Dhaka Mail Logo

জাতীয়

মুজিব সরকার জনগণের বিরুদ্ধে থাকায় চুয়াত্তরে দুর্ভিক্ষ হয়েছিল: তিতুমীর

নিজস্ব প্রতিবেদক

০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:১৩ পিএম

১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষের জন্য তৎকালীন শেখ মুজিব সরকারের জনবিচ্ছিন্নতা, বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা ও রাজনৈতিক অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। 

তিনি বলেন, ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা সরকারের সঙ্গে জনগণের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। জনগণের আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় রাষ্ট্রীয় সহিংসতার মাধ্যমে ক্ষমতায় টিকে থাকতে হয়েছিল তাদের।

রোববার (৮ নভেম্বর) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর আয়োজিত ‘চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ: স্বাধীনতা-পরবর্তী অর্থনৈতিক সংকট’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলো বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছিল। জনগণের সঙ্গে সম্পর্কহীন একটি সরকার গঠন করা হয়েছিল। নাগরিকদের দমন করতে আধাসামরিক বাহিনীও গড়ে তোলা হয়।

তৎকালীন অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ১৯৭২ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি মেট্রিক টন চালের দাম ছিল ১৪৭ ডলার। অথচ বাংলাদেশে একই পরিমাণ চালের দাম ছিল ৩১৬ ডলার। এই পার্থক্য থেকেই বাজার নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহির অভাব বোঝা যায়।

তিতুমীর বলেন, শুধু অর্থনীতি নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই তৎকালীন সরকার ব্যর্থ হয়েছিল। জনগণের সার্বভৌমত্বে বিশ্বাস না করায় সরকারের সঙ্গে সাধারণ মানুষের দূরত্ব তৈরি হয়েছিল।

আলোচনায় ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের শাসনব্যবস্থার সঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলের তুলনাও করেন তিনি।

তিতুমীর বলেন, তৎকালীন সরকারের জনগণের সমর্থনভিত্তিক বৈধতা ছিল না। ক্ষমতা ধরে রাখতে বিরোধী মতের মানুষের ওপর দমন-পীড়ন চালানো হতো। তার অভিযোগ, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনার শাসনামলেও একই ধরনের পদ্ধতিতে বিরোধী মত দমন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, শেখ হাসিনা সরকারের শাসনব্যবস্থা মূলত ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের শাসনামলেরই ধারাবাহিকতা ছিল।

দেশে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন নিয়েও মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আসার কথা কেউ কেউ বলছেন। কিন্তু দেশের মাটি, মানুষ ও সাধারণ জনগণের সঙ্গে তাদের কখনো সম্পর্ক ছিল না। তারা আর দেশে ফিরে আসতে পারবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের ‘গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা সেমিনার সিরিজ’-এর পঞ্চম পর্বে আলোচক হিসেবে অংশ নেন লেখক ও পানাম ইনস্টিটিউটের ট্রেজারার আসিফ ইকবাল এবং অর্থনীতিবিদ ও গবেষক ড. নাহিয়ান বিন খালেদ।

আসিফ ইকবাল বলেন, স্বাধীনতার পর অর্থনৈতিক সংকটের কারণে প্রায় ১৫ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। তাঁর মতে, এত বিপুল প্রাণহানির ঘটনাকে কেবল অর্থনৈতিক সংকট না বলে অর্থনৈতিক বিপর্যয় হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, সে সময় সরকারের পতনের পর সাধারণ মানুষের মধ্যে শোকের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। কারণ এর কয়েক মাস আগেই দুর্ভিক্ষে মানুষের মৃত্যুর অভিজ্ঞতা ছিল। পরবর্তী সময়ে সিপাহিদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের রাস্তায় নেমে আসার পেছনেও আগের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ফিরে না যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা কাজ করেছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জনসাধারণের সঙ্গে র‍্যালিতে অংশ নেওয়ার প্রসঙ্গ তুলে আসিফ ইকবাল বলেন, সরকারপ্রধানের সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত হওয়ার এটি একটি পদ্ধতি। জনগণের প্রত্যাশা উপলব্ধি করতে তাঁদের কাছাকাছি থাকা প্রয়োজন।

অর্থনীতিবিদ ড. নাহিয়ান বিন খালেদ বলেন, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের অন্যতম কারণ ছিল খাদ্য ও সম্পদের ওপর সুবিধাভোগী শ্রেণির নিয়ন্ত্রণ। তৎকালীন রেশন কার্ড ব্যবস্থার সুবিধা নির্দিষ্ট একটি শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকায় গ্রামের কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ প্রয়োজনীয় খাদ্যসহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন।

তিনি বলেন, সে সময় মজুতদারেরা বিপুল পরিমাণ চাল মজুত করে রাখলেও সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি। খাদ্যবাজারে অনিয়ম ও সরকারের ব্যর্থতা সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল।

সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের মহাপরিচালক এহ্‌সান মাহমুদ।

তিনি বলেন, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের সময় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কিছু অর্থনৈতিক সংকট থাকলেও দেশের বাজারব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা এবং রাজনৈতিক অব্যবস্থাপনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছিল।

এহ্‌সান মাহমুদের অভিযোগ, ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের শাসনামলে স্বজনপ্রীতি ও পরিবারকেন্দ্রিক সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকর করে তোলা হয়েছিল। চাল, গম থেকে শুরু করে ত্রাণের কম্বল বিতরণেও ক্ষমতাসীনদের প্রভাব ছিল।

বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্যে চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষের পর্যাপ্ত প্রতিফলন ঘটেনি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

জাদুঘরের মহাপরিচালক বলেন, কবি রফিক আজাদের ‘ভাত দে হারামজাদা নইলে মানচিত্র খাব’ কবিতার বাইরে দুর্ভিক্ষ নিয়ে সাহিত্য ও শিল্পকলায় খুব বেশি কাজ সামনে আসেনি। দুর্ভিক্ষের স্মৃতি ও শিল্পকর্মের একটি অংশ ইচ্ছাকৃতভাবে আড়ালে রাখা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের দুর্ভিক্ষবিষয়ক চিত্রকর্মের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। এসব শিল্পকর্ম সাধারণ মানুষের সামনে আরও বেশি প্রদর্শনের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন এহ্‌সান মাহমুদ।

লেখক ও গবেষক তুহিন খানের সঞ্চালনায় সেমিনারে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক, আইনজীবী, শিক্ষার্থী এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

এমএইচ/এএইচ