Dhaka Mail Logo

জাতীয়

জুলাই সনদ ও গণভোট নিয়ে বিরোধ, উত্তপ্ত হতে পারে সংসদ

মো. মেহেদী হাসান হাসিব

২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১১:১০ পিএম

  • আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
  • জুলাই সনদ ও গণভোট নিয়ে বিরোধ
  • উন্নয়ন বরাদ্দে বৈষম্যের অভিযোগ
  • সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে মতবিরোধ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের চতুর্থ অধিবেশন শুরু হচ্ছে আগামী ৯ নভেম্বর। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন, সংবিধান সংস্কার ও গণভোটের রায় কার্যকর করা নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মতপার্থক্য বাড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উন্নয়ন বরাদ্দে বৈষম্যের অভিযোগ এবং আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতা নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য। এসব ইস্যুতে আসন্ন অধিবেশনে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তপ্ত বিতর্ক হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের মতপার্থক্য গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ারই অংশ।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম তিনটি অধিবেশনে মোট ৬১টি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব বৈঠকে বিভিন্ন সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা ওয়াকআউট করেছেন, কখনো সরকারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতাও করেছেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুই পক্ষের দূরত্ব বেড়েছে। এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে রাজনৈতিক বক্তব্য ও কর্মসূচিতেও।

গত ১৪ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আগামী ৯ নভেম্বর বেলা সাড়ে তিনটায় সংসদের চতুর্থ অধিবেশন আহ্বান করেছেন। অধিবেশন শুরুর সময় ঘনিয়ে এলেও সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সমঝোতার কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সরকার ও বিরোধী দলের মতপার্থক্যের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের রাজনৈতিক সমঝোতার অভিযোগ।

গত ২০ অক্টোবর রাজশাহীর এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অভিযোগ করেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ও বিরোধী পক্ষের একটি অংশ দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তিনি বলেন, ‘একটি পক্ষ সীমান্তের ওপার থেকে অর্থ দিচ্ছে, আর অন্য পক্ষ এখানে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে।’

আরও পড়ুন: ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাবনা নেই: নাহিদ ইসলাম

এর আগে ১ অক্টোবর ফেনীর ফুলগাজীতে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ ও জামায়াত আবার এক হয়ে অতীতের মতো গোপনে রাজনৈতিক সমঝোতা করছে।

এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। গত ২৫ অক্টোবর জাতীয় প্রেসক্লাবে জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে এক আলোচনা সভায় তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সঙ্গে জামায়াতের সম্পর্ক নিয়ে বিএনপি মিথ্যাচার করছে। বিএনপি নির্বাচনের সময় ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে আওয়ামী লীগের কাছে ভোট চেয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

জুলাই সনদ, সংবিধান সংস্কার ও গণভোট নিয়ে বিরোধ

সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মতপার্থক্যের অন্যতম প্রধান কারণ জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন, সংবিধান সংস্কার এবং গণভোটের রায় কার্যকর করা। বিরোধী জোটের অভিযোগ, নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের পর বিএনপি সংস্কারের মূল প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসেছে।

এ বিষয়ে ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, বিএনপি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়নি; বরং দেশে-বিদেশে ‘না’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালিয়েছে। তিনি বলেন, ‘বিএনপি জনগণের সঙ্গে ধাপ্পাবাজি করেছে। বিরোধী দল ৭০ ভাগ মানুষের দেওয়া ভোটের সঙ্গে ধাপ্পাবাজি করবে না।’

অন্যদিকে বিএনপি বলে আসছে, জুলাই জাতীয় সনদে যেসব বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট বা ভিন্নমত রয়েছে, সেগুলো বাদে বাকি প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা হবে।

আরও পড়ুন: প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন, উপনির্বাচনে সেনা মোতায়েন চায় জামায়াত

গত শনিবার (২৪ আগস্ট) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির নবম বৈঠক শেষে কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, প্রতিটি বৈঠকেই বিরোধী দলকে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। তাদের মতামত ও প্রস্তাব পাওয়া গেলে তা বিবেচনা করা হবে।

অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা বা পরামর্শের ভিত্তিতে জুলাই সনদে বিএনপির নোট অব ডিসেন্টের বিষয়ে ছাড় দেওয়া হবে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ মুহূর্তে এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। বিরোধী দল চাইলে কোন কোন বিষয়ে ভিন্নমত পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে, তা কমিটির কাছে তুলে ধরতে পারে।

