২৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০৫:৪৩ পিএম
আমাদের দেশের মানুষ ভোটকে ‘উৎসব বলে মনে করে। ভোটের সময় দেশের গ্রাম-গঞ্জে গেলে বোঝা যায় এ দেশের মানুষ এই উৎসবে কতটা আগ্রহ নিয়ে সামিল হন। ভোট আসলে মেতে ওঠে তারা। সারাদিন ভোটের আলাপ-আলোচনা। চায়ের দোকান, হাটবাজার, মাঠ-ঘাট, অলিগলি, পাড়া মহল্লা সরগরম! কীভাবে নিজের প্রার্থীর পক্ষে ভোট আনা যায়, নিজের প্রার্থীকে উপরে রাখা যায়, এ নিয়ে সবাই ব্যস্ত থাকে। ভোট না করলে বাঙালির যেন অনেক অপূর্ণতা থেকে যায়। মানুষ জমি, সম্পত্তি বিক্রি করে, ঋণ করে ভোট করে এমন উদাহরণ বিরল নয়। কিন্তু ইতিহাসের নিরিখে দেখা যায়, সেই ব্রিটিশ আমল থেকে এ দেশের মানুষের জীবনে বহুবার ভোট এসেছে, তবে প্রতিটি ভোট এসেছে এক একেক ধরনের রূপ ধারণ করে, একেক অবস্থার পেক্ষাপটে। বলা যায় ভোট শুধু ক্ষমতা বদলের উপায় হয়ে আসে না, এ দেশের মানুষের জীবনে ভোট আসে নানা রূপে। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রয়ারী নির্বাচনের রয়েছে বিশেষ পেক্ষাপট।
বর্তমান সময়ে আমাদের দেশে ভোটের যে ধারা মূলত তার সূত্রপাত হয়েছিল ব্রিটিশ আমলে । বণিক বেশে এসে উপমহাদেশের শাসন ক্ষমতা দখলের পর চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথার কুফল, সিপাহী বিদ্রোহ ও নানা অপশাসনের কারণে ব্রিটিশরা এক সময় নানাভাবে নিন্দিত হতে থাকে। নিজেদের শাসন নিজেরা করা সহ নানা দাবিতে উপমহাদেশের মানুষ সোচ্চার হতে থাকে এরই ধারাবাহিকতায় ১৮৮০ সালের পর জমিদারী আইনের ক্ষেত্রে কিছুটা শীতিলসহ ব্রিটিশ নীতিতে কিছুটা পরিবর্তন আসে। ১৯০৯ সালে পাশ হয় ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অ্যাক্ট যা মর্লে-মিন্টো সংস্কার নামে পরিচিত। এই আইনটিতে নির্বাচনের কথা, আইন পরিষদে ভারতীয়দের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি এবং মুসলিমদের জন্য পৃথক নির্বাচনের কথা বলা হয়। ১৯১৯ এবং ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন মুলত ১৯০৯ সালের আইনের সম্প্রসারিত রুপ। ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত পূর্ববঙ্গের নির্বাচনসমূহও মূলত এই আইনগুলোর অধীনে অনুষ্ঠিত হয়। পাকিস্তানের সংবিধান (১৯৫৬) এই ব্যবস্থা রহিত করে।
১৯২০ সালে ব্রিটিশ ভারতে ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিল ও প্রাদেশিক কাউন্সিলের সদস্য মনোনীত করার জন্য সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এটিই ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে সর্বপ্রথম নির্বাচন। এরপর ১৯২৩, ১৯২৬, ১৯২৯/৩০ ও ১৯৩৪ সালে ভোট হয়। তবে এসব নির্বাচন গুলো ছিল অনিয়মিত, প্রার্থী ও ভোটারের সংখ্যা ছিল অনেক কম। তাছাড়া সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ ছিল না।
১৯৩৭ সালের নির্বাচনকে প্রথম গণভোট বলা যেতে পারে। অনেক প্রাপ্তবয়স্করা ছাড়াও নারীরা প্রথমবারের মতো ভোটাধিকার লাভ করে। তবে এটাকে সর্বজনীন বলা যেতে পারেনা। যারা নির্দিষ্ট পরিমাণ চৌকিদারি ট্যাক্স দিতো তারাই কেবল ভোটার হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে ছিল। সেই হিসাব অনুযায়ী বাংলার মাত্র ১৫ শতাংশ লোক ভোটার হতে পেরে ছিল। ১৯৩৭ সালের ভোটের সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে কে হিন্দু আর কে মুসলিম। ভোটের পর হিন্দু আর মুসলিম এলিটদের দূরত্ব আরও বাড়তে থাকে এবং তা আর কমেনি। এমন অস্থিরতার মধ্যে ১৯৪৬ সালের নির্বাচন হয়। দূরত্ব বাড়তে বাড়তে বাড়তে এক সময় দাঙ্গা-হাঙ্গামাসহ নানা ঘটনা এবং ৪৭ সালে ভাগ হয়ে যায় বাংলাসহ উপমহাদেশ।
