Dhaka Mail Logo

জাতীয়

আজ সেলিম আল দীনের ৭৩তম জন্মদিন

নিজস্ব প্রতিবেদক

১৮ আগস্ট ২০২২, ১০:১৬ এএম

অমিত প্রতিভাবান, রবীন্দ্রোত্তর বাংলা ভাষার অন্যতম নাট্যকার সেলিম আল দীন। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের নাট্য আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে তাঁর। আজ নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের ৭৩তম জন্মদিন। 

নাটককে সেলিম আল দীন ইংরেজ নির্দেশিত পাঁচ অঙ্ক আর বিসর্গ চিহ্নিত সংলাপের নির্ধারিত বৃত্তে বেঁধে রাখতে চাননি। প্রাচ্য ভূখণ্ডের ধারাবাহিকতা ঘেঁটে তিনি আবিষ্কার করেছেন শিল্পের আঙ্গিক লুপ্তির কৌশল। তাই তাঁর নাটক একাধারে গান, কাব্য, উপন্যাসের বিস্তৃতি ও নাট্যময় দ্বন্দ্বদীর্ণতায় বর্ণাঢ্য। ক্রিয়া আর প্রতিক্রিয়ানির্ভর নাটকের বিশ্বজুড়ে প্রচল ফর্মের সমান্তরালে বাংলার বিশ্বাস ও স্পর্ধায় তিনি প্রতিষ্ঠিত করেছেন তার নাটক। যাতে কথোপকথন বা সংলাপ বা টেক্সটের পাশাপাশি অন্তর্কথন বা সাবটেক্সট আছে সমান উচ্চতায়। বিশ্বসাহিত্যে সেলিম আল দীনের নাটক আঙ্গিক, গল্প ও উপস্থাপনারীতিতে এক ও অদ্বিতীয়। নিজের মাটি ও মানুষকে তিনি চিনতেন জন্মদাগের মতো। এই ভূখণ্ডে হাজার বছর আগে জন্ম নেওয়া পূর্বজদের শিল্পকর্মের উত্তরাধিকার তিনি বহন করেছেন আধুনিক মননশীলতার মেধাবী স্পর্শে।

সেলিম আল দীনের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে নাট্যসংগঠন স্বপ্নদল বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে আজ ও আগামীকাল আয়োজন করছে দুই দিনব্যাপী ‘নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন জন্মোৎসব ২০২২’। 

নাট্যাচার্যকে নিয়ে স্বপ্নদলের নিয়মিত উৎসবের ২৬তম এ আসরের স্লোগান ‘বিশ্বজয়ে বাঙলা নাট্য আজ এগিয়ে যায়, ঐতিহ্য-রবীন্দ্রনাথ-সেলিম আল দীন ধারায়’। উৎসবে ঐতিহ্যের ধারায় রবীন্দ্রনাথ-সেলিম আল দীন উদ্ভাবিত আধুনিক ‘বাঙলা নাট্যরীত’-এ নির্মিত স্বপ্নদলের ‘হেলেন কেলার’ ও ‘ত্রিংশ শতাব্দী’ মঞ্চায়ন করা হবে। এছাড়া থাকছে স্মরণ-শোভাযাত্রা, সমাধিতে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ, নাট্যাচার্যকে নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী, নাট্যাচার্যের প্রতিকৃতিসহকারে শিল্পকলা চত্বর সজ্জা প্রভৃতি।

আজ সন্ধ্যা ৭টায় এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটারে মঞ্চায়িত হবে স্বপ্নদল প্রযোজনা মনোড্রামা ‘হেলেন কেলার’। অপূর্ব কুমার কুণ্ডুর রচনা, জাহিদ রিপনের নির্দেশনায় এতে অভিনয় করেছেন জুয়েনা শবনম। নাট্যমঞ্চায়নের আগে নাট্যাচার্যকে নিয়ে প্রামাণ্যটিত্র ‘অপরিহার্য সেলিম আল দীন ও স্বপ্নদলের বন্ধুর অভিযাত্রা’ প্রদর্শিত হবে। এদিন সকাল ১০টায় রয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পুরাতন কলাভবন থেকে নাট্যাচার্যের সমাধি অভিমুখে স্মরণ-শোভাযাত্রা ও পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ।

আগামীকাল সন্ধ্যা ৭টায় স্টুডিও থিয়েটারে রয়েছে স্বপ্নদল প্রযোজনায় বাদল সরকারের মূল রচনা অবলম্বনে জাহিদ রিপনের রূপান্তর-নির্দেশনায় যুদ্ধবিরোধী গবেষণাগার নাট্য ‘ত্রিংশ শতাব্দী’র মঞ্চায়ন।

অন্ধ ও বধির হওয়া সত্ত্বেও প্রবল আত্মবিশ্বাসে সব নেতিবাচকতার বিপরীতে ঘুরে দাঁড়ানো বিশ্বের বিস্ময় মহীয়সী নারী হেলেন কেলারের জীবনীভিত্তিক প্রযোজনা ‘হেলেন কেলার’। এতে উন্মোচিত হয় পাশ্চাত্যের হেলেন কেলারের জীবনে প্রাচ্যের রবীন্দ্রনাথ তথা রবীন্দ্রদর্শনের প্রবল প্রভাবের প্রকৃত-স্বরূপ। অন্যদিকে ‘ত্রিংশ শতাব্দী’র মূল কাহিনী পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কজনক অধ্যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে জাপানের হিরোশিমা-নাগাসাকির আণবিক বোমা বিস্ফোরণের অপ্রত্যাশিত পরিণতি। এর সমান্তরালে গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপিত হয়েছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, বসনিয়া-ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান, পাকিস্তান-ভারত, ইরাকে আগ্রাসন, কুয়েত-তিউনিশিয়া-ইয়ামেন-সিরিয়া-তুরস্ক-মিয়ানমার-গুলশানে বর্বর হামলা, সাম্প্রতিক রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ কিংবা সংখ্যালঘু নির্যাতন বা শিক্ষক-লাঞ্ছনা প্রভৃতি প্রসঙ্গ।

