নিজস্ব প্রতিবেদক
২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৪১ পিএম
দেশের ৪০ শতাংশ কৃষক ক্যান্সারে আক্রান্ত বলে দাবি করেছেন কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। তাঁর ভাষ্য, কৃষকদের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার প্রধান কারণ কীটনাশক। দেশে আমদানি করা কীটনাশক শুল্ক বিভাগ থেকে ছাড়ের আগে পরীক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রোববার (২৫ অক্টোবর) রাজধানীর ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের মিলনায়তনে বাংলাদেশ সোসাইটি ফর সেফ ফুড আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন কৃষিমন্ত্রী।
আমিন উর রশিদ বলেন, আগে মানুষ বলত, কৃষকেরা রোগে আক্রান্ত হন না। কারণ, তাঁরা কঠোর পরিশ্রম করেন। কিন্তু এখন কৃষকেরা সবচেয়ে কঠিন রোগ ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তে ৪০ শতাংশ কৃষকের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায় বলে উল্লেখ করেন তিনি।
কীটনাশক আমদানির বিষয়ে কৃষিমন্ত্রী বলেন, শুল্ক বিভাগ থেকে ছাড় পাওয়ার আগে কীটনাশক পরীক্ষা করার কোনো নিয়ম বা ব্যবস্থা এখন পর্যন্ত নেই। কীটনাশক আমদানির অনুমতি দেওয়া হয় মূলত নির্দিষ্ট পোকামাকড়ের ওপর প্রয়োগ করে সেটি কার্যকর কি না, তা যাচাইয়ের ভিত্তিতে। কিন্তু ফসলে ওই কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ মানুষের জন্য কতটা ক্ষতিকর, তা যাচাইয়ের বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না।
নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে কীটনাশকের যথাযথ নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, দেশে এমন অনেক কীটনাশক আমদানি ও বাজারজাত করা হচ্ছে, যেগুলো বিশ্বের বহু দেশে ব্যবহার করা হয় না। কীটনাশক আমদানি ও ব্যবহারের বিদ্যমান নীতিমালা পর্যালোচনা করে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হবে।
তিনি বলেন, খাদ্যের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি উৎপাদিত খাদ্য নিরাপদ, পুষ্টিকর ও মানসম্মত করাও গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে বিপণন পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে।
কীটনাশকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ
কৃষকদের স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়ে আমিন উর রশিদ বলেন, কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার কৃষক ও ভোক্তা উভয়ের জন্যই উদ্বেগের কারণ। খাদ্যে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ থেকে গেলে তা জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এ কারণে কীটনাশক আমদানি ও ব্যবহারের নীতিমালা পর্যালোচনায় সরকার একাধিক কমিটি গঠন করেছে।
সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানী, বিশেষজ্ঞ, আমদানিকারক ও অন্যান্য অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে এ বিষয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
কৃষকদের প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, প্রয়োজনীয় কারিগরি জ্ঞান ও প্রশিক্ষণের অভাবে অনেক কৃষক কীটনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহারে সঠিক মাত্রা অনুসরণ করতে পারেন না। কৃষকদের সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ এবং নিরাপদ উৎপাদন পদ্ধতির সম্প্রসারণে সরকার কাজ করছে। একই সঙ্গে কৃষিকে লাভজনক পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে কৃষি উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ফসল উৎপাদনে রাসায়নিক সারের অতিরিক্ত ব্যবহার মাটির স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। জমির প্রয়োজন অনুযায়ী সুষম সার ব্যবহার এবং উত্তম কৃষিচর্চা অনুসরণ করতে হবে। কীটনাশক ও কৃষি উপকরণ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে মানসম্মত পণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি প্রযোজ্য বিধিবিধান ও মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে।
পোলট্রি খাতেও নজরদারির তাগিদ
পোলট্রি খাতের প্রসঙ্গ তুলে কৃষিমন্ত্রী বলেন, মুরগির খাদ্যে অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়েও কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে।
কৃষিপণ্য রপ্তানি প্রসঙ্গে আমিন উর রশিদ বলেন, বাংলাদেশের কৃষিপণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে সম্প্রসারণের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। তবে রপ্তানিতে সাফল্য অর্জন করতে হলে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাশাপাশি বিদেশি ভোক্তাদের কাছেও পণ্য পৌঁছাতে হবে। এ লক্ষ্যে কাঁঠাল, আনারসসহ সম্ভাবনাময় কৃষিপণ্যের মান উন্নয়ন ও রপ্তানি সম্প্রসারণে কাজ চলছে।
নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয় উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, কৃষক, উদ্যোক্তা, বিজ্ঞানী, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও ভোক্তাসহ সবাইকে এ ক্ষেত্রে সচেতন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
বাংলাদেশ সোসাইটি ফর সেফ ফুডের সেমিনার আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক ড. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ম. তামিম, জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আমির হোসেন, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম, মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. খালেদ কনক এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইংয়ের পরিচালক ড. মোহাম্মদ এনায়েত-ই-রাব্বি উপস্থিত ছিলেন।
এএইচ/এআর