Dhaka Mail Logo

জাতীয়

সিটি হাসপাতালে ভাঙচুর: অভিযুক্ত বেল্লালের নাম বাদ দিতে ওসির সুপারিশ

মোস্তফা ইমরুল কায়েস

০৫ নভেম্বর ২০২৬, ১০:৫৫ পিএম

  • হামলার নেপথ্যে বেল্লালকে দায়ী করছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ
  • চলতি মাসে হঠাৎ করে গুমের মামলা করেন বেল্লাল
  • হাসপাতালে ঢুকেই এমডিকে খুঁজতে থাকেন হামলাকারীরা
  • পুলিশ বলেছে বেল্লালকে আসামি করলে মামলা নেওয়া হবে না: হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের সিটি হাসপাতালে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় থানায় মামলা করতে গিয়ে বাধার মুখে পড়ার অভিযোগ করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তাদের দাবি, হামলার নেপথ্যে থাকা বেল্লাল হোসেন নামে এক ব্যক্তিকে আসামি করতে চাইলে আপত্তি জানান মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল হালিম। ওই ব্যক্তির নাম বাদ দিয়ে মামলা করার পরামর্শও দেন তিনি। এ ঘটনায় শেষ পর্যন্ত মামলা না করে থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, জমি কেনাবেচা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে পরিকল্পিতভাবে এই হামলা চালানো হয়েছে। মঙ্গলবার গভীর রাতে ৭০ থেকে ৮০ জনের একটি দল হাসপাতালে ঢুকে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। এ সময় তারা হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) চিকিৎসক শহীদুল বারীকে খুঁজতে থাকে। তাকে না পেয়ে এক কর্মীকে মারধর করে এবং বিভিন্ন জিনিসপত্র ভাঙচুর করে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, এই হামলার নেতৃত্বে ছিলেন মোহাম্মদপুরের গ্রাফিক্স কলেজের সাবেক ছাত্রদল নেতা আব্দুল সালাম। ঘটনার পর তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।  এ বিষয়ে আব্দুল সালামের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। 

তবে হামলার এক দিন পেরিয়ে গেলেও পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করেনি। সিসিটিভি ফুটেজে হামলাকারীদের চেহারা দেখা গেলেও ব্যবস্থা না নেওয়ায় নিরাপত্তা ও বিচার পাওয়া নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

মঙ্গলবার রাতে যেভাবে হামলার ঘটনা

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মঙ্গলবার রাতে এক নারী ঠোঁট কাটা ও কপালে আঘাত নিয়ে হাসপাতালে আসেন। কর্তৃপক্ষের ধারণা, পড়ে গিয়ে তিনি আহত হয়েছিলেন। তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। চিকিৎসার বিল আসে ২ হাজার টাকা। রোগীর স্বজনেরা বিল থেকে ৫০০ টাকা কমানোর অনুরোধ করেন। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ৩০০ টাকা কমিয়ে দেয়। রাত ১২টার দিকে বিল পরিশোধ করে তাঁরা হাসপাতাল ছেড়ে যান।

কর্তৃপক্ষের দাবি, ওই ব্যক্তিরা চলে যাওয়ার পরপরই ৭০ থেকে ৮০ জনের একটি দল হাসপাতালে ঢোকে। তাদের অধিকাংশই উঠতি বয়সী তরুণ ও যুবক। নিচতলায় ঢুকেই তারা চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করে এবং হাসপাতালের এমডিকে খুঁজতে থাকে। একপর্যায়ে নিচতলায় দায়িত্ব পালন করা সজীব নামের এক কর্মীকে বেধড়ক মারধর করে তারা।

এ সময় কয়েকজন চিকিৎসক বাইরে বের হলে হামলাকারীরা তাদের কাছে এমডি কে, তা জানতে চায়। পরে তারা দুটি প্রিন্টার, কম্পিউটারসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র ভাঙচুর করে। পাশাপাশি ক্যাশ থেকে টাকাপয়সাও নিয়ে যায় বলে অভিযোগ করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় বাপ্পী নামের এক ব্যক্তি হাসপাতালের পক্ষে মোহাম্মদপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

আরও পড়ুন: সিটি হাসপাতালে হামলা-লুটপাটে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রদল নেতা বহিষ্কার

বুধবার বিকেলে সরেজমিনে হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, নিচতলায় স্বাভাবিক কার্যক্রম চললেও কয়েকজন শ্রমিক ভাঙচুরের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামতের কাজ করছেন। মেঝেতে তখনো ভাঙচুরের চিহ্ন রয়েছে। রিসেপশন ও হেল্প ডেস্কের কর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা যায়।

কী ঘটেছিল জানতে চাইলে হাসপাতালের এক কর্মী বলেন, ভোরে ভাঙচুর হয়েছে। তাই এখন ভাঙা কাচ লাগানো হচ্ছে। হাসপাতালের প্রবেশমুখের সিঁড়ির বাঁ পাশের দেয়ালে চিকিৎসকদের পরিচয় ও রোগী দেখার সময়সূচি-সংবলিত একটি সাইনবোর্ড ছিল। হামলার সময় সেটি ভেঙে ফেলা হয়। পরে একজন শ্রমিক সেটি খুলে নিচ্ছিলেন।

এ বিষয়ে হাসপাতালের এমডি চিকিৎসক শহীদুল বারী বলেন, যারা চিকিৎসা নিয়ে চলে গিয়েছিলেন, তারা কোনো অভিযোগ করেননি। অথচ তাঁদের চলে যাওয়ার পর ১০ মিনিটের মধ্যে ৭০ থেকে ৮০ জন এসে হামলা চালান। তার ভাষ্য, এতে বোঝা যায়, পুরো ঘটনাটি পরিকল্পিত ছিল। এমন পরিস্থিতিতে হাসপাতাল কীভাবে পরিচালনা করবেন, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।

শহীদুল বারী আরও বলেন, হামলাকারীরা এসেই তাকে খুঁজছিল। তাকে না পেয়ে এক কর্মীকে বেধড়ক মারধর করে। হাসপাতালের নিচতলায় থাকা কম্পিউটারসহ মূল্যবান জিনিসপত্র ভাঙচুর করে। হামলার নেতৃত্বে ছিলেন গ্রাফিক্স কলেজের সাবেক ছাত্রদল নেতা আব্দুল সালাম। এ ঘটনায় সরকারের কাছে নিরাপত্তা চান তাঁরা।

এদিকে আলোচিত এ ঘটনায় চিকিৎসকদের সংগঠন ড্যাব বিবৃতি দিয়ে এ ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। ড্যাব নেতৃবৃন্দ অবিলম্বে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত সকল অপরাধীকে দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে দেশের সকল হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে চিকিৎসকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য সরকারের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানানো হয়েছে।  

হামলার নেপথ্যে বেল্লালের সঙ্গে জমি নিয়ে বিরোধের অভিযোগ

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, হামলাকারীরা মব তৈরি করে হাসপাতালের এমডির ওপর হামলা করতে চেয়েছিল। এর পেছনে রয়েছে বেল্লাল হোসেন নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে দীর্ঘদিনের জমি নিয়ে বিরোধ।

কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় এক যুগ আগে বেল্লাল হোসেনের কাছ থেকে হাসপাতালটির এমডি চিকিৎসক শহীদুল বারীসহ কয়েকজন ব্যক্তি কুয়াকাটার কলাতলী মৌজায় জমি কেনার জন্য সাড়ে চার কোটি টাকা দেন। বেল্লালের কথা ছিল, তাঁদের কেনা জমি বুঝিয়ে দেবেন। কিন্তু জমি বুঝে নিতে গেলে উল্টো তাঁদের বিরুদ্ধে গুম, অপহরণ ও হামলার মামলা করা হয়। ভুক্তভোগীদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে বেল্লাল পাঁচ থেকে ছয়টি করে মামলা করেছিলেন বলে অভিযোগ তাদের।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, এসব মামলায় তাঁরা দীর্ঘদিন ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। মামলাগুলোর রায় তাঁদের পক্ষে গেলেও তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বেল্লাল প্রভাবশালী হওয়ায় তাঁরা প্রতিকার পাননি।

আরও পড়ুন: মোহাম্মদপুরে সিটি হাসপাতালে হামলা, জড়িতদের শাস্তি দাবি ড্যাবের

৫ আগস্টের পর বেল্লালের বিরুদ্ধে জমি নিয়ে প্রতারণার অভিযোগে ঢাকা মেইলে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এসব প্রতিবেদনে উঠে আসে, সিটি হাসপাতালের এমডি শহীদুল বারীসহ একাধিক ব্যক্তির কাছে সরকারি পানি উন্নয়ন বোর্ডের জমি বিক্রির অভিযোগ রয়েছে বেল্লালের বিরুদ্ধে। পরে বিষয়টি নিয়ে সিআইডি তদন্ত করে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, তদন্তে প্রতারণার প্রমাণ পাওয়ার পর চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়। আদালত বেল্লালের প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত বলে অভিযোগ থাকা ঢাকা, কুষ্টিয়া ও চট্টগ্রামের সম্পত্তি ক্রোকের নির্দেশ দেন।

কর্তৃপক্ষের ধারণা, এসব ঘটনার জেরেই ক্ষুব্ধ হয়ে বেল্লাল লোকজন ভাড়া করে হাসপাতালে হামলা চালিয়েছেন।  এ বিষয়ে বেল্লালের ফোনে কল করা হলে তাকে পাওয়া সম্ভব হয়নি।

বেল্লালের নাম বাদ দিতে ওসির ফোন

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, হামলার নেপথ্যে থাকা বেল্লাল হোসেনকে আসামি করতে চাইলে মোহাম্মদপুর থানার ওসি আব্দুল হালিম ফোন করে তাকে বাদ দিয়ে মামলা করার পরামর্শ দেন। বেল্লালের নাম বাদ না দিলে মামলা নেওয়া হবে না বলেও জানানো হয়। এ কারণে শেষ পর্যন্ত মামলা না করে লিখিত অভিযোগ দিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনার পর ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও পুলিশ মামলা নেয়নি বলে অভিযোগ করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। শুধু তা-ই নয়, এ ঘটনায় কাউকে আটক বা গ্রেপ্তারও করা হয়নি। অথচ সিসিটিভি ফুটেজে হামলাকারীদের চেহারা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে বলে দাবি তাদের। কার নেতৃত্বে হামলা হয়েছে, সে তথ্যও পুলিশকে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এরপরও ব্যবস্থা না নেওয়ায় সুষ্ঠু বিচার পাওয়া নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

এদিকে হামলার নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ ওঠা মোহাম্মদপুরের গ্রাফিক্স কলেজের ছাত্রদল নেতা আব্দুস সালামকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তবে বহিষ্কারের পরও পুলিশ তাকে আটক করেনি বলে অভিযোগ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের।

এ বিষয়ে মোহাম্মদপুর থানার ওসি আব্দুল হালিমের সঙ্গে যোগাযোগ করে ঢাকা মেইল। তিনি বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যাঁকে মামলার আসামি করতে চাচ্ছে, তিনি তো ঘটনাস্থলে ছিলেন না। তাহলে তাঁকে আসামি করা হবে কেন?

তখন ওসিকে প্রশ্ন করা হয়, কারও বিরুদ্ধে সন্দেহ থাকলে অভিযোগকারী মামলায় তাঁর নাম উল্লেখ করতে পারেন। তদন্তে সংশ্লিষ্টতা না পাওয়া গেলে অভিযোগপত্র থেকে তাঁর নাম বাদ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। জবাবে ওসি বলেন, বিষয়টি তিনি দেখছেন এবং ব্যবস্থা নিচ্ছেন। তবে পরে কাউকে আটক করার তথ্য জানাতে পারেননি তিনি।

সর্বশেষ খবর হল এই ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের হয়ে জাবেদ ইকবাল নামে এক ব্যক্তি বুধবার ঢাকার মহানগর আদালতে মামলা করেছেন। মামলায় বিল্লাল হোসেন, আব্দুস সালাম, রাফি ও আসমা নামে সেই নারীকে সহ চারজনের নাম উল্লেখ করে  ৬০-৭০ জনকে অজ্ঞাত দেখিয়ে আসামি করা হয়েছে। এ মামলায় আদালত থানাকে পুরো ঘটনা তদন্ত করে পাঁচ দিনের মধ্যে রিপোর্ট দিতেও বলেছে বলে জানা গেছে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

হাসপাতালের এমডি চিকিৎসক শহীদুল বারী ঢাকা মেইলকে বলেন, ওসির কাছে মামলা করতে গেলে প্রথমে অভিযোগ নেওয়া হয়। পরে মামলায় বেল্লালের নাম দেখে তাকে বাদ দিয়ে মামলা করতে বলা হয়। বেল্লাল নিজেকে সমন্বয়ক দাবি করে ওসির সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন বলেও জানান তিনি।

শহীদুল বারী বলেন, ঘটনার পর তারা বেল্লালের বিরুদ্ধে করা মামলা এবং তাঁকে নিয়ে প্রকাশিত সংবাদগুলো ওসিকে পাঠিয়েছেন। কিন্তু এরপরও পুলিশ কাউকে আটক বা গ্রেপ্তার করেনি।

হামলার সঙ্গে বেল্লালের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, বেল্লাল অনেক মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। তারা কয়েকজন তার বিরুদ্ধে মামলা করে আইনি প্রক্রিয়ায় প্রতারণার বিষয়টি প্রমাণ করেছেন। আদালত তাঁর সম্পত্তি ক্রোকের নির্দেশ দিয়েছেন। এসব কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি লোকজন দিয়ে হামলা চালিয়েছেন বলে তাঁদের ধারণা।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আরও দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জমি বিক্রির নামে বেল্লাল বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। এখন তিনি নিজেকে জুলাই যোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন। তার বিরুদ্ধে সিআইডি ইতিমধ্যে অভিযোগপত্র দিয়েছে এবং প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে বলে দাবি করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

এমআইকে/এআর