ঢাকা মেইল ডেস্ক
২০ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৩৯ পিএম
সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশিকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন তথ্য সামনে আসছে। তাদের পরিচয়, পারস্পরিক সম্পর্ক ও ঘটনাটি ঘিরে ছড়ানো ভিডিও নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। নজরুল ইসলামকে নিজের ছেলে হিসেবে শনাক্ত করে তার বাবা জানিয়েছেন, সুইটি আক্তার তার ছেলের স্ত্রী নন। অন্যদিকে, সুইটি আক্তার নামে শনাক্ত হওয়া নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবরও তার পরিবার নিশ্চিত করতে পারেনি।
সুইটির বাড়ি টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার মহেড়া ইউনিয়নের নগর ছাওয়ালী গ্রামে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) বহির্গমন ছাড়পত্র ও জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন গণমাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া নারীকে সুইটি আক্তার হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। তবে তার পরিবারের দাবি, গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবির সঙ্গে তাদের মেয়ের চেহারার মিল নেই। ফলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া নারীই তাদের সুইটি কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। সুইটির বাবা-মা মেয়ের মৃত্যুর খবর সত্য হলে তার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের সহযোগিতা চেয়েছেন।
সুইটির বাবা ফজল মিয়ার দাবি, গত ১৩ অক্টোবরও মেয়ের সঙ্গে তার কথা হয়েছে। তখন সুইটি তাকে জানিয়েছিল, দুই মাস পর বাড়ি ফিরবে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবে অন্য নারীকর্মীদের সঙ্গে বিরোধের পর প্রায় দুই বছর আগে সুইটিকে কারাগারে নেওয়া হয়। এরপর দীর্ঘ সময় তার সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ ছিল না। সুইটির মা জহুরা বেগমও বলেছেন, প্রকাশিত ছবির সঙ্গে তার মেয়ের চেহারার মিল নেই। তবে নামের মিল থাকায় পরিবার উদ্বিগ্ন। সৌদিতে অনেকে তাকে সিতি নামে চিনতেন। সুইটির বিয়ে হয়েছিল এবং পরে বিচ্ছেদ হয়। তার চার বছরের একটি মেয়েও রয়েছে বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন।
আরও পড়ুন: মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড নিয়ে ছড়ানো ভিডিওটি 'ভুয়া': সৌদি
নজরুলের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের বিরামপুর গ্রামে। আবদুল বাছির ও রেহেনা বেগম দম্পতির চার সন্তানের মধ্যে নজরুল সবার বড়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নজরুল ও সুইটিকে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলেও তার বাবার দাবি, নজরুলের বিয়ে হয়নি এবং তাদের পরিবার সুইটিকে চেনে না।
আবদুল বাছির বলেন, ‘ছেলেকে কলেজে পড়ার সময় পরিবারের হাল ধরতে বিদেশে পাঠিয়েছিলাম। সে বিয়ে করল কখন? ওই মেয়ে নজরুলের স্ত্রী নয়, তাকে আমরা চিনিও না। শুনেছি, তারা একই জায়গায় কাজ করত।’
সময় টিভির সাংবাদিক তানভীর হাসান তার ফেসবুক পোস্টে দাবি করেছেন, নজরুল ও সুইটি মসজিদুল হারামে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন এবং ঘটনাটি ২০২৩ সালের মে মাসে ঘটেছিল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, নজরুলের এক ভারতীয় বন্ধু ভিডিওটি ধারণ করে ব্যক্তিগত বিরোধের জেরে টিকটকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। ওই ব্যক্তির ২০ বছরের কারাদণ্ড হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেছেন। তবে এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
নজরুলকে সৌদি আরবে পাঠাতে সাত লাখ টাকা ঋণ করেছিলেন তার বাবা। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর সৌদি আরবে যাওয়ার প্রায় এক মাস পর মসজিদুল হারামে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ পান নজরুল। সাত-আট মাস পর পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। পরে কারাগার থেকে ফোন করে নিজের বন্দি থাকার কথা জানান, তবে আটকের অভিযোগ সম্পর্কে বিস্তারিত বলেননি।
আরও পড়ুন: সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড নিয়ে যা বললেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী
আবদুল বাছির বলেন, ‘প্রায় তিন বছর তিন মাস ধরে আমার ছেলে কারাগারে ছিল। গত রোববার সে আমাকে ফোন দিয়েছিল। বলেছিল, সে সমস্যার মধ্যে রয়েছে। এটাই ছিল তার সঙ্গে আমার শেষ কথা। এরপর গত বুধবার জানতে পারি, আমার ছেলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।’
তার বাবার দাবি, কারাগারে থাকাকালে নজরুল তাকে জানিয়েছিল, বাংলাদেশ কনস্যুলেটের কেউ তার সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। আবদুল বাছির বলেন, ‘প্রতিটি দেশের কনস্যুলেট কারাগারে থাকা নিজ দেশের নাগরিকদের খোঁজখবর নেয়। অথচ আমাদের দেশের কনস্যুলেট থেকে আমার ছেলের কোনো খোঁজ নেওয়া হয়নি বলে সে জানিয়েছিল। আমার ছেলের মতো আর কেউ যেন এভাবে মারা না যায়। বিদেশে কারাগারে থাকা বাংলাদেশিদের খোঁজখবর নেওয়ার ব্যবস্থা করা হোক।’
নজরুল আইনি সহায়তা পেয়েছিল কি না, আত্মপক্ষ সমর্থনের যথেষ্ট সুযোগ পেয়েছিল কি না এবং কারাগারে থাকা অবস্থায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এদিকে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে সৌদি কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশকে বিষয়টি জানায়নি বলে জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেট জানিয়েছে। এ ঘটনায় সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা ও বিস্তারিত তথ্য চেয়ে কূটনৈতিক চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও সৌদি রাষ্ট্রদূতের কাছে ঘটনার ব্যাখ্যা চেয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
নজরুল দেড় লাখ টাকা পাঠালেও তাকে বিদেশে পাঠাতে নেওয়া ঋণের বাকি অংশ এখনো পরিবারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে বলে জানা যায়। আবদুল বাছির বলেন, ‘আমার ছেলে গেল, সব হারিয়ে আমি এখন নিঃস্ব। সরকারের কাছে দাবি জানাই, আমার ছেলের মরদেহ যেন দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, নজরুলের মরদেহ দেশে ফেরানোর বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। মরদেহ ফিরিয়ে আনা হলে পরিবারকে সহায়তা করা হবে।
সৌদি কর্তৃপক্ষের বিবৃতিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কথা জানানো হলেও অভিযোগের বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। মামলার প্রকৃত অভিযোগ, বিচারপ্রক্রিয়া এবং রায় সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তথ্য পাওয়া জরুরি।