images

মতামত

জাকাত: সামাজিক নিরাপত্তা ও বৈষম্য নিরসনমূলক আর্থিক ইবাদত

২৯ মার্চ ২০২৫, ১২:৪৯ পিএম

images

মানুষ ধর্মচর্চা করে। মানুষ মহান প্রতিপালকের সন্তুষ্টি অর্জন করে চায়। ধর্ম পালনের মাধ্যমেই মানুষ মহান স্রষ্টার কৃপা অর্জনে ব্রতী হন। ধর্ম কী, ধর্মের অনুসারী কারা এবং মানুষ কীরূপে ধর্মীয় অনুশাসন পালন করে? মানুষ কেন ধর্মীয় নির্দেশনা পালন করবে? এবং এত সমাজ বা রাষ্ট্র কীভাবে উপকৃত হয়। তা এ নিবন্ধের মূল আলোচনা। সাধারণত ‘ধর্ম’ হচ্ছে অতি প্রাকৃতিক সত্তা বা রহস্যকৃত শক্তিতে বিশ্বাস। যা মানবজীবন ও প্রকৃতির ধারাকে নিয়ন্ত্রণ করে। ধর্ম একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান। ইহা কতগুলো বিশ্বাস, আচরণ, নৈতিকতা ও পারস্পরিক নির্ভরশীল ব্যবস্থাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। ধর্মীয় অনুশাসনের মাধ্যমে পার্থিব দিক ও পরলৌকিক মঙ্গল বিবেচনায় মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠিত ধর্ম চারটি। ইসলাম, হিন্দু, খ্রিষ্টান ও বৌদ্ধ ধর্ম। যার মধ্যে সমগ্র মানবজাতির কল্যাণে মনোনীত দ্বীন ইসলাম। মহান স্রষ্টা একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান হিসেবে ইসলামকে হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর মাধ্যমে অবতীর্ণ করেছেন। শান্তি, সাম্য ও বিশ্বমানবতার ধর্ম হিসেবে ইসলামের লক্ষ্য জাতি, ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে সর্বস্তরে শান্তি স্থাপন করা। ইসলাম ধর্মের মূল বাণী হল মহান আল্লাহর একত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করা। একই সাথে সততা, ন্যায়নিষ্ঠা ও মূল্যবোধ জাগ্রত করা। যাতে সামাজিক নিরাপত্তা বিধান ও বৈষম্য নিরসনের মাধ্যমে কল্যাণমূলক সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা যায়। 

‘জাকাত’ ইসলামের প্রধান আর্থিক ইবাদত। ‘জাকাত’ আরবি শব্দ। যার আভিধানিক অর্থ হলো পবিত্রতা, পরিচ্ছন্নতা ও বৃদ্ধি পাওয়া ইত্যাদি। ইসলামের মৌলিক ভিত্তি পাঁচটি যথা-আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস, সালাত, রোজা, হজ ও যাকাত। ইসলামে জাকাত প্রদান ফরজ এবং পাঁচ মৌলিক স্তম্ভের মধ্যে পঞ্চম। ইসলামিক বিধান অনুসারে যাকাত কী?  কোনো ব্যক্তির মাল (অর্থ) হতে বিশেষ পদ্ধতিতে আল্লাহর উদ্দেশ্যে যথাযথ পন্থায় ব্যয় করাই জাকাত। জাকাত অস্বীকারকারী কাফের। প্রতি চন্দ্রবর্ষে সম্পদশালী নর-নারী কর্তৃক নেসাবভুক্ত সম্পদের ২.৫ শতাংশ উপযুক্ত ব্যক্তির মাঝে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দান করাকে ইসলামের পরিভাষায় জাকাত বলা হয়। জাকাত ব্যক্তির সম্পদকে পবিত্র করে, বিভিন্ন ক্ষতি কৃপণতা থেকে মানুষকে হেফাজত করে। যাকাতের মাধ্যমে বান্দার সম্পদ বৃদ্ধি পায়।

