Dhaka Mail Logo

জাতীয়

গ্রেফতার আতঙ্কে হকাররা, মিরপুর-১ এ ঝুলছে অবৈধ সংযোগের মৃত্যুফাঁদ

একে সালমান

৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৫৪ পিএম

  • সংঘর্ষ-ভাঙ্গচুর ও অগ্নিসংযোগ মামলার পর ১০ নম্বর জুড়ে উধাও হকাররা
  • মিরপুর ১ নম্বর শাহআলী থানাধীন ফুটপাতের ওপর ঝুলছে বৈদ্যুতিক সংযোগ
  • সমঝোতা শেষে আবারও ফুটপাতে বসবে বলে আশাবাদী ব্যবসায়ীরা

‎রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা জুড়ে দখল করা ফুটপাত দখলমুক্ত করতে উচ্ছেদ অভিযান চালাচ্ছে সিটি কর্পোরেশন। মিরপুর-১০ ও মিরপুর-১ এম্বর এলাকায় দখল করে গড়ে তোলা দোকানপাট উচ্ছেদ করতে গিয়ে হামলার শিকার হন পুলিশ ও সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তারা। দফায় দফায় সংঘর্ষে সিটি কর্পোরেশন ও পুলিশের গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এতে অনেকে আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় মিরপুর ও পল্লবী থানায় এক হাজার অজ্ঞাতনামা আসামির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে।

এমন ঘটনার পর গ্রেফতার আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন ফুটপাতের হকাররা। পুলিশের অভিযান কিংবা প্রশাসনের উচ্ছেদ কার্যক্রমের আশঙ্কায় দোকানপাট শূন্য মিরপুর এলাকা। এ ছাড়াও, মিরপুর-১ নম্বর এলাকায় শাহআলী থানাধীন ফুটপাত ও সড়কের পাশে ঝুলতে দেখা যাচ্ছে বিপজ্জনক বৈদ্যুতিক তার ও অবৈধ সংযোগ। এসব সংযোগ মূলত আবার দোকানপাট বসানোর আশায় ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।

‎সরেজমিনে দেখা যায়, মিরপুর-১০ গোলচত্বর ও আশপাশের এলাকা পুরোপুরি দোকানপাট শুন্য। কোথায়ও হকারদের কোনো চিহ্ন নেই। যতদূর চোখ যায় কোনো অস্থায়ী দোকান চোখে পড়ে না। স্থানীয়রা জানান, দিনে কিংবা রাতে ফুটপাত উচ্ছেদের পর কোন দোকানপাট বসে না। এ ছাড়াও, কিছু কিছু গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে পুলিশ পাহারা বসানো হয়েছে। পাশাপাশি, যেন কোনো দোকানপাট না বসতে পারে সেজন্য পুলিশের গাড়ি নিয়মিত টহল দিতে দেখা গেছে।

‎এদিকে মিরপুর-১ নম্বর এলাকায় দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। বিভিন্ন দোকান ও অস্থায়ী স্থাপনার পাশে ফুটপাতের দোকানকে কেন্দ্র করে বৈদ্যুতিক তার ঝুলতে দেখা গেছে। যেসব সংযোগ সন্ধ্যার পর ফুটপাত কিংবা সড়কের ওপর বসানো দোকানপাটে বৈদ্যুতিক বাতি জ্বালাতে ব্যবহৃত হতো। এসব খোলা তার, জোড়াতালি দেওয়া সংযোগ এবং নিচু হয়ে থাকা বিদ্যুতের লাইন পথচারীদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। বৃষ্টি কিংবা আর্দ্র আবহাওয়ায় এসব সংযোগ থেকে শর্টসার্কিট ও বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার আশঙ্কা আরও বেড়ে যায়।

‎স্থানীয়রা দখলমুক্ত ফুটপাত চায়

‎মিরপুর-১০ এর বাসিন্দা আতাউর রহমান বলেন, গত কয়েকদিন ফুটপাত দখলমুক্ত হওয়ার পর আমরা ফুটপাত ও সড়কে স্বস্তি নিয়ে চলাচল করতে পারছি। গত কয়েক দশকে এভাবে চলাচল করা ছিল স্বপ্নের মতো। এমন পরিবেশে ফুটপাত দিয়ে হাঁটাচলা করা যায়? আমরা কখনো কল্পনা করতে পারিনি যে, সবদিকে হকাররা যেভাবে ফুটপাত ও সড়ক দখল করে রেখেছে; কখনো এটা দখলমুক্ত হবে আর আমরা এতে চলাচল করব।

‎তিনি আরও বলেন, আমরা সব সময় চেয়েছিলাম, শহরে চলাচলের জন্য সুন্দর একটা পরিবেশ। যেমন ফুটপাত ব্যবহার ও যানজট নিরসন। যদি সরকার সদিচ্ছা নিয়ে প্রতিটি এলাকার ফুটপাতের অবৈধ হকার উচ্ছেদ করে দখলমুক্ত করে। তাহলে আশা করছি নগর জুড়ে স্বস্তি ফিরে আসবে।

