Dhaka Mail Logo

জাতীয়

সৌদিতে ২ বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড নিয়ে বিতর্ক, কী বলছেন আইনজ্ঞরা

নিজস্ব প্রতিবেদক

১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:২৯ পিএম

সৌদি আরবের মক্কা নগরীর একটি মসজিদে অনৈতিক কাজের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর দেশটির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা চেয়েছে বাংলাদেশ।

প্রশ্ন উঠেছে, দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে তাঁদের পরিবার বা দূতