ঢাকা মেইল ডেস্ক
১৯ নভেম্বর ২০২৫, ০৮:৫২ এএম
মানুষ পৃথিবীতে একবারই আসে। এই জীবন অমূল্য, অপ্রতিদ্বন্দ্বী এবং একবার হারালে আর ফিরে পাওয়া যায় না। তাই একজন মানুষকে হত্যা করা মানে একটি সম্পূর্ণ জগৎ ধ্বংস করে ফেলা। তাই ধর্ম, নীতি, আইন—সবই বলে, ‘মানুষ হত্যা মহাপাপ।’ একজন মানুষকে হত্যা করলে শুধু একজনই মারা যায় না, তার পরিবার, সন্তান, আত্মীয়স্বজন এবং সমাজের অসংখ্য মানুষ কষ্টে ভোগে।
জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে অন্যতম কুখ্যাত গণহত্যা। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ব্রিটিশ শাসনের প্রকৃত চেহারা ও নগ্ন রূপের প্রকাশ ঘটে। গোটা বিশ্ব শিহরিত হয় ও দেশে-বিদেশে সর্বত্র ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে।
১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল অবিভক্ত ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের অমৃতসর শহরের জালিয়ানওয়ালাবাগ নামক একটি বদ্ধ উদ্যানে ইংরেজ সেনানায়ক ব্রিগেডিয়ার রেগিনাল্ড ডায়ারের নির্দেশে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়।
সে দিন বেশিরভাগই পার্শ্ববর্তী গ্রাম থেকে এসেছিলেন বৈশাখী উৎসব উদযাপনের জন্য। একই স্থানে রাওলাট আইনের বিরুদ্ধে একটি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ সমাবেশও ছিল। রাওলাট আইন ছিল ১৯১৯ সালে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক পাশ করা একটি কুখ্যাত আইন, যার মাধ্যমে ভারতে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দমন করা হতো এবং পুলিশকে বিনা পরোয়ানায় যেকোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার ও বিনা বিচারে আটক রাখার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল।
জালিয়ানওয়ালাবাগে সমাবেশের খবর ব্রিগেডিয়ার-জেনারেল রেজিনাল্ড ডায়ারের কাছে পৌঁছালে তিনি তার সৈন্যদের নিয়ে সেখানে পৌঁছান এবং কোনও সতর্কতা ছাড়াই নিরস্ত্র সমাবেশে গুলি চালান। প্রস্থান পথ বন্ধ থাকায় লোকেরা পালাতে পারেনি।
ব্রিটিশ সরকারের পরিসংখ্যানে প্রায় ৩৭৯ জন নিহত এবং ১,২০০ জনেরও বেশি আহত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। মানুষকে কুয়োতে ফেলে পাথর মেরেও হত্যা করা হয়। তবে, বেসরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে প্রায় তিনগুণ বেশি বলে ধারণা করা হয়। হতাহতের মধ্যে ছিল নিরীহ পুরুষ, মহিলা এবং শিশু।
হত্যাকাণ্ডের পর ব্রিটিশ সরকার একটা কমিশন গঠিত হয়। ব্রিগেডিয়ার-জেনারেল রেজিনাল্ড ডায়ারকে তার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার পর ইংল্যান্ডে ডেকে পাঠানো হয়। কিন্তু এই নৃশংস কাজ করার জন্য তার বিরুদ্ধে কোনও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ড ঘটনার প্রতিবাদে ভারতের সর্বত্র ঘৃণা ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন জন বিভিন্নভাবে প্রতিবাদের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইংরেজ সরকারের দেওয়া ‘নাইটহুড’ উপাধি ত্যাগ করেন। দিল্লির হাকিম আজমল খান তাঁর 'মসিহ-উল-মূলক' উপাধি এবং প্রথম শ্রেণির 'কাইসার-ই-হিন্দ' স্বর্ণ মেডেল ব্রিটিশ সরকারকে ফেরত দেন।
কবি নজরুল ইসলাম নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানান, সেই সময়ের নবযুগ পত্রিকায় প্রবন্ধ লিখে। নবযুগ পত্রিকায় ছাপা প্রবন্ধের অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো। ডায়ারের স্মৃতিস্তম্ভ – কাজী নজরুল ইসলাম,
