মাহফুজুর রহমান
২০ অক্টোবর ২০২৬, ১০:১৮ পিএম
রাজধানীর উসমানী উদ্যানে নির্মিত জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ যেন একই সঙ্গে ইতিহাসের স্মারক ও নান্দনিক স্থাপত্যের এক অনন্য উপস্থাপনা। আধুনিক নির্মাণশৈলী, দৃষ্টিনন্দন নকশা আর পেছনের দেয়ালে গণঅভ্যুত্থানের চিত্র সব মিলিয়ে স্থাপনাটি তৈরি করেছে স্বতন্ত্র আবহ। এর সৌন্দর্য যেমন দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে, তেমনি দেয়ালে ফুটে ওঠা ইতিহাস মনে করিয়ে দিচ্ছে বাংলাদেশের মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার কথা।
স্মৃতিস্তম্ভটির সামনে দাঁড়ালে প্রথমেই চোখে পড়ে এর আধুনিক নকশা ও সামগ্রিক নির্মাণশৈলী। স্থাপনাটির গঠন ও উপস্থাপনায় রয়েছে নান্দনিকতার ছাপ। এর পেছনের দেয়ালটিও কেবল স্থাপনার একটি অংশ হয়ে থাকেনি; বরং সেখানে স্থান পেয়েছে বাংলাদেশের ইতিহাসের দুটি গুরুত্বপূর্ণ গণঅভ্যুত্থানের চিত্র। দেয়ালের সামনের অংশে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান। আর পেছনের অংশে তুলে ধরা হয়েছে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের দৃশ্য।
একই স্থাপনায় দুই সময়ের গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি তুলে ধরার বিষয়টি জুলাই স্মৃতিস্তম্ভকে দিয়েছে বাড়তি তাৎপর্য। স্থাপনাটির সৌন্দর্য দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করলেও দেয়ালে থাকা চিত্রগুলো এর ঐতিহাসিক গুরুত্বকে আরও গভীর করেছে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের গণআন্দোলনের ভিন্ন দুটি অধ্যায়কে পাশাপাশি দেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
নকশায় আধুনিকতা, নির্মাণে স্বাতন্ত্র্য
স্মৃতিস্তম্ভটির অন্যতম আকর্ষণ এর নির্মাণশৈলী। প্রচলিত স্মৃতিস্তম্ভের ধারণার বাইরে আধুনিক নকশার মাধ্যমে একে উপস্থাপন করা হয়েছে। মূল স্তম্ভের গঠন, এর চারপাশের বিন্যাস এবং পেছনের দেয়ালের সঙ্গে সামগ্রিক সমন্বয় স্থাপনাটিকে দিয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য।
উসমানী উদ্যানের পরিবেশের মধ্যে স্থাপনাটি সহজেই নজর কাড়ে। উদ্যানের ভেতরে চলাচলকারী মানুষ কিংবা সেখানে সময় কাটাতে আসা দর্শনার্থীদের কাছে এটি হয়ে উঠতে পারে আগ্রহের একটি জায়গা। বিশেষ করে যারা স্থাপত্য, ইতিহাস ও নগরপরিসরের নান্দনিকতা নিয়ে আগ্রহী, তাঁদের জন্য এখানে দেখার মতো দুটি দিক রয়েছে একদিকে আধুনিক স্থাপত্যের উপস্থাপনা, অন্যদিকে ইতিহাসকে দৃশ্যমান করে তোলার প্রয়াস।
উসমানী উদ্যানের জুলাই স্মৃতিস্তম্ভের নকশা ও সৌন্দর্য নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন দর্শনার্থীরা। তাঁদের মতে, আধুনিক নির্মাণশৈলীর পাশাপাশি দেয়ালে ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো তুলে ধরায় স্থাপনাটি পেয়েছে ভিন্ন মাত্রা।
ঘুরতে আসা দর্শনার্থী মমতাজ বেগম বলেন, ‘স্মৃতিস্তম্ভটি দেখতে বেশ সুন্দর ও আধুনিক। এর নকশা আমার ভালো লেগেছে। বিশেষ করে দেয়ালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চিত্র ফুটিয়ে তোলার বিষয়টি ভালো উদ্যোগ।’
দেয়ালের এক পাশে জুলাই, অন্য পাশে ঊনসত্তর
জুলাই স্মৃতিস্তম্ভের পেছনের দেয়ালটি স্থাপনাটির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশগুলোর একটি। এর সামনের অংশে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। অন্যদিকে, পেছনের অংশে রয়েছে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের দৃশ্য। ফলে দেয়ালটি শুধু স্মৃতিস্তম্ভের পটভূমি নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের দুটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের দৃশ্যমান উপস্থাপনা।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান তৎকালীন পাকিস্তানি শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে তীব্র করে তোলে। এই আন্দোলন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যা রাষ্ট্র ও সমাজের নানা ক্ষেত্রে পরিবর্তনের দাবি সামনে নিয়ে আসে।
দুটি গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট, সময় ও রাজনৈতিক বাস্তবতা এক নয়। তবে উভয় ক্ষেত্রেই মানুষের সম্মিলিত প্রতিবাদ, অধিকার আদায়ের আকাঙ্ক্ষা এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। একই দেয়ালে দুই সময়ের আন্দোলনের দৃশ্য তুলে ধরার ফলে দর্শনার্থীরা বাংলাদেশের গণআন্দোলনের ইতিহাসকে একটি বিস্তৃত পরিসরে দেখার সুযোগ পান।
এখানে দেয়ালচিত্রের গুরুত্ব কেবল অতীতের ঘটনাকে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দৃশ্যমান উপস্থাপনার মাধ্যমে ইতিহাসকে সাধারণ মানুষের কাছে আরও সহজবোধ্য করে তোলার সুযোগও তৈরি হয়। বইয়ের পাতা কিংবা লিখিত বিবরণের বাইরে এমন চিত্র মানুষের মধ্যে ইতিহাস জানার আগ্রহ তৈরি করতে পারে।
দর্শনার্থী মাহমুদ ইমন বলেন, 'এখানে এসে ভালো লেগেছে। স্মৃতিস্তম্ভটির নির্মাণশৈলী বেশ আকর্ষণীয়। সবচেয়ে ভালো লেগেছে, একই জায়গায় জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এতে আমাদের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দুটি অধ্যায় সম্পর্কে জানার সুযোগ তৈরি হয়েছে।'
স্মৃতির পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের কাছে ইতিহাস পৌঁছানোর সুযোগ
একটি স্মৃতিস্তম্ভের গুরুত্ব শুধু তার নির্মাণশৈলী বা বাহ্যিক সৌন্দর্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি কোন ইতিহাসকে ধারণ করছে, মানুষের কাছে কী বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কতটা অর্থবহ হয়ে উঠছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
উসমানী উদ্যানের জুলাই স্মৃতিস্তম্ভের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। কারণ, এখানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পাশাপাশি ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের চিত্রও স্থান পেয়েছে। ফলে স্থাপনাটি বাংলাদেশের গণআন্দোলনের ইতিহাসের দুটি অধ্যায়কে একই পরিসরে উপস্থাপন করছে।
বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের কাছে ইতিহাস তুলে ধরার ক্ষেত্রে এ ধরনের স্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে উদ্যান ঘুরতে আসা শিশু-কিশোর কিংবা ইতিহাসে আগ্রহী তরুণদের কাছে দেয়ালের চিত্রগুলো প্রশ্ন ও কৌতূহল তৈরি করতে পারে। সেই কৌতূহল থেকেই তাঁরা জানতে চাইতে পারেন কেন এই আন্দোলন হয়েছিল, কারা এতে অংশ নিয়েছিলেন, কী ছিল তাঁদের দাবি এবং দেশের ইতিহাসে এসব ঘটনার প্রভাব কতটা গভীর।
তবে একটি স্থাপনাকে কার্যকর স্মৃতিচর্চার কেন্দ্রে পরিণত করতে হলে শুধু নির্মাণ করাই যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক তথ্য, ঘটনার কালানুক্রম এবং প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যা সহজে জানার সুযোগ থাকাও জরুরি। দেয়ালচিত্রের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত বিবরণ কিংবা তথ্যফলক থাকলে দর্শনার্থীরা ঘটনাগুলোর প্রেক্ষাপট আরও ভালোভাবে বুঝতে পারবেন।
নগরের মধ্যে ইতিহাসের একটি দৃশ্যমান স্মারক
ঢাকার মতো ব্যস্ত নগরে উদ্যানগুলো শুধু অবসর কাটানোর জায়গা নয়; এগুলো মানুষের মিলন, বিনোদন ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেরও গুরুত্বপূর্ণ পরিসর। এমন একটি জনপরিসরে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভের উপস্থিতি ইতিহাসকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের কাছাকাছি নিয়ে আসার সুযোগ তৈরি করেছে।
স্থাপনাটির আধুনিক নকশা একদিকে দৃষ্টিনন্দন, অন্যদিকে পেছনের দেয়ালের চিত্রগুলো একে দিয়েছে বিষয়গত গভীরতা। নান্দনিকতা ও ইতিহাসের এই সমন্বয়ই স্মৃতিস্তম্ভটির স্বাতন্ত্র্য। এটি দেখতে আসা মানুষের কাছে স্থাপনাটি যেমন সৌন্দর্যের আকর্ষণ তৈরি করতে পারে, তেমনি দেয়ালের চিত্র তাঁদের বাংলাদেশের অতীত ও সাম্প্রতিক ইতিহাস নিয়ে ভাবার সুযোগ দিতে পারে।
সব মিলিয়ে, উসমানী উদ্যানের জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ কেবল একটি স্থাপত্যকর্ম নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ইতিহাসকে দৃশ্যমানভাবে তুলে ধরার একটি প্রয়াস। মূল স্তম্ভের আধুনিক নির্মাণশৈলী ও পেছনের দেয়ালে ১৯৬৯ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চিত্র এই দুইয়ের সমন্বয় স্থাপনাটিকে দিয়েছে আলাদা পরিচয়। এখন এর ঐতিহাসিক তাৎপর্য সাধারণ মানুষের কাছে কতটা পৌঁছাচ্ছে, দর্শনার্থীরা একে কীভাবে দেখছেন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এটি কতটা কার্যকর স্মারক হয়ে উঠবে, তা নির্ভর করবে এর সংরক্ষণ, তথ্য উপস্থাপন ও জনসম্পৃক্ততার ওপর।
নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘আমাদের শহরে ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো স্মরণীয় করে রাখতে এ ধরনের স্থাপনা বিশেষভাবে প্রয়োজন। জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। ঢাকার অন্য কোথাও এ ধরনের স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়নি। উসমানী উদ্যানে এটি নির্মাণের ফলে দর্শনার্থীরা জুলাই গণঅভ্যুত্থান সম্পর্কে জানার সুযোগ পাবেন। বিশেষ করে পরবর্তী প্রজন্ম জানতে পারবে, কীভাবে এই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করেছিল এবং একটি শোষণমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে তরুণেরা কীভাবে জীবন উৎসর্গ করেছেন। এসব ইতিহাস নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা রাষ্ট্রের দায়িত্বের অংশ।’
তিনি বলেন, ‘উসমানী উদ্যানে নির্মিত জুলাই স্মৃতিস্তম্ভকে কেন্দ্র করে এমন পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন, যাতে মানুষ এখানে এসে দেশের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারে। তবে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ ও এর আশপাশের কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে উদ্যানের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও পরিবেশ যেন নষ্ট না হয়, সেদিকে বিশেষভাবে নজর রাখতে হবে। আমরা চাই, স্মৃতিস্তম্ভের মাধ্যমে ইতিহাসের স্মৃতি জাগ্রত থাকুক, একই সঙ্গে উদ্যানের স্বতন্ত্র চরিত্রও বজায় থাকুক।’
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরে আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান আমাদের জাতীয় ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই গণঅভ্যুত্থান ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। উসমানী উদ্যানে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতিকে পাশাপাশি সংরক্ষণ করার মধ্য দিয়ে দেশের ইতিহাসের দুটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে এক জায়গায় তুলে ধরা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই দুই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া মানুষদের আত্মত্যাগের স্মৃতি নতুন প্রজন্মকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করবে। উসমানী উদ্যানে এসে বিভিন্ন বয়সের মানুষ দেশের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারবে এবং দেশ গঠনে আত্মত্যাগের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারবে। এ কারণে দুটি গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতিচিহ্ন যুক্ত হওয়ায় উদ্যানটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব আরও বেড়েছে। আমরা আশা করি, তরুণসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষ এখানে আসবে, দেশপ্রেমের শিক্ষা নেবে এবং সেই চেতনা ভবিষ্যতে বাংলাদেশ বিনির্মাণে কাজে লাগাবে।’
এম/এএইচ