images

জাতীয়

বেতনভুক্ত কর্মী রেখে টেলিগ্রামে অশ্লীল ভিডিও বিক্রি, আয় ১০ লাখ টাকা

মোস্তফা ইমরুল কায়েস

২৮ এপ্রিল ২০২৬, ১০:২৮ পিএম

    • গত ছয় মাসে জাহিদের আয় ৮-১০ লাখ টাকা
    • বিভিন্ন নারীর স্ক্যান্ডালের ভিডিও মিলেছে তার মোবাইলে
    • এক সময় হাফেজ ছিলেন, এখন অভিযুক্ত অপরাধী
    • বাবা-মা জানতেন ঢাকায় কাপড়ের ব্যবসা করেন

ঢাকায় কাপড়ের ব্যবসার কথা বলে পরিবারকে আড়ালে রেখে টেলিগ্রাম ও ফেসবুকে অশ্লীল ভিডিও বিক্রির ব্যবসা গড়ে তুলেছিলেন জাহিদ হোসেন। বয়স ২০ বছরের কম। মোহাম্মদপুরের একটি কওমি মাদ্রাসা থেকে হাফেজি পাস করা এই তরুণ গত ছয় মাসে এ কাজ করে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা আয় করেছেন বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

রোববার রাতে তাঁকে রাজধানীর মিরপুরের শেওড়াপাড়া এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। ডিবির দাবি, বিভিন্ন নারীর ব্যক্তিগত ও অন্তরঙ্গ ভিডিও সংগ্রহ করে টেলিগ্রাম গ্রুপে বিক্রি করতেন জাহিদ। এ কাজে তিনি একজন কর্মীকেও মাসিক বেতনে নিয়োগ দিয়েছিলেন।

রোববার এই জাহিদ ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের মিরপুর বিভাগের ডিবির হাতে গ্রেপ্তার হন। তবে একজন অভিযোগ না করলে তাঁকে খুঁজে পাওয়াও কঠিন ছিল। জাহিদকে গ্রেপ্তারের পর বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য।

যেভাবে জড়ালেন এই অপকর্মে:
ডিবিকে জাহিদ জানিয়েছেন, তিনি ফেসবুক বুস্টিংয়ের কাজ জানতেন বলে ফেসবুক খুব ভালো বুঝতেন। সেই সুবাদে একদিন তাঁর চোখ আটকে যায় একটি নোংরা ভিডিওতে। ভিডিওর লিংকে গিয়ে জানতে পারেন, এসব ভিডিও বিক্রি করে আয় করা যায়। এরপর তিনি নোংরা ভিডিও বিক্রি করে বিকাশে টাকা নেওয়ার জন্য খুঁজতে থাকেন মোবাইল সিম। ফেসবুকের একটি গ্রুপে পেয়ে যান অবৈধ সিম বিক্রিকারী সদস্যদের। তাঁদের কাছ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকায় একটি জিপি সিম কিনে তাতে বিকাশ খোলেন তিনি। এরপর শুরু হয় তাঁর প্রতারণার মাধ্যমে আয়ের গল্প। তবে সেই সিমটি শনাক্ত করেছে ডিবি।

যেভাবে খুঁজে পাওয়া গেল জাহিদকে:
ডিবি সূত্র জানিয়েছে, এক তরুণী সম্প্রতি ডিবির কাছে আসেন। তিনি ডিবিকে জানান, তাঁর সাবেক প্রেমিকের কাছে তাঁর কিছু অন্তরঙ্গ ভিডিও ছিল। সেগুলো এখন কয়েকটি টেলিগ্রাম গ্রুপে ঘুরছে। আর সেসব ভিডিও দেদার বিক্রিও হচ্ছে। তাঁর এক বন্ধু সেই ভিডিও গ্রুপে দেখতে পেয়ে তাঁকে জানায়। এরপর তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দেন সেই তরুণী। এমন এক বিষয়, যা তিনি তাঁর মাকেও জানাতে পারেননি। বাধ্য হয়ে নিজেকে রক্ষায় নিজের অবয়ব বদলে ফেলেন। এরপর ছুটে যান ডিবিতে। সাহায্য কামনা করেন তাঁদের কাছে। সেই গ্রুপটিকে খুঁজতে শুরু করে ডিবি। একপর্যায়ে চক্রের প্রধান জাহিদকে শনাক্ত করেন তাঁরা। অবশেষে গ্রেপ্তারও করা হয় তাঁকে। তবে সেই তরুণী এতটাই লজ্জায় পড়ে গেছেন যে, বাড়ি থেকেও বের হতে পারছেন না। যদিও বিষয়টি তিনি তাঁর পরিবার এমনকি নিকটজন কাউকেও জানতে বা বুঝতে দেননি।

ডিবি সূত্র আরও জানায়, সেই তরুণীর অভিযোগের পর ডিবি মাত্র একটি বিকাশ নম্বরের সূত্র ধরে তদন্ত শুরু করে। এরপর বেরিয়ে আসতে থাকে টেলিগ্রাম গ্রুপ, গ্রুপের অ্যাডমিন, কারা সেই ভিডিও কিনেছে, কতজন সদস্য রয়েছে—এমন নানা তথ্য।

