মোস্তফা ইমরুল কায়েস
০১ জানুয়ারি ২০২৩, ০১:৪৪ এএম
নতুন বছরকে বরণ করতে উন্মুক্ত স্থানে অনুষ্ঠান, ফটকা ফোটানো এবং আতশবাজি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) পক্ষ থেকে। তবে সেই নিষেধাজ্ঞা মানেনি নগরবাসী। নিষিদ্ধ ফটকা আর আতশবাজিতেই বর্ষবরণ করেছেন তারা।
এতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে। অনেকে বলছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে বসেছিল। তা বাস্তবায়নের জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে তেমন কোনো জোরালো উদ্যোগ ছিল না। ফলে আইন অমান্য করার একটি মহোৎসব চলে নগরজুড়ে।
যদিও শনিবার (৩১ ডিসেম্বর) দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপি কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক বলেছিলেন, থার্টি ফার্স্টে উন্মুক্ত স্থানে কোনো আয়োজন করা যাবে না। কোথাও কোনো ডিজে পার্টি হবে না। কোথাও আতশবাজি-পটকা ফোটানো যাবে না, ফানুস ওড়ানো যাবে না। ফানুস উড়ালে প্রয়য়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ডিএমপি কমিশনারের পক্ষ থেকে এমন কথা বলা হলেও শনিবার রাত ১২টা বাজার পর ছিল ভিন্ন চিত্র। নগরীর বিভিন্ন মোড়ে আইনশৃ্ঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা নিয়োজিত থাকলেও তারা কাউকে কোনো বাধা দেননি। এমনকি অনেকের চোখের সামনেই যুবকরা ফটকা ও আতশবাজি ফুটিয়েছেন, কিন্তু তারা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছেন।

সরেজমিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, শনিবার রাত দশটা থেকে ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় ফটকা ও আতশবাজি শুরু হয়। রাস্তাঘাট, অলিগলি এবং প্রধান সড়কে যুবকরা জড়ো হতে থাকে। তাদের প্রত্যেকের হাতে ছিল ফটকা ও আতশবাজি। রাত ১২টা বাজার মাত্রই একযোগে ফটকা আর আতশবাজির শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো রাজধানী। রাত প্রায় একটা পর্যন্ত চলেছে এই আতশবাজির শব্দ এবং বিকট শব্দে সাউন্ড বক্স বাজিয়ে গান বাজানো।
এদিকে অগ্নি দুর্ঘটনা রোধে ইংরেজি নববর্ষ উদযাপন উপলক্ষে থার্টি ফার্স্ট নাইটে ফানুস না ওড়াতে ও আতশবাজি না করতে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হলেও কেউ তা শোনেনি। উল্টো একই চিত্র এই ফানুস ওড়ানোতেও দেখা গেছে। গত বছর থার্টি ফার্স্ট নাইটে ওড়ানো ফানুস থেকে রাজধানীর প্রায় ১০টি স্থানে আগুনের ঘটনা ঘটে। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন না হয় সে কারণে এই অনুরোধ করেছিল ফায়ার সার্ভিস। এবারও অন্তত দুটি স্থানে আগুনের ঘটনার খবর পাওয়া গেছে।
ডিএমপির নিষেধাজ্ঞা এবং ফায়ার সার্ভিসের অনুরোধ সত্ত্বেও থার্টি ফার্স্ট নাইটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাস, লালবাগ, মোহাম্মদপুর, জাপান গার্ডেন সিটি, বছিলা, ঘাটারচর, উত্তরা, যাত্রাবাড়ী ও শনিরআখড়া এলাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় ফানুসের পাশাপাশি ফটকা ও আতশবাজি ফোটানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে।
রাত ৯টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় অন্তত ৫০টি ফানুস উড়াতে দেখা যায়। এতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বহিরাগতরাও অংশ নেন। পাশাপাশি রাত ১২টা বাজার পর থেকে ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, কলাবাগান, টিএসসি, নিউমার্কেট ও শ্যামলী ছাড়াও মিরপুর এলাকায় বিপুলসংখ্যক ফানুস উড়ানো হয়েছে।
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা জহুরুল ইসলাম বলেন, পুলিশ নিষেধাজ্ঞা দিয়েই চুপ থাকল। অথচ আজ রাত ১২টার আগ থেকে এলাকায় ছেলেরা ফটকা ফোটাচ্ছে। এসব কি তারা দেখে না।

