images

জাতীয়

যুক্তরাষ্ট্রের ঘাটতি বাজেট

প্রবাস ডেস্ক

১১ মার্চ ২০২৩, ১০:১৪ পিএম

পৃথিবীর অর্থনৈতিক শক্তি, সামরিক শক্তি এবং বাণিজ্য শক্তিসহ সর্বক্ষেত্রে সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। প্রায় সাড়ে পঁচিশ ট্রিলিয়ন ডলারের জিডিপির (নমিনাল) বিশাল অর্থনীতি। আমার জানা মতে আমেরিকায় ঘটা করে করে পুরো বাজেট পেশ করা হয় নাI কংগ্রেশনাল বাজেট কমিটি বছরের যেকোনো সময় প্রতিটি সেক্টর জন্য প্রয়োজনীয় ফাইন্যান্স নিয়ে আলোচনা করে প্রস্তাব করেI এছাড়া তারা সারা বছরের আয়-ব্যয়সহ বিস্তারিত প্রকাশ করে এবং প্রতিটি সেক্টরের ভবিষ্যতের জন্য আলাদা আলাদা করে সামগ্রিক একটি অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি করে দশ বছরের জন্য, যা প্রতি বছর সমরের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়মিতভাবে পরিবর্তন বা পরিবর্ধন হয়ে থাকেI তাছাড়া আমেরিকান কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা ফেডারেল রিজার্ভ (Federal Reserve) সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য নীতি নির্ধারণ করে থাকে। এর বাইরেও বাজেটের উপর অনির্ভরশীল কিছু ফিনান্সিয়াল কার্যক্রম চলেI

প্রেসিডেন্ট বাইডেন আগামী দশ বছরে (২০২৩-২০৩৩) ৩ ট্রিলিয়ন বাজেট ঘাটতি কমানোর লক্ষ্যে বাজেট পলিসি ঘোষণা করেছেনI ২০২২ সালে মার্কিন সরকারের রাজস্ব আদায় ছিল ৪.৯ ট্রিলিয়ন ডলার আর সরকারের ব্যয় ছিল ৬.২৭ ট্রিলিয়ন। ফলে গত বছরের বাজেট ঘাটতি ১.৩৮ ট্রিলিয়ন ডলারI ২০২৩ সালের প্রক্ষেপিত বাজেট ঘাটতি ১.৪ ট্রিলিয়ন ডলার আর ২০৩৩ সালে ২.৭ ট্রিলিয়ন ডলারI ২০২৩ সালে বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৫.৩% হতে পারে। এটা ২০২৪ ও ২০২৫ সালে আরও বেড়ে শতকরা ছয় ভাগের উপর চলে যেতে পারে। সুতরাং শুনতে অবাক লাগলেও সত্য, আমেরিকা সবসময়ই ঘাটতি বাজেটে চলছে। গত ৫০ বছরের আমেরিকার এভারেজ বাজেট ঘাটতি ৩.৬%I

পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ, প্রতিবছর বড় ধরনের ঘাটতি নিয়েই চলছেI এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই ঘাটতি বাজেট কিভাবে সরকার ম্যানেজ করে? সরকার প্রাইভেট, পাবলিক সেক্টর এবং আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন দেশ থেকে ঋণ নিয়ে থাকেI ফেডারেল গভর্নমেন্টের জন্য এই ঋণের একটি স্ট্যাটুটারি লিমিট থাকে যেটা ডেট সিলিং নামে পরিচিতI বর্তমানে এই সিলিং ৩১.৪ ট্রিলিয়ন ডলারI এছাড়া ফেডারেল ফিন্যান্সিয়াল ব্যাংক থেকে ছাড়া বন্ড এই হিসাবের বাইরে ধরা হয়I প্রতি বছর কংগ্র্যাশনাল বাজেট কমিটির দেয়া প্রক্ষেপিত বাজেট ঘাটতি অনুযায়ী ফেডারেল গভর্নমেন্ট ট্রেজারি বন্ড ইস্যু করে ফান্ড কালেকশন করে। যেমন সোশ্যাল সিকিউরিটি ট্রাস্ট ফান্ড। আরও মজার বিষয় হচ্ছে, গভর্নমেন্টের ইস্যু করা এই ট্রেজারি বন্ডের বাজেট অথবা অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি কোনো প্রভাব নেই I

আমেরিকার ডেফিসিট কন্ট্রোল একট (Deficit Control Act) দ্বারা এই ঋণ (loan) নিয়ন্ত্রিত হয়I প্রতি বছর কংগ্রেশনাল বাজেট অফিস বাজেট ঘাটতির একটি প্রক্ষেপণ দাঁড় করায়, আর কমপ্লায়েন্স কমিটি এটা নিয়ন্ত্রণ করে থাকেI আমেরিকার বার্ষিক ঋণ সবসময়ই জিডিপির (GDP) চেয়ে বেশি থাকেI ২০২২ সালের দেশি/বিদেশি ঋণ মিলিয়ে সর্বমোট ৩১.৩৮ ট্রিলিয়ন ডলার। অথচ আমেরিকার মোট জিডিপি প্রায় ২৬ ট্রিলিয়ন ডলারের কাছাকাছিI তার অর্থ ২০২২ সালে মার্কিন জাতীয় ঋণ ছিল জিডিপির ১২০%। চট করে মনে হবে একি ভয়ংকর অবস্থা!

এখন খুব সহজ একটি প্রশ্ন সবার মনে আসবে। পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ আমেরিকা সত্যি সত্যিই কি ভয়ঙ্কর অবস্থার মধ্যে দিয়ে চলছে? উত্তর ‘মোটেও নয়’। কারণ আমেরিকার ঘাটতি বাজেটের একটি বড় অংশ খরচ করতে হয় সারা পৃথিবীর উপর আধিপত্য টিকে রাখার চেষ্টায়। যেমন বর্তমানে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে ইউক্রেনকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার সহায়তা করছে। এছাড়া সারা পৃথিবীর স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলার পিছনেও প্রতি বছর প্রচুর ডলার খরচ করতে হয়I

আমেরিকার সবচেয়ে বড় সুবিধা- আইএমএফের সূত্র অনুযায়ী পৃথিবীর ৬০% কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের ফরেন কারেন্সি রিজার্ভ রাখে মার্কিন ডলারে। কাজেই আমেরিকার ডলার সারা পৃথিবীর বাণিজ্যে প্রভাব রেখে চলেছে, আর আমেরিকা এখনো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদারI বাণিজ্যের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ নিয়ে একদমই চিন্তা করতে হয় নাI যেহেতু গত পঞ্চাশ বছরের গড় ঘাটতি বাজেট ৩.৬%, কাজেই ঘাটতি নিয়ে তাদের পলিসি মেকাররা মোটেও চিন্তিত নয় বরং এটাই তাদের নরমাল এখনI

আর মুডিও আমেরিকাকে +AAA স্ট্যাটাস দিয়ে রেখেছে। কাজেই আর কি চিন্তা!

লেখক: প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ কানাডা অ্যাসোসিয়েশন অফ ক্যালগেরি

/জেএম