Dhaka Mail Logo

জাতীয়

৮২.২ শতাংশ তরুণ গণমাধ্যমকর্মী তথ্য সাক্ষরতার প্রশিক্ষণ পাননি: গবেষণা

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৪৯ পিএম

দেশে তরুণ গণমাধ্যমকর্মীদের বড় অংশই তথ্য সাক্ষরতাবিষয়ক কোনো প্রশিক্ষণ পাননি বলে এক গবেষণায় উঠে এসেছে।

ইউনেস্কোর আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির গবেষক দলের পরিচালিত তরুণদের গণমাধ্যম ও তথ্য সাক্ষরতা মূল্যায়নের ফলাফলে এমনটাই উঠে এসে।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিশ্ব গণমাধ্যম ও তথ্য সাক্ষরতা সপ্তাহ ২০২৬ উপলক্ষে ঢাকায় আয়োজিত জাতীয় সেমিনার ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে এই ফলাফল তুলে ধরা হয়।

ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির তথ্য অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারপারসন ও মিডিয়া অ্যান্ড ইনফরমেশন লিটারেসি নেটওয়ার্ক বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক ড. দিলারা বেগম অনুষ্ঠানের মূল গবেষণা প্রবন্ধে বলেন, প্রশ্নমালাভিত্তিক এই মূল্যায়নে দেশের আট বিভাগের ১ হাজার ৬০৫ জন তরুণ অংশ নেন। ২০২৬ সালের জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

তিনি বলেন, ‘উত্তরদাতাদের মধ্যে ৮২.২ শতাংশ জানান, তারা গণমাধ্যম ও তথ্য সাক্ষরতাবিষয়ক কোনো প্রশিক্ষণ পাননি। নির্বাচনসংক্রান্ত তথ্যের প্রধান উৎস হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেছেন ৫২.৩ শতাংশ এবং নির্বাচনের সময় ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্যের মুখোমুখি হওয়ার কথা জানিয়েছেন ৬২.২ শতাংশ।

‘মূল্যায়নে গড় এমআইএল (মিডিয়া অ্যান্ড ইনফরমেশন লিটারেসি) সূচক ছিল ১০০-এর মধ্যে ৬৮.৪৯, যা গবেষণার মূল্যায়ন কাঠামোয় মধ্যম পর্যায় হিসেবে চিহ্নিত। তথ্য বোঝা, মূল্যায়ন ও ব্যবহারের তুলনায় তথ্যপ্রাপ্তি এবং তথ্য তৈরির ক্ষেত্রে গড় স্কোর কম ছিল।’

মূল প্রবন্ধে গণমাধ্যম ও তথ্য সাক্ষরতা শিক্ষা ও তরুণদের প্রশিক্ষণ জোরদার, দায়িত্বশীল কনটেন্ট তৈরি, নির্বাচন ও নাগরিক তথ্য সাক্ষরতা, গণগ্রন্থাগারের ভূমিকা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশীদারত্ব বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিষয়ক সাক্ষরতা অন্তর্ভুক্ত করে জাতীয় এমআইএল নীতি প্রণয়ন এবং জাতীয় এমআইএল নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়। প্রতিবেদনের ওপর পরবর্তী কাজ চলমান রয়েছে; আলোচনার জন্য গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়।

ইউনেস্কো ঢাকা এবং মিডিয়া অ্যান্ড ইনফরমেশন লিটারেসি নেটওয়ার্ক বাংলাদেশের সহযোগিতায় ও জাতিসংঘের নির্বাচনবিষয়ক প্রকল্প ‘ব্যালট’ এর সহায়তায় ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির তথ্য অধ্যয়ন বিভাগ এই অনুষ্ঠান আয়োজন করে। অনুষ্ঠানটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্জুর এলাহী অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়।

ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে বিশ্ব গণমাধ্যম ও তথ্য সাক্ষরতা সপ্তাহ ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত জাতীয় সেমিনার ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে অতিথিবৃন্দ।
ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে বিশ্ব গণমাধ্যম ও তথ্য সাক্ষরতা সপ্তাহ ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত জাতীয় সেমিনার ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে অতিথিবৃন্দ। 

