বোরহান উদ্দিন
২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০২:২৮ পিএম
ইট-পাথরে গড়া রাজধানীতে একচিলতে খোলা বাতাস কিংবা সবুজের ছোঁয়া পাওয়া যেন এক সৌভাগ্যের বিষয়। কাজের শেষে কিংবা ছুটির দিনে পরিবার-পরিজনকে নিয়ে একটু স্বস্তি নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর জায়গার বড্ড অভাব কয়েক কোটি মানুষের এই শহরে। অবশ্য ৯ বছর বন্ধ থাকার পর তালা খুলে দেওয়া আধুনিকায়ন করা ঐতিহাসিক ওসামানী উদ্যান কিছুটা হলেও ঘুরতে বের হওয়া মানুষের জন্য প্রশান্তি এনে দিতে পারে।
রাজধানীর গুলিস্তানে বাংলাদেশ সচিবালয় ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান কার্যালয় নগর ভবনের ঠিক মাঝখানে ২১ দশমিক ৮৫ একরের বিশাল এই উদ্যান। দীর্ঘ প্রায় ৯ বছর সংস্কার ও আধুনিকায়ন কাজ শেষে উদ্যানটি এখন সাধারণ নগরবাসীর জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত। শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই নয়, দেশের ধারাবাহিক ইতিহাস ও জুলাই অভ্যুত্থানের স্মৃতিকে ধারণ করে এটি এখন হয়ে উঠেছে ইতিহাস আর প্রকৃতির এক অপূর্ব মিলনমেলা। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এটির উদ্বোধন করেছেন।

সবুজের সমারোহ আর নতুন জলাশয়
পুরোনো ঐতিহ্য ধরে রেখে উদ্যানটিকে আধুনিক এক নাগরিক বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। পুরোনো জলাশয়টি সংস্কারের পাশাপাশি এখানে তৈরি করা হয়েছে নতুন আরও পাঁচটি লেক বা জলাশয়। লেকের পাড় বাঁধাই করে তৈরি করা হয়েছে মনোরম ঘাট, যেখানে বসে বিকেলের স্নিগ্ধ বাতাস উপভোগ করা যাবে অনায়াসে।
পুরোনো গাছগাছালি অক্ষত রেখেই পুরো উদ্যানে গড়ে তোলা হয়েছে ছোট-বড় বেশ কিছু ‘সবুজ দ্বীপ’। উদ্যানজুড়ে নতুন করে অনেক প্রজাতির গাছও লাগানো হয়েছে।
শুধু ঘুরতে আসা নগরবাসী নন, যারা নিয়মিত হাঁটাচলা বা ব্যায়াম করতে ভালোবাসেন, তাদের জন্য এটি হতে পারে নতুন আকর্ষণ। পুরো পার্ক জুড়ে তৈরি করা হয়েছে প্রায় ৩ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ দৃষ্টিনন্দন হাঁটার পথ (ওয়াকওয়ে)। পার্কটি দুই স্তরে সাজানো হয়েছে; যার মধ্যে সড়ক থেকে প্রায় দুই মিটার উঁচুতে তৈরি করা হয়েছে দ্রুত চলাচলের বিশেষ পথ।

এছাড়া শারীরিক অনুশীলনের জন্য এখানে রাখা হয়েছে ব্যায়ামাগার। শরীরচর্চা আর প্রাতঃভ্রমণের পাশাপাশি আধুনিক স্থাপত্যের প্যাগোডা, গণশৌচাগার ও সুপরিসর পার্কিং সুবিধাও যুক্ত করা হয়েছে এতে। পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থার অংশ হিসেবে উদ্যানে রাখা হয়েছে ৫০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা।
ইতিহাসের স্মারক: ৯০ ফুটের ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’
শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যই নয়, এই উদ্যানের প্রধান আকর্ষণ হিসেবে যুক্ত হয়েছে ৯০ ফুট উঁচু ব্রোঞ্জ ধাতুর ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে প্রায় এক একর জায়গাজুড়ে এটি নির্মাণ করা হয়েছে। লেজার কাটিং প্রযুক্তির মাধ্যমে স্মৃতিস্তম্ভের গায়ে খোদাই করা হয়েছে ৮৩৪ জন শহীদের নাম। আর এর ঠিক সামনে স্থাপন করা হয়েছে ২০টি প্রতীকী সমাধিফলক।

স্মৃতিস্তম্ভটির বাইরের অংশে ১৬৩ ফুট দীর্ঘ ও সাড়ে ৪ ফুট উঁচু এবং ভেতরের অংশে ১৭১ ফুট দীর্ঘ ও সাড়ে ৭ ফুট উঁচু রিলিফ ভাস্কর্য রয়েছে। এই ভাস্কর্যে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০-এর গণআন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান- বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র অর্জনের পুরো ইতিহাসকে ধারাবাহিকভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। পার্কের দুটি প্রবেশপথে তৈরি করা হয়েছে ‘২৪’-এর ইংরেজি অক্ষরের আদলে দুটি চোখধাঁধানো প্রধান ফটক।

আরও যেসব স্থাপনা হচ্ছে উদ্যানের ভেতরে
সব বয়সীদের উপযোগী করে পার্কটিকে সাজানো হয়েছে। উদ্বোধনের পর উদ্যানটি ঘুরে দেখার জন্য খুলে দেওয়া হলেও খুব শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে ভেতরের নগর জাদুঘর, সমৃদ্ধ একটি গ্রন্থাগার, ১২টি আকর্ষণীয় খাবারের দোকান, জিমনেসিয়াম ও পূর্ণাঙ্গ পার্কিং ব্যবস্থা। এগুলো চালু হলে পার্কটি পরিবারসহ সময় কাটানোর জন্য শহরের অন্যতম সেরা কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে।
সপ্তাহের যেকোনো দিন সকাল থেকেই খোলা থাকছে ওসমানী উদ্যান। পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা এবং উদ্যানের পরিবেশ সুরক্ষার জন্য সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে প্রবেশমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে জনপ্রতি ১০ টাকা। ইট-কাঠের যান্ত্রিকতা ছেড়ে ইতিহাস ও সবুজের মাঝে কিছুটা সময় কাটাতে যেকোনো দিন ঘুরতে আসা যাবে নবরূপের ওসমানী উদ্যানে।
বিইউ/এএস