images

মতামত

ক্যাডার সৃজন: সমাজসেবা পেশা, পেশাগত বৈষম্য ও সংস্কার কমিশনের সুপারিশ

২২ আগস্ট ২০২৪, ০৬:২৬ পিএম

দেশে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অনেক সেবামূলক দফতর আছে। ‘সমাজসেবা অধিদফতর’ যার মধ্যে অন্যতম। একে বলা হয় সমাজের অসহায়, বিপন্ন ও নিগৃহীত মানুষে ঠিকানা। এটি একটি বহুমুখী কর্মসূচি সমৃদ্ধ দফতর। জাতি গঠনমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সর্বত্র সমাদৃত। এ দফতরকে কেন্দ্র করে সরকার বহু কল্যাণকর ও সেবামূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। তৃণমূল পর্যায়ে সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রব্যবস্থার অস্থিত্ব অনুভব যেসব দফতরের মাধ্যম। সমাজসেবা অধিদফতর তন্মধ্যে অন্যতম। এ দফতর দেশব্যাপী সামাজিক কল্যাণ, সামাজিক সুরক্ষা ও সামাজিক উন্নয়ন সাধনে অনন্য ভূমিকা পালন করছে। সামাজিক নিরাপত্তা, দারিদ্র্য বিমোচন, শিশু সুরক্ষা, প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর কল্যাণ, প্রান্তিক মানুষের উন্নয়ন, অসহায় রোগীর সেবা, সামাজিক অবক্ষয় প্রতিরোধসহ বিবিধ জনকল্যাণবান্ধব কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে সমাজসেবা অধিদফতর। ‘উপজেলা সমাজসেবা অফিসার’ হিসেবে ২০০৬ সালে এ দফতরে যোগদান। এ সুবাধে নিবিড়ভাবে প্রত্যক্ষ করেছি সমাজের অসহায়, প্রান্তিক ও অক্ষম মানুষের জীবন। লক্ষ্য করেছি তাদের অসহায়ত্ব। এ অসহায়ত্ব দূরীকরণে সমাজসেবা অধিদফতর। এ দফতরে কর্মরতগণ মানবসেবার মহান ব্রত এবং রাষ্ট্রের সেবক হিসেবে স্বীয় দায়িত্ব কর্মকর্তব্য রূপে প্রতিপালন করে যাচ্ছে।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় সমাজসেবা অধিদফতর দেশের অন্যতম ও বৃহৎ বো প্রদানকারী দফতর। এ দফতর মাঠ পর্যায়ে মন্ত্রণালয়ধীন সকল ৭টি উইয়িং এর কাজ বাস্তবায়ন করছে। সমগ্র দেশে ১০৩২টি কার্যালয়ের মাধ্যমে ৫৪টি কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। কর্মসূচি সমূহের আওতায় মোট উপকারভোগীর সংখ্যা ১ কোটি ৮৯ লক্ষ। দেশের জনবান্ধব কর্মসূচিসমূহ যেমন: দেশে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা ও দলিত-বেদে-হিজড়া জনগোষ্ঠীর বিশেষ ভাতা এ দফতর বাস্তবায়ন করছে। সুবিধাবঞ্চিত শিশুর কল্যাণেও কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে যেমন: সরকারি শিশু পরিবার, ছোটমনি নিবাস, ক্যপিটেশন গ্রান্ট কার্যক্রম, প্রতিবন্ধী শিশু উন্নয়মূলক প্রতিষ্ঠান, প্রবেশন কার্যক্রম, দুঃস্থ শিশুদের পুনর্বাসন কেন্দ্র ও কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র ইত্যাদি।

