নিজস্ব প্রতিবেদক
২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০৬ পিএম
টঙ্গীর একটি মাদরাসায় কন্যাশিশুকে চুমু দেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে শিক্ষককে মারধর ও ভাঙচুরের ঘটনার পর নিরাপত্তাহীনতার কথা জানিয়ে গাজীপুরের বাসা ছেড়েছেন শাহজালাল রুমি। স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে তিনি অন্যত্র অবস্থান করছেন। একদিকে হত্যার হুমকি পাওয়ার অভিযোগ, অন্যদিকে মাদরাসায় হামলা, শিক্ষককে মারধর ও ভাঙচুরের অভিযোগে মামলা—সব মিলিয়ে ঘটনাটি ঘিরে তৈরি হয়েছে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও আইনি জটিলতা।
রোববার (২৫ অক্টোবর) টঙ্গীতে রুমির বাসায় তালা ঝুলতে দেখা যায়। ভবনটির কেয়ারটেকার হাবিবুর রহমানের ভাষ্য, গত দুই থেকে তিন দিন ধরে রুমির পরিবারের সদস্যরা বাসায় থাকছেন না। মাদরাসার ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মুঠোফোন নম্বর থেকে হত্যার হুমকি পাওয়ার অভিযোগ করেছেন রুমি। পরিবারের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বাসা ছেড়েছেন তিনি।
রুমি পেশায় একজন ফেব্রিক ব্যবসায়ী। পাশাপাশি বডি বিল্ডিংয়ের সঙ্গেও যুক্ত তিনি। বাবার ফ্ল্যাটে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে বসবাস করতেন। তার মেয়ের বয়স আট বছর এবং ছেলের চার বছর। মেয়েকে মাদরাসায় ভর্তি করানোর পর সেখানে ঘটে যাওয়া অভিযোগের বিচার চাইতে গিয়ে পরিস্থিতি সংঘাতের দিকে গড়ায়।
বিচার চাইতে গিয়ে নিজেই মারধরে জড়ালেন রুমি
মাদরাসায় শিশুটির সঙ্গে কী ঘটেছিল, তা তদন্তের বিষয়। তবে অভিযোগের বিচার চাওয়ার পাশাপাশি শিক্ষককে শারীরিকভাবে আঘাত করার ঘটনাও সামনে এসেছে। প্রকাশিত ভিডিওতে শিক্ষককে চড় মারতে দেখা গেছে রুমিকে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই শিক্ষককে মারধরের ঘটনায় অন্যরাও অংশ নেন।
মাদরাসা কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, রুমি কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিষ্ঠানে গিয়ে শিক্ষক ও অন্যদের মারধর করেন এবং ভাঙচুর চালান। এ ঘটনায় অর্থ ও মুঠোফোন লুটের অভিযোগও আনা হয়েছে। এসব অভিযোগে রুমিসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ।
অন্যদিকে, রুমি শিক্ষককে মারধরের ঘটনা স্বীকার করলেও অর্থ লুটের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, মেয়ের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিচার চাইতে তিনি মাদরাসায় গিয়েছিলেন। নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সিসিটিভি ফুটেজ যাচাইয়েরও দাবি জানিয়েছেন তিনি।
স্থানীয়রা বলছেন, সন্তানের প্রতি অন্যায় হয়ে থাকলেও কাউকে মারধর করা বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার বৈধতা তৈরি হয় না। অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং অপরাধের বিচার করার দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আদালতের। ফলে শিশুটির ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের পাশাপাশি মাদরাসায় মারধর ও ভাঙচুরের অভিযোগও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি।
হুমকির অভিযোগ, উদ্বিগ্ন পরিবার
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর রুমি একাধিকবার ফেসবুক লাইভে এসে নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিভিন্ন ব্যক্তি তাকে হত্যার হুমকি দিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি। স্ত্রী, দুই সন্তান এবং শ্বশুর-শাশুড়ির নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বাসা ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন রুমি।
ভবনটির কেয়ারটেকার হাবিবুর রহমানের ভাষ্য, রুমির পরিবারের সদস্যরা কয়েক দিন ধরে বাসায় ফিরছেন না। মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বিগ্ন রুমি। তবে বর্তমানে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তিনি কোথায় অবস্থান করছেন, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
রুমির বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত এবং তার পরিবারের নিরাপত্তা—দুটি বিষয়ই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিচার যেমন আইন অনুযায়ী হওয়া প্রয়োজন, তেমনি তাকে বা তার পরিবারের সদস্যদের হুমকি দেওয়া হয়ে থাকলে সেটিও তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
একই ঘটনায় দুই মামলা, তদন্ত করছে পুলিশ
মাদরাসার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুটি পৃথক মামলা হয়েছে। শিশুটির বাবা রুমির করা মামলায় মাদরাসার শিক্ষক মোসলেম আহম্মদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। অন্যদিকে, মাদরাসা কর্তৃপক্ষের করা মামলায় রুমিসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে হামলা, মারধর, ভাঙচুর ও অর্থ লুটের অভিযোগ আনা হয়েছে।
রুমি তার মেয়ের ঘটনার বিচার চেয়েছেন এবং নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগেরও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন। দুই পক্ষের অভিযোগের সত্যতা এখনো তদন্তসাপেক্ষ।
টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফ হোসেন জানিয়েছেন, দুটি মামলাই তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তের ভিত্তিতে আইনি প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে।
এআর