8

জাকাতের নেসাব হচ্ছে: বছরান্তে বান্দার নিকট সাড়ে সাত ভরি (৮৭.৮৫ গ্রাম) সোনা বা সাড়ে বায়ান্ন ভরি (৬১২.১৫ গ্রাম) রূপা বা সমপরিমাণ নগদ অর্থ জমা থাকলে তিনি সম্পদশালী। এ পরিমাণ সম্পদ কোন ব্যক্তির নিকট এক বছর স্থায়ী থাকলে তাকে বছর শেষে আবশ্যিকভাবে জাকাত প্রদান করতে হয়। 

‘জাকাত’ বছরে একবার আদায়যোগ্য, উত্তম ও ফরয ইবাদত। মহান আল্লাহ প্রবিত্র কোরআনের ফরজ ইবাদতসমূহ প্রসঙ্গে সুস্পষ্ট ঘোষণা প্রদান করেছেন। পবিত্র কোরআনের ৮২ জায়গায় সালাত ৩২ জায়গায় জাকাত এবং ২৭ জায়গায় সালাত ও জাকাত সম্পর্কে একত্রে বলা হয়েছে। জাকাত প্রদানে রয়েছে মহান আল্লাহর পক্ষ হতে মহা পুরস্কার। সূরা বাকারা ২৭৭ নং আয়াতে মহান আল্লাহর ঘোষণা “ নিশ্চই যারা ঈমান এনেছে, সৎকাজ করেছে, সালাত কায়েম করেছে আর জাকাত প্রদান করেছে, তাদের পুরস্কার তাদের রবের কাছে। তাদের কোনো ভয় নেই, তারা চিন্তিত হবে না”। নির্ধারিত খাতে অর্থাৎ ব্যক্তির নিকট যথাযথভাবে জাকাত প্রদান করতে হবে। মানব জীবনে জাকাত প্রদানের গুরুত্ব অন্তহীন। সূরা মুনাফিকুনের ১০ নং আয়াতে মহান আল্লাহ এরশাদ করেন ,“ আমি তোমাদেরকে যে রিযিক তাহা হইতে ব্যয় করিবে তোমাদের কাহারও মৃত্যু আসিবার পূর্বে। অন্যথায় মৃত্যু আসিলে সে বলিবে, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে আরও কিছুকালের জন্য অবকাশ দিলে আমি সদাকা দিতাম এবং সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত হইতাম”। যাকাত এমন এক আর্থিক ইবাদত যার মাধ্যমে ব্যক্তির সম্পদ বৃদ্ধি পায়। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহর ঘোষণা “ আর তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ’র সন্তুষ্টি লাভের জন্য যাকাত দান করে, তাদেরই ধন-সম্পদ বৃদ্ধি পায়”। (সূরা আর-রূম-৩৯) যাকাত এমন এক ইবাদত, যে ইবাদতের মাধ্যমে মহান স্রষ্টার আনুকূল্য, ভালোবাসা ও নৈকট্য অর্জন করা যায়। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহর ঘোষণা, “তোমরা সালাত কায়েম কর, যাকাত দাও এবং রাসুলের আনুগত্য কর, যাহাতে তোমরা অনুগ্রহভাজন হইতে পার”। (সূরা নূর:-৫৬)