বছিলার নাসিমা বেগম বলেন, গত বছর এই মোহাম্মদপুরে ফটকা ও আতশবাজির কারণে এক শিশু অসুস্থ হয়ে মারা গিয়েছিল। এবারও যে কে মরলো আল্লাহ পাক ভালো জানে। কান ঝালাপালা হয়ে গেল। অসহ্য শব্দ। পুলিশ কি এসব দেখছে না।
যাত্রাবাড়ীর ব্যবসায়ী ডালিম হায়দার বলেন, আজ সকাল সকাল ঘুমাবো বলে বিছানায় যাওয়ার চেষ্টা ছিল। কিন্তু ঘুমাতে পারলাম না। আতশবাজির শব্দে ঘুমই ভেঙে গেল। ডিএমপির পক্ষ থেকে নাকি নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল। তাহলে প্রশ্ন হলো-এসব ফটকা ও আতশবাজি ফোটালো কারা? নিশ্চয় ভূত ফোটায়নি।
ক্ষুব্ধ সচেতন নগরবাসী
নিষেধাজ্ঞা দিয়ে পুলিশের এমন নীরব ভূমিকায় অনেকে অবাক হয়েছেন। জিয়াউর রহমান নামে এক যুবক তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘ঢাকা শহরের অসীম ক্ষমতাবান পুলিশের নিষেধাজ্ঞাকে অবজ্ঞা করে আতশবাজি ও ফানুসের সাথে হিন্দি গানের সাথে তালে বেতালে নাচানাচি করে উদযাপিত নববর্ষ।’ তিনি আরও লিখেছেন, ‘আমি অবাক হয়েছি আইনকে অবজ্ঞা করার এক চরম মানসিকতা দেখে। একটা ভালো লক্ষণ নয়। আইনকে অগ্রাহ্য করার যে ভয়াবহ প্রবণতা তার ফলাফল নিশ্চিতভাবেই ভালো কিছু আসবে না। হতাশ লাগলো। জাতির এই মানসিকতা দেখে।’

শুধু মানুষ নয়, পশু-পাখিও ছিল উৎকণ্ঠিত। বিকট শব্দে নগরীর বিভিন্ন জায়গায় গাছগুলোতে বসে থাকা পাখিদের উড়তে দেখা গেছে। সাংবাদিক রেদোয়ান আহমেদ তার ফেসবুক লিখেছেন, মানুষ যখন আতশবাজি, ফটকা আর ফানুস ওড়ানোয় ব্যস্ত সে সময় পাখিদের প্রাণ প্রায় ওষ্ঠাগত। স্বার্থপর মানুষ শুধু সাময়িক আনন্দের কথা চিন্তা করে। প্রকৃতির অন্য কোনো প্রাণীর প্রতি দায়বদ্ধতা নেই তাদের।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিষেধাজ্ঞা দিলেও সেটি বাস্তবায়নে তেমন কোনো ধরনের উদ্যোগ না নেওয়ায় অনেকে ক্ষুব্ধ হয়েছেন। কেউ কেউ সামাজিক মাধ্যমে তার কথাই জানিয়েছেন। প্রবাসী নজরুল ইসলাম টিপু ফেসবুকে লিখেছেন- কখনও দেশে ইংরেজি নববর্ষ দেখার সুযোগ হয়নি। দুবাই আবুধাবিতে দীর্ঘ সময় ধরে আতশবাজি ফোটানোর বিরল দৃশ্য দেখেছি। সেগুলো বরাবরই গ্রিনিজ বুকে রেকর্ড হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছে। তবে সেগুলো রাষ্ট্রীয় খরচে হতো জানি। কিন্তু বাপের গাঁটের টাকায় মুহুর্মুহু আতশবাজি ফুটিয়ে নববর্ষ পালন করার ধনী রীতি প্রদর্শনের বাহাদুরি আজকে প্রথম নিজের শহরে দেখলাম! শহরতলী এবং আবাসিক এলাকায় এগুলো হওয়া মোটেও সমীচীন নয়। হার্টের রোগী, শিশু, বৃদ্ধ ও অবুজ প্রাণীদের জন্যে ঝুঁকি নিয়ে আসে।

তিনি আরও লিখেছেন, রাত বারোটা বাজার মুহূর্তে আতশবাজি ফোটানোর অলিখিত নিয়ম থাকলেও এখানে পৌনে বারোটায় উদযাপন শুরু হয়েছে! রাত প্রায় সাড়ে বারোটার দিকেও এটি অব্যাহত আছে। কোনদিকে ক্যামরা ধরব ভেবে পাচ্ছিলাম না কেননা চারিদিকেই আকাশে আগুনের উৎসব চলছেই। অতঃপর একদিকেই ধরে রাখি। গোলার আওয়াজ চারিদিকে চলছেই। মনে হচ্ছে ইসরালের সেনাবাহিনী ফিলিস্তিনের গাজা শহরের গভীর অন্ধকার খান খান করে অবিরত গোলা বর্ষণ করে যাচ্ছে।
অনেকে প্রাপ্তবয়স্ক হলেও আজকের ফটকা ও আতশবাজির শব্দে ভয় পেয়েছেন। হোসাইন মোহাম্মদ জাবির তার ফেসবুকে লিখেছেন, ব্যক্তি হিসেবে আমি কনজারভেটিভ বা খ্যাত তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে ভেবেছিলাম আমার আড়াই বছরের মেয়ে বর্ষবরণের এ উৎসব, অন্যান্যদের হইচই, ফানুস, আতশবাজি, শব্দে হয়তো খুশি হবে। এ উদ্দেশ্যে ওকে নিয়ে ছাদে গেলাম। এখনো বারোটা বাজেনি, তবে যা চলছে তাতে ও অত্যন্ত আতংকিত। চিৎকার করে কাঁদছে; ভয় পেয়েছি, ভয় পেয়েছি বলছে। দুঃখিত। বর্ষবরণের এই আনন্দে খুশি হতে পারছি না। রাগ লাগছে, মনে হচ্ছে ক্ষমতা বা সুযোগ থাকলে সব বন্ধ করে দেই।
এমআইকে/জেবি