Dhaka Mail Logo

জাতীয়

জাপান-বাংলাদেশ শীর্ষ বৈঠক: জ্বালানি, প্রযুক্তি ও মেগা অবকাঠামোয় জোর

বোরহান উদ্দিন

২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৩২ পিএম

* টেক পার্ক স্থাপন, হাই-স্পিড রেলে বিনিয়োগের আহ্বান
​*এলএনজি, বিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে সহযোগিতার তাগিদ
* দ্রুত ইপিএ কার্যকর এবং মন্ত্রী পর্যায়ের যৌথ কমিশনের প্রস্তাব
* দ্রুত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল গঠনে অঙ্গীকার

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির মধ্যে দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে বাংলাদেশ ও জাপানের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও জোরদার, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তি ও মহাকাশ গবেষণা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) স্থানীয় সময় বেলা সাড়ে ১১টায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান টোকিওতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বৈঠক শেষে যৌথ বিবৃতিতে এসব জানানো হয়েছে।

বৈঠকে জ্বালানি, অবকাঠামো ও আইসিটি খাতে ১ ট্রিলিয়ন জাপানি ইয়েন (৬.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) বেসরকারি বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা হয়৷ এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দ্রুত বাংলাদেশে জাপানি টিম পাঠানোর বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পায়৷

​বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও শিল্পায়নের লক্ষ্য অর্জনে জাপান সরকার ও দেশটির বেসরকারি খাতকে আরও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানান।

2

​তিনি বলেন, বাংলাদেশকে একটি অর্থনৈতিক, প্রযুক্তি ও উৎপাদনশিল্পের কেন্দ্রে পরিণত করার পরিকল্পনা নিয়ে সরকার কাজ করছে। ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের নবম বৃহত্তম ভোক্তা অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

​প্রধানমন্ত্রী স্মরণ করেন, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর জাপান প্রথমদিকের স্বীকৃতিদানকারী দেশগুলোর একটি। তিনি তার পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দুই বার জাপান সফর এবং তার মাতা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ক জোরদারে অবদানের কথা উল্লেখ করে দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

জ্বালানি নিরাপত্তা ও সহযোগিতা 

দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা অপরিহার্য উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী জাপানের সাম্প্রতিক ৫০ বিলিয়ন জাপানি ইয়েনের জরুরি সহায়তা ঋণের জন্য কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি বাংলাদেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) অবকাঠামো, দক্ষ বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান।

3

প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মহাকাশ গবেষণা

প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী 'বাংলাদেশ-জাপান টেক পার্ক' প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন। প্রস্তাবিত টেক পার্কে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিকস এবং ইলেকট্রনিকস উৎপাদনের মতো খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানান তিনি। পাশাপাশি মহাকাশবিজ্ঞান, স্যাটেলাইট প্রকৌশল ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিতে জাপানের অগ্রসর সক্ষমতার সঙ্গে সহযোগিতা সম্প্রসারণের আগ্রহ প্রকাশ করেন।

অবকাঠামো, দ্রুতগতির রেল ও যোগাযোগব্যবস্থা

দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে দেশের ছয়টি প্রধান বিভাগীয় শহরকে যুক্ত করে দ্রুতগতির (হাই-স্পিড) রেল নেটওয়ার্ক এবং দেশব্যাপী উড়াল সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। এ ধরনের বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পের পরিকল্পনা প্রণয়ন, কারিগরি সহায়তা, বিনিয়োগ ও অর্থায়নে জাপানের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার সুফল পেতে সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

বাণিজ্য ও বিনিয়োগে সম্প্রসারণ

বাংলাদেশে জাপানি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নতুন বিনিয়োগকে স্বাগত জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, করনীতি, শুল্ক ছাড়করণ এবং অর্থ স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে তার সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। একই সঙ্গে 'বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি' (EPA) দ্রুত কার্যকর করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।

জাতিসংঘ, ইন্দো-প্যাসিফিক ও রোহিঙ্গা সংকট

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের নির্বাচনে জাপানের সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী।

4

​এ ছাড়া একটি অবাধ, উন্মুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান মিয়ানমারেই নিহিত উল্লেখ করে রোহিঙ্গাদের নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে দ্রুত নিজ দেশে প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে জাপানের সক্রিয় ভূমিকা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।

যৌথ কমিশন গঠনের প্রস্তাব

দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার অগ্রাধিকার খাতগুলো চিহ্নিত করা ও নেওয়া উদ্যোগগুলো দ্রুত বাস্তবায়নে মন্ত্রী পর্যায়ের একটি 'যৌথ কমিশন' প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে দুই দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

​বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচিকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান।

এদিকে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার নির্ধারিত শীর্ষ বৈঠক শেষ হয়েছে। বৈঠক শেষে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী যৌথ বিবৃতিতে অংশ নেন। এরপর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সৌজন্যে আয়োজিত অফিসিয়াল ভোজে অংশ নেন দুই প্রধানমন্ত্রী।

বিইউ/এআরএম