‎মিরপুর-১০ এর বেনারশি পল্লী এলাকার বাসিন্দা হেমায়েত উদ্দিন বলেন, মিরপুর-১০ নম্বর এলাকার এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল যে, কোনদিকে চলাফেরার তেমন কোনো অবস্থা ছিল না। যেদিকে বের হতাম, সব জায়গায় দোকানপাটে ঠাসা। কোথায়ও হাঁটার মতো অবস্থা ছিল না। গত কয়েকদিন আগে ফুটপাত উচ্ছেদ নিয়ে পুলিশ ও সিটি কর্পোরেশনের সঙ্গে তুমুল সংঘর্ষ হয়েছিল এবং হকাররা তাণ্ডব চালিয়েছিল। মনে হচ্ছিল তাদেরকে মনে হয় কখনো ওঠানো যাবে না।

‎তিনি আরও বলেন, গত কয়েকদিনে আমরা যে স্বস্তি নিয়ে এখন চলাচল করছি। সব সময় যদি এমন পরিবেশ থাকে। তাহলে নগর জুড়ে সুন্দর একটি পরিবেশ তৈরি হবে। আমরা পরিবার-পরিজন নিয়ে স্বস্তিতে চলাচল করতে পারব।

এ ছাড়াও, মিরপুর-১ এলাকার বাসিন্দা সৈয়দ মুশফিক হাসান বলেন, মিরপুর-১ নম্বর এলাকায় এখনো ব্যবসায়ীরা অপেক্ষায় আছেন। কখন আবারো ফুটপাত বসতে দেওয়া হবে। তারা ফুটপাত ও রাস্তার ওপর অবৈধ দোকানগুলোতে বৈদ্যুতিক সংযোগ দিয়ে টাকা আদায় করতেন। সেসব অবৈধ সংযোগের বৈদ্যুতিক তার ও সরঞ্জাম এখনো সড়কের ওপর ঝুলছে। হয়তো তারা আশায় আছেন, দোকানপাট বসা নিয়ে সমাঝোতা শেষে তারা আবার ফুটপাত দখল করে ব্যবসা শুরু করতে পারবেন।

‎তিনি আরও বলেন, সরকার ফুটপাত ও রাস্তার ওপর গড়ে ওঠা দোকানপাট যেভাবে উচ্ছেদ করেছে। তেমনি সড়কের ওপর ফুটপাতের দোকানগুলোর জন্য রাখা বৈদ্যুতিক তার ও সরঞ্জামগুলো বিচ্ছিন্ন করতে হবে। তা না হলে এসব সংযোগ থেকে যেকোনো ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে।

‎‎অভিযান আতঙ্কে ব্যবসা করছেন হকাররা

মিরপুর-১০ গোলচত্বর, ফায়ার সার্ভিস কিংবা স্টেডিয়ামের আশপাশের সড়ক ও ফুটপাত ঘুরে দেখা যায়, পুরো এলাকার ফুটপাত ও সড়ক একেবারে ফাঁকা। কোথায়ও কোনো দোকানপাট নেই। যা আগের থেকে একেবারেই ভিন্ন চিত্র। আগে পুরো এলাকার সড়ক ও ফুটপাত জুড়ে দোকানপাটে ঠাসা ছিল। এসব এলাকা দিয়ে চলাফেরা ছিল একরকম দুঃস্বপ্ন।

‎মিরপুর-১০ এর ফুটপাতের ব্যবসায়ী ইমরান হোসেন বলেন, আমরা ফুটপাতে ব্যবসা করে পরিবার-পরিজন নিয়ে কোনোমতে চলতাম। ফুটপাত উচ্ছেদ নিয়ে হকার ও প্রশাসনের লোকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে। আমাদের অনেককে ধরে নিয়ে গেছে। আমরা আতঙ্কে দিন পার করছি। কখন এসে আমাদের পুলিশ আটক করে নিয়ে যায় সেই দুশ্চিন্তায় দিনানিপাত করতে হচ্ছে।‎

‎তিনি আরও বলেন, আমরা গত কয়েকদিন যাবৎ এক রকম না খেয়ে আছি। অনাহারে আমাদের দিন কাটছে। সরকারের উচিত আমাদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করে আমাদের উচ্ছেদ করা। কিন্তু তারা আমাদের একেবারে অসহায় করে দিয়ে সব উচ্ছেদ করে দিল।

‎একই এলাকার ব্যবসায়ী সিহাব উদ্দিন বলেন, ফুটপাতের ব্যবসা আমাদের জীবিকার প্রধান অবলম্বন। প্রতিদিনের বিক্রির ওপর নির্ভর করে আমাদের সংসার চলে। কিন্তু উচ্ছেদের পর আমরা কোনো দোকান বসাতে পারি না। আমাদের আয়ের আর কোনো উৎস নেই। পুলিশ-হকার সংঘর্ষের পর আমাদের আশপাশের কয়েকজনকে পুলিশ আটক করে নিয়ে গেছে। আমরা এখন গ্রেফতার আতঙ্কে দিন পার করছি।

‎মিরপুর-১ নম্বরে বৈদ্যুতিক তারের ঝুঁকি

‎মিরপুর-১০ এর হকার সংকটের বিপরীতে মিরপুর-১ নম্বর এলাকায় দেখা যাচ্ছে জননিরাপত্তার আরেকটি উদ্বেগজনক চিত্র। বিভিন্ন দোকান ও অস্থায়ী স্থাপনার আশপাশে ঝুলে রয়েছে অসংখ্য বৈদ্যুতিক তার। যেসব সংযোগ থেকে সড়ক ও ফুটপাতের ওপর গড়ে ওঠা দোকানপাটে বৈদ্যুতিক সংযোগ দেওয়া হতো। সেসব তার এখন সড়কের ওপর ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। অনেকে বলছেন, দোকানপাট উচ্ছেদ হলেও এসব বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করার কারণ হলো— আবারও কয়েকদিন দোকানপাট বসাতে পারে এমন সমঝোতা হয়তো চলছে। যার ফলে এমন ঝুঁকিপূর্ণভাবে বৈদ্যুতিক তার ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।

‎স্থানীয় বাসিন্দা জহুর উদ্দিন বলেন, সড়কের ওপর থাকা দোকানপাট উচ্ছেদ করলেও বৈদ্যুতিক তারের সংযোগ এখনো রয়ে গেছে। কোথাও তারের জোড়াতালি, কোথাও নিচু হয়ে থাকা সংযোগ, আবার কোথাও অপরিকল্পিতভাবে নেওয়া বিদ্যুৎ লাইন দেখা যায়। এসব সংযোগের বৈধতা ও নিরাপত্তা কে দেবে? এসব সংযোগ থেকে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

‎বিশেষ করে জনবহুল এলাকায় এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ সংযোগ যেকোনো সময় শর্টসার্কিট, অগ্নিকাণ্ড কিংবা বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার কারণ হতে পারে।

‎লুৎফুর রহমান নামে আরেক বাসিন্দা অভিযোগ করে ঢাকা মেইলকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এসব ঝুঁকিপূর্ণ সংযোগ চোখে পড়লেও সেগুলো অপসারণে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই। দুর্ঘটনা ঘটার পর দায় এড়ানোর প্রবণতা বন্ধ করতে আগেই ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু দোকানপাট উচ্ছেদ করলেও এসব সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি সংশ্লিষ্টদের।

‎‎‎ডিএনসিসি প্রশাসকের হুঁশিয়ারি

‎ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন কঠোর বার্তা দিয়ে বলেছেন, নগরবাসীর নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে ‘আমার লাশের ওপর দিয়ে হলেও’ ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযান চলবে।

তার এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে রাজধানীর ফুটপাত দখলের বিরুদ্ধে ডিএনসিসির কঠোর অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়েছে।

প্রশাসক বলেন,অবৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা করে যারা নগরবাসীর নির্বিঘ্ন চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করছে, তাদের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত থাকবে। নগরবাসীর সুবিধা নিশ্চিত করা সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্ব। এ দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের বাধা বা হামলা মেনে নেওয়া হবে না।

‎তিনি আরও বলেন, মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরের ফুটওভার ব্রিজের নিচের অংশ থেকে অবৈধ দখল উচ্ছেদের পর সেখানে গাছ লাগিয়ে নাগরিকদের নির্বিঘ্ন চলাচলের জন্য সুন্দর পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ডিএনসিসির অন্যান্য এলাকাতেও একই ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।

‎মিরপুরবাসীর উদ্দেশে শফিকুল ইসলাম খান বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনায় প্রমাণিত হয়েছে, সাধারণ মানুষ ফুটপাত দখলমুক্ত চান। ভবিষ্যতে কারও ইন্ধনে আবার ফুটপাত দখলের চেষ্টা করা হলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

‎উচ্ছেদ ঘিরে ৪ মামলায় আসামি ১ হাজার

‎মিরপুর এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান কেন্দ্র করে সংঘর্ষ-অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও হামলার ঘটনায় মিরপুর মডেল থানা ও পল্লবী থানায় চারটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় মোট এক হাজার অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।

‎এ বিষয়ে মিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাফিজুর রহমান ঢাকা মেইলকে বলেন, সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে গাড়ি পোড়ানোর অভিযোগে একটি, পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে একটি এবং ট্রাফিক পুলিশের পক্ষ থেকে আরেকটি মামলা করা হয়েছে। এসব মামলায় আসামির সংখ্যা ৪০০ থেকে ৫০০ জন। ইতোমধ্যে অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকিদের গ্রেফতারে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

‎অন্যদিকে, কাফরুল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, সিটি করপোরেশনের গাড়ি পোড়ানোর অভিযোগে একটি মামলা করা হয়েছে। এতে ৪০০ থেকে ৫০০ জনকে অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করা হয়েছে। অভিযুক্তদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।

‎একেএস/এফএ