Dhaka Mail Logo

রাজনীতি

জামায়াতের সঙ্গে শরিকদের দূরত্ব বাড়ছে?

নিজস্ব প্রতিবেদক

০১ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:৩৭ পিএম

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়া নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ১১ দলীয় ঐক্যের শরিক দলগুলোর মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রার্থিতা নিয়ে জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মধ্যে টানাপড়েনের বিষয়টি সামনে এসেছে। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচন এককভাবে করার জামায়াতের সিদ্ধান্তে জোটের অন্য শরিকদের মধ্যেও অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে জোটের ঐক্য ও ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।

নির্বাচনের তারিখ এখনো চূড়ান্ত না হলেও জামায়াতে ইসলামী নিজেদের সম্ভাব্য প্রার্থীদের দলীয় একক প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে। এতে জোটের মধ্যে সংকট তৈরি হচ্ছে বলে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে।

এর আগে এই জোটে থাকা কওমি মাদরাসাকেন্দ্রিক ধর্মভিত্তিক কয়েকটি দলের জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার তৎপরতার খবরও এসেছিল।

ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে, জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের ভেতরে আসলে কী হচ্ছে? বিশেষ করে এনসিপি ও জামায়াতের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে কেন?

শনিবার জোটের লংমার্চ কর্মসূচিতে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের অনুপস্থিতিকে ঘিরে এ প্রশ্নটি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে।

এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেছেন, তারা জোটে আছেন। তবে তাদের মনে হয়েছে, জনগণের দাবি-দাওয়াসংক্রান্ত বিষয়গুলোতে আলাদাভাবে মাঠে নামা প্রয়োজন।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলছেন, সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আলাদাভাবে করলেও জোটে কোনো সমস্যা হবে না বলে তারা মনে করেন।

image

স্থানীয় সরকার নির্বাচন এককভাবে করার জামায়াতের সিদ্ধান্তে দলটির নেতৃত্বাধীন জোটে এনসিপি ছাড়াও অন্য শরিকদের মধ্যে একধরনের অস্বস্তি রয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।

জোটের অন্যতম দল এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু অবশ্য বলছেন, জোট নিয়ে তারাও খুব একটা স্বস্তিতে নেই। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে জোটটি ধীরে ধীরে দুর্বল হতে পারে।

দূরত্বের প্রশ্ন আসছে কেন

সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা না হলেও গত কিছুদিন ধরেই ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থিতা নিয়ে ১১ দলীয় ঐক্যের মধ্যে জামায়াত ও এনসিপির টানাপড়েনের খবর পাওয়া যাচ্ছিল। এর আগে থেকেই জোটের কওমি মাদরাসাভিত্তিক দলগুলোকে নিয়েও সংকট চলছিল।

সবশেষ সোমবার ১১ দলীয় ঐক্যের খুলনা বিভাগ অভিমুখী লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কোনো নেতাকে দেখা যায়নি। বিষয়টি জোটের ভেতরের সংকটকে সামনে নিয়ে এসেছে বলে মনে করেন অনেকে।

জানা গেছে, আসিফ মাহমুদকে জামায়াত ছাড় দিতে রাজি না হওয়ায় এনসিপি নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে দক্ষিণের প্রার্থী করতে যাচ্ছে।

চট্টগ্রামে লংমার্চের সমাবেশে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান

অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শুরু হতে যাচ্ছে। সেখানেও জামায়াত এককভাবে নির্বাচন করতে আগ্রহী।

ভোট নিয়ে জোটের অভ্যন্তরে সংকট তৈরির আশঙ্কার কথা বলেছেন ১১ দলীয় ঐক্যে থাকা এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জুও।

তিনি বলছেন, এই জোট কোনো মতাদর্শিক জোট নয়। এটি প্রথমে ছিল ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্য। বর্তমানে এর অবস্থান ১১ দলীয় ঐক্য।

তার মতে, এই ঐক্যের ভিত্তি ছিল জাতীয় নির্বাচনে আসন সমঝোতা। নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পর এখন জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নই এই ঐক্যের মূল ইস্যু।

মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, জোট নিয়ে তারাও খুব একটা স্বস্তিতে নেই। সরকার গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করলে এই ঐক্যের আর কার্যকারিতা থাকবে না। তা ছাড়া সামনে সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জোটভুক্ত একেকটি দল একেকভাবে নির্বাচন করতে চাইছে। ফলে তার ধারণা, সিটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই ঐক্য আরও দুর্বল হতে পারে।

এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলছেন, সংসদ, সংস্কার ও বিচার ইস্যুতে তারা জামায়াতের সঙ্গে জোটে আছেন। এসব বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে কোনো দূরত্ব নেই।

তিনি বলেন, তাদের মনে হয়েছে, এখন এককভাবে মাঠে নামা প্রয়োজন। সে কারণে নিজেদের এজেন্ডা ও কর্মসূচি নিয়ে তারা মাঠে নেমেছেন। শনিবার লংমার্চের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে নাহিদ ইসলাম না থাকায় দূরত্বের আলোচনা আসছে। তবে তারা ১১ দলীয় জোটে আছেন। স্থানীয় সরকার নির্বাচন আলাদাভাবেই করবেন। শুধু জনগণের দাবি-দাওয়াগুলো নিয়ে স্বতন্ত্রভাবে মাঠে থাকবেন।

অর্থাৎ এত দিন জনজীবনের সংকটসংক্রান্ত যেসব ইস্যুতে এনসিপি জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে কর্মসূচি পালন করছিল, সেগুলো এখন দলটি এককভাবে করতে চাইছে।

এটিই তাদের মধ্যে দূরত্বের বহিঃপ্রকাশ কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলগুলো সব সময় এককভাবে অংশ নিয়ে আসছে। এবারও তারা সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

তিনি বলেন, জোট আছে এবং থাকবে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে জামায়াত অতীতেও যে অবস্থানে ছিল, এখনো সেখানেই আছে। এসব বিষয় নিয়ে জোটে কোনো সমস্যা হবে না। জোটে যারা আছেন, তারা থাকবেন। কেউ কেউ বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছেন, তবে তারা সফল হবেন না।

যেভাবে ১১ দলীয় ঐক্যের যাত্রা শুরু

প্রসঙ্গত, গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে 'ওয়ান বক্স পলিসি' অর্থাৎ ইসলামি দলগুলোর এক বাক্সে ভোট—এই স্লোগান নিয়ে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলনসহ আটটি ধর্মভিত্তিক দল আসন সমঝোতার মোর্চা গঠন করে জোট হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল।

পরে এনসিপি, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) জোটে যোগ দিলে এটি ১১ দলীয় জোটে রূপ নেয়।

নির্বাচনের আগে জুলাই সনদ ও সংস্কার বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলনেও নেমেছিল ওই মোর্চা। পরে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হলে তারা আন্দোলন থেকে সরে এসে নির্বাচনি তৎপরতা শুরু করে।

নির্বাচনের পর গত ৬ আগস্ট ঢাকার মুক্তাঙ্গনে জোটের এক অবস্থান কর্মসূচি থেকে সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সারসংকট নিরসনসহ ছয় দফা দাবিতে ঢাকা ছাড়াও চারটি বিভাগীয় শহরে লংমার্চ ও মহাসমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করেন জোটের নেতা শফিকুর রহমান।

শেখ হাসিনা বিরোধী গণ অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতারাই এনসিপি গঠন করেছিলেন

জোটের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে যে ধারণা পাওয়া গেছে, তা হলো—সিটি করপোরেশন নির্বাচনসহ স্থানীয় নির্বাচনকে ঘিরেই জোটের মধ্যে কিছুটা হলেও আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।

বিশেষ করে এনসিপি নেতা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন থেকে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এনসিপি চাইছিল, আসিফ মাহমুদসহ স্থানীয় নির্বাচনে তাদের প্রার্থিতা নিয়ে জামায়াত সমঝোতায় আসুক।

কিন্তু জামায়াত ইতিমধ্যে তাদের সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম অনেকটাই চূড়ান্ত করেছে। সেখানে আসিফ মাহমুদের পরিবর্তে নিজেদের প্রার্থী হিসেবে মহানগর উত্তরের আমির সেলিম উদ্দিনের নাম চূড়ান্ত করেছে দলটি। আর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অনানুষ্ঠানিকভাবে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন ডাকসুর ভিপি আবু সাদিক কায়েম।

যদিও জোটের শরিক এনসিপি এর আগে দক্ষিণে মেয়র প্রার্থী হিসেবে আসিফ মাহমুদ এবং উত্তরে প্রার্থী হিসেবে আরিফুল ইসলাম আদিবের নাম ঘোষণা করেছিল।

পরে সেপ্টেম্বরের শুরুতে আসিফ মাহমুদ ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার ভোটার হন। আর এনসিপির আরেক নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার ভোটার হন।  সূত্র: বিবিসি বাংলা

এআর