“অত্যাচারীরা যুগে যুগে যত কিছু কীর্তি রাখিয়া গিয়াছে, এইখানে তাহাদের সব কিছুরই স্মৃতিস্তম্ভ আমাদের চোখে শূলের মতো বাজিতেছে। কিন্তু এই সেদিন জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হইয়া গেল, যেখানে আমাদের ভাইরা নিজের বুকের রক্ত দিয়া আমাদিগকে এমন উদ্বুদ্ধ করিয়া গেল, সেই জালিয়ানওয়ালাবাগের নিহত সব হতভাগ্যেরই স্মৃতিস্তম্ভ বেদনা-শেলের মতো আমাদের সামনে জাগিয়া থাক, ইহা খুব ভালো কথা, কিন্তু সেই সঙ্গে তাহাদেরই দুশমন ডায়ারকে বাদ দিলে চলিবে না। ইহার যে স্মৃতিস্তম্ভ খাড়া করা হইবে, তাহার চূড়া হইবে এত উচ্চ যে ভারতের যে-কোনো প্রান্ত হইতে তা যেন স্পষ্ট মূর্ত হইয়া চোখের সামনে জাগিয়া ওঠে। এ-ডায়ারকে ভুলিব না, আমাদের মুমূর্ষ জাতিকে চিরসজাগ রাখিতে যুগে যুগে এমনই জল্লাদ কশাই-এর আবির্ভাব মস্ত বড়ো মঙ্গলের কথা। ডায়ারের স্মৃতিস্তম্ভ যেন আমাদিগকে ডায়ারের স্মৃতি ভুলিতে না দেয়। ইহার জন্য আমাদেরই সর্বাগ্রে উঠিয়া পড়িয়া লাগিতে হইবে। নতুবা আমরা অকৃতজ্ঞতার বদনামের ভাগী হইব। এই যে আজ আমাদের নূতন করিয়া জাগরণ, এই যে আঘাত দিয়া সুপ্ত চেতনা, আত্মসম্মানকে জাগাইয়া তোলা, ইহার মূল কে? – ডায়ার”।
এরপর কবি নজরুল ইসলাম মুহাজিরীন হত্যার প্রতিবাদে লেখেন 'মুহাজিরীন হত্যার জন্যে দায়ী কে'। এরপর ব্রিটিশ প্রশাসন নবযুগ পত্রিকাটি বাজেয়াপ্ত করে।
জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড নিয়ে ব্রিটিশরা যতই গাদ্দারী ভাব দেখাক না কেন এক সময় তাদের মাথা নিচু হয়ে এসেছিল। ১৯৬১ ও ১৯৮৩ সালে ভারত সফরকালে রাণী এলিজাবেথ এই বিষয়ে কোনও মন্তব্য করেননি, তবুও তিনি ১৩ অক্টোবর ১৯৯৭ সালে ভারতে রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় ঘটনাগুলি সম্পর্কে বক্তব্য রাখেন, “এটা আমাদের গোপন কিছু বিষয় নয়, এটা অতীতের কিছু জঘন্য ঘটনার কথা- জালিয়ানওয়ালাবাগ, যা আমি আগামীকাল পরিদর্শন করব, এটি একটি দুঃশ্চিন্তার উদাহরণ। কিন্তু ইতিহাস পুনর্বিবেচনা করা যায় না”।
১৯৯৭ সালের ১৪ অক্টোবর রাণী এলিজাবেথ দ্বিতীয়বার জালিয়ানওয়ালাবাগ পরিদর্শন করেন এবং ৩০-সেকেন্ডের নীরবতার মুহূর্তের সাথে তার সম্মান প্রদান করেন পরিদর্শনকালে, তিনি গোলাপী জাফরান বা কেওরা বর্ণের একটি পোশাক পরেন।
স্মৃতিস্তম্ভ পরিদর্শনের সময় তিনি তাঁর জুতা খুলে ফেলেছিলেন এবং স্মৃতিস্তম্ভে একটি জয়মাল্য পরিয়ে দিয়েছিলেন। রাণী নিজেও ঘটনার সময় জন্মগ্রহণ করেননি তারপরও তিনি মাথা নিচু করে দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন।
জালিয়ানওয়ালাবাগের চেয়ে বাংলাদেশে বড় ধরনের হতাহতের ঘটনা ঘটে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে। জাতিসংঘের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই সময় ১৪০০ লোকের ও বেশি নিহত হয়। প্রায় ২০ হাজার মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করে। হতাহতের বেশির ভাগ ছাত্র, চাকরিপ্রত্যাশী, তরুণ ও শিশু-কিশোর।
এ দেশের মানুষ সে সময় দেখেছে বুলেট কত সস্তা। এদেশের মানুষ দেখছে প্রাণঘাতী অস্ত্র কীভাবে নিরস্ত্র মানুষের উপর ব্যবহার করা হয়, কিভাবে মানুষকে পাখির মত হত্যা করা হয়।
এ দেশের মানুষ দেখেছে আবু সাঈদের বুক পেতে দেওয়া! হালকা গড়ন, পরনে কালো গোল-গলা টি-শার্ট আর ধূসর ট্রাউজার্স, রাষ্ট্র যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে দুটো হাত আড়াআড়ি করে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। সে তো কোন অপরাধ করিনি, কাউকে আক্রমণ করিনি, তবুও নির্মম বুলেট তাকে বিদ্ধ করল ক্রমাগত। মাত্র কয়েক সেকেন্ডে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল, জীবন নিঃশেষিত হয়ে গেল, শহিদ হলেন। একজন নিরস্ত্র মানুষের বুক, মাথা, পেট লক্ষ্য করে কেন গুলি করা হবে? একটা পাখিকেও কি এভাবে গুলি করা যায়!
শহিদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ। ‘ভাই পানি লাগবে কারও, পানি’ মুগ্ধের এ কথাটি এদেশের মানুষকে সারা জীবন কাঁদাবে। খাবার পানি আর বিস্কুট বিতরণের সময় একটি গুলি তার কপাল ভেদ করে কানের পাশ দিয়ে বের হয়ে যায়, লুটিয়ে পড়ে রাস্তায়। মুগ্ধ’র রক্তে যখন রাস্তা ভেসে যাচ্ছিল, তখন তার বন্ধুরা বহু সংগ্রাম করেও সাথে সাথে তাকে হাসপাতালে নিতে পারেননি। এক সময় হাসপাতালে নেওয়া হলে ডাক্তাররা বলেন তার প্রাণ আগেই বেরিয়ে গিয়েছে।
সাভারের আশুলিয়াসহ বিভিন্ন জায়গার হত্যাকাণ্ডের ভিডিও প্রকাশ হয়েছে যেগুলো দেখে মানুষ বাকরুদ্ধ ও অসুস্থ হয়েছে। প্রতিটি মৃত্যই যেন এক একটা শোক গাঁথা। যারা নিহত হয়েছে তারা আমাদেরই সন্তান, এ দেশেরই মানুষ, আজ তারা এই স্বপ্নের পৃথিবীতে নেই! তাও আবার তরুণ-শিশু-কিশোর, তাদের নিয়ে মা-বাবার, এ জাতির কত স্বপ্ন ছিল! তারা একটা দাবি করেছিল। যৌক্তিকতা বিবেচনা করে আগেই সমাধানের পথ ছিল, কেন বুলেট দিয়ে জবাব দিতে হবে? কেন সেই সংখ্যা এক এক করে ১৪০০ গিয়ে দাঁড়াল? আজ ১৪০০ মায়ের বুকে শুধু শূন্যতা আর হাহাকার।
এক বছর যেতে না যেতেই এক শ্রেণির কিছু লোক সেই শোক গাঁথা মৃত্যুগুলোকে চাপা দিতে বা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার অপচেষ্টা করে যাচ্ছে। অবাক হতে হয় যখন কিছু লোক নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে খুনের নীতি সমর্থন করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়, কাঁদা ছিটায়, বিভিন্ন জায়গায় বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ছড়ায়।
হত্যাকাণ্ড নিয়ে একেক সময় একেক ধরনের বিবৃতি দেওয়া হচ্ছে। প্রথমে বলা হয়ে ছিল সরকার বিরোধীরা এদেরকে হত্যা করেছে, এরপর বলা হল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল, নিরাপত্তা বাহিনীর কিছু সদস্যের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে এমনটা ঘটেছে, তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়নি, ইত্যাদি ইত্যাদি।
১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে যুগান্তকারী রায় দিয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা বর্তমানে মানুষ তথ্য প্রযুক্তির যুগে বাস করে। এই যুগে যোগাযোগ, তথ্যপ্রবাহ, গণমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এমনভাবে বিস্তৃত হয়েছে মানুষ মুহূর্তের মধ্যে সব খবর পেয়ে যায়। একজন মানুষ বিভিন্ন মাধ্যম থেকে তথ্য পায় এবং কোনটা সঠিক যাচাই করে নিতে পারে। ফলে আজকের পৃথিবীতে সত্যকে গোপন রাখা অনেক কঠিন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে প্রতিটি নৃশংস হত্যার খবর এ দেশের মানুষের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল, কারা, কীভাবে, কোন কারণে তাদেরকে হত্যা করেছে। তাই তারা এক সময় হত্যার বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, রুপ নেয় জুলাই গণ-অভ্যুত্থান।
সব থিউরি সব সময় কাজ করে না। তথ্য প্রযুক্তির যুগে একটি দলের নীতিনির্ধারক মহলের কর্মকাণ্ড দেখে এ দেশের মানুষ অবাক হয়। অ্যাডলফ হিটলারের তথ্য মন্ত্রী পল জোসেফ গোয়েবলস থিউরি ছিল মিথ্যা বারবার বলতে হয়, মিথ্যা বারবার বললে সত্য বলে মনে হয়। কিন্তু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একই কথা বারবার বলার কৌশল যদি পাবলিকের কাছে ধরা পরে তাহলে পচে যাওয়ার আর কিছু বাকি থাকে না।
পৃথিবীর অনেক রাষ্ট্র, গোষ্ঠী, ব্যাক্তি, রাজা-বাদশা হত্যাকাণ্ড ঘটানোর পর এক সময় নৈতিকতার কাছে হার মেনেছে। হত্যাকাণ্ডের জন্য এক সময় মাথা নিচু করেছে। বিচার মেনে নেওয়ার পাশাপাশি নৈতিক বোধ যত জাগ্রত হয় ততই বাংলাদেশের জন্য মঙ্গলকর।
স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর এ দেশের মানুষ ১৪০০ হত্যাকাণ্ডকে কোথায় কীভাবে লুকাবে, সেটাই বড় প্রশ্ন। তাছাড়া ইতিহাসও পুনর্বিবেচনা করার সুযোগ রাখে না।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী