images

অফবিট

যৌন কেলেঙ্কারিতে আলোচিত যেসব তারকা ক্রিকেটার

স্পোর্টস ডেস্ক

১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০১:২৬ পিএম

ক্রিকেটকে সাধারণত ভদ্রলোকের খেলা বলা হয়। কিন্তু মাঠের বাইরের কিছু ঘটনা এই ধারণাকে বারবার প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। সময়ের পরিক্রমায় দেখা গেছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নামকরা ক্রিকেটার এমনকি আম্পায়াররাও জড়িয়েছেন যৌন কেলেঙ্কারি ও বিতর্কে। এসব ঘটনা কখনো ক্যারিয়ারে বড় প্রভাব ফেলেছে, কখনো আবার দীর্ঘদিন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থেকেছে।

জেনে নেওয়া যাক, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আলোচিত এমন কিছু যৌন কেলেঙ্কারি ও বিতর্কের ঘটনা, যা এক সময় কাঁপিয়ে দিয়েছিল ক্রিকেট দুনিয়া।

শেন ওয়ার্ন:

images_(1)
শেন ওয়ার্ন

যৌন কেলেঙ্কারি ঘিরে ক্রিকেট দুনিয়ায় সবচেয়ে বেশি আলোচিত নামগুলোর একটি অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তি লেগ স্পিনার শেন ওয়ার্ন। সময়টা ছিল ২০০০ সাল। তখন স্টিভ ওয়ারের নেতৃত্বাধীন অস্ট্রেলিয়া দলে সহ-অধিনায়কের দায়িত্বে ছিলেন ওয়ার্ন। ঠিক সেই সময়ই ব্রিটিশ নার্স ডোনা রাইটের কাছে পাঠানো তার আপত্তিকর ফোনবার্তা ও বার্তা বিনিময় প্রকাশ্যে আসে। গণমাধ্যমে ফাঁস হওয়া একাধিক অশ্লীল বার্তা ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়, যার জেরে অস্ট্রেলিয়া দলের সহ-অধিনায়কের পদ হারাতে হয় এই তারকা স্পিনারকে। তিন বছর না যেতেই আবারও ব্যক্তিগত আচরণ নিয়ে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন ওয়ার্ন। এক মডেলের সঙ্গে আপত্তিকর অবস্থায় ধরা পড়েন তিনি, যা নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়। পরে সেই মডেল প্রকাশ্যে ওয়ার্নের শারীরিক ফিটনেস ও ব্যক্তিত্বের প্রশংসা করলেও বিতর্ক থামেনি। এরপর ২০০৬ সালেও ফের যৌন সম্পর্ক ঘিরে তার নাম উঠে আসে শিরোনামে। এখানেই শেষ নয়—বছরের পর বছর ধরে ওয়ার্নের বিরুদ্ধে একাধিক বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের খবর প্রকাশিত হয়েছে। এমনকি ২০১১ সালে আইপিএল চলাকালে স্টেডিয়ামে প্রকাশ্যে তৎকালীন বান্ধবী এলিজাবেথ হারলেকে চুম্বন করাও নতুন করে সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল। ক্রিকেট ইতিহাসে তাই শেন ওয়ার্ন শুধু মাঠের সাফল্যের জন্যই নয়, মাঠের বাইরের বিতর্কিত অধ্যায়ের জন্যও স্মরণীয় হয়ে আছেন।

ক্রিস গেইল:

licensed-image_3
ক্রিস গেইল

ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটের সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর একটি ক্রিস গেইল। মাঠে তার বিধ্বংসী ব্যাটিং যতটা পরিচিত, মাঠের বাইরের আচরণ নিয়েও ততটাই বিতর্ক রয়েছে। ২০১২ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ চলাকালে গেইলকে একটি হোটেল কক্ষে তিনজন ব্রিটিশ নারীর সঙ্গে আপত্তিকর অবস্থায় পাওয়া যায়—এ ঘটনা তখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অঙ্গনে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।
এছাড়া নারী সাংবাদিকদের প্রতি অসৌজন্যমূলক ও অশালীন আচরণের অভিযোগও রয়েছে গেইলের বিরুদ্ধে, যা বিভিন্ন সময় সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয় ২০১৫ সালের বিশ্বকাপে, যখন এক নারী কর্মী গেইলের বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃতভাবে অশালীন আচরণের অভিযোগ তোলেন। এসব ঘটনার কারণে গেইল বারবার সমালোচনার মুখে পড়েছেন এবং তার ব্যক্তিগত আচরণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

