তায়েব মিল্লাত হোসেন
২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪২ এএম
ঢাকাইয়া জনগোষ্ঠী সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী। সেই তারাই নাকি আবার ইতিহাস বিষয়ে অসচেতন। এই সমালোচনা নতুন কিছু নয়। অনেকে এমনটিও বলে থাকেন, ঢাকাইয়ারা নব্য ঢাকার মানুষদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন। বিশেষ করে বলতে হয় পেশাগত জীবনের কথা। কিন্তু এ দুটি বিষয়কেই ভুল প্রমাণ করেছেন ফরাশগঞ্জের আদি বাসিন্দা এম হাসান আলী। একদিকে তিনি ঢাকাচর্চার অগ্রগণ্য এক ব্যক্তিত্ব। আবার সেই তিনি ব্যাংকার হিসেবে পেশাজীবনে পেয়েছেন সাফল্য। তবে একা একা এগিয়ে যাবেন, তাতে বিশ্বাসী নন তিনি। তাই ২০২৩ সালে এম হাসান আলী প্রতিষ্ঠা করেন ঢাকা প্রফেশনাল কমিউনিটি (ডিপিসি)। যা ঢাকাইয়া পেশাজীবীদের ঐক্যের পাটাতন হিসেবে সম্প্রতি তিন বছর পার করেছে। ঢাকাইয়াদের পেশাগত দক্ষতার উন্নয়ন শুধু নয়, নাগরিক অধিকার নিয়ে সচেতনতামূলক কাজও করছে এই সংগঠন।
তবে কোনো মিলনায়তনে বসে গরম গরম কথা বলে নিজেদের কাজ শেষ করবে, এই প্রবণতা মুক্ত হয়ে কাজ করছে ঐতিহ্যবাহী ঢাকার নবতর উদ্যোগ ডিপিসি। কখনো সূত্রাপুরে, কখনো লালবাগে, কখনো বংশালে তারা করে চলেছে উঠান বৈঠক। যেখানে নতুন প্রজন্মের মধ্যে ঢাকার ইতিহাস, চেতনা ও মূল্যবোধ ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা থাকে। নাগরিক জীবনের সংকট কীভাবে দূর হতে পারে, বৈঠকে আসে সেই প্রসঙ্গ। আর পেশাগত উন্নয়নের আলাপ তো থাকেই। ঢাকাইয়ারা যেখানে বসবে, সেখানে মুখরোচক খাবার থাকবে না, রঙ্গরসিকতা ভরা আড্ডা হবে না, সেটা তো হবে ঐতিহ্যের প্রতি বিমাতা আচরণ। তাই খাবারে, চুটকিতেও ভরপুর থাকে উঠান বৈঠক।

মানুষের দুয়ারে যাওয়ার মতো এ বৈঠক ব্যতিক্রমী এক উদ্যোগ বলে মনে করেন ঢাকা গবেষক রফিকুল ইসলাম রফিক। তিনি বলছেন, উঠান বৈঠকে বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। ঢাকার ঐতিহ্য নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এতে ঢাকাইয়াদের মধ্যে সচেনতা বৃদ্ধি হবে বলে তিনি মনে করেন।
এদিকে ঢাকা প্রফেশনাল কমিউনিটির (ডিপিসি) বড় কোনো আয়োজনের নিয়মিত এক স্থান ফরাশগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রের মুক্তমঞ্চ। এর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আজিম বখ্শ ঢাকাইয়া পেশাজীবীদের অন্যতম একজন শুভানুধ্যায়ী ও পরামর্শক। ঢাকার সর্দার পরিবারের এই ব্যক্তিত্ব ডিপিসি নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলেন। তিনি বলেন, ‘ডিপিসি নতুন সংগঠন হিসেবে পেশাজীবীদের নিয়ে কাজ করছে। তারা ছোট্ট পরিসরে হলেও কৃতি শিক্ষার্থীদের উৎসাহমূলক পুরস্কার দিচ্ছে। এগুলো ভালো কাজ। এর পাশাপাশি তারা শিল্প, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের চর্চা করবে, এটা আমি দেখতে চাই।’

ঢাকাইয়াদের পেশাগত উন্নয়ন কীভাবে করা যায়, সেই লক্ষ্য সামনে রেখে ডিপিসির জন্ম। তবে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি সুরক্ষায়ও কাজ করে তারা। এ প্রসঙ্গে ডিপিসির প্রতিষ্ঠাতা ও আহ্বায়ক এম হাসান আলী বলেন, ‘আমাদের প্রতিটি অনুষ্ঠানে ঢাকাইয়া সংস্কৃতির চর্চা থাকে। সেটা ভাষার দিক দিয়ে হোক, কিংবা রঙ্গরসিকতা দিয়ে হোক। আর আমাদের আয়োজন মানেই বিশেষ কিছু ঢাকাই খাবার থাকবেই।’
তিন বছর পূর্তিতে ডিপিসির মিলনমেলা
আদি ঢাকার পেশাজীবীদের প্রাণের সংগঠন ডিপিসি সদ্যই তিন বছরে পা রেখেছে। বিষয়টি স্মরণীয় করে রাখতে শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর ফরাশগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রের মুক্তমঞ্চে বসেছিল মিলনমেলা। যেখানে ঢাকা নিয়ে স্মৃতিচারণ, ঢাকাই খাবার ও রঙ্গরসিকতা পরিবেশনের মাধ্যমে ডিপিসির তিন বছর পূর্তি উদযাপিত হয়।
এই আয়োজনে সামিল হয়েছিলেন কবি ও রাজনীতিক সাহানা সুলতানা। তার ভাষ্যমতে, ‘আমি একজন ঢাকাইয়া, এটা আমার গর্ব। আমাদের পেশাজীবীদের সংগঠন ডিপিসির তিন বছরের আয়োজনে সময় কাটানো ভালো লাগার মতো বিষয়।’

ডিপিসির তৃতীয় বর্ষপূর্তির অনুষ্ঠানটি শুরু হয় পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে। তারপর হয় সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনা। একই আয়োজনে এসএসসি পাস ঢাকাইয়া শিক্ষার্থীদের সম্মাননা দেওয়া হয়। ডিপিসি পরিবারের এসব কৃতি সন্তানকে ক্রেস্ট তুলে দেন ঢাকা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আজিম বখ্শ।
অনুষ্ঠানে ডিপিসির তিন বছরের পথচলা, সংগ্রাম ও অর্জনের কথা তুলে ধরেন এর প্রতিষ্ঠাতা ও আহ্বায়ক এম হাসান আলী। তিনি বলেন, ‘ডিপিসি শুধু একটি সংগঠন নয়, এটি একটি পরিবার। এটি আমাদের ভালোবাসার বন্ধন। এভাবেই আমরা ঢাকাইয়াদের সামাজিক উন্নয়নে কাজ করতে যেতে চাই। আমাদের উদ্যোগে তরুণদের জন্য মেন্টরশিপও চালু থাকবে।’
আরও পড়ুন: বসুন্ধরা সুপারগলফ: ঢাকায় নতুন গলফ ক্লাব চালু
এই আয়োজনে যারা এসেছিলেন, তাদের বসবাস মূলত সূত্রাপুর, কোতোয়ালি, গেন্ডারিয়া, বংশাল, লালবাগ, চকবাজার, হাজারীবাগসহ পুরনো ঢাকার বিভিন্ন এলাকায়। অতিথিরা ডিপিসিকে শুভেচ্ছা জানান ও এর কর্মকাণ্ডে সবসময় পাশে থাকার আশা প্রকাশ করেন। পুরান ঢাকার উন্নয়ন অগ্রগতির জন্য যে ঢাকা চর্চার বিকল্প নেই, এ বিষয়ে তারা একমত পোষণ করেন।
আয়োজনের সবশেষে ছিল সাংস্কৃতিক পর্ব। যেখানে মূলত ঢাকার ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের সামনে উপস্থাপন করা হয়। ডিপিসির সদস্যরা করেন পুঁথি পাঠ ও স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি। একই পর্বে ঢাকাইয়া ভাষায় রঙ্গরসিকতাও পরিবেশন করা হয়। যা সেকালের ঢাকার কৌতুক স্মরণ করিয়ে দেয় সবাইকে। এই আবহের মধ্যেই ঢাকাই খাবার নিয়ে শুরু হয় আপ্যায়ন পর্ব। খেতে খেতে আড্ডায় মজে যান অনেকে। বিদায়বেলায় সবাই একই প্রত্যাশা রেখে যান, আবার যেন হয় এমন মিলনমেলা।
এজেড