিয়া ও বাজেট ব্যবহার প্রকাশ করা এবং সকল কর্মসূচি ও কর্মকাণ্ডে শতভাগ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।
৫. দক্ষ মানবসম্পদ:
স্থানীয় সরকারের কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি করে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা।
এই সুপারিশগুলো যদি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে স্থানীয় সরকার শুধু প্রশাসনিক কাঠামো নয়, বরং দেশের টেকসই উন্নয়নের মূল চালিকা শক্তি হতে পারে।
বাস্তবতার ফারাক
১. ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ বনাম বিকেন্দ্রীকরণের বাস্তবতা:
সংস্কার কমিশন যেখানে বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলেছে, বাস্তবে ক্ষমতা এখনো কেন্দ্রীয় মন্ত্রণালয় ও বিভাগীয় প্রশাসনের হাতে কেন্দ্রীভূত। নির্বাচিত প্রতিনিধি অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে অক্ষম থাকেন। ফলে স্থানীয় সমস্যা স্থানীয়ভাবে সমাধান না হয়ে কেন্দ্রে চলে আসে।
২. আর্থিক স্বায়ত্তশাসনের ঘাটতি:
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজস্ব আহরণের সুযোগ সীমিত। কেন্দ্রীয় বরাদ্দের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে প্রকল্প বাস্তবায়ন দেরি হয়। উদাহরণস্বরূপ, একটি জলবায়ু অভিযোজন প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল কেন্দ্র থেকে সময়মতো না পৌঁছালে স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ে।
৩. রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও প্রশাসনিক দ্বৈততা:
নির্বাচিত প্রতিনিধি এবং নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে দায়িত্বের অস্পষ্ট বিভাজন রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দ্বন্দ্ব ও বিলম্ব প্রকল্প বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করে।
৪. অংশগ্রহণমূলক শাসনের ঘাটতি:
উন্মুক্ত বাজেট সভা, ওয়ার্ড সভা বা গ্রাম আদালতের মতো উদ্যোগ থাকলেও সেগুলো সঠিকভাবে কার্যকর হয় না। ফলে নাগরিক অংশগ্রহণ সীমিত থাকে এবং পরিকল্পনা জনগণের চাহিদার সাথে সমন্বিত হয় না।
৫. দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা:
ডিজিটাল শাসন ও তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনার কথা বলা হলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান পর্যাপ্ত প্রযুক্তি, প্রশিক্ষিত জনবল ও অবকাঠামোর অভাবে পিছিয়ে আছে।
ফারাকের প্রভাব
এই ফারাকের কারণে দারিদ্র্য হ্রাস, নারী ক্ষমতায়ন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও জলবায়ু অভিযোজনের মতো লক্ষ্যগুলো প্রত্যাশিত গতিতে অর্জিত হচ্ছে না। উদাহরণস্বরূপ, উপকূলীয় অঞ্চলে বাঁধ নির্মাণ ও নদী শাসন কার্যক্রমের ক্ষেত্রে স্থানীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন ব্যর্থ হলে বর্ষার সময় বন্যা ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
করণীয়: সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য পথনির্দেশনা
১. স্থানীয় সরকারের প্রকৃত স্বায়ত্তশাসন আইনি কাঠামোর মাধ্যমে নিশ্চিত করা।
২. স্থানীয় কর ও রাজস্ব আহরণের সুযোগ বাড়িয়ে আর্থিক স্বাধীনতা বৃদ্ধি করা।
৩. নির্বাচিত প্রতিনিধি ও কর্মকর্তাদের কাজ স্পষ্টভাবে ভাগ করে দায়িত্বের বিভাজন নিশ্চিত করা।
৪. প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তির ব্যবহার করে দক্ষ মানবসম্পদ ও ডিজিটাল অবকাঠামো নিশ্চিত করা।
৫. পরিকল্পনা ও বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় সক্রিয় নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
৬. প্রকল্প ও কর্মসূচির সফলতা মূল্যায়নের ভিত্তিতে অর্থ বরাদ্দ করা
স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী না করে টেকসই উন্নয়ন অর্জন সম্ভব নয়। সংস্কার কমিশনের সুপারিশ একটি গুরুত্বপূর্ণ পথনির্দেশনা দিয়েছে, তবে বাস্তবায়নের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক সংস্কৃতি ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন ছাড়া এগুলো কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রার পরবর্তী ধাপ নির্ভর করছে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের ওপর। আমরা কি সত্যিই স্থানীয় সরকারকে টেকসই উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে প্রস্তুত, নাকি বিকেন্দ্রীকরণের প্রতিশ্রুতি কেবল নীতি পত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে?
লেখক: নির্বাহী পরিচালক, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট - সিজিডি
সিন্ডিকেট সদস্য, রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়