নিজস্ব প্রতিবেদক
২২ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:০১ এএম
‘ও বাবা, তোমরা আমার পেটের পোলার নাগান। মা হইয়া আমি চাইতেছি, আমার মাইয়ারে আইনা দাও, আমার আত্মাটার শান্তি করো’, আহাজারির সুরে সাংবাদিকদের বলছিলেন সম্প্রতি সৌদি আরবে শিরশ্ছেদের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া বাংলাদেশি নারী সিঁথির বৃদ্ধা মা।
টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার বাসিন্দা এই মা প্রবাসে মেয়ের মৃত্যুর আকস্মিক খবরে এতটাই ভেঙে পেড়েছেন যে, গত প্রায় সাত দিনে নাওয়া-খাওয়া প্রায় ছেড়েই দিয়েছেন বলে জানাচ্ছে তার পরিবার।
মা-বাবার সঙ্গে থাকা সিঁথির বড় বোন জানান, খবরটা শোনার পর থাইকাই সারাক্ষণই খালি কান্নাকাটি করতাছে। বয়স হইছে, এমনেই অসুস্থ থাকে। এর মধ্যে খাওয়া-দাওয়া ছাইড়া দেওয়ায় আরও অসুস্থ হইয়া পড়ছে।
তিনি এটাও জানান, গত সপ্তাহে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার আগের দিনও তার বোনের কথা হয়েছিল পরিবারের। কিন্তু তখনো তারা ঘুনাক্ষরেও কল্পনা করতে পারেননি যে, একদিন না যেতেই বোনের মৃত্যুর খবর শুনতে হবে।
সিঁথির বোন বলেন, ‘আমরা এর কিছুই জানতাম না। আমার বোনও কিছু কয় নাই। খালি জানতাম যে, সৌদির জেলখানায় বন্দি আছে। পরে গেল বুধবার হের এক বান্ধবী হঠাৎ ফোন দিয়া কয় যে, মৃত্যুদণ্ড হইছে।’
স্বজনদের এখন একটাই চাওয়া, সরকার যেন সৌদি আরব থেকে ওই নারীর মরদেহ বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনে তাদের কাছে হস্তান্তর করে। সিঁথির বোন বলেন, ‘সরকার যেন আমার বোনরে ফেরত এনে দেয়। হের কবরটা যেন এখানে দিতে পারি। এতটুকুই চাওয়া।’
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া নজরুল ইসলামের পরিবারও একই দাবি জানিয়েছে। তার বাবা বলেন, ‘তিন বছর তিন মাস হয় ছেলের মুখ দেখি না। আমি যেন ছেলের চেহারা শেষবারের মতো দেখতে পারি।’
সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে। যদিও শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব হবে কি না, সেটি নিয়েও সংশয় প্রকাশ করছেন কেউ কেউ।
বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক ও অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, ‘সংশয় প্রকাশের অবকাশ রয়েছে, কারণ এ ধরনের ঘটনায় অতীতে অনেক বিদেশি নাগরিকের মরদেহ তাদের দেশে ফেরত না পাঠানোর নজির সৌদি আরবের আছে। এমনকি, বাংলাদেশের সঙ্গেও আগে এমনটা ঘটেছে।’
চিঠির জবাব কতদূর?
সৌদি আরবের সরকারি বার্তা সংস্থা ‘সৌদি প্রেস এজেন্সি’ (এসপিএ) গত ১৪ অক্টোবর প্রকাশিত একটি খবরে জানায়, দেশটির সরকার দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে। মক্কার একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কাজে লিপ্ত হওয়ার শাস্তিস্বরূপ’ সেদেশের আদালত ওই মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছিল বলে খবরে উল্লেখ করা হয়।
এ ঘটনার পর বাংলাদেশ সরকারের কর্মকর্তারা দাবি করেন, দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার বিষয়ে কোনো তথ্যই সৌদি কর্তৃপক্ষ সেখানকার দূতাবাসকে জানায়নি।
যদিও ভিয়েনা প্রটোকল অনুযায়ী, একটি দেশের নাগরিক আরেক দেশে আটক বা বন্দি হলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সেটি আটক ব্যক্তির দেশের সরকার বা দূতাবাস কর্মকর্তাদের অবহিত করার কথা।
কিন্তু সৌদি আরব সেটি না করার কারণে ভিয়েনা প্রটোকল লঙ্ঘন হয়েছে কি না, সেই প্রশ্নটা সামনে চলে আসে। সামাজিক মাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা, এমনকি ক্ষোভ প্রকাশ করতেও দেখা গেছে অনেককে।
নজরুল ও সিঁথির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পরদিন, অর্থাৎ ১৫ অক্টোবর জেদ্দায় অবস্থিত বাংলাদেশ কনস্যুলেট থেকে সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি পাঠানো হয়। সেখানে মৃত্যুদণ্ডের শিকার বাংলাদেশিদের নাম-পরিচয়সহ ঘটনার বিস্তারিত জানানোর অনুরোধ জানান কর্মকর্তারা। পরে ১৮ অক্টোবর ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ বিন জাফর এইচ বিন আবিয়াকে ডেকে সেই চিঠির একটি অনুলিপি হস্তান্তর করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, তারা দ্রুত সময়ের মধ্যে সেটির জবাব পাওয়ার আশা করছেন। কিন্তু বুধবার (২১ অক্টোবর) সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনো জবাব আসেনি বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র।
আগের অভিজ্ঞতা কী বলে?
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের যেসব দেশে মৃত্যুদণ্ডের সংখ্যা বাড়তে দেখা যাচ্ছে, সেগুলোর মধ্যে সৌদি আরব অন্যতম।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুন মাস পর্যন্ত সময়ের মধ্যে সৌদি আরবে কমপক্ষে ৮১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালে রেকর্ড সংখ্যক ৩৪৫টি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে সৌদি সরকার।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, ২০২৫ সাল পর্যন্ত এক দশকে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশকে মাদকসংক্রান্ত অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও মানদণ্ড অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ নয়।
ক্রমবর্ধমান মৃত্যুদণ্ডের সংখ্যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলছে, সৌদি আরবে কর্মরত বিদেশি নাগরিকরাও প্রাণনাশের মতো নির্মম শাস্তির মুখোমুখি হচ্ছেন।
মাদকসংক্রান্ত অপরাধে ১০ বছরে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সংখ্যা বিশ্লেষণ করে সংস্থাটি দেখেছে যে, তাদের মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশই ছিলেন বিদেশি নাগরিক। মাদকের বাইরে কিছু চুরি, ডাকাতি, হত্যাসহ অন্যান্য ঘটনাতেও বিদেশি নাগরিকদের মৃত্যুদণ্ডসহ বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল আরও জানাচ্ছে যে, বিভিন্ন সময় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া বিদেশি নাগরিকদের অনেকেরই মরদেহ তাদের পরিবারের কাছে ফেরত দেয়নি সৌদি সরকার। কিছু ক্ষেত্রে মরদেহ কোথায় দাফন করা হয়েছে, সেই তথ্যও স্বজনদের না জানানোর অভিযোগ পেয়েছে মানবাধিকার সংস্থাটি।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে যে, গত দুই দশকে বাংলাদেশের প্রায় ডজনখানেক নাগরিককে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে সৌদি আরবের আদালত। সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাটি ঘটেছিল ২০১১ সালে।
এছাড়া মিশরীয় এক নাগরিককে হত্যার দায়ে ওই বছর রিয়াদে কর্মরত প্রবাসী আটজন বাংলাদেশিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাদের কারেও লাশ আমরা ফিরতে দেখি নাই। এবারও যে তেমনটি ঘটবে না, সেটা নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না বলে জানান ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান।
কিন্তু সৌদি সরকার কেন বিদেশিদের মরদেহ ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে অনাগ্রহ দেখায়?
শরিফুল হাসান বলেন, ‘দুর্ঘটনার মতো মৃত্যুর ক্ষেত্রে তারা বিদেশিদের লাশ ফেরত দেওয়া নিয়ে আপত্তি করে না। আপত্তিটা মূলত বেশি দেখা যায়, বিতর্কিত বা মানবাধিকার লঙ্ঘনে অভিযুক্ত ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে। সৌদি সরকার সম্ভবত ভয় পায় এই কারণে যে, বিতর্কিত ঘটনায় লাশ ফেরত দিলে সেটি নিয়ে পরবর্তীতে হয়তো তদন্ত হবে বা নানা প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে।’
কী বলছে সরকার?
সৌদি আরবে সম্প্রতি যে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, সেটি নিয়ে নানা বিতর্ক ও সমালোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে, দণ্ড কার্যকর করার আগে বাংলাদেশ সরকারকে না জানানোয় মানবাধিকার বিভিন্ন সংস্থা যেমন উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, তেমনি সামাজিক মাধ্যমেও সাধারণ বাংলাদেশিরা ক্ষোভ প্রকাশ করছে।
এ অবস্থায় সৌদি সরকার নিহতদের মরদেহ ফেরত দেবে কি না, সেটি নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা অবশ্য বলছেন, বাংলাদেশ সরকার কূটনৈতিকভাবে শক্ত অবস্থান ও জোর তৎপরতা দেখাতে পারলে নিহতদের মরদেহ ফেরত আনা কঠিন হবে না। অধিকাংশ সময়ই এটা নির্ভর করে কূটনৈতিক তৎপরতা ও ভুক্তভোগী দেশের নাগরিকদের প্রতিক্রিয়ার মাত্রার ওপর।
চলতি বছর মহানবীকে (স.) নিয়ে ফেসবুকে মন্তব্যের জেরে দোষী সাব্যস্ত করে শ্রীলঙ্কান এক নাগরিককে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল সৌদি আরব। কিন্তু ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর তার মুক্তির দাবিতে শ্রীলঙ্কায় বিক্ষোভ শুরু হয়। একপর্যায়ে দেশটির সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতার মুখে চলতি বছরের শুরুতে ওই ব্যক্তির সাজা মওকুফ করার সিদ্ধান্ত নেয় সৌদি সরকার।
শরিফুল হাসান বলেন, ‘আমাদের দেশের সরকারও যদি কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে সৌদি সরকারের ওপর কার্যকরভাবে চাপ সৃষ্টি করতে পারে, তাহলে তারাও নিহত দুজনের মরদেহ ফেরত পাঠাতে বাধ্য হবে। অন্যথায়, এটা নিয়ে গড়িমসি করতে পারে।’
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ সম্প্রতি সাংবাদিকদের জানান, তারা সৌদি সরকারের কাছে ঘটনার বিস্তারিত তথ্য চেয়ে যে চিঠি লিখেছেন, সেখানে রায়ের অনুলিপিও চাওয়া হয়েছে। রায়টি হাতে পেলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘এক্ষেত্রে নিহতদের মরদেহ যেন দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা যায়, আমাদের পক্ষ থেকে অবশ্যই সেই প্রচেষ্টা চালানো হবে।’ সূত্র: বিবিসি বাংলা
এএইচ