‘হেলেন কেলার’ প্রযোজনাটি এরই মধ্যে ভারত, জাপান এবং ‘ত্রিংশ শতাব্দী’ প্রযোজনাটি ‘ভারত রঙ্গ মহোৎসব’সহ জাপান ও ইংল্যান্ডে মঞ্চায়িত হয়েছে।

১৯৪৯ সালের ১৮ আগস্ট ফেনীর সোনাগাজী থানার সেনেরখিল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন। বাংলাদেশের বিচিত্র শ্রমজীবী, পেশাজীবী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সমাজজীবন ও তাদের আবহমান কালের সংস্কৃতিকে নাটকে মহাকাব্যিক ব্যাপ্তিদান করেছেন। জীবদ্দশায় তিনি একজন নাট্যকার হিসেবে সুখ্যাতি লাভ করলেও সমকালীন বিশ্বের শিল্পধারায় নতুন নন-জেনরিক শিল্পধারার প্রবর্তনে সচেষ্ট ছিলেন। নাট্যকার পরিচয়ের বাইরে তিনি ছিলেন একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক, সংগঠক, নাট্যনির্দেশক এবং শিল্পতাত্তি্বক। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের প্রতিষ্ঠা সেলিম আল দীনের হাত ধরেই। ঢাকা থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য তিনি। ১৯৮১-৮২ সালে আমৃত্যু শিল্পসঙ্গী নাট্যজন নাসির উদ্দীন ইউসুফকে সঙ্গে নিয়ে তিনি গড়ে তোলেন গ্রাম থিয়েটার। মূলত ঢাকা থিয়েটারের সাংগঠনিক কাঠামো থেকে তিনি তার সুবিস্তৃত নিরীক্ষামূলক নাট্য রচনা ও তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন।

'মধ্যযুগের বাঙলা নাট্য' সেলিম আল দীনের পিএইচডি অভিসন্দর্ভ; বাংলা নাটকের আকরগ্রন্থ। বাংলা ভাষার একমাত্র নাট্যবিষয়ক কোষগ্রন্থ বাংলা নাট্যকোষ সংগ্রহ, সংকলন, প্রণয়ন ও সম্পাদনা করেন তিনি। নাট্যবিষয়ক গবেষণা পত্রিকা 'থিয়েটার স্টাডিজে'র সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া, নাট্যশিক্ষার্থীদের জন্য তিনি অনুবাদ ও সম্পাদনা করেন নাট্যবিষয়ক গ্রন্থ 'নন্দিকেশ্বরের অভিনয় দর্পণ'। তার প্রকাশিত অন্যান্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে কাব্যগ্রন্থ 'কবি ও তিমি', উপন্যাস 'অমৃত উপাখ্যান'। তার রচিত সব সৃজনকর্ম নিয়ে দশ খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে সেলিম আল দীন রচনাসমগ্র। নাট্যাচার্য রচিত উল্লেখযোগ্য নাটকের মধ্যে রয়েছে_ 'জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন', 'বাসন', 'মুনতাসির', 'শকুন্তলা', 'কীত্তনখোলা', 'কেরামতমঙ্গল', 'যৈবতী কন্যার মন', 'চাকা', 'হরগজ', 'প্রাচ্য', 'হাতহদাই', 'নিমজ্জন', 'ধাবমান',

'স্বর্ণবোয়াল', 'পুত্র', 'বনপাংশুল'। তার রচিত গীতিনৃত্যনাট্য 'স্বপ্ন রমণীগণ' ও 'ঊষা উৎসব'।

তার প্রথম রেডিও নাটক 'বিপরীত তমসায়' ১৯৬৯ সালে এবং প্রথম টেলিভিশন নাটক আতিকুল হক চৌধুরীর প্রযোজনায় 'লিব্রিয়াম (পরিবর্তিত নাম ঘুম নেই)' প্রচারিত হয় ১৯৭০ সালে। আমিরুল হক চৌধুরী নির্দেশিত এবং বহুবচন কর্তৃক প্রযোজিত তার প্রথম মঞ্চনাটক 'সর্প বিষয়ক গল্প' মঞ্চস্থ হয় ১৯৭২ সালে। নাট্য ও গবেষণামূলক রচনাকর্মের পাশাপাশি তিনি টেলিভিশন নাটক রচনা, চলচ্চিত্রের সংলাপ রচনা ও মঞ্চনাট্যের নির্দেশক হিসেবে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন। সেলিম আল দীনের নির্দেশিত নাটকের মধ্যে রয়েছে_ 'মহুয়া', 'দেওয়ানা মদিনা', 'একটি মারমা রূপকথা', 'কাঁদো নদী কাঁদো', 'মেঘনাদবদ'। তার রচিত 'হরগজ' নাটকটি সুইডিশ ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং এ নাটকটি ভারতের রঙ্গকর্মী নাট্যদল কর্তৃক হিন্দি ভাষায় মঞ্চস্থ হয়েছে। সেলিম আল দীনের নাটক ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত।

নাট্যচর্চায় অসামান্য অবদানের জন্য সেলিম আল দীন একুশে পদক, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, অলক্ত সাহিত্য পুরস্কারসহ আরও বহু সম্মাননা ও খেতাবে ভূষিত হয়েছেন।

এইচই