প্রতিবছর ২৪ থেকে ৩১ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী গণমাধ্যম ও তথ্য সাক্ষরতা সপ্তাহ পালিত হয়। তথ্য সংগ্রহ, বোঝা ও সমালোচনামূলক মূল্যায়নের পাশাপাশি দায়িত্বশীলভাবে তথ্য ব্যবহার, তৈরি ও আদান-প্রদানের দক্ষতা প্রসার এ সপ্তাহের লক্ষ্য। এ বছরের প্রতিপাদ্য, ‘উই অল প্লে আ পার্ট-মিডিয়া অ্যান্ড ইনফরমেশন লিটারেসি ফর দ্য পিপল’, সুস্থ তথ্যপরিবেশ গড়ে তুলতে শিক্ষক, সাংবাদিক, নীতিনির্ধারক, ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতা, নাগরিক সমাজ ও তরুণদের যৌথ দায়িত্বকে তুলে ধরেছে।

‘নিজের বিশ্বাসের সঙ্গে মিলে যায়- এমন তথ্য নিয়েও প্রশ্ন করতে মানুষকে উৎসাহিত করতে হবে’

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ড. জাহেদ উর রহমান। এতে সভাপতিত্ব করেন ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন ও প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন।

ডা জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘গণমাধ্যম ও তথ্য সাক্ষরতা মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। নিজের বিশ্বাসের সঙ্গে মিলে যায়—এমন তথ্য নিয়েও প্রশ্ন করতে মানুষকে উৎসাহিত করতে হবে।

‘ভুল তথ্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপতথ্য বিশ্বজুড়েই একটি চ্যালেঞ্জ। সেমিনার ও উন্মুক্ত আলোচনার মাধ্যমে সব বয়সের মানুষের মধ্যে এসব মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় সমালোচনামূলক চিন্তার দক্ষতা গড়ে তোলা সম্ভব।’

ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে বিশ্ব গণমাধ্যম ও তথ্য সাক্ষরতা সপ্তাহ ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত জাতীয় সেমিনার ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ড. জাহেদ উর রহমান।।
ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে বিশ্ব গণমাধ্যম ও তথ্য সাক্ষরতা সপ্তাহ ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত জাতীয় সেমিনার ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ড. জাহেদ উর রহমান।।

বাংলাদেশে ইউনেস্কোর প্রতিনিধি ও ঢাকা কার্যালয়ের প্রধান ড. সুসান ভাইজ বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন।

তিনি বলেন, ‘গণমাধ্যম ও তথ্য সাক্ষরতা তরুণদের তথ্য নিয়ে প্রশ্ন করতে, সমালোচনামূলকভাবে ভাবতে এবং নির্বাচনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে জেনেবুঝে সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে। শিক্ষায় এসব দক্ষতা যুক্ত করে এবং আলোচনা ও বিতর্কের সুযোগ বাড়িয়ে আমরা গণতান্ত্রিক জীবনে তাঁদের সচেতন অংশগ্রহণে সহায়তা করতে পারি।’

বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আশিক মোসাদ্দিক এবং ইউএনডিপি বাংলাদেশের জাতিসংঘের নির্বাচনি সহায়তা প্রকল্প ব্যালটের প্রধান কারিগরি উপদেষ্টা আন্দ্রেস দেল কাস্তিয়ো সানচেস।

ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে ২৫ অক্টোবর সচেতনতামূলক র‍্যালি এবং একটি গণমাধ্যম ও তথ্য সাক্ষরতা সচেতনতা বুথ উদ্বোধনের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু হয়। সপ্তাহের কর্মসূচিতে ছিল ২৬ অক্টোবর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে গণমাধ্যম ও তথ্য সাক্ষরতা বিষয়ে বক্তৃতা প্রতিযোগিতা, ২৭–২৮ অক্টোবর ক্যাম্পাসে সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং ২৯ অক্টোবর সেমিনার ও পুরস্কার বিতরণ। ৩০–৩১ অক্টোবর অনলাইনে সচেতনতামূলক কার্যক্রম আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।

এসব কার্যক্রমে তথ্য যাচাই, ভুল ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপতথ্য মোকাবিলা, নৈতিক যোগাযোগ এবং ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দায়িত্বশীল ব্যবহার নিয়ে আলোচনা ও সম্পৃক্ততার সুযোগ তৈরি হয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, ক্যাম্পাসভিত্তিক সংগঠন ও যুব নেটওয়ার্ককে নিয়ে অংশীদারদের বৃহত্তর কার্যক্রম।

সপ্তাহের আয়োজনের বাইরেও এসব কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে- সিটিজেনশিপ অলিম্পিয়াড, এমআইএল অ্যাম্বাসেডর উদ্যোগ, তরুণদের নেতৃত্বে সোশ্যাল অ্যাকশন প্রজেক্ট (এসএপি), বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবগুলোর ভিডিও নির্মাণ কার্যক্রম, টিচার্স ফেলোশিপ এবং ক্যাম্পাস কানেক্টেড।