সমাজকল্যাণ এক মহৎ ও পেশাগত সমাজকর্ম। যে পেশার সেবায় পরিধি সীমাহীন এবং প্রদত্ত সকল সেবা পরিমাপ যোগ্য নয়। কিন্তু এ দফতরের কর্মচারীগণ দীর্ঘ বৈষম্যের শিকার। দেশের প্রশাসনিক সরকার কাঠামোতে  সমাজসেবা বিভাগের কর্মরতগণ আত্মমর্যাদা সংকটে ভোগে। কারণ উপজেলা ও জেলার প্রশাসনিক কাঠামোতে পদমর্যাাদা অনুসারে বেতন স্কেল, উচ্চতর স্কেল ও পদোন্নতির সুযোগ প্রাপ্তি হতে এ দফতরের কর্মকর্তাগণ বঞ্চিত। ফলে তরুণ কর্ম প্রত্যাশীগণ সমাজকল্যাণ কর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে এ পেশায় যুক্ত হচ্ছে না। অপরদিকে সমাজসেবা ক্যাডারভুক্ত দফতর নয়। কিন্তু দেশের উচ্চ শিক্ষিত তরুণদের ক্যাডার পদে কর্ম প্রত্যাশা প্রবল। পিএসসি দেশের সরকার পরিচালনার জন্য উপযুক্ত কর্মী বাহিনী বাছাই করে। এ দফতর দেশে ১ম শ্রেণির ক্যাডার ও নন-ক্যাডার পদে কর্মচারী নিয়োগ প্রদান করে। ‘নন-ক্যাড়ার নিয়োগ বিধিমালা-২০১৫’ অনুসারে বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী ক্যাডার বঞ্চিতগণ নন-ক্যাডার ১ম শ্রেণির পদের জন্য সুপারিশ প্রাপ্ত হন। এ প্রক্রিয়ায় সমাজসেবা অফিসার/সমমান পদে কর্মকর্তাগণ নন-ক্যাডার হিসেবে নিয়োগ প্রাপ্ত হন। নবীণ কর্মকর্তাগণ এরূপ নিয়োগে কর্মে যোগদানের শুরুতেই পেশার প্রতি অতৃপ্ত ও অসন্তুষ্ট থাকে। নন-ক্যাডার হিসেবে পদায়নে তারা অ-সম্মানিত বোধ করে। তারা কর্মের প্রতি যথাযথ মনোযোগ প্রদান করে না। বরং ক্যাডার পদের জন্য নব উদ্যোমে প্রচেষ্টা শুরু করে কিংবা ভিন্ন পেশার সন্ধান করে। যাহা একটি মানব কল্যাণধর্মী পেশার উন্নয়ন ও প্রসারের জন্য অন্যতম প্রতিবন্ধক।

4

১৯৬১ সালে সমাজকল্যাণ পরিদফতর হিসেবে এ বিভাগের সূচনা। ১৯৮৪ সালে পুর্ণাঙ্গ সমাজসেবা অধিদফতর হিসেবে উন্নীত হয় এবং ১৯৮৯ সালে পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রণালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। স্বাধীনতার পূর্বে জনপ্রশাসনে শুধুমাত্র ৩টি পদ একই গ্রেডভুক্ত (২য় শ্রেণির গেজেটেড) ছিল। যথা: ১. সার্কেল অফিসার (উন্নয়ন) ২. সার্কেল অফিসার (রাজস্ব) ৩. সমাজকল্যাণ সংগঠক (সমাজসেবা অফিসার)। স্বাধীনতা পরবর্তী অনেক নব দফতর সৃষ্টি হয়েছে এবং সৃজিত হয়েছে নতুন ক্যাডারভুক্ত দফতরের। জনবল কাঠামোর আকার বর্ধিত ও স্কেল আপগ্রেডেশন হয়েছে অনেক বিভাগের। কিন্তু বহুল কর্মসূচিসমৃদ্ধ এ দফতরের ভাগ্য বদল হয়নি আজও। স্বাধীনতা পরবর্তী দেশে প্রশাসনিক সংস্কার সাধনের জন্য দুইটি কমিশন গঠিত হয়েছে। প্রথমটি ১৯৮৩ সালে সামরিক আইন প্রশাসকের আওতায় গঠিত বিগ্রে. জে. এনামূল হক কমিশন। অপরটি ১৯৯৭ সালে গঠিত এ টি এম. শামসুল হক কমিশন। কমিশন দু’টি সময়ের আবর্তে কিছু কিছু প্রশাসনিক সংস্কার সাধনের সূচনা করে।

