১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৫:৫৭ পিএম
উনিশ’শো আশি সালের কথা। দেশজুড়ে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সবুজ বিপ্লবের কর্মসূচির তোড়জোড় চলছে। উন্নয়নের জাগরণ সারাদেশে। খালকাটা কর্মসূচির পাশাপাশি কল-কারখানায় উৎপাদন বৃদ্ধি এবং নারী-পুরুষকে কাজে সম্পৃক্ত করা, সাক্ষরতা বৃদ্ধির কাজ চলছে।
প্রেসিডেন্ট জিয়া দিনের বেশিরভাগ সময় কাটান গ্রামে। রাত কাটান ঢাকায়। গ্রাম সরকার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। জনগণকে উন্নয়নের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনতে কর্মসূচির পর কর্মসূচি বাস্তবায়ন চলছে। সে সময় জিয়াউর রহমানের সরকার গ্রামের মানুষকে শিক্ষা-বিনোদনে সম্পৃক্ত করতে বিনামূল্যে বিশাল সাইজের টেলিভিশন সেট প্রদান করেন।
গ্রামগুলোতে তখনো পুরোমাত্রায় পল্লী বিদ্যুতের অগ্রযাত্রা শুরু হয়নি। প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষ ব্যাটারির সাহায্যে টেলিভিশন সেট চালু করে এক জায়গায় বসে তা দেখতেন। বিটিভি তখন অনুষ্ঠান সম্প্রচার শুরু করতো সন্ধ্যার কিছু আগে। রাত ১১টার আগেই শেষ হয়ে যেতো। টেলিভিশনে বিভিন্ন শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান, খবর দেখানো হতো। আমার এক বোনের বাড়িতে গিয়ে আমি প্রথম টেলিভশন সম্প্রচার দেখি। এভাবে একদিন দুলাভাইকে বলে আমাদের বাড়িতে টেলিভিশন দেখানোর আয়োজন করা হয়।
গরুর গাড়িতে করে টেলিভিশন সেট আর ব্যাটারি এনে একটি এন্টেনা বাঁশের মাথায় লাগিয়ে বাড়ির বৈঠকখানার সামনে টিভি দেখানোর আয়োজন করা হয়। সাদা কালো সে টেলিভিশনের অনুষ্ঠান দেখতে সমবেত হন গ্রামের হাজারো মানুষ। সমস্যা দেখা দেয় টিভি সেট চালুর সময়। অনভিজ্ঞ গ্রামের কেউই টিভি সেট অন করতে পারছিল না। গ্রামের মধ্যপাড়ার মারফত আলী ইলেকট্রনিক্সের দোকানে কাজ করতেন। ডেকে আনা হলো মারফত ভাইকে। তিনি মোটা সাইজের টিভির একটি সুইচ কয়েকটি মোড়া দিলেন। অমনি ভেসে উঠল হারমোনিয়ামের ওপর গভীর মনোযোগী এক নারীর ছবি। তিনি আনমনে গাইছেন, ‘আমার ঘরখানায় কে বিরাজ করে। নড়েচড়ে ঈশানও কোণে। দেখতে পাইনে দু’নয়নে...।’
স্ক্রিনের এক কোণে ভেসে উঠল শিল্পী ফরিদা পারভীনের নাম। উচ্ছ্বসিত হাজারো মানুষ হাতে তালি দিয়ে উঠলেন। আমার মনে পড়ে ফরিদা পারভীনের আরও কয়েকটি গান সেদিন সম্প্রচারিত হয়েছিল। রাত ১১টা পর্যন্ত গ্রামের মানুষ টেলিভিশনের সামনে বসে কখনো খবর কখনো অন্যান্য অনুষ্ঠান দেখে বাড়ি ফেরেন। জীবনে সেদিনই প্রথম টিভির পর্দায় লালনসঙ্গীত শিল্পী ফরিদা পারভীনকে দেখি। তার গান শুনে মানুষের সে কী উচ্ছ্বাস! এরপর ফরিদা পারভীনকে অনেকবার দেখেছি। কথা বলেছি।
যশোর বিমানবন্দরে একদিন তার সঙ্গে কথা হয়। নিজের পরিচয় দিলাম। তিনি আন্তরিকতার সঙ্গে কিছুটা আঞ্চলিকতার টানে আমার কাছে অনেক কিছু জানতে চাইলেন। তার সঙ্গে সেদিন গাজী আবদুল হাকিম সাহেবও ছিলেন। এরপর শিল্পী ফরিদা পারভীন জাতীয় প্রেস ক্লাবে অনেকবার এসেছেন। গান গেয়েছেন। দেখা হয়েছে। কথা বলেছি।
লালন সঙ্গীতকে তিনি নিজের জন্য আবশ্যকীয় করে নিয়েছিলেন। তার প্রথম স্বামী ছিলেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক সঙ্গীতজ্ঞ ইতিহাসবিদ অধ্যাপক আবু জাফর। তিনি জাতীয় পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন। ২০২৪ সালের ৬ ডিসেম্বর তিনি মারা যান। আবু জাফর স্যারের সঙ্গে আমার দুদিন কথা হয়েছে। কিন্তু আমি তার বই ও বিভিন্ন লেখা পাঠ করেছি। ফরিদা পারভীনকে আজকের উচ্চতায় তুলে এনেছিলেন অধ্যাপক আবু জাফর। তার লেখা গান গেয়েই তিনি খ্যাত হয়েছেন।
শিল্প সংস্কৃতির জগতটা একটু ভিন্ন হয়। এখানে মানুষের আবেগ উচ্ছ্বাস বাস্তবতাকে হার মানায়। একটু এলোমেলো বোহেমিয়ান মানুষেরা শিল্প চর্চায় দিন গুজরান করে। এরা ভালোবাসার কাঙাল হয়। কিন্তু একটা পর্যায়ে অবহেলায় জীবন নিঃশেষ করে দেয়। অধ্যাপক আবু জাফর সঙ্গীতের পণ্ডিত ছিলেন। শিল্প-সাহিত্যের বোদ্ধা মানুষ ছিলেন। জীবনের এক পর্যায়ে তিনি ইসলামী মূল্যবোধকে আঁকড়ে ধরেন। তার ভাবনার জগতে বড় ধরণের পরিবর্তন আসে। এ নিয়ে সহধর্মিনী ফরিদা পারভীনের সঙ্গে তার মতপার্থক্য তৈরি হয়, যা বিচ্ছেদে গড়ায়।
ফরিদা পারভীন সঙ্গীত ত্যাগ করতে চাননি। সঙ্গীতকে অবলম্বন করেই বেঁচে থাকতে চেয়েছেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি লালনগীতির প্রতি তার আবেগ অনুরাগ প্রকাশ করতে গিয়ে কেঁদেছেন। তিনি সংসার ছেড়েছেন। তবুও সঙ্গীত ছাড়েননি। লালনগীতিকে বাংলাদেশের মানুষের কাছে দরদ নিয়ে গেয়েছেন। পৌঁছে দিয়েছেন শেকড়ের গভীরে।
১৩ সেপ্টেম্বর জগতের মায়া ত্যাগ করে তিনি পরলোকে পাড়ি দিয়েছেন। তিনি গেয়েছেন, তোমরা ভুলেই গেছো মল্লিকাদির নাম। কিংবা একবার যেতে দে না, আমার ছোট্ট সোনার গাঁয়। যতদিন বাংলাভাষা থাকবে, এ দেশের লোকায়ত সঙ্গীতের ক্ষেত্রে ফরিদা পারভীনকেও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবেন কোটি মানুষ।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ঢাকা মেইল।