সিটিজেনশিপ অলিম্পিয়াড ২০২৬-এ বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১,৭৪৬ অংশগ্রহণকারী অংশ নেন। ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির তথ্য অধ্যয়ন বিভাগ ও মিডিয়া অ্যান্ড ইনফরমেশন লিটারেসি নেটওয়ার্ক বাংলাদেশের নেতৃত্বে এবং ব্যালটের আওতায় ইউনেস্কোর কারিগরি সহায়তায় এ অলিম্পিয়াড আয়োজন করা হয়।

বাস্তব জীবনের পরিস্থিতিভিত্তিক প্রশ্নের মাধ্যমে গণমাধ্যম ও তথ্য সাক্ষরতার প্রয়োগ, সমালোচনামূলক চিন্তা, নৈতিক বিচারবোধ এবং ডিজিটাল ও নাগরিক জীবনে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা জোরদারে তরুণদের চিন্তাশক্তি বিকশিত করতে এটি আয়োজন করা হয়।

এমআইএল অ্যাম্বাসেডর উদ্যোগে প্রায় ২৫ জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সহপাঠীদের সম্পৃক্ত করা, অলিম্পিয়াডের শিক্ষণ উপকরণের প্রচারণা চালনা এবং দায়িত্বশীল তথ্য ব্যবহার প্রসারে কাজ করেন। শিক্ষার্থীদের এসএপি উদ্যোগগুলোয় ফেসবুকে তথ্যবিশৃঙ্খলা, গণমাধ্যমের সঙ্গে দায়িত্বশীল সম্পৃক্ততা এবং মা ও গৃহিণীদের গণমাধ্যম ও তথ্য সাক্ষরতার মতো বিষয় উঠে আসে। অংশগ্রহণকারী ক্লাবগুলো গণমাধ্যম ও তথ্য সাক্ষরতা, সমালোচনামূলক চিন্তা ও দায়িত্বশীল নাগরিকত্বের বার্তা নিয়ে ভিডিও তৈরি করে।

গণমাধ্যম ও তথ্য সাক্ষরতা শিক্ষা, শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন উদ্যোগে পরামর্শদান এবং ক্যাম্পাসভিত্তিক সম্পৃক্ততা জোরদারে ২৪ জন শিক্ষককে ফেলোশিপ দেওয়া হয়। ক্যাম্পাস কানেক্টেড উদ্যোগের মাধ্যমে ১৩টি বিশ্ববিদ্যালয়কে যুক্ত করে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সহযোগিতা ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ তৈরি করা হয়।

অনুষ্ঠানে সিটিজেনশিপ অলিম্পিয়াডের ১০ জন বিজয়ী, পাঁচজন এমআইএল অ্যাম্বাসেডর, ভিডিও নির্মাণে অবদানের জন্য পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাব এবং তিনটি এসএপি দলকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

এসএপি পুরস্কার পায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ফেসবুকে তথ্যবিশৃঙ্খলা (ইনফরমেশন ডিসঅর্ডার অন ফেসবুক)’, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির ‘গণমাধ্যমের প্রভাব ও দায়িত্বশীল সম্পৃক্ততা (মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্স অ্যান্ড রেসপনসিবল এনগেজমেন্ট)’ এবং খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মা ও গৃহিণীদের মধ্যে গণমাধ্যম ও তথ্য সাক্ষরতা (মিডিয়া অ্যান্ড ইনফরমেশন লিটারেসি) প্রকল্প।

সপ্তাহব্যাপী এ আয়োজন ও বৃহত্তর কর্মসূচির মাধ্যমে অংশীদারেরা জনসচেতনতার সঙ্গে গণমাধ্যম ও তথ্য সাক্ষরতার দক্ষতা শেখা ও প্রয়োগের সুযোগ যুক্ত করছে। শিক্ষক, গবেষক, গ্রন্থাগারিক, গণমাধ্যমকর্মীসহ বিভিন্ন অংশীজনের সহযোগিতার মাধ্যমে মিডিয়া অ্যান্ড ইনফরমেশন লিটারেসি নেটওয়ার্ক বাংলাদেশের বার্ষিক আয়োজনের বাইরেও এ সম্পৃক্ততা অব্যাহত রাখতে কাজ করছে।

এএম