Dhaka Mail Logo

রাজনীতি

জেন-জিদের রাষ্ট্র মেরামতের আকাঙ্ক্ষা এখনো পূরণ হয়নি: মাহমুদুর রহমান

নিজস্ব প্রতিবেদক

০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:০৪ পিএম

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদের আইকনকে পরাজিত করলেও তরুণ প্রজন্মের (জেন-জি) রাষ্ট্র মেরামতের আকাঙ্ক্ষা এখনো পূরণ হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন দৈনিক আমার দেশ-এর সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমান। তিনি বলেছেন, জুলাই সনদ প্রণয়নের প্রক্রিয়া ও পদ্ধতিই ভুল ছিল। রাজনৈতিক পরিপক্বতা থাকলে জুলাই সনদের আগে নির্বাচন দেওয়া হতো না।

বুধবার (৪ নভেম্বর) জাতীয় প্রেসক্লাবের আব্দুস সালাম হলে আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) আয়োজনে ‘বছর পেরিয়ে জুলাই সনদ: গণ-অভ্যুত্থানের তরুণ অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময়’ শীর্ষক সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

মাহমুদুর রহমান বলেন, নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে স্বাক্ষরের প্রক্রিয়াটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। যারা এতে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে, তারা কার্যত জুলাই সনদের চেতনা স্বীকার করতে চায় না। তারা বিপ্লব শব্দটি উচ্চারণ করতেও অস্বস্তি বোধ করে। তরুণেরা রাষ্ট্র সংস্কার চাইলেও অধ্যাপক ইউনূসের সরকার তাদের আকাঙ্ক্ষা যথাযথভাবে অনুধাবন করতে পারেনি। তারপরও ওই সরকার ছিল জুলাইয়ের বন্ধু সরকার। অনভিজ্ঞতার কারণে সরকার চাপের মুখে পড়েছিল। জুলাইয়ের অনেক তরুণ সংগঠন সরকারকে সহযোগিতা না করে অসহযোগিতা করেছে। বিএনপিও সরকারকে সহযোগিতা করেনি। সব মিলিয়ে সেটি ছিল একটি দুর্বল সরকার।

নির্বাচনের পর জুলাইয়ের পক্ষের শক্তিগুলোর বিভাজনের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এখন কে দেশের ভেতর থেকে আর কে দেশের বাইরে থেকে মাস্টারমাইন্ড ছিলেন, তা নিয়ে কৃতিত্ব নেওয়ার প্রতিযোগিতা চলছে। অথচ স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে হলে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। বিভাজনমূলক বক্তব্যের দায় সরকারকেই নিতে হবে।

জুলাইয়ের পক্ষের রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে এবি পার্টিসহ সব বাংলাদেশপন্থী দলকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান মাহমুদুর রহমান। এ লক্ষ্যে জাতীয় কনভেনশন আয়োজনের প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, বিভাজন চলতে থাকলে দেশের স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। আবু সাঈদ শুধু বাংলাদেশের আইকন নন, তিনি গোটা পৃথিবীর আইকন। জুলাই বিপ্লব এক দিনের ঘটনা নয়, এটি চলমান প্রক্রিয়া। জুলাই শহীদদের আত্মত্যাগ ছাড়া আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হতো না। আরও একটি বিপ্লবের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে।

image

সভাপতির বক্তব্যে এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, এই সংবিধান ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিয়ে বাংলাদেশের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব নয়। নতুন করে রাষ্ট্র মেরামতের সনদ তৈরি করতে হবে। সেই সনদে চার কোটি মানুষের স্বাক্ষর নেওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে। রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে জনগণকেই প্রকৃত অংশীজন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

ড. ইউনূস সরকারের অদক্ষতা ও অনভিজ্ঞতার সমালোচনা করে মঞ্জু বলেন, এসব কারণে ওই সরকারকে উপহাস করে এনজিওগ্রাম সরকার বলা হতো। অব্যবস্থাপনা ও অযোগ্যতার কারণে বর্তমান সরকারকে অনেকে লন্ডনী-গো সরকার বলছে। ফ্যাসিবাদ রুখতে গণ-অভ্যুত্থানের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক বিপ্লব প্রয়োজন। গণ-অভ্যুত্থান ও নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সব সমস্যার সমাধান হয়নি; বরং সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। সীমান্তের ওপার থেকে ফ্যাসিবাদী শক্তি উল্লসিত হচ্ছে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর তরুণদের বলা হচ্ছে, তোমরা বিপ্লব করেছ, এখন রাষ্ট্র নিয়ে আর ভাবার দরকার নেই, পড়ার টেবিলে ফিরে যাও। কোনো কোনো রাজনীতিবিদ বিপ্লবীদের ফার্মের মুরগির সঙ্গে তুলনা করছেন। যারা তরুণদের অবদানকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছেন, তাঁরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেননি।

তিনি বলেন, ১৭ বছর ধরে যে জগদ্দল পাথর সরানো যায়নি, তরুণেরা তা সরিয়েছেন। লক্ষ্মণ সেনের মতো দুপুরের খাবার ফেলে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল ফ্যাসিবাদী শাসকগোষ্ঠী। যারা তরুণদের অবদান অস্বীকার করছেন, তাঁরা অজ্ঞতাপ্রসূত কাজ করছেন।

জুলাই সনদের গুরুত্ব তুলে ধরে তাজুল ইসলাম বলেন, সংবিধান ও প্রচলিত আইনের মাপকাঠিতে জুলাই বিপ্লব হয়নি। এটি ছিল আইনি সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে জনগণের অভ্যুত্থান। এখন ভাড়াটে লোক দিয়ে নানা ধরনের বয়ান তৈরির চেষ্টা চলছে। আইন ও সংবিধানের দোহাই দিয়ে জুলাই সনদ অমান্য করা যাবে না। জুলাই সনদ আমাদের রেড লাইন।

দৈনিক ওয়াদা-এর সম্পাদক ও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সাবেক প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, জুলাইকে শুধু রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতেও ছড়িয়ে দিতে হবে। আওয়ামী ফ্যাসিবাদ যেন আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে, সে জন্য সাংস্কৃতিক আন্দোলন জোরদার করতে হবে। ফ্যাসিবাদ তৈরির পেছনে কারা রসদ জোগায়, তা চিহ্নিত করতে হবে। হিটলারের উত্থানের পেছনেও নানা শক্তি ও উপাদান কাজ করেছিল। বাংলাদেশেরও ফ্যাসিবাদ তৈরির পেছনের শক্তিগুলো চিহ্নিত করা প্রয়োজন।

সভায় এবি যুব পার্টির সদস্যসচিব হাদীউজ্জামান খোকন সঞ্চালনা করেন। স্বাগত বক্তব্য দেন এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আব্বাস ইসলাম খান নোমান।

সভায় আরও বক্তব্য দেন তারুণ্যের জুলাই ফাউন্ডেশনের নেতা সাগর উদ্দিন, পুসাবের সংগঠক তালহা বিন আমীন, জুলাই ঐক্যের নেতা রিয়াদুস ইসলাম জুবা, জুলাই যোদ্ধা লাবিব, স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের সংগঠক সাইয়েদ আহমেদ সরকার, শহীদ সোহেল রানার ভাই আলভী নাবিল, জুলাই রেভ্যুলেশন ওয়াচের সংগঠক সানজিদ হাসান তানভীর, বৈষম্যবিরোধী কওমির সদস্যসচিব মাসুদুর রহমান জুনায়েদ, প্রতিবন্ধী নাগরিক পরিষদের সংগঠক ইফতেখার মাহমুদ, জুলাই সংগঠক নেছার উদ্দিন, শহীদ রাকিবের ভাই আমিন উদ্দিন, মঞ্চ ২৪-এর সংগঠক ইশরাত করিম অর্পিতা, দ্য রেড জুলাইয়ের সংগঠক রাসেল মাহমুদ এবং মুস্তাইন বিল্লাহ হাবীবি।

এবি পার্টির জ্যেষ্ঠ নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার যোবায়ের আহমেদ ভূঁইয়া ও শাহাদাতুল্লাহ টুটুল, প্রবাসী কল্যাণবিষয়ক সম্পাদক গোলাম রব্বানী রাজা, ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক সেলিম খান, দক্ষিণের আহ্বায়ক আব্দুল হালিম খোকন এবং খুলনা সাংগঠনিক সম্পাদক ইয়ামিনুর রহমানসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।

এএইচ/এআর