Dhaka Mail Logo

জাতীয়

‘সংবিধান সংশোধনে বিরোধী দলের প্রস্তাব পেলে বিবেচনা করা হবে’

নিজস্ব প্রতিবেদক

২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৩৫ পিএম

কমিটির পক্ষ থেকে প্রতিটি বৈঠকেই বিরোধী দলকে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে উল্লেখ করে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘বিরোধী দলের মতামত ও প্রস্তাব পাওয়া গেলে তা বিবেচনা করা হবে।’

শনিবার (২৪ অক্টোবর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির নবম বৈঠক শেষে জাতীয় সংসদের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি। 

কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে  সঙ্গে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

তিনি বলেন, ‘আজকের বৈঠকে সংবিধান বিশেষজ্ঞ, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইনের অধ্যাপক ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। আমন্ত্রিত প্রায় ৬০ জনের মধ্যে ৪৪ জন উপস্থিত ছিলেন। সকাল ১১টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত চলা বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা মৌখিক ও লিখিতভাবে তাঁদের মতামত তুলে ধরেছেন। যারা লিখিত বক্তব্য দিতে পারেননি, তাঁদের আগামী সাত থেকে ১০ দিনের মধ্যে তা জমা দিতে অনুরোধ করা হয়েছে।’

S

আলোচনার বিষয়বস্তু তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘সংবিধানের মৌলিক কাঠামো তত্ত্ব, সরকারি ও আইন প্রণয়নসংক্রান্ত কার্যক্রমের ওপর বিচার বিভাগের পর্যালোচনার ক্ষমতা এবং সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের এখতিয়ার নিয়ে বিশেষজ্ঞরা মতামত দিয়েছেন। পাশাপাশি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কার্যকর করা, সুপ্রিম কোর্টের পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা এবং বিচারক নিয়োগসংক্রান্ত বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।’

সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার অধিকার প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদে আলোচিত প্রস্তাব অনুযায়ী চারটি বিষয় ছাড়া অন্য সব বিষয়ে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ ও ভোট দেওয়ার সুযোগ রাখার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বিষয়গুলো হলো সংবিধান সংশোধন, অর্থবিল, সরকারের প্রতি অনাস্থা বা আস্থার প্রশ্ন এবং যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি বা জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয়। এসব ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যরা দলীয় অবস্থানের বাইরে গিয়ে ভোট দিতে পারবেন না- এমন প্রস্তাব আলোচনায় এসেছে। তবে এ বিষয়ে কমিটি এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি।’

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগপ্রক্রিয়া এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সম্পর্কে কমিটির সভাপতি বলেন, ‘সরকার গঠনের প্রক্রিয়া, কাঠামো ও কর্মপরিধি নিয়ে বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত প্রস্তাব পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্টদের লিখিত মতামত দিতে অনুরোধ করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘একটি প্রস্তাবে বলা হয়েছে, সংসদে উচ্চকক্ষ গঠিত হলে সেটি ভেঙে না দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায় উচ্চকক্ষকে যুক্ত করা যায় কি না, তা বিবেচনা করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের স্পিকারকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার প্রস্তাবও এসেছে। বিকল্প হিসেবে সরকারি ও বিরোধী দলের সম্মতিতে স্পিকার নির্বাচন এবং তাদের সম্মতিতে উপদেষ্টা নিয়োগের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।’

S

তবে এসব প্রস্তাবের কোনোটিই এখনো চূড়ান্ত নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সব মতামত পর্যালোচনা করে কমিটির প্রতিবেদনে বিভিন্ন বিকল্প তুলে ধরা হবে।’

উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে পাঁচজন সদস্য মনোনয়নের যে প্রস্তাব রয়েছে, তা কীভাবে কার্যকর করা যায়, সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বিভিন্ন দেশের সংবিধানের উদাহরণ দিয়ে বলা হয়েছে, শিল্প-সংস্কৃতি, বিজ্ঞানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখা ব্যক্তিদের মধ্য থেকে সদস্য মনোনয়নের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড থাকা প্রয়োজন তবে বাংলাদেশে উচ্চকক্ষের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও ভিন্নমত রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় উচ্চকক্ষের প্রয়োজনীয়তা নতুন করে বিবেচনা করা উচিত। ফলে এ বিষয়ে আরও আলোচনা ও পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে।’

সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ‘কমিটির পক্ষ থেকে প্রতিটি বৈঠকেই বিরোধী দলকে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। তাঁদের মতামত ও প্রস্তাব পাওয়া গেলে তা বিবেচনা করা হবে।’

অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার পরে বা পরামর্শের ভিত্তিতে জুলাই সনদে বিএনপির নোট অব ডিসেন্টে ছাড় দেবেন কি না- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ মুহূর্তে এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। বিরোধী দল চাইলে কোন কোন বিষয়ে ভিন্নমত পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে, তা কমিটির কাছে তুলে ধরতে পারে।’

২০১১ সালের সংবিধান সংশোধনের অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, ‘সে সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্ত করার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে মতভিন্নতা তৈরি হয়েছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সেই সময়ের তুলনা করা ঠিক হবে না। বর্তমান কমিটি বিভিন্ন পক্ষের মতামত বিবেচনায় নিয়ে কাজ করছে।’

S

সুপ্রিম কোর্টের পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে সরকারের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। তবে আগের সরকারের জারি করা অধ্যাদেশে বিভিন্ন ত্রুটি থাকায় সেটিকে আইনে পরিণত করা হয়নি। পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়টি কমিটির আলোচনায় রয়েছে।’

সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি নির্বাচন প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদে যেভাবে ঐকমত্য হয়েছে, সে অনুযায়ী বিরোধী দল থেকে স্থায়ী কমিটির সভাপতি মনোনয়নের বিষয়টি বাস্তবায়ন করা হবে।’

সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে বিরোধী দলের দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তারা সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিশেষ কমিটি হিসেবে কাজ করছেন। বাংলাদেশের সংবিধানে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ নামে কোনো পরিষদের বিধান নেই। সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর তারা শপথ নিয়েছেন।’

গণভোটের রায় প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, জনগণের ম্যান্ডেটকে তারা সম্মান করেন। তবে গণভোটসংক্রান্ত অধ্যাদেশটি আইনে পরিণত করা বাধ্যতামূলক ছিল না বলে তারা মনে করেন। 

তিনি আরও বলেন, ‘ভবিষ্যতে সংবিধান সংশোধনের পর সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী গণভোটের প্রয়োজন হলে সে বিষয়ে বিদ্যমান আইন অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।’

এসময় আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ সাকীসহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন।

এমএইচএইচ/এএইচ