১৫ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:২২ পিএম
আমাদের দেশে জনসেবামূলক কাজ রীতিমত অগ্নিপরীক্ষার সমতূল্য। অধিক জনসংখ্যা। সেই অনুপাতে নেই কর্মসংস্থান। সাধারণ মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থা করুণ। শিক্ষা-দীক্ষা, সুবিবেচনাবোধ, পরমত-সহিষ্ণুতা, পরদুঃখকাতরতা, সহানুভুতি, মায়া-মমতা, নিঃস্বার্থ প্রেম ও সর্বোপরি ধৈর্যশীল নাগরিক বেশ উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এমন অবস্থা সরকারি-বেসরকারি চারি বা রাজনীতি যেটাই হোক মানুষের মনের মতো সেবা প্রদান সত্যিই দুরুহ। এমনি পরিস্থিতিতে আমাদের দেশে কেউ কর্মজীবনে সুখ্যাতি অর্জন বা রাজনীতি করে সমলোচনার ঊর্ধ্বে থাকবেন এটি প্রকৃতই কল্পনাতীত। এরপরও যদি দুর্ভিক্ষ কবলিত দেশের দায়িত্বভার কাঁধে আসে তাহলে তো রাজ্য-শাসন আরো ভয়াবহ কঠিন। ইতিহাসের এমন এক বাঁক-বদলে আওয়ামী লীগের বহুমুখী শোষণ ও অর্থ-লুণ্ঠনের ফলাফল ১৯৭৪ সালে দুর্ভিক্ষ জাতির জীবনে সাংঘাতিক দুর্বিসহ ঘটনা।
এরপর রাষ্ট্রনায়ক জিয়ার শাসনামল বাংলাদেশের ইতিহাসে অপার সম্ভাবনাময় ও মুসলিম সোনালী শাসনামলের সমরূপ। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রের কোষাগারের কিছুই নিজের বা পরিবারের জন্য ব্যয় করতেন না। তার ব্যক্তিগত সততা ছিল প্রশ্নাতীত। এই সততাই তাকে শাসক নয়, দায়িত্বশীল রাষ্ট্রনায়কে পরিণত করে। তার সততা ছিল বহুমাত্রিক। এটি শুধু আর্থিক সততার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল ক্ষমতার ব্যবহার, রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত, ব্যক্তিগত জীবনযাপন এবং রাজনীতির নৈতিকতা।
তিনি বিশ্বাস করতেন, রাষ্ট্র পরিচালনার মূল শক্তি আসে জনগণের আস্থা থেকে, আর সেই আস্থা অর্জনের প্রথম শর্ত হলো নেতৃত্বের সততা ও দেশপ্রেম। রাষ্ট্রপতি হয়েও জিয়াউর রহমানের জীবনযাপন ছিল অত্যন্ত সাধারণ। ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও তিনি বিলাসিতা বা আড়ম্বর পছন্দ করতেন না। রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধাকে ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করার কোনো প্রবণতা তার মধ্যে দেখা যায়নি। তার বাসভবন, পোশাক, চলাফেরা সবকিছুতেই ছিল সংযম ও শালীনতা। এই ব্যক্তিগত সংযমই জনগণের কাছে তাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছিল। তিনি কখনোই রাষ্ট্রীয় কোষাগারকে পারিবারিক সম্পদ হিসেবে দেখেননি। আত্মীয়করণ ও দলীয়করণের ঊর্ধ্বে উঠে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন। বরং তিনি সচেতনভাবে এই বিষয়গুলো এড়িয়ে চলতেন, যাতে রাষ্ট্র ও ব্যক্তির মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন বজায় থাকে।
এই প্রসঙ্গে বর্তমান বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতা তারেক রহমান ‘পিতা ও শিক্ষক’ স্মৃতিচারণমূলক প্রবন্ধে লিখেছেন- ‘১৯৭৬ সালের কথা। তখন স্কুলে পড়ি। প্রতিদিনের মতো সেদিনও দুই ভাই স্কুলে যাচ্ছি। সাতটায় সেদিন আমরাও বের হচ্ছি। বাবা অফিসে যাচ্ছেন। গাড়িতে গিয়ে উঠলাম। বাবা তার গাড়িতে উঠলেন। তার গাড়ি বেরিয়ে যাচ্ছে হঠাৎ তার গাড়ির ব্রেকলাইট জ্বলে উঠল। বাসার গেট থেকে বেরোবার আগেই জোর গলায় আমাদের গাড়ির ড্রাইভারকে ডাক দিলেন। সে দৌড়ে গেল। আমরা গাড়িতে বসেছিলাম, ড্রাইভার যখন ফিরে এলো চেহারা দেখে মনে হলো বাঘের খাঁচা থেকে বের হয়েছে। জিজ্ঞাসা করলাম, কী ব্যাপার?
উত্তরে সে বলল, ‘স্যার বলেছেন আপনাদের এই বেলা নামিয়ে দিয়ে অফিসে গিয়ে পিএসের কাছে রিপোর্ট করতে। এখন থেকে ছোট গাড়ি নিয়ে স্কুলে যাওয়া-আসা করতে হবে। কারণ, ছোট গাড়িতে তেল কম খরচ হয়। আর এই গাড়ির চাকা খুলে রেখে দিতে হবে।’ উল্লেখ্য, ওই গাড়িটি ছিল সরকারি দামি বড় গাড়ি।’
আজ বাংলাদেশের যে সব মানুষ তারেক রহমানকে ভালোবাসেন তার বড় একটি কারণ তিনি ন্যায়পরায়ণ শাসক জিয়া ও দেশনেত্রী ম্যাডাম খালেদা জিয়ার সন্তান। যে পিতা দেশের প্রশ্নে আধিপত্যবাদীদের নিকট আত্মসমর্পণ করেননি। যে মাতা বিনা-অপরাধে বিনা চিকৎসায় জীবনের শেষ দিনগুলো কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে কাটিয়েছেন। কিন্তু ফ্যাসিস্ট ও ফ্যাসিস্টের পৃষ্ঠপোষকের সঙ্গে আপোস করেননি। পিতা হিসেবে নয়, রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে শহীদ জিয়ার শাসনামল নিশ্চয়ই ভুলে যাননি মেধাবী তারেক রহমান। হয়তো এই কারণেই তিনি স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিন লক্ষ লক্ষ মানুষের সামনে দৃপ্ত কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘আই হ্যাভ আ প্লান’।
জিয়া পরিবার জনতার রক্ত শোষণ করে না। বাংলাদেশের অর্থপাচার করে না। যদিও বিগত দিনে কিছু কিছু পত্রিকা তারেক জিয়াকে ‘দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের জনকে’ পরিণত করার অবিরাম প্রচেষ্টা করেছিল। ভবিষ্যতেও সুযোগ পেলে তারা তাই-ই করবে। তবে তাদের শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন এই কারণে যে, যারা ম্যাডাম জিয়া ও তারেক জিয়াকে জনবিচ্ছিন্ন করার বয়ান উৎপাদন করতো তারাই এখন ব্যাপকভাবে গণবিচ্ছিন্ন ও গণধিকৃত হয়েছে। তবে তারা এই জাতির মারাত্মক নির্লজ্জ সন্তান। তারা পলাতক ফ্যাসিস্টকে তৈল-মর্দনে জাতির সর্বনাশ করেছেন, এখন জাতির ত্রাতা হিসেবে আবির্ভুত তারেক রহমানকেও বহুমাত্রিক তৈল-মর্দনে অতিশয় ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। তবে আশার কথা হলো- এইসব তৈলে কাজ নাও হতে পারে। কারণ বিএনপি চেয়ারপারসন হয়তো কিছুই ভুলে যাননি।
শহীদ জিয়াউর রহমানের রাজনীতি ছিল মূলত চারটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়ানো: বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, বহুদলীয় গণতন্ত্র, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আপসহীন অবস্থান। তবে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ছিল তার রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু। এই জাতীয়তাবাদ ধর্ম, ভাষা বা গোষ্ঠীকেন্দ্রিক নয়। বরং ভৌগোলিক সীমানার ভেতরে বসবাসকারী সব মানুষের সম্মিলিত পরিচয়। এটি একদিকে যেমন বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে, অন্যদিকে তেমনি পরাধীন মানসিকতার বিরুদ্ধেও একটি অবস্থান। ম্যাডাম জিয়া আমরণ এই মূলনীতির ওপরেই আস্থাশীল ছিলেন।
তারেক রহমানের রাজনীতিও বাংলাদেশপন্থী। দেশের স্বার্থের সঙ্গে তিনি আপস করেন না। তার বক্তব্য, লেখনী ও রাজনৈতিক কর্মসূচি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি নিজেকে নতুন কোনো দর্শনের প্রবক্তা হিসেবে নয়, বরং জিয়ার রাজনীতির ধারাবাহিক উত্তরসূরি হিসেবেই উপস্থাপন করেন। তারেক রহমান বারবার ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর কথা বলেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, এই দর্শন ছাড়া বাংলাদেশ পরিচয় সংকটে পড়বে। এই বক্তব্য সরাসরি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তারেক রহমানের ভাষায়, ‘রাষ্ট্র আগে, দল পরে’। বস্তুত এই ধারণাও জিয়ার রাজনীতিরই আধুনিক পুনোর্চ্চারণ। বাংলাদেশপন্থী রাজনীতির আরেকটি উদাহরণ হলো-মানুষের প্রতি মমত্ববোধ। যে-মমত্ববোধ ছিলো শহীদ জিয়া ও ম্যাডাম জিয়ার রাজনীতির অনুপম দর্শন। দেশের মানুষকে একই পরিবারের সদস্য মনে করতেন প্রয়াত দুই কিংবদন্তি নেতাই। তাদের শিক্ষা ও শাসনে তারেক রহমান বেড়ে উঠেছেন। তাই তিনি মানুষকে ভালোবাসার যে-পারিবারিক শিক্ষা পেয়েছেন তা নিশ্চয়ই স্মরণে রেখেছেন। তারেক রহমানের লেখা থেকেই উদ্ধৃতি দিচ্ছি-
‘আরেকটি ঘটনা। বয়স কম। স্কুলে পড়ি। কিছু গালাগাল রপ্ত করেছি। সময় পেলে আক্রমণের সুযোগ হাতছাড়া করি না। সেদিনও করিনি। কারণটি পুরোপুরি মনে নেই। তবে বাসার বাইরের গেটের সামনে সন্ধ্যাবেলা পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গে দুষ্টামি করছিলাম। রাস্তা দিয়ে মাঝে মধ্যেই গাড়ি যাওয়া-আসা করছিল গেইটে কর্তব্যরত সেনাবাহিনীর গার্ড ছিল ডিউটিতে। আমাকে বলল, ‘ভাইয়া সন্ধ্যা হয়ে গেছে। ভেতরে যান।’
আর যায় কোথায়? খেলার মধ্যে বিড়ম্বনা? যা মুখে এলো স্বরচিত কবিতার মতো তা বলে গেলাম। খেলা শেষ। ভেতরে এলাম। ক্লান্ত। কোনো মতে পড়া শেষ করে রাতে খেয়ে ঘুম। ঘুমিয়েছিলাম বোধ হয় ঘণ্টা দেড়েক। হঠাৎ মনে হলো ভূমিকম্প হচ্ছে। চোখ খুলে দেখি বাবা। শিকারের সময় বাঘ থাবা দিয়ে যেভাবে হরিণ শাবক ধরে, বাবা ঠিক সেভাবে হাত দিয়ে আমার মাথার চুল ধরে টেনে তুললেন এবং বাঘের মতো গর্জন করে বললেন, ‘কেন গাল দিয়েছিলি? ওকি তোর বাপের চাকরি করে? যা মাফ চেয়ে আয়।’ মাকে বললেন, ‘যাও ওকে নিয়ে যাও। ও মাফ চাইবে তারপর ঘরে ঢুকবে।’
মা আমাকে নিয়ে গেলেন সামনের বারান্দায়। বিনা দোষে গাল খাওয়া ব্যক্তিটিকে ডেকে আনা হলো। যদিও লোকটি অত্যন্ত ভদ্রতার সঙ্গে মাকে বলল, ‘না ম্যাডাম, ভাইয়ার কথায় আমি কিছু মনে করিনি। ছোট মানুষ অমন করে। জানি না তিনি আজ কোথায়। তবে আজ সে জন্য আমি আপনার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।’
তারেক রহমানের এই লেখা থেকেই বোঝা যায়, তিনি কতটা পারিবারিক সুশিক্ষায় শিক্ষিত। আর তার মরহুম পিতা শহীদ জিয়াও কেমন ছিলেন? রাষ্ট্রপতির সন্তান বলে গার্ডকেও কড়া কথা বলার সুযোগ ছিল না। তারেক জিয়াও কতটা অনুতপ্ত। শৈশবের অপরাধ। যা ম্যাডাম জিয়ার মাধ্যমে ক্ষমা চেয়ে ঋণ শোধ করেছেন, তারপও ২০১২ সালের লেখাতে আবারও ক্ষমা চাচ্ছেন। তাই বলা যায়, তিনি ভুলে যাননি। কারা? কে নির্যাতন করেছে? কাদের নির্দেশে করেছে? কারা এবং কোন পত্রিকা তাকে অন্যায়ভাবে দুর্নীতিবাজ বানিয়েছে? হয়তো সবই মাফ করেছেন, কিন্তু ভুলে যাননি।
আজ তাই সময়ের বাস্তবতায় বলা যায়, জিয়াউর রহমান ও তারেক রহমান দুজন ভিন্ন সময়ের, ভিন্ন বাস্তবতার রাজনৈতিক নেতা। কিন্তু তাদের রাজনীতির স্রোত একই নদী থেকে উৎসারিত। জিয়ার রাজনীতি ছিল রাষ্ট্র গঠনের রাজনীতি। তারেক রহমানের রাজনীতি সেই রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক, আধিপত্যহীন, স্বনির্ভর, মর্যাদাশীল ও শুভ-ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নেওয়ার প্রয়াস।
লেখক: রাজনীতি বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।