টিম পেইন:

licensed-image
টিম পেইন

মাঠের পারফরম্যান্স নয়, বরং মাঠের বাইরের একটি বিতর্কিত ঘটনার জেরেই নেতৃত্বের দায়িত্ব ছাড়তে বাধ্য হন টিম পেইন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, ২০১৭ সালে তাসমানিয়া ক্রিকেটের এক সাবেক নারী কর্মীর সঙ্গে তিনি আপত্তিকর বার্তা আদান–প্রদান করেছিলেন। বিষয়টি নিয়ে ওই নারী ২০১৮ সালের জুন মাসে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া ও ক্রিকেট তাসমানিয়া—উভয় সংস্থার কাছেই আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানান।
তখন পরিচালিত অভ্যন্তরীণ তদন্তে পেইনের বিরুদ্ধে কঠোর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি এবং তিনি দায়িত্বে বহাল থাকেন। তবে প্রায় সাড়ে তিন বছর পর অভিযোগের বিষয়টি নতুন করে প্রকাশ্যে আসতে শুরু করলে পরিস্থিতি বদলে যায়। বিতর্ক আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কায় শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার এই উইকেটকিপার ব্যাটসম্যান স্বেচ্ছায় পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন।

বাদ যাননি ইংল্যান্ডের সাবেক তারকারাও:
ইংল্যান্ডের সাবেক অলরাউন্ডার ইয়ান বোথামও মাঠের বাইরের বিতর্ক থেকে মুক্ত ছিলেন না। একসময় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, তিনি অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানকালে এক নারী পরিচারিকার সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন। পাশাপাশি ‘মিস বার্বাডোস’ খ্যাত লিন্ডি ফিল্ডের সঙ্গেও তার ব্যক্তিগত সম্পর্কের খবর প্রকাশ্যে আসে, যা তখন ব্রিটিশ গণমাধ্যমে বেশ আলোচনার জন্ম দেয়।

images
ইয়ান বোথাম

একইভাবে ইংল্যান্ডের আরেক সাবেক তারকা ক্রিকেটার কেভিন পিটারসনও ব্যক্তিগত সম্পর্ক ঘিরে বিতর্কে জড়ান। তার বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ তোলেন দক্ষিণ আফ্রিকার মডেল ভ্যানিসা নিমো। অভিযোগে তিনি জানান, পিটারসন নাকি বারবার শারীরিক সম্পর্কের জন্য চাপ সৃষ্টি করতেন। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর ক্রিকেট মহলে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয় এবং পিটারসনের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে।

শহীদ আফ্রিদি:

af
শহীদ আফ্রিদি

নারী ভক্তদের কাছে পাকিস্তানের কিংবদন্তি অলরাউন্ডার শহীদ আফ্রিদি দীর্ঘদিন ধরেই ব্যাপক জনপ্রিয় ছিলেন। তবে এক সময় মাঠের বাইরের একটি ঘটনায় তার নাম জড়িয়ে পড়ে বিতর্কে। সিঙ্গাপুরে একটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পাকিস্তান দলের সঙ্গে দেশ ছাড়ার আগমুহূর্তে করাচির একটি হোটেলে আফ্রিদিকে একাধিক নারীর সঙ্গে অবস্থান করতে দেখা যায়। ওই সময় তার সঙ্গে ছিলেন জাতীয় দলের আরও দুই ক্রিকেটার—হাসান রাজা ও আতিক-উজ-জামান।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড কঠোর অবস্থান নেয়। শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে তিন ক্রিকেটারকেই পরবর্তী চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির দল থেকে বাদ দেওয়া হয়। এই ঘটনা তখন পাকিস্তান ক্রিকেটে বড় ধরনের আলোচনার জন্ম দেয় এবং ব্যক্তিগত আচরণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলে।

নিউজিল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিতর্কিত অধ্যায়:
যৌন নির্যাতন ও ব্যক্তিগত আচরণ ঘিরে বিতর্ক থেকে নিউজিল্যান্ডের ক্রিকেটাররাও বাদ পড়েননি। ২০০৫ সালে ক্রাইস্টচার্চে নিউজিল্যান্ডের পেসার শেন টাফির সঙ্গে ২৩ বছর বয়সী এক নারী কর্মীর ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ছবি প্রকাশ্যে আসে। ছবিগুলো ফাঁস হওয়ার পর বিষয়টি সে সময় ক্রিকেট অঙ্গনে বেশ আলোচনার জন্ম দেয়। তবে পরে ওই নারী দাবি করেন, তিনি টাফিকে ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না এবং পুরো ঘটনার সঙ্গে তার সরাসরি সম্পৃক্ততা নেই। তার এই বক্তব্যের পর বিষয়টি আর আইনি পর্যায়ে গড়ায়নি এবং বিতর্কটি ধীরে ধীরে চাপা পড়ে যায়।


অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকার পেসার আন্দ্রে নেল ব্যক্তিগত সম্পর্ক ঘিরে সমালোচনার মুখে পড়েন। লাটভিয়ার মডেল জেলিনা কুলতিয়াসোভার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের খবর প্রকাশ্যে আসে, যেখানে অভিযোগ ওঠে—নেল নিজের বৈবাহিক অবস্থার কথা ওই নারীকে জানাননি। পরে বিষয়টি জানতে পেরে ওই মডেলই প্রকাশ্যে সম্পর্কের কথা জানান, যা ক্রিকেট অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করে।

_130017114_shutterstock_editorial_11857577z
আন্দ্রে নেল

দলগত অভিযোগ:
২০০৫ সালে পুরো ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের বিরুদ্ধেই মাঠের বাইরের আচরণ নিয়ে গুরুতর অভিযোগ ওঠে। সে বছর অস্ট্রেলিয়া সফরে ছয় ম্যাচের মধ্যে পাঁচটিতেই হেরে যায় ক্যারিবিয়ান দল। মাঠের ব্যর্থতার পাশাপাশি হোটেলকেন্দ্রিক একাধিক অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ সামনে আসায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। দলের স্পন্সর প্রতিষ্ঠান ডিজিসেল এতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায়। প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মকর্তা দাবি করেন, সফরকালে হোটেলের কক্ষে ক্রিকেটারদের আপত্তিকর আচরণের বিষয়টি তারা প্রত্যক্ষ করেছেন, যা পরবর্তীতে গণমাধ্যমে ফাঁস হয়।

একই বছর প্রায় একই ধরনের অভিযোগ ওঠে শ্রীলঙ্কা জাতীয় দলের বিরুদ্ধেও। শ্রীলঙ্কা পুলিশ একটি নির্দিষ্ট পতিতালয়ে অভিযান চালিয়ে জানতে পারে, সেটি মূলত ক্রিকেটারদের যাতায়াতের জন্যই ব্যবহৃত হতো। পুলিশের তদন্তে আরও দাবি করা হয়, প্রায় এক দশক ধরে সেখানে জাতীয় দলের একাধিক ক্রিকেটারের আসা–যাওয়া ছিল। বিষয়টি নিশ্চিত করতে এক পুলিশ সদস্য ছদ্মবেশে ক্রিকেটার সেজে সেখানে প্রবেশ করেন। অভিযানের সময় ওই স্থান থেকে আটজন নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়, যা শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটে বড় ধরনের বিতর্কের জন্ম দেয়।

ভারতীয় ক্রিকেটেও বিতর্ক:

images_(9)
মোহাম্মদ শামি

যৌন কেলেঙ্কারি ও ব্যক্তিগত জীবন ঘিরে বিতর্কের তালিকায় উঠে এসেছে ভারতীয় পেসার মোহাম্মদ শামির নামও। তার স্ত্রী হাসিন জাহান অভিযোগ করেন, শামির সঙ্গে একাধিক নারীর সম্পর্ক রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, এসব বিষয় নিয়ে কথা বলায় শামির পক্ষ থেকে তার ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে। এই অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর বিষয়টি দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয় এবং আইনি জটিলতায় রূপ নেয়। তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—এই মামলা এখনো আদালতে বিচারাধীন, এবং আইনি প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত শামির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমাণিত নয়।

আম্পায়াররাও বিতর্কের বাইরে নন:
শুধু ক্রিকেটার নন, বিতর্কের তালিকায় উঠে এসেছিল আম্পায়ারদের নামও। পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক আম্পায়ার আসাদ রউফের বিরুদ্ধে এক ভারতীয় মডেল বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ তোলেন। অভিযোগের প্রেক্ষিতে দুজনের একসঙ্গে তোলা কিছু ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যা দ্রুত আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। তবে আসাদ রউফ এসব অভিযোগ স্পষ্টভাবে অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। যদিও ভাইরাল হওয়া ছবিগুলোর কারণে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়তে হয় তাকে এবং বিষয়টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অঙ্গনে বড় ধরনের বিতর্ক সৃষ্টি করে।

তারকাখ্যাতি কিংবা মাঠের সাফল্য ব্যক্তিগত আচরণের দায় থেকে কাউকে মুক্ত করে না। সময় বদলেছে, ক্রিকেট প্রশাসনও এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠোর। তবু অতীতের এসব ঘটনা ক্রিকেট ইতিহাসের এক বিতর্কিত অধ্যায় হয়ে রয়ে গেছে।

বিএস