আরও পড়ুন: নিয়োগ পদোন্নতিতে ‘এলাহি কাণ্ড’, চাকরিচ্যুত হয়ে ‘বিশৃঙ্খলা’

অশ্লীল ভিডিও বিক্রি করেই লাখ লাখ টাকা আয়:
ডিবির কাছে দেওয়া তথ্যে জাহিদ জানিয়েছেন, গত ছয় মাস ধরে তিনি এ কাজ করছেন। প্রতিটি ভিডিও ৫০০ থেকে ১ হাজার, এমনকি ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি করেছেন তিনি। ফলে অল্প দিনেই তিনি লাখপতি বনে যান। এখন পর্যন্ত জাহিদ ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন। তবে এসব টাকার পুরোটাই এখনো খরচ করেননি। রেখেছেন তাঁর ও তাঁর মায়ের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে। যা তিনি অকপটে স্বীকারও করেছেন। তাঁর মায়ের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ১ লাখ এবং তাঁর অ্যাকাউন্টে প্রায় ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা রয়েছে।

বাবা-মা জানতেন তিনি কাপড়ের ব্যবসা করেন:
জাহিদের গ্রামের বাড়ি দক্ষিণাঞ্চলের ভোলা জেলায়। তিনি মোহাম্মদপুরে মাদ্রাসায় পড়াশোনা ও চাকরি করতে করতে মিরপুরে গিয়ে থিতু হন। সেখানে একটি বাড়িতে বাসা ভাড়া নিয়ে এই অপকর্ম করছিলেন। কিন্তু তাঁর বাবা-মা জানতেন, তিনি ঢাকায় কাপড়ের ব্যবসা করেন।

আদালতে তোলার আগে ডিবি অফিসে তাঁর সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তিনি তখন বলছিলেন, তাঁর মা জানেন তিনি মিরপুরে পাঞ্জাবির ব্যবসা করেন। গ্রামে থাকা তাঁর বাবা-মা এখনো জানেন না তাঁর এসব অপকর্মের কথা। তবে তাঁরা জেনেছেন, তাঁকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি।

বেতনে কর্মী রেখে পেজ ও গ্রুপ চালাতেন জাহিদ:
জাহিদ টেলিগ্রামে নোংরা ভিডিও বিক্রি এবং বিভিন্ন ব্যক্তির মেসেজের উত্তর দেওয়ার জন্য একটি ছেলেকে রেখেছিলেন। যাকে প্রতি মাসে ১৫ হাজার টাকা বেতন দিতেন। বাকি টাকা তিনি তাঁর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে রাখতেন। তবে সেই কর্মীকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। শুধু জাহিদের সেই কর্মীই নয়, জিজ্ঞাসাবাদে আরও কয়েকজনের তথ্য মিলেছে। সেই চক্রের সদস্যদের খুঁজছে ডিবি।

রুমে খেতেন-ঘুমাতেন জাহিদ, কাউকে দেখাও দিতেন না:
ডিবির অভিযানে থাকা কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, জাহিদ যে বাসায় থাকতেন, তা মূলত একটি চিলেকোঠার ঘর ছিল। বাসার ওপরের ছাদে থাকা ছোট একটি ঘরে থাকতেন তিনি। সেখানেই খেতেন, ঘুমাতেন। তবে একজন নারী তাঁর বাসার নিচে খাবার দিয়ে যেতেন, তিনি নিচে এসে তা নিয়ে যেতেন। ওই বাসার কেউ তাঁকে দেখতেও পেত না। এভাবে রাতদিন চলছিল তাঁর প্রতারণার মাধ্যমে নোংরা ভিডিও বিক্রির মহোৎসব।

আরও পড়ুন: বাড়তি সুবিধা পেতে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ফন্দি পলকের!

প্রলোভনে পড়ে এখন জীবন নছনছ:
মেয়েদের উলঙ্গ ও নোংরা ভিডিও টেলিগ্রামে বিক্রিকারী জাহিদের জীবন এখন তছনছ হতে চলেছে। গত ছয় মাসে বিষয়টি উপভোগ করলেও এখন তাঁর জীবন কঠিন বিভীষিকাময়। ডিবি তাঁকে রিমান্ডে নিয়েছে। এরপর আদালতে তোলা হলে তাঁর ঠিকানা হবে কারাগারের লাল দালান।

ডিবির মিরপুর জোনের এডিসি সোনাহার আলী ঢাকা মেইলকে বলেন, আমরা মূলত এক নারীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছি। তাঁর সঙ্গে আরও কয়েকজন জড়িত। তাঁদেরও খোঁজা হচ্ছে। পুরো চক্রটি বিভিন্ন নারীর নোংরা ভিডিও বিভিন্ন গ্রুপ থেকে সংগ্রহ করে টেলিগ্রাম গ্রুপে বিক্রি করত। জাহিদ এভাবে লাখ লাখ টাকা হাতিয়েছে।

তিনি আরও বলেন, জাহিদ এ কাজে একজন সহযোগীকেও রেখেছিল, যাকে সে বেতন দিত। জাহিদকে খুঁজে পেয়ে আমরা তাঁকে মিরপুরের শেওড়াপাড়ার ওয়াসার পানির পাম্পসংলগ্ন একটি বাসা থেকে গ্রেপ্তার করেছি। এখন তাঁর রিমান্ড চলছে।

এমআইকে/এআর