Dhaka Mail Logo

জাতীয়

গাজীপুরের যানজট নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনার দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক

২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৫৬ পিএম

গাজীপুরে যানজট নিরসন, পরিবেশ রক্ষা ও পরিকল্পিত নগরায়ণ নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন জেলার সংসদ সদস্যরাসহ বিশিষ্টজনেরা। 

একইসঙ্গে বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বচ্ছ মূল্যায়ন, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও মেট্রোরেল গাজীপুর পর্যন্ত সম্প্রসারণ এবং সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন তারা।

শনিবার (২৪ অক্টোবর) সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে ঢাকাস্থ গাজীপুর সাংবাদিক ফোরাম আয়োজিত ‘দৃশ্যমান সমস্যা অবারিত সম্ভাবনার গাজীপুর’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এসব আহ্বান জানান বক্তারা। 

ফোরামের সভাপতি ফয়সাল আলমের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক রাশেদুল হকের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন গাজীপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য এ কে এম ফজলুল হক মিলন, গাজীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য এস এম রফিকুল ইসলাম বাচ্চু, গাজীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মজিবুর রহমান, গাজীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য সালাহ উদ্দিন আইয়ুবী, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানা নিশিতা, জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া এবং জিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ তাহেরুল হক চৌহান প্রমুখ।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক ফয়সাল খান। প্রবন্ধে শিল্পবর্জ্য ও অপরিকল্পিত কলকারখানার কারণে গাজীপুরে পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়। কারখানার শৃঙ্খলার পাশাপাশি সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলে গাজীপুরের পরিবেশ রক্ষা করার কথা বলা হয়। 

তাছাড়া যানজট, মাদক, কিশোর গ্যাং, সড়কে বর্জ্য ফেলা, ছিনতাই, জলাবদ্ধতা, অপরিকল্পিত শিল্পায়ন, রেলস্টেশনের অকার্যকারিতা, বনভূমি দখল ও কৃষিজমি ভরাটসহ গাজীপুরের বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরা হয়।

মূল প্রবন্ধে বিআরটি প্রকল্পের জন্য নির্মিত বিভিন্ন স্থাপনায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, সামান্য বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা এবং শ্রীপুরের শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের আবাসন ও নিরাপদ যাতায়াতের সংকটের কথা তুলে ধরা হয়। শ্রীপুরের সাতখামাইর ও ইজ্জতপুর রেলস্টেশন কার্যকর করা এবং প্রয়োজনীয় ট্রেনের যাত্রাবিরতি নিশ্চিত করার সুপারিশও করা হয়।

প্রবন্ধে কালিয়াকৈরে বনভূমি দখল এবং কালীগঞ্জে আবাসন প্রকল্পের নামে কৃষিজমি, খাল-বিল ও অন্যান্য জলাভূমি ভরাটের বিষয়েও উদ্বেগ জানানো হয়।

S

বিআরটি নিয়ে স্বচ্ছ মূল্যায়নের সুপারিশ

মূল প্রবন্ধে বিআরটি প্রকল্প বাতিল ও নির্মিত অবকাঠামো ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে স্বচ্ছ মূল্যায়নের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। গাজীপুরবাসীর দীর্ঘ ১৪ বছরের দুর্ভোগ এবং ১৮ জেলার মানুষের যাতায়াতের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত, সাশ্রয়ী ও কার্যকর পরিবহনব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বিআরটি চালুর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্তের কারণ ও এর পেছনের যুক্তি জনসমক্ষে স্পষ্ট করা, অনিয়ম-দুর্নীতি বা পরিকল্পনাগত ত্রুটি থাকলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের চিহ্নিত করা এবং তদন্তের ফল প্রকাশের সুপারিশ করা হয়। বিআরটি বাস্তবায়িত না হওয়ায় গাজীপুর থেকে সহজ যাতায়াতব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানানো হয়। এজন্য ঢাকা থেকে গাজীপুর পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং মেট্রোরেল সম্প্রসারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়।

বৈঠকে গাজীপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য এ কে এম ফজলুল হক মিলন বলেন, ‘বাংলাদেশের এমন কোনো অঞ্চলের মানুষ নেই, যারা গাজীপুরে বসবাস করেন না। জনবহুল এই জেলার উন্নয়নে জনসংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে মহাপরিকল্পনা করা প্রয়োজন।’

তিনি বলেন, ‘বিআরটি প্রকল্প কীভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, তা নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন ছিল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিআরটি থাকলেও গাজীপুরের মতো জনবহুল এলাকায় পরিকল্পনা প্রণয়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।’
এই সংসদ সদস্য মনে করেন, ‘পুলিশ শুরু থেকে সক্রিয় ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করলে মাদকের আগ্রাসন কমানো সম্ভব।’

গাজীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য এস এম রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘গাজীপুরের বর্তমান অবস্থা খুবই বিপন্ন। পরিবেশ রক্ষা করে এখানে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। সারাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ এই জেলায় বসবাস করেন। তাই আগামী ১০০ বছরের কথা বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। অন্যথায় একসময় এলাকাটি বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়তে পারে।’

গাজীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মজিবুর রহমান বলেন, ‘যানজট নিরসনের জন্য বিআরটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এতে সমস্যার সমাধান হয়েছে কি না, তা বিবেচনা করা দরকার।’

তার মতে, উত্তরা থেকে একটি ফ্লাইওভারের মাধ্যমে কালীগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও জয়দেবপুরমুখী সংযোগ করা হলে যান চলাচলে সুবিধা হতে পারত। সড়কের মাঝখানে ডিভাইডার দিয়ে চলাচলের জায়গা সংকুচিত করা হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ক্যামেরা ব্যবহারের দাবি জানান মজিবুর রহমান। পাশাপাশি মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশ ও প্রশাসনের পাশাপাশি অভিভাবকদেরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

গাজীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য সালাহ উদ্দিন আইয়ুবী বলেন, ‘বিআরটি প্রকল্পের পরিবর্তে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন।’

গাজীপুরের জয়দেবপুরে একটি পার্ক নির্মাণেরও প্রস্তাব দেন তিনি। মাদক নির্মূলে পুলিশের সংস্কার জরুরি উল্লেখ করে তিনি গাজীপুরে বাসভাড়া কমানো এবং এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে গাজীপুর পর্যন্ত সম্প্রসারণের দাবি জানান। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে কাপাসিয়া পৌরসভা গঠনের কথাও বলেন তিনি।

এসময় আরও বক্তব্য দেন ঢাকাস্থ গাজীপুর সাংবাদিক ফোরামের সিনিয়র সহসভাপতি আতাউর রহমান, দফতর সম্পাদক এস এম নূর মোহাম্মদ, যোগাযোগ বিষয়ক সম্পাদক সাব্বির আহমেদ, জ্যেষ্ঠ সদস্য মঞ্জুর বারী ও কার্যনির্বাহী সদস্য সাইফুল ইসলাম শুভ।

এএইচ