১৯৮৪ সালে জনপ্রশাসন পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত ‘বিগ্রেডিয়ার জেনারেল এনামুল হক’ কমিশন দেশে উল্লেখযোগ্য প্রশাসনিক সংস্কার সাধন করে। যার মধ্যে অন্যতম ছিল প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ, দফতরভিত্তিক নতুন পদসৃজন, স্কেল আপগ্রেডেশনসহ ইত্যাদি। এ কমিশন সমাজসেবা অধিদফতর কর্তৃক বাস্তবায়িত কর্মসূচির পরিধি, গুণগতমান এবং জনবলের সংখ্যা পর্যালোচনা করে। ১৯৮৩ সনে প্রশাসনিক পূণর্বিন্যাস সংক্রান্ত এনাম কমিশন ‘সমাজসেবা’কে প্রফেশনাল ক্যাডারভুক্তির সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান করে। যাহা ছিল নিন্মরূপ: After reviewing the existing giving thoughtful consideration to thr fact stated below the committee strongly recommends that the officers of the Department of “Social Services Sub-Cadre” under BCS Education. বর্ণিত সুপারিশক্রমে সমাজসেবা অধিদফতরের জন্য বিসিএস (সমাজসেবা) ক্যাডার সৃষ্টির প্রস্তাবটি ২৪ নভেম্বর ১৯৮৫ তারিখে অনুষ্ঠিত প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটির বৈঠকে উপস্থাপিত হয়। ঐ সময়ের ক্যাডার সৃষ্টির জন্য নির্ধারিত প্রথম শ্রেণির পদের চেয়ে সমাজসেবা অধিদফতরের পদের সংখ্যা কম ছিল। ফলে সমাজসেবা ক্যাডার সৃজনের প্রস্তাব আটকে যায়।

১৯৮৫ সালে সমাজসেবা অধিদফতর প্রথম শ্রেণির পদ ছিল ১০৪টি। যা বর্তমানে প্রথম শ্রেণির (গেজেটেড) কর্মকর্তা হিসেবে ১১৭২টি পদে উন্নিত। ২য়, ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণির কর্মকর্তা/কর্মচারি মিলিয়ে বর্তমানে সমাজসেবা অধিদফতরে ১২৪২৯ পদ বিশিষ্ট সাংগঠনিক কাঠমো রয়েছে। বিদ্যমান ২৯টি ক্যাডারের মধ্যে অধিকাংশ ক্যাডারভুক্ত বিভাগের ১ম শ্রেণির ক্যাডার পদ সংখ্যার চেয়ে সমাজসেবা অধিদফতরের পদ সংখ্যা অনেক বেশি।

যুগের পরিবর্তন হয়েছে। তারুণ্যের চেতনায় দেশে নবশক্তির উত্থান ঘটেছে। নবীন কর্মকর্তারাই দেশের সম্পদ। তারুণ্যের চাহিদার অনুধাবন ও তাদের প্রতি সম্মানজনক অবস্থা সৃষ্টি করতে হবে। এ দফতরের নবীন কর্মকর্তাগণই  উপজেলা পর্যায়ে দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি, সমাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, এসজিজি ও এপিএ বিষয়কসহ বিবিধ কমিটিতে সদস্য-সচিব হিসেবে দক্ষতার সহিত দায়িত্ব পালন করছে। তারা উপজেলা পর্যায়ে মোট ৩৬টি কমিটির সদস্য-সচিব এবং সর্বমোট ৫০টি কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত। উপজেলা পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট কমিটি সমূহের কার্যকারিতা ও সফলতা নির্ভর করে ব্যক্তিক কর্মদক্ষতা ও পদমর্যাদার উপর। আমরা উপজেলা কিংবা জেলা পর্যায়ে একই প্রশাসনিক কাঠামোতে দায়িত্ব প্রাপ্তগণের মর্যাদাপূর্ণ সহ-অবস্থানের নিশ্চয়তা চাই। একটি পেশার অগ্রগতি সাধনে প্রয়োজন সর্মাদাসম্পন্ন, সুদক্ষ ও মেধাবী কর্মশক্তি। যার প্রয়োজনীয় উদ্যোগের সংস্কার সরকারকে করতে হবে।

সমাজকর্ম একটি মর্যাদাপূর্ণ পেশা। কিন্তু যুগ পরিক্রমায় উচ্চ শিক্ষিত তরুণ কর্মক্ষেত্র পছন্দের ক্ষেত্রে পেশার বিদ্যমান সুযোগ ও মর্যাদার বিষয় বিবেচনা করছে। তরুণেরা পেশা নির্বাচনে একটি পেশার মহত্ব কিংবা গুণাগুণ বিবেচনা করছে না। পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) এর সুপারিশক্রমে গড়ে প্রতিবছর ‘সমাজসেবা অফিসার’ পদে তিন শত কর্মকর্তা নিয়োগ প্রাপ্ত হন। পরিতাপের বিষয় গড়ে প্রতিবছর যোগদানকৃত দুই শত নবীন কর্মকর্তা পেশা পরিবর্তন করছে। উচ্চ শিক্ষিত নবীন কর্মকর্তাগণ কেন মহৎ পেশা পরিহার করছে! যাদের কর্ম স্থায়িত্বকাল মাত্র ১ থেকে দেড় বছর। যার অন্যতম কারণ সমাজসেবা ক্যাডারভুক্ত দফতর নয়। এখানে পদোন্নতির ব্যবস্থা সীমিত এবং বিদ্যমান বেতন কাঠামো সন্তোষজনক নয়। মাঠ পর্যায়ে নিয়োগ প্রাপ্ত নবীন কর্মকর্তাগণের মধ্যে যদি কর্ম সন্তুষ্টির অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। নবীন কর্মকর্তাদের মধ্যে কর্ম পরিত্যাগের প্রবণতা অত্যাধিক। যাহা একটি মানবিক সেবা কর্মসূচি বাস্তবায়নে চরম প্রতিবন্ধকতা। তাই সমাজসেবা অধিদফতরের নবীন-প্রবীণ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রাণের দাবি সমাজসেবা ক্যাডারভুক্ত হোক। সকল স্তরের জোর দাবি এখানে পদোন্নতির সু-ব্যবস্থা নিশ্চিত এবং বিদ্যমান স্কেল আপগ্রেডেশন করা হোক।

সুখী-সমৃদ্ধ, শোষণমুক্ত ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার মহান অঙ্গীকার নিয়ে আমাদের মহান স্বাধীনতা। দেশের সংবিধানে সকল নাগরিকের অধিকার ও নিরাপত্তার কথা বলা হয়েছে। দেশে একটি নিরপেক্ষ প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।  সমাজসেবা একটি জাতিগঠনমূলক প্রতিষ্ঠান। এ দফতর ক্যাডাভুক্তকরণ বর্তমান সময়ের একটি যৌক্তিক দাবী। একটি মর্যাদাপূর্ণ পেশা এবং মহৎ কর্মের ব্রত নিয়ে মেধাবী তরুণেরা কর্মের ক্ষেত্র হিসেবে সমাজসেবা পেশাকে বাছাই করুক। এ দপ্তর পরিচালনায় পেশাদারিত্ব মনোভাব সম্পন্ন কর্মীদল তৈরি করতে হবে।  নতুন প্রজম্মের চাহিদা মাফিক নতুন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় জন্য সমাজসেবা অধিদফতরের সংস্কার সাধন অতি জরুরি। ১৯৮৪ সালের এনাম কমিশনের সুপারিশক্রমে ‘সমাজবো ক্যাডার’ সৃজনে উদ্যোগ গ্রহণ করা হোক। একটি পেশার উত্তরণ ও পেশাগত মর্যাদা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কর্মচারীদের যৌক্তিক দাবিসমূহ সুনিশ্চিত করা হোক। 

লেখক: উপপরিচালক, সমাজসেবা অধিদফতর, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়