ফিচার ডেস্ক
৩১ আগস্ট ২০২৬, ১০:৫০ এএম
বিচ্ছেদের পরও অনেকের মন থেকে মুছে যায় না পুরনো প্রেমের স্মৃতি। কিন্তু সেই প্রাক্তনের সঙ্গে দেখা করতে গেলে বর্তমান সঙ্গীর আপত্তি থাকাটাই স্বাভাবিক। তবে পৃথিবীর কিছু সংস্কৃতিতে বিষয়টি একেবারেই ভিন্ন। উত্তর ভিয়েতনামের খাও ভাই এলাকায় প্রতি বছর বসে এমনই এক ‘লাভ মার্কেট’, যেখানে পুরনো প্রেমিক-প্রেমিকারা দীর্ঘদিন পর একে অপরের সঙ্গে দেখা করেন। তাদের অনেকেই বর্তমানে বিবাহিত। এমনকি কোনো কোনো দম্পতি একসঙ্গে উৎসবে এলেও পরে প্রত্যেকে নিজের পুরনো প্রেমের মানুষের সঙ্গে দেখা করেন। স্থানীয় সংস্কৃতিতে এই সাক্ষাৎকে পরকীয়া হিসেবে দেখা হয় না, বরং অতীতের সম্পর্ক ও স্মৃতিকে সম্মান জানানোর একটি ঐতিহ্য হিসেবেই বিবেচনা করা হয়।
উত্তর ভিয়েতনামের পাহাড়ি এলাকা খাও ভাইয়ে প্রতি বছর এমন একটি উৎসব হয়, যার নাম ‘খাও ভাই লাভ মার্কেট’। নামের মধ্যে ‘মার্কেট’ কথাটি থাকলেও এটি সাধারণ অর্থে কেনাবেচার বাজার নয়। এটি মূলত মানুষের ভালোবাসা, পুরনো সম্পর্ক, স্মৃতি এবং বিচ্ছেদের গল্পকে ঘিরে তৈরি হওয়া এক সাংস্কৃতিক সমাবেশ। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এই ঐতিহ্য চলে আসছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই ক্ষুদ্র দেশটিতে।
উত্তর ভিয়েতনামের পার্বত্য অঞ্চলের হা জিয়াং প্রদেশের মেও ভাক এলাকায় অবস্থিত এই খাও ভাই এলাকাটি। অঞ্চলটি দুর্গম, চুনাপাথরের পাহাড় দিয়ে ঘেরা। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী বসবাস করেন এই খাও ভাইয়ে। হমং, নুং, জিয়ায়, তায়, দাও-সহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর পারস্পরিক সহাবস্থান এই পাহাড়ি উপত্যকায়।
খাও ভাই লাভ মার্কেটের সঙ্গে একটি পুরনো লোককাহিনি জড়িয়ে রয়েছে। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, বা নামের এক নুং জাতির তরুণ এবং উত নামে এক জিয়ায় সম্প্রদায়ভুক্ত তরুণী একে অপরের ভালবাসায় জড়িয়ে পড়েন। কিন্তু ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর হওয়ায় তাদের পরিবার এই সম্পর্ক মেনে নেয়নি। শেষ পর্যন্ত সংঘাত এড়াতে তারা আলাদা হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। যাওয়ার আগে তারা প্রতিশ্রুতি দেন, প্রতি বছরে এক বার খাও ভাইয়ে এসে একে অপরের সঙ্গে দেখা করবেন। সেই লোককথা আজও বহমান। সেই থেকেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে খাও ভাই লাভ মার্কেটের ঐতিহ্য।
প্রতি বছর সাধারণত এপ্রিলের শেষ থেকে মে মাসের মধ্যে খাও ভাই লাভ মার্কেটের দিনটি স্থির করা হয়। মূল দিনটি ভিয়েতনামি চান্দ্র পঞ্জিকার তৃতীয় মাসের ২৭তম দিন। ওই দিন উত্তর ভিয়েতনামের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকা থেকে শত শত মানুষ এখানে জড়ো হন। বিশেষ আকর্ষণ হলো একসময় বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া প্রাক্তন প্রেমিক-প্রেমিকারাও এই দিনে একে অপরের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পান। স্থানীয় সংস্কৃতিতে এটিকে বিশ্বাসঘাতকতা বা পরকীয়া হিসেবে দেখা হয় না। বরং এটি অতীতের একটি সম্পর্ককে স্বীকার করার এবং সেই সম্পর্কের স্মৃতিকে সম্মান জানানোর সামাজিক রীতি। অনেক ক্ষেত্রেই বর্তমানে বিবাহিত স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে উৎসবে আসেন। এর পর দু’জন আলাদা হয়ে নিজেদের পুরোনো প্রেমিক বা প্রেমিকার সঙ্গে দেখা করেন। তাদের বর্তমান সঙ্গীরাও এই সাক্ষাৎকে মেনে নেন। অতীতের সেই সম্পর্ক বর্তমান দাম্পত্যজীবনের ওপর প্রভাব ফেলে না।
স্থানীয় ঐতিহ্যে এই সাময়িক সাক্ষাৎ নিয়ে ঈর্ষা বা রাগ না দেখানোর একটি সামাজিক বোঝাপড়া রয়েছে। বরং এটিকে অতীতের প্রতি সম্মান এবং পুরনো অনুভূতির স্মৃতিচারণ বলে মনে করা হয়।
‘লাভ মার্কেট’ নামটি কিছুটা বিভ্রান্তিকর হলেও, এটি কেবল প্রেমিক-প্রেমিকাদের মিলনস্থল নয়। বর্তমানে উৎসবের সঙ্গে লোকসংগীত, ঐতিহ্যবাহী পোশাক, নাচ, স্থানীয় খাবার, দেশীয় বিভিন্ন খেলা এবং হস্তশিল্পের বাজারও যুক্ত হয়েছে। ফলে ব্যক্তিগত প্রেমের স্মৃতি থেকে শুরু করে পাহাড়ি ভিয়েতনামের বৃহত্তর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য- সব কিছুই এই উৎসবের অংশ হয়ে উঠেছে।
আসন্ন ফসল কাটার উৎসব ও ভালো ফলনের প্রার্থনার মধ্যে দিয়ে সূচনা হয় হাটের। তিন দিন ধরে চলে আনন্দ উদ্যাপন। উৎসবের পর্বে খেলাধুলার পাশাপাশি জিয়াই ঢোলের তালে নাচ ও লোকসঙ্গীত পরিবেশিত হয়। দ্বিতীয় দিনে সকলে মিলে রন্ধন উৎসব পালন করেন। দম্পতিদের ‘সুখের সন্ধানে’ নানা ধরনের অনুষ্ঠানও আয়োজন করা হয়। উৎসবের শেষ পর্বে সমাপনী অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে দর্শনার্থীরা একটি বুদ্ধমূর্তিকে স্নান করার প্রথা মেনে চলেন।
সূত্র: আনন্দবাজার
এমআর