সমাজসেবা অধিদপ্তর একটি বহুমুখী কর্মসূচি সমৃদ্ধ দপ্তর । এটি একটি মানবকল্যাণধর্মী ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। অসহায়, নিগৃহীত ও বিপন্ন মানুষের কল্যাণের লক্ষ্যে এ দপ্তর দেশব্যাপী অনন্য ভূমিকা পালন করছে। এ অধিদপ্তর পরিচালিত একটি অন্যতম কার্যক্রম হাসপাতাল সমাজসেবা কর্মসূচি। এ কর্মসূচিটি সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত। এ কর্মসূচির মাধ্যমে সেবার পরিধি বৃদ্ধির জন্য “ইসলামে দুস্থ ও অসহায় রোগীদের কল্যাণে যাকাতের গুরুত্ব ও তাৎপর্য” শীর্ষক সেমিনার আয়োজন করা হয়। এ সেমিনার উদ্বোধন করেন দেশের বিশিষ্ট ইসলামী ব্যক্তিত্ব ও ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন। সেমিনারে আলোচকগণ দুস্থ রোগীদের কল্যাণার্থে যাকাত প্রদানের গুরুত্ব তুলে ধরেন। আলোচকগণ বক্তব্যে বলেন, রোগীকল্যাণ সমিতিতে যাকাত প্রদানের মাধ্যমে দেশের অসহায় রোগীদের চিকিৎসা সেবা  সুনিশ্চিত হবে। হাসপাতাল সমাজসেবা কার্যক্রমের সেবার পরিধি বৃদ্ধি পাবে। সেমিনার হতে অংশগ্রহণকারীগণ যাকাত, দান ও অনুদান নিঃস্ব মানুষের কল্যাণে কীরূপে ভূমিকা রাখবে তা জানতে পারে।

9

ইসলামী দৃষ্টিকোণ হতে ‘যাকাত’ একটি তাৎপর্যমণ্ডিত ইবাদত। এ কাজ পুণ্যশীলতার পরিচয়, মুমিনের বন্ধু ও সৎকর্মপরায়ণদের বৈশিষ্ট্য।  কুরআন মজীদে যাকাত প্রদানকারীদের জন্য রয়েছে সুসংবাদ এবং যাদেরকে বলা হয়েছে হেদায়তপ্রাপ্ত। যাকাত ব্যক্তির সম্পদ পরিশুদ্ধ ও প্রবৃদ্ধি করার ইসলামী বিধান। শরিয়তের পরিভাষায় সুনির্ধারিত সম্পদ সুনির্ধারিত শর্তে তার হকদারদের অর্পণ করা এক মহৎ কর্ম। ব্যক্তির যাকাত প্রদানের শর্ত হচ্ছে: নেসাব পরিমাণ ধন সম্পদের মালিক হওয়া, মুসলমান হওয়া, প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া, জ্ঞানী ও বিবেক সম্পন্ন হওয়া, স্বাধীন বা মুক্ত হওয়া, নেসাব পরিমাণ ধন সম্পদ প্রয়োজনীয় সম্পদের অতিরিক্ত হওয়া এবং ঋণমুক্ত থাকা। শরিয়তে যাকাতের খাত স্বয়ং আল্লাহ নির্ধারণ করেছেন। পবিত্র কোরআনের সুরা তাওবায় ৬০ নম্বর আয়াতে যাকাতের আটটি খাতের উল্লেখ রয়েছে, “যাকাত তো সেসব লোকের জন্যই, যারা অভাবগ্রস্ত, নিতান্ত নিঃস্ব, যারা তা সংগ্রহ করে আনে, যাদের অন্তরসমূহকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করা হয়, ক্রীতদাস মুক্তির ক্ষেত্রে, ঋণগ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে এবং মুসাফিরদের জন্য। এটা আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। আর আল্লাহ পাক সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।” বর্ণিত আয়াতের আলোকে আটটি খাতে যাকাত প্রদান করা যাবে। যথা: ১. ফকির ২. মিসকিন ৩. যাকাত সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত ব্যক্তি ৪. দ্বীন ইসলামের প্রতি চিত্তাকর্ষণে কোন অমুসলিম কিংবা ইসলামে অটল রাখার্থে নও মুসলিম ৫. দাসদাসীর মুক্তি ৬. ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির ঋণমুক্তি ৭. একান্ত ও শরিয়ত সম্মত আল্লাহর পথে যুদ্ধের ক্ষেত্রে এবং ৮. রিক্তহস্ত মুসাফির। ইহা রমজান মাসে আদায় করা শ্রেয়। 

যাকাতের মাধ্যমে মানবাত্মা পরিশুদ্ধ হয়। কৃপণতা, স্বার্থপরতা, আমিত্ব ইত্যাদি আতিœক ব্যাধি থেকে যাকাত আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে। সম্পদের যথাযথ যাকাত আদায় করলে একদিকে যেমন মন ও আত্মার পরিশুদ্ধ হয়, তেমনি অনাথ-অসহায়দের প্রতি সহানুভূতির মাধ্যমে সম্পদে পবিত্রতা ও খায়ের-বরকত আসে। বিবিন্ন হাদিসে রাসূল (সা.) যাকাতের গুরুত্ব বর্ণনা করেছেন। মহানবী (সা.) বর্ণনা করেন, “যাকে আল্লাহ সম্পদ দিয়েছেন, কিন্তু সে তার যাকাত দেননি কিয়ামতের দিন তা বিষধর সাপরূপে উপস্থিত হবে এবং তা গলায় পেছিয়ে দেওয়া হবে। সাপটি তার উভয় অধরপ্রান্তে দংশন করবে এবং বলবে, আমিই তোমার ধন, আমিই তোমার পুঞ্জীভূত সম্পদ”। (সহীহ বুখারী হাদিস নং ১৮০৩) রমজান মাসে যাকাত আদায় করলে অসহায় মানুষের প্রতি অধিক সহানুভূতি প্রকাশ করা যায়। আরবিবর্ষ হিসেবে যাকাত আদায় করতে হয়। তাই রমজান মাসে আদায় করলে বেশি নেকী পাওয়া যায়।

যাকাতের আর্থ-সামাজিক তাৎপর্য অপরিসীম। যাকাত প্রদানের মাধ্যমে সমাজে ধনী-দরিদ্রের ভেদাভেদ দূর হয়। পাশাপাশি বৈষম্যহীন রাষ্ট্র নির্মাণ করা সম্ভব হয়। যাকাতের মাধ্যমে বান্দার সম্পদ পবিত্র হয় ও সম্পদ বৃদ্ধি পায়। যাকাত ব্যবস্থা ধনী-গরীব ব্যবধান হ্রাস করে। আল্লাহ তার বান্দাদের অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার পাশাপাশি তাদের পরীক্ষার জন্য যাকাত প্রদানে উৎসাহিত করেছেন। তাই  যাকাত ধনীদের দয়া বা অনুগ্রহ নয়। যাকাত গরিবের অধিকার। তাই যাকাত আদায় করা ধনী ব্যক্তির উপর ফরজ করা হয়েছে। যাকাত আদায় না করার একটি অনিবার্য পরিণতি হলো, সমাজে বিপর্যয় নেমে আসবে এবং এ বিধান উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। ফলে ধনী-গরিবের বৈষম্য তীব্রতর হবে। গরিব শ্রেণি শুধু লাঞ্ছনা ও বঞ্চনারই শিকার হবে। দেশে মোট আয়ে ধনীদের অংশ বাড়ছে। যেমন- দেশের সবচেয়ে বেশি ধনী ১০ শতাংশ মানুষের হাতেই এখন দেশের মোট আয়ের ৪১ শতাংশ। বিপরীতে সবচেয়ে গরিব ১০ শতাংশ মানুষের আয় দেশের মোট আয়ের ১.৪১ শতাংশ। গত ৫০ বছরে ধনীর আয় অনেক বেড়ে যাওয়ায় বেড়েছে ধনী ও গরিবের আয়বৈষম্য। ( সূত্র: বিবিএস খানার আয় ও ব্যয় জরিপ ২০২২)।

‘যাকাত’ ইসলামের এক শাশ্বত বিধান। ইবাদত ছাড়াও এতে রয়েছে আত্মিক ও সামাজিক উৎকর্ষ। যাকাত মুসলমানদের পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব, সম্প্রীতি সৌন্দর্য বর্ধন করে। যাকাত ব্যবস্থা বিশ্বের প্রথম সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি। একটি কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় যাকাতভিত্তিক সমাজব্যবস্থা অতি প্রয়োজন। এটি দেশের আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তার রক্ষাকবচ। সমাজকে দেউলিয়া হতে রক্ষা করে। সুবিধাবঞ্চিত মানুষের অধিকার নিশ্চিত করে। সার্বিকভাবে সামাজিক নিরাপত্তা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে।