Dhaka Mail Logo

জাতীয়

তিন হাজার কোটি ব্যয় ও ১৪ বছরের ভোগান্তির পর বাতিল হচ্ছে প্রকল্পটি!

নিজস্ব প্রতিবেদক

২০ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:১৯ পিএম

প্রকল্পটিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা। এর জন্য ১৪ বছর ধরে জনসাধারণকে পোহাতে হয়েছে চরম ভোগান্তি। দীর্ঘসূত্রতা, নকশাগত ত্রুটি ও পরিকল্পনার নানা দুর্বলতায় প্রশ্নবিদ্ধ গাজীপুরের বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রকল্পের অবকাঠামো সরিয়ে সড়কটিকে সাধারণ ছয় লেনের মহাসড়কে রূপান্তর করা হবে।

গত রোববার (১৮ অক্টোবর) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরদিন সোমবার সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেয়।

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিআরটি করিডরের স্টেশন ও লেন বিভাজক অপসারণ করে দুই পাশে তিনটি করে মোট ছয় লেনের সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রকল্পের আওতায় নির্মিত দুটি দুই লেনের উড়ালসড়ক চার লেনে সম্প্রসারণ করা হবে। বিআরটি পরিচালনার জন্য গঠিত ঢাকা বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট পিএলসি বন্ধ করে এর কার্যক্রম সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের (সওজ) আওতায় নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন

‘শ্বেতহস্তী’ কর্ণফুলী টানেলের লোকসান কমাতে নতুন উদ্যোগ

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের বিআরটি শাখার উপসচিব তাসলিমা আহমেদ পলির সই করা চিঠিতে এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনা করে আইনি জটিলতা নিরসন এবং প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করার কার্যক্রমও নিতে বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোকে ১৫ দিনের মধ্যে অগ্রগতি প্রতিবেদন পাঠাতে হবে। কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি মাসের ৩ তারিখের মধ্যে অগ্রগতি জানাতে হবে।

প্রকল্পটির জন্য বছরের পর বছর ধরে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত
প্রকল্পটির জন্য বছরের পর বছর ধরে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত

যে বাস চালুর জন্য প্রকল্প, সেটিই চালু হয়নি

রাজধানী ঢাকা ও গাজীপুরের মধ্যে দ্রুত গণপরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে ২০১২ সালের নভেম্বরে বিআরটি প্রকল্প অনুমোদন করে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। গাজীপুরের শিববাড়ী থেকে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত প্রায় ২০ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই করিডরে সড়কের মাঝখানে পৃথক লেনে বিশেষ বাস চালানোর পরিকল্পনা ছিল। প্রকল্পটি চালু হলে প্রতিদিন প্রায় ২৫ হাজার যাত্রী দ্রুত যাতায়াত করতে পারবেন বলে আশা করা হয়েছিল।

প্রাথমিকভাবে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৩৯ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। ২০১৬ সালের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করে ২০১৭ সাল থেকে বিশেষ বাস চালুর পরিকল্পনা থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। ভূমি অধিগ্রহণ, নকশা পরিবর্তন, বিভিন্ন সেবা সংস্থার লাইন স্থানান্তর এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতাসহ নানা জটিলতায় কাজের গতি ব্যাহত হয়। ২০১৮ সালে মাঠপর্যায়ে বড় পরিসরে নির্মাণকাজ শুরু হলেও নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প শেষ করা সম্ভব হয়নি।

দীর্ঘসূত্রতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ব্যয়ও। কয়েক দফা সংশোধনের পর প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়ায় ৪ হাজার ২৬৮ কোটি ৩২ লাখ টাকায়। পরে ২০২৫ সালে ব্যয় আরও বাড়িয়ে ৬ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকার বেশি এবং মেয়াদ ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়। তবে ওই বছরের ২৭ জুলাই একনেক প্রস্তাবটি অনুমোদন করেনি। শেষ পর্যন্ত প্রকল্পে ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা ব্যয় হওয়ার পরও বিশেষ বাস চালু না করেই তা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো।

আরও পড়ুন

ধর্মীয় স্থাপনা উন্নয়নে বড় প্রকল্প, শুরুতেই আপত্তি

বিআরটি প্রকল্পের আওতায় সড়কের মাঝখানে লেন বিভাজক, ১৫টি স্টেশন, উড়ালসড়ক, টঙ্গী সেতু ও বাস ডিপোসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। তবে স্টেশনগুলোর কাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি। যাত্রীদের ওঠানামার জন্য নির্মিত পদচারী-সেতুগুলোর অনেকগুলোও ব্যবহার উপযোগী নয়। কোথাও লিফট ও চলন্ত সিঁড়ি থাকলেও সেগুলোর অনেকগুলো অব্যবহৃত অবস্থায় রয়েছে।

সড়কের মাঝখানে বিভাজক, লোহার বেড়া এবং অসমাপ্ত স্থাপনার কারণে অনেক জায়গায় যান চলাচলের জায়গা সংকুচিত হয়েছে। কোথাও উড়ালসড়ক, কোথাও সমতল সড়ক, আবার কোথাও সরু লেন থাকায় যানবাহন চলাচলে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। নির্মাণকাজের দীর্ঘ সময়জুড়ে গাজীপুর, টঙ্গী ও বিমানবন্দর এলাকায় যানজট এবং জনদুর্ভোগ ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। নির্মাণকাজের সময় বিভিন্ন দুর্ঘটনায় সাতজনের প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে।

নতুন করে ছয় লেন করা হচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত
নতুন করে ছয় লেন করা হচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত

এবার প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে হলে স্টেশন ও লেন বিভাজক সরাতে হবে। অব্যবহৃত লিফটসহ কিছু যন্ত্রপাতি অন্যত্র ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে সওজের। তবে অবকাঠামো অপসারণ ও উড়ালসড়ক সম্প্রসারণে কত সময় লাগবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা জানানো হয়নি।

কারিগরি ত্রুটি ও সমন্বয়হীনতা

প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের আগে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একটি বিশেষজ্ঞ দল কারিগরি দিক পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন দেয়। পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হকের নেতৃত্বে দলটি গত বছর অক্টোবরে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দেয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত দুটি কমিটির প্রতিবেদন পর্যালোচনার ভিত্তিতে বিশেষজ্ঞ দলটি প্রকল্পটি পুরোপুরি বাতিল করে বিদ্যমান অবকাঠামো উন্নত মহাসড়ক হিসেবে ব্যবহারের সুপারিশ করে।

আরও পড়ুন

মেট্রোরেলের ৭৩০ বেয়ারিং প্যাডে ত্রুটি, ঝুঁকিতে নিরাপত্তা

প্রতিবেদনে প্রকল্পটিকে অবকাঠামো পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে ‘পদ্ধতিগত ব্যর্থতার’ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। যথাযথ কারিগরি যাচাই, দক্ষ জনবল, জবাবদিহি, নকশাগত ত্রুটি এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতাকে এ পরিস্থিতির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রস্তুতকারী, নকশা প্রণয়নকারী পরামর্শক এবং পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত সরকারি কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার সুপারিশও করা হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পটির বাস পরিচালনার পরিকল্পনাতেও বাস্তব সমস্যা ছিল। বাংলাদেশের প্রচলিত বাসগুলোর দরজা বাঁ দিকে। কিন্তু বিআরটি স্টেশনগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে বাসের দরজা ডান দিকে থাকতে হয়। ফলে বিশেষ নকশার বাস চালু করলেও সেগুলো সাধারণ সড়কে প্রচলিত বাসের মতো চলাচল করতে পারত না।

এদিকে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), ফরাসি উন্নয়ন সংস্থা (এএফডি) এবং গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটির (জিইএফ) অর্থায়ন রয়েছে। ফলে প্রকল্প বন্ধ করতে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনা ও আইনি জটিলতা নিষ্পত্তির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

জেবি