পাকিস্তানের ২৩ বছরের শাসনামলে এ দেশের মানুষ ভোট দিতে পেরে ছিল দুই বার। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের পক্ষে যে গণজোয়ার তৈরি হয়ে ছিল, ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে তার ভাটা পড়ে যায়। আবার ১৯৫৪ সালে মানুষ ভোট দিতে পারলেও তাদের প্রতিনিধিরা ক্ষমতায় থাকতে পারিনি।
জেনারেল আইয়ুব খান ১৯৫৮ সালে প্রচলিত গণতান্ত্রিক পদ্ধতি পরিত্যাগ করে মৌলিক গণতন্ত্র প্রবর্তন করেন এবং বলেন এটাই সবচেয়ে উন্নত গণতন্ত্র। মৌলিক গণতন্ত্রের আওতায় পাকিস্তানের উভয় অংশে ৪০,০০০ করে মোট ৮০,০০০ মৌলিক গণতন্ত্রী নিয়ে নির্বাচকমণ্ডলী গঠিত হয়। নির্বাচকমণ্ডলীর সদস্যরা মৌলিক গণতন্ত্রী বা বিডি মেম্বার ছিল। জনগণের মৌলিক গণতন্ত্রী নির্বাচন করা ছাড়া কোনো দায়িত্ব ছিল না। তাছাড়া তারাই প্রেসিডেন্ট, জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচন করতেন। এই মৌলিক গণতন্ত্রীদের আস্থা ভোটে আইয়ুব খান ১৯৬০ সালে ও ১৯৬৫ সালে প্রেসিডেন্ট হন। পাকিস্থানে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭০ সালে যেটা শেষ পর্যন্ত ৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে রূপ নেয়।
আশা করা হয়েছিল, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর এদেশে গণতান্ত্রিক চর্চার আর কোনো বাধা থাকবে না। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার নিয়ে তৈরি হওয়া বাংলাদেশের গণতন্ত্র সেই পূর্বের শনির দশা থেকে বের হতে পারিনি। দেশে সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক চর্চা ও ক্ষমতা পরিবর্তনের সুষ্ঠু কোনো নিয়মের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া সম্ভব হয়নি। এক ঝামেলা চলে গেলে আর এক ঝামেলা এসে জেঁকে বসে।
এটাই এ দেশের বাস্তবতা হয়ে দাঁড়ায়, ক্ষমতাসীন বা দলীয় সরকারের অধীনে কোনো জাতীয় নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হয়না। ক্ষমতাসীনরা ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করার এক ধরনের অপচেষ্টায় লিপ্ত থাকে। ভোটার থাকতে বিনা ভোটে নির্বাচিত হওয়া, পাতানো নির্বাচন, রাতের ভোট, ভোট ডাকাতি, ভোট জালিয়াতি, ভোট ম্যাকানিজম, বন্দুকের নল, বিভিন্ন বাহিনীর অত্যাচার, ভয়ভীতি দেখিয়ে সিল মারা, ভূতুড়ে ভোট, গায়েবি ভোট, টাকা পয়সার ছড়াছড়ি, বিরোধীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি, ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধা দেওয়াসহ নানা ঘটনা বারবারই এ দেশের গণতন্ত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
স্বাধীন দেশে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয় ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ। আওয়ামী লীগের অধীনে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৩টি আসনে জয়ী হয়। নির্বাচনটি রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় প্রভাবে হয়ে ছিল বলে বিরোধীদের অভিযোগ ছিল। দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। সামরিক শাসক এরশাদের অধীনে তৃতীয় ও চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যথাক্রমে ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালে অনুষ্ঠিত হয়। এই দুই নির্বাচনে বিভিন্ন ধরনের অনিয়মের পাশাপাশি বন্দুকের নল ও বিভিন্ন ধরনের বাহিনীর সন্ত্রাসের মুখোমুখি হয় এ দেশের মানুষ। এক সময় সব দল এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলে এবং পতন ঘটায় যেটা ৯০-এর গণঅভ্যুত্থান নামে পরিচিত। এরশাদের পতনের পর একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয় এবং দেশে সুস্থ গণতান্ত্রিক চর্চার আশায় ১৯৯১ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
১৯৯৬ সালের নির্বাচনের আগ থেকেই নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন দানা বাঁধতে থাকে। ঐ সময় আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য ব্যাপক আন্দোলন সংগ্রাম করেছিল। এরপর বিএনপি ১৯৯৬ সালে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী এনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার আইন পাশ করে। তবে বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সম্পর্কে তেমন অতীত অভিজ্ঞতা না থাকার কারণে ২০০১ ও ২০০৮ সালে এই সরকারের গঠন নিয়ে অসন্তোষ দেখা যায়। তবে ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচন মোটামুটি নিরপেক্ষ হয়েছিল এবং শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর হয়েছিল- এ বিষয়ে কারোর দ্বিমত থাকার কথা নয়।
২০০৮ সালে রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা ত্রুটি দেখিয়ে এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের উদ্যোগ নেন। ২০১১ সালে সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ের ওপর ভর করে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এটা বাতিল করা হয়। ফলে যে তরি চড়ে আ. লীগ ১৯৯৬ ও ২০০৮ সালে রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছিল, সেটা আর থাকল না। বিরোধী দলগুলো অনেক প্রতিবাদ আন্দোলন সংগ্রাম করেছিল কিন্তু কোনো লাভ হয়নি।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া পরপর তিনটি নির্বাচন (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪) নিয়ে দেশে-বিদেশে অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়। ২০১৪ সালের নির্বাচনে দেখা যায়, এ দেশের মানুষ ভোট পাগল হওয়া স্বতেও ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩টি আসনে প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়। অপর যে ১৪৭ টি আসনে নির্বাচন হয়েছিল সেখানে ভোটার উপস্থিতি ছিল অনেক কম। এমনও অসংখ্য কেন্দ্র ছিল যেখানে একজন লোকও ভোট দিতে যায়নি। নানামুখী চাপ ও পদক্ষেপের কারণে ২০১৮ সালের নির্বাচনে দুই একটি বিরোধী দল অংশগ্রহণ করলেও হামলা-মামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শন আর প্রশাসনের দ্বিচারিতা মনভাবের কারণে তারা শেষ পর্যন্ত মাঠে থাকতে পারিনি। যেটা শেষ পর্যন্ত একতরফা নির্বাচনে পরিণত হয়। অভিযোগ ছিল ২০১৮ সালে ভোটের আগের রাতেই সারাদেশের বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র দখলে নিয়ে নেয় ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা। আগের রাতেই সিল মেরে ব্যালট বাক্স ভরে রাখার অভিযোগ ওঠে। এমনও অভিযোগ ওঠে বিদেশ থেকে সাদা চামড়ার লোক এনে তাদেরকে দিয়ে বলানো হয় ভাল ভোট হয়েছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনও বিরোধীরা বর্জন করে। যেটা ডামি নির্বাচন হিসেবে পরিচিতি পায়, যেখানে আওয়ামী লীগ ও তাদের জোটের ও দলের লোকেরাই নির্বাচিত হয়। শুধু জাতীয় সংসদ নির্বাচন নয়, দলভিত্তিক নির্বাচন ব্যবস্থার নামে স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো একই ভাবে অনুষ্ঠিত হয়। সেগুলো চলে যায় পেশী শক্তি ও সিন্ডিকেটের দখলে।
নির্বাচন কমিশনের উপর এদেশের মানুষ বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য কমিশনাররা সবচেয়ে উচ্চ শিক্ষিত ও সাংবিধানিক ক্ষমতার অধিকারী হয়ে থাকেন। অথচ দেখা গেছে, বিগত সময়ে তারাই নীতি নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে ও শপথ ভঙ্গ করে বিশেষ রাজনৈতিক দলের আজ্ঞাবহ হিসেবে কাজ করেছে, সেখানে অন্য কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা অবান্তর। ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করার জন্য দেশের সমস্ত প্রতিষ্ঠান দলীয়করণ ও বিরোধীদের উপর অসংখ্য হামলা-মামলা, গুম-খুনের অভিযোগ ওঠে।
একটি দলের নীতিনির্ধারক মহলের কর্মকাণ্ড দেখে এ দেশের মানুষ অবাক হয়েছে যে, পর পর তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রহসনের ও একতরফা ভাবে করেও নৈতিকতাবোধ জাগেনি । নতুন প্রজন্মের মধ্যে দলটি সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা জন্মেছে। বর্তমানে মানুষ তথ্য প্রযুক্তির যুগে বাস করে। এই যুগে যোগাযোগ, তথ্যপ্রবাহ, গণমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এমনভাবে বিস্তৃত হয়েছে মানুষ মুহূর্তের মধ্যে সব খবর পেয়ে যায়। একজন মানুষ বিভিন্ন মাধ্যম থেকে তথ্য পায় এবং কোনটা সঠিক যাচাই করে নিতে পারে। ফলে আজকের পৃথিবীতে সত্যকে গোপন রাখা অনেক কঠিন। সবচেয়ে বড় কথা, নির্বাচন কোন গোপন বিষয় না। প্রতিটি পাড়া ও মহল্লার মানুষ বা ভোটাররা বুঝে ফেলে ভোট কেমন হচ্ছে। এমন অবস্থার পর একটি দলের প্রধান যখন গণমাধ্যমের সামনে এসে বলে স্মরণকালের গ্রহণযোগ্য ভোট হয়ে হয়েছে, তাহলে পাবলিকের কাছে পচে যাওয়ার আর কিছু বাকি থাকে না।
এরই মধ্যে ২০২৪ সালে কোটা বিরোধী সাধারণ শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীদের আন্দোলন শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে পরিণত হয়। পৃথিবীর অনেক দেশে গণ-অভ্যুত্থান হয়েছে এবং অনেক সরকার প্রধানের দেশ ত্যাগের ইতিহাস আছে। কিন্তু বাংলাদেশের মত একবারে এত লোক বিদেশে চলে যাওয়ার ইতিহাস কোথাও নেই। প্রধানমন্ত্রী, তার পরিবার, আত্নীয়স্বজন, আশপাশের লোকজন, দুই একজন বাদে চলমান ও সাবেক সব কেবিনেট সদস্য ও এমপিরা, কেন্ত্রীয় নেতা, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতারাসহ অনেক তৃণমূলের নেতারা পালিয়ে যায়। পাশাপাশি অনেক সরকারি কর্মকর্তা ও পেশাজীবিরা পালিয়ে যায়। অনেক নেতাকর্মী দেশের ভিতরে আত্নগোপনে।
জাতিসংঘের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের সময় বাংলাদেশে প্রায় ১৪০০ লোক নিহত হয়। আহত ও পঙ্গু হয় হাজার হাজার মানুষ। নিহতদের বেশির ভাগ ছাত্র, চাকরিপ্রত্যাশী, তরুণ ও শিশু-কিশোর। প্রতিটি মৃত্যই যেন এক একটা শোকগাথা। সাভারের আশুলিয়াসহ বিভিন্ন জায়গার হত্যাকাণ্ডের ভিডিও প্রকাশ হয়েছে যেগুলো দেখে মানুষ বাকরুদ্ধ, অসুস্থ হয়েছে। এসব ঘটনাসহ নানা কারণে আওয়ামী লীগকে দেশে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে দলের প্রধান শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতা বিরোধী একটি মামলায় ফাঁসির রায়ও হয়েছে। আরও অনেক মামলার রায় ঘোষণার অপেক্ষায় আছে ও অনেক মামলার কার্যক্রম অব্যাহত আছে।
এই যখন অবস্থা তখন আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একই সাথে ঐদিন গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে যেখানে পরিবর্তন ও সংস্কারের জন্য সমর্থন চাওয়া হবে। এই নির্বাচনের প্রধান একটি দিক হচ্ছে প্রায় ১৭ বছর ক্ষমতায় থাকা সেই আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ ছাড়া। যে দলটি অন্যদের বাদ দিয়ে পরপর তিনটি একতরফা নির্বাচন করে কৌশলে দীর্ঘদিন রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিল, এখন আবার তাদেরকে নিয়ে সবার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের দাবির নৈতিকতা নিয়ে সবাই একই প্রশ্ন তুলছে। তাছাড়া আওয়ামী লীগ যে ভাবে বিরোধীদের ধরাশায়ী করেছিল। মৃত্যুকূপ থেকে জীবন ফিরে পাওয়া সেই বিরোধীরা সেই দলকে ছাড় দিতে নারাজ । তাছাড়া কোন ব্যক্তিই বা কোন কারণে ছাড় দিতে বলবে। এমন অবস্থার মধ্যে দেশের দেশের মানুষ সিধান্ত নিতে যাচ্ছে। এ দেশে আর যেন কেউ স্বৈরচারী হয়ে না ওঠতে পারে ও দেশে সুগঠিত গণতন্ত্রের ভিত্তি তৈরি হয় এটাই যেন ১২ ফেব্রয়ারী ২০২৬ সালের নির্বাচনের আকাঙ্ক্ষা।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী