ঢাকা মেইল ডেস্ক
১০ জানুয়ারি ২০২৬, ০৪:২৪ পিএম
লেখার শুরুতেই জানাই আন্তরিক অভিনন্দন। বহু নির্যাতন, নিপীড়ন ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে দেশে প্রত্যাবর্তন ও দলীয় ফোরামে সর্বসম্মতিক্রমে স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনে বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দলের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ায়। নিঃসন্দেহে বর্তমান বাংলাদেশি রাজনীতিতে তারেক রহমান একটি প্রতিষ্ঠিত নাম। তিনি দেশে বিদেশে সমানভাবে পরিচিত। তারপরও তার কিছুটা পরিচয় দিয়ে রাখি। তারেক রহমান এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)’র চেয়ারম্যান এবং দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের প্রধান মুখ। তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র। এই সূত্রে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনীতির অন্যতম শক্তিশালী রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহনকারী ব্যক্তিত্ব। বিএনপির রাজনীতিতে তিনি দীর্ঘদিন ধরে কৌশলগত পরিকল্পনাকারী ও সংগঠক হিসেবে পরিচিত। একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে তিনি বিএনপির নীতিনির্ধারণ ও সাংগঠনিক কাঠামোতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন ও দক্ষতার স্বাক্ষর রাখেন। তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন একজন কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীল, কৌশলী ও হিসাবি রাজনৈতিক নেতা হিসেবে। নির্বাচন, আন্দোলন ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্ষেত্রে তাঁর সিদ্ধান্ত দলকে প্রভাবিত করে। সমর্থকদের চোখে তিনি বিএনপির নেতৃত্বের মূল ভরকেন্দ্র।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে তার ভূমিকা নির্ভর করবে তিনি কতটা মাঠ-ঘনিষ্ঠ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গণতান্ত্রিক নেতৃত্বে নিজেকে রূপান্তরিত করতে পারেন তার ওপর। তবে তারেক রহমানের নেতৃত্ব ধরনকে বোঝার জন্য তার রাজনৈতিক ভূমিকা, সাংগঠনিক কৌশল, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন এবং সমর্থক-সমালোচকদের দৃষ্টিভঙ্গি, সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি। তারেক রহমানের নেতৃত্বের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ। দলীয় সিদ্ধান্ত, আন্দোলনের রূপরেখা কিংবা সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাস এসব ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সংগত কারণেই তার হাতেই কেন্দ্রীভূত। এতে করে দলীয় শৃঙ্খলা বজায় থাকে। তবে একই সঙ্গে তৃণমূলের স্বতঃস্ফূর্ততা যেন সীমিত হয়ে না পড়ে সে বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে। তার রাজনীতি বরাবরই কৌশলগত ও দূরদর্শিতায় ঋদ্ধ। তিনি সরাসরি মাঠের রাজনীতির চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল ও পরিকল্পনাভিত্তিক রাজনীতিতে বেশি মনোযোগী। আন্দোলন, নির্বাচন বা আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, সব ক্ষেত্রেই তিনি লাভ-ক্ষতির হিসাব করে এগোনোর পক্ষপাতী। এই বৈশিষ্ট্য তাঁকে আবেগ-নির্ভর নেতার চেয়ে একজন বাস্তববাদী কৌশলী রাজনৈতিক পরিকল্পনাকারী হিসেবে পরিচিতি দিয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নেতৃত্ব তার রাজনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে প্রবাসে নির্বাসিত থাকার কারণে তারেক রহমানের ভূমিকা মূলত সরাসরি মাঠে নয়, ছিল কৌশলগত ও নীতিগত দিকনির্দেশনায়। তিনি প্রবাসে অবস্থান করলেও গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক ভাষ্য, দাবি ও কর্মসূচির রূপরেখা নির্ধারণে প্রবল প্রভাব রেখেছেন। তিনি কখনোই মাঠের সেনাপতি হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেননি; বরং রাজনৈতিক অভিভাবক ও সমন্বয়কের ভূমিকায় থেকেছেন। গণঅভ্যুত্থান ক্ষোভের বিস্ফোরণ না হয়ে একটি রাজনৈতিক দাবি-নির্ভর গণআন্দোলনে রূপ নেয়, এই জায়গায় তারেক রহমানের ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি প্রবাসে থেকেও তার বক্তব্যে বার বার আন্দোলনকে সরকারবিরোধী হলেও রাষ্ট্রবিরোধী না করার আহ্বান জানান। গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও নাগরিক অধিকারের ভাষাকে সামনে আনেন। আন্তর্জাতিক পরিসরে আন্দোলনের নৈতিক অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা করেন। গণঅভ্যুত্থানের সময় তারেক রহমান বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির ঐক্যের কথা বলেছেন বার বার। ঐক্য ছিল মূলত রাজনৈতিক দলের মধ্যে এবং ছাত্র, নাগরিক ও স্বতঃস্ফূর্ত সামাজিক শক্তির সঙ্গে সমন্বয়।
১/১১ এর সামরিক সরকার তারেক রহমানকে প্রাণঘাতী নিপীড়ন চালায়। সিনেম্যাটিক ভিলেনের চরিত্র ধারণ করে তারেক ও আরাফাতকে এক প্রকার জিম্মি করে সদ্যপ্রয়াত মহীয়সী রাজনীতিক বেগম খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠানোর জন্য অব্যাহত চাপ দিতে থাকে। কিন্তু এই দেশ ও মানুষ থেকে ম্যাডামকে বিচ্ছিন্ন করতে না পেরে তারেক রহমনাকে অকথ্য শারীরিক নির্যাতন করে। সুতরাং গণতন্ত্র রক্ষায় তারেক রহমানের নিজস্ব দুর্ভোগের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাবে এটি অবশ্যসম্ভাবী সত্য। তবে নতুন রাজনীতিতে জনগণ- বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন কাঠামো, নিরপেক্ষ প্রশাসন, ভোটাধিকার নিশ্চিতকরণে তারেক রহমানের নিরপেক্ষ ও দূরদর্শী রাজনীতির প্রমাণ দেখতে চায়। জনগণ চায়, জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের যথাযথ মূল্যায়ন, ভারতের আধিপত্যবাদের কাছে আত্মসমর্পণ নয়। দল নয়, রাষ্ট্রকেন্দ্রিক রাজনীতি। শুধু বিএনপিকে ক্ষমতায় আনার রাজনীতি নয়, বরং রাষ্ট্র সংস্কারের রাজনীতি বিশেষ করে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা। দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান। ত্যাগী, সৎ ও যোগ্য নেতৃত্বের মূল্যায়ন। দল ও রাষ্ট্রে নেতৃত্বের নবায়ন। সিন্ডিকেট ও সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান। প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচার। প্রতিহিংসা নয় আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার। অন্যায়কারী যে-ই হোক, সরকারপক্ষ, বিরোধীপক্ষ, কিংবা নিজ দলের মানুষ সবার জন্য একই আইনের প্রয়োগ চায় মানুষ।

আজকের বাংলাদেশ তরুণপ্রধান দেশ। তরুণদের রাজনীতিতে জায়গা করে দেওয়া। তরুণদের কেবল মিছিলে নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রে আনা হোক। ভয়মুক্ত ও মর্যাদাপূর্ণ রাজনীতি। নতুন প্রজন্ম ক্যাডার নয়, নাগরিক রাজনীতি চায়। লাঠি নয়, যুক্তি এবং ভয় নয়, মর্যাদা চায়। সরকার উদারনৈতিক সমালোচনা ও ভিন্নমত প্রকাশের জায়গা বিস্তৃত করবে জেন-জি’র এমনই প্রত্যাশা। নতুন প্রজন্মের জন্য আশা, সুযোগ ও ভবিষ্যতের ভাষা। স্পষ্ট অবস্থান ও সাহসী সিদ্ধান্ত। একটি স্পষ্ট ইয়ুথ ভিশন জাতির কল্যাণে দরকার। নতুন প্রজন্মের মনের ভাষা এমন, দ্বিধা নয়, অস্পষ্টতা নয়। স্পষ্ট নেতৃত্ব চায়। স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের জন্য সাহসী, স্বচ্ছ ও মানবিক নেতৃত্ব প্রয়োজন। এইসব নিশ্চয়তা জনগণের বড় চাওয়া। চির-আকাঙ্ক্ষার জায়গা।
তারেক রহমানের কাছে নতুন প্রজন্মের চাওয়া আসলে কোনো ব্যক্তিকেন্দ্রিক আবেগ নয়; এটি একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ, মর্যাদা ও অংশগ্রহণের দাবি। এই চাওয়াগুলো স্পষ্ট, বাস্তব এবং আগের প্রজন্মের রাজনীতির পুনরাবৃত্তি নয়। তাই রাষ্ট্রের যুগোপযোগী সাহসী সংস্কার, তরুণদের আস্থা অর্জন এবং রাজনীতিকে মানবিকী ও আধুনিকীকরণ তাকে শহীদ প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়াউর রহমান এবং অমর দেশপ্রেমিক দেশনেত্রীর মতোই অমরত্বের পথ দেখাবে। নতুনের মাঝে বাঁচতে হবে। তরুণদের মনের ভাষা বুঝতে হবে। নবপ্রজন্মের হৃদয়ে স্থান পাওয়ার মতো কাজ করলেই তারেক রহমান তার পিতা-মাতার মতো বিশ্ব-রাজনীতির ইতিহাসে স্থান করে নিতে পারবেন। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের সাথে নিরাপোস থাকলেই তিনি একজন পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে ইতিহাসে স্থান পাবেন।
লেখক: কলামিস্ট ও রাজনীতি বিশ্লেষক