গণভোটের রায় প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জনগণের ম্যান্ডেটকে তারা সম্মান করেন। তবে গণভোটসংক্রান্ত অধ্যাদেশটি আইনে পরিণত করা বাধ্যতামূলক ছিল না বলে তারা মনে করেন। ভবিষ্যতে সংবিধান সংশোধনের পর সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী গণভোটের প্রয়োজন হলে বিদ্যমান আইন অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।

উন্নয়ন বরাদ্দে বৈষম্যের অভিযোগ

জুলাই জাতীয় সনদ ও সংবিধান সংস্কারের পাশাপাশি উন্নয়ন বরাদ্দে বৈষম্যের অভিযোগও সংসদে দুই পক্ষের বিরোধের কারণ হতে পারে। জামায়াতে ইসলামীর অভিযোগ, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে বিএনপির সংসদ সদস্যরা বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ পেলেও বিরোধী দলের সদস্যদের ক্ষেত্রে বৈষম্য করা হচ্ছে।

দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে বিএনপির সংসদ সদস্যরা কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ পাচ্ছেন। এ নিয়ে বিরোধী দল কথা বললে অন্য খাত থেকে সামান্য বরাদ্দ দেওয়া হয়।

এ ছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইন সংশোধন, স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন, বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা এবং সরকারি কেনাকাটায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়েও সরকারের কাছে জবাবদিহি চাইতে পারে বিরোধী দল।

অন্যদিকে সরকারের অবস্থান হলো, সংবিধান সংশোধনের কাজ প্রচলিত সংসদীয় বিধি ও সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই করতে হবে। সংবিধানে পৃথক ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর কোনো বিধান নেই বলে মনে করে সরকার।

এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, তারা সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিশেষ কমিটি হিসেবে কাজ করছেন। বাংলাদেশের সংবিধানে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ নামে কোনো পরিষদের বিধান নেই। সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর তারা শপথ নিয়েছেন।

আরও পড়ুন: জাপানি কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে বিনিয়োগে অত্যন্ত আগ্রহী: প্রধানমন্ত্রী

সরকার ও বিরোধী দলের এসব পাল্টাপাল্টি অবস্থানের মধ্যে আগামী ৯ নভেম্বর শুরু হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের চতুর্থ অধিবেশন। জুলাই জাতীয় সনদ, সংবিধান সংস্কার ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের পাশাপাশি উন্নয়ন বরাদ্দে বৈষম্যের অভিযোগ নিয়ে অধিবেশনে দুই পক্ষের মধ্যে বিতর্ক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা প্রসঙ্গে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি গণমাধ্যমকে বলেন, তারা সব সময় গঠনমূলক সমালোচনাকে স্বাগত জানান। যেকোনো বিষয়ে সংসদে কথা বলার পূর্ণ সুযোগ পাবে বিরোধী দল।

সংসদে উত্তাপের শঙ্কা দেখছেন না অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান

রাজপথে রাজনৈতিক উত্তাপ নেই, আগামী সংসদ অধিবেশনেও উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরির আশঙ্কা দেখছেন না রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান। তার মতে, সরকার ও বিরোধী দলের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা গণতন্ত্রের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।

আসন্ন সংসদ অধিবেশনে রাজপথের রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রতিফলন দেখা যাবে কি না, জানতে চাইলে তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘রাজপথেও সেভাবে কোনো উত্তাপ তৈরি হয়নি, সংসদেও হবে না। এটা স্বাভাবিক গণতন্ত্রের প্রক্রিয়া। দলগুলো প্রতিযোগিতা করে। সে প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে তারা নানা দিক থেকে কথা বলছে। এটা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা। এটা স্বাভাবিক বিষয়, গণতান্ত্রিক স্বাভাবিক বিষয়।’

সরকারের পাশাপাশি বিরোধী দলগুলোরও রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তনে ভূমিকা রাখা উচিত বলে মনে করেন তিনি। মাহবুবুর রহমান বলেন, সরকার একাই রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তন করবে, এমনটা দলগুলোর মনে করা উচিত নয়। বরং সরকারকে সহযোগিতা করা দরকার।

তিনি আরও বলেন, সরকার নিজের কাজে মনোযোগ দিচ্ছে। বিরোধী দলের কর্মসূচি পালনে বাধা দেওয়া হচ্ছে না এবং এসব কর্মসূচি নিয়ে সরকারের তেমন মাথাব্যথাও নেই। তার মতে, সরকার কীভাবে সফল হতে পারে, সেই চেষ্টা করছে।

এমএইচএইচ/এআর