Dhaka Mail Logo

জাতীয়

ডিজে পার্টির আয়ের ৭০ শতাংশ পেতেন অতিরিক্ত ডিআইজি জহির

মোস্তফা ইমরুল কায়েস

২০ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:০২ পিএম

  • আটক ব্যক্তিদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ব্যাংকারও রয়েছেন
  • উদ্ধার হয়েছে কুশ, ইয়াবা, মদ ও কনডম
  • অভিযানকারীদের দাবি, ফ্ল্যাটটি মিনি পতিতালয় হিসেবে ব্যবহৃত হতো
  • ফ্ল্যাটের মালিক অতিরিক্ত ডিআইজিকে অন্যত্র সংযুক্ত করা হয়েছে

রাজধানীর পূর্বাচলে একটি ছয়তলা ভবনের ফ্ল্যাটে মাদকসহ ৮৫ জনকে আটকের ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) দাবি, ফ্ল্যাটটিতে অনলাইনে জন্মদিনের পার্টির আয়োজনের নামে তরুণ-তরুণীদের জড়ো করে মাদক সেবন ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানো হতো। ফ্ল্যাটটির মালিক পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহির। পার্টি থেকে পাওয়া আয়ের ৭০ শতাংশ তিনি নিতেন বলে জানিয়েছে ডিবি। এ ঘটনায় ফ্ল্যাটটির কার্যক্রম পরিচালনায় সহযোগিতাকারী কথিত কো-হোস্ট মাহবুবুল আলমকেও আটক করা হয়েছে।

জানা গেছে, গতকাল সোমবার রাত ১২টা থেকে ফ্ল্যাটটিতে অভিযান শুরু হয়। আজ বিকেলে অভিযান শেষে সেখান থেকে ৮৫ জন নারী-পুরুষকে আটকের কথা জানায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। তাঁদের মধ্যে ২৬ জন নারী রয়েছেন। আটক ব্যক্তিদের বড় একটি অংশ তরুণ-তরুণী। তাঁদের মধ্যে ঢাকার বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ব্যাংকার রয়েছেন।

ডিবির একটি সূত্র জানায়, ওই ফ্ল্যাটে অনলাইনে বিজ্ঞাপন দিয়ে তরুণ-তরুণীদের আমন্ত্রণ জানানো হতো। সেখানে রাতভর মাদক সেবন ও পার্টির আয়োজন করা হতো। এ জন্য ফ্ল্যাটটিতে মদ, সিনথেটিক মাদক, কনডমসহ পার্টির বিভিন্ন উপকরণ রাখা হতো। অভিযানের সময় এসব সামগ্রী উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।

অভিযানে অংশ নেওয়া ডিবির কয়েকজন সদস্য জানান, ফ্ল্যাটটি এয়ারবিএনবির (একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম) মাধ্যমে ভাড়া দেওয়া হয়েছিল। এয়ারবিএনবির মাধ্যমে আবাসন ভাড়া নেওয়া ও দেওয়া যায়।

অভিযানে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের কয়েকজনের দাবি, ফ্ল্যাটটির মালিক জহির। এয়ারবিএনবির মাধ্যমে ফ্ল্যাটটিতে এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য তিনি হোস্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। আর পুরো কার্যক্রম পরিচালনায় তাঁকে সহায়তা করতেন মাহবুবুল আলম নামের এক তরুণ, যিনি কো-হোস্ট হিসেবে কাজ করতেন। এ ধরনের ব্যবসা পরিচালনায় মাহবুবুলের অভিজ্ঞতা রয়েছে বলে জানান তাঁরা।

অভিযানসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, মাহবুবুলের পরামর্শেই জহির ফ্ল্যাটটি বিশেষভাবে নকশা ও সাজসজ্জা করেন। পরে এয়ারবিএনবির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে তাঁরা কার্যক্রম শুরু করেন। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, ফ্ল্যাটটির মালিক জহির হওয়ায় ব্যবসার মুনাফার ৭০ শতাংশ তিনি পেতেন। বাকি ৩০ শতাংশ পেতেন মাহবুবুল আলম।

অভিযানসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আরও জানান, অভিযান চলাকালে ফ্ল্যাটটিতে শতাধিক মানুষের উপস্থিতি ছিল। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান শুরুর পর ১৫ থেকে ২০ জন কৌশলে সেখান থেকে চলে যান বলে তাঁদের দাবি।

অভিযান শেষ করতে দীর্ঘ সময় লাগার কারণ জানতে চাইলে এক কর্মকর্তা বলেন, ফ্ল্যাটটিতে ২০২৫ সাল থেকে এ ধরনের কার্যক্রম চলছিল। গতকালের অভিযানের সময় সেখানে বিপুলসংখ্যক মানুষ উপস্থিত থাকায় প্রত্যেককে শনাক্ত ও তল্লাশি করতে সময় লেগেছে। এ ছাড়া পুরো ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালানো, উপস্থিত ব্যক্তিদের হেফাজতে নেওয়া এবং তাঁদের থানায় বা সংশ্লিষ্ট স্থানে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হয়েছে। এ জন্য রাজারবাগ থেকে প্রিজন ভ্যান এনে কয়েক দফায় তাঁদের নিয়ে যেতে হয়েছে। এসব কার্যক্রম শেষ করতে ভোর ছয়টা বেজে যায় বলে জানান ওই কর্মকর্তা।

আরও পড়ুন:

অভিযানসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ফ্ল্যাটটি থেকে কুশ ও পাঁচ বোতল মদ উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার করা মদের মধ্যে একটি বোতলে কিছুটা মদ অবশিষ্ট ছিল, দুটি বোতলে অর্ধেক মদ ছিল এবং আরেকটি বোতল পুরোপুরি খালি ছিল। এ ছাড়া সেখানে কনডমও পাওয়া যায় বলে জানান তাঁরা।

অভিযানে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের অভিযোগ, ফ্ল্যাটটিতে চলা কার্যক্রম এবং সেখান থেকে উদ্ধার করা সামগ্রী দেখে ধারণা করা হচ্ছে, আবাসিক বাসার আড়ালে সেখানে অনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হতো।

এ বিষয়ে ডিবির উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইলিয়াস কবির ঢাকা মেইলকে বলেন, ফ্ল্যাটটি এয়ারবিএনবিকে ভাড়া দেওয়া হলেও সেখান থেকে পাওয়া আয়ের ৭০ শতাংশ নিতেন অতিরিক্ত ডিআইজি জহির। ওই ফ্ল্যাট থেকে তরুণ-তরুণীদের পাশাপাশি একজন ব্যাংকারকেও আটক করা হয়েছে। সেখানে মদের পাশাপাশি কুশ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় কো-হোস্ট মাহবুবুল আলম নামের একজনকে আটক করা হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহির পুলিশ সদর দপ্তরে কর্মরত। তিনি সদর দপ্তরের অফিস রিপেয়ার অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স বিভাগের দায়িত্বে আছেন। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

এদিকে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে বলেন, গত রাত থেকে অভিযান চলছিল। ওই ফ্ল্যাট থেকে ৮৫ জনকে আটক করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ২৬ জন নারী রয়েছেন। ফ্ল্যাটটির মালিক একজন অতিরিক্ত ডিআইজি। তিনি ফ্ল্যাটটি ভাড়া দিয়েছিলেন।

তিনি আরও জানান, ফ্ল্যাটটি থেকে একজন কো-হোস্ট ছাড়াও কথিত দুজন সংবাদকর্মীকে আটক করা হয়েছে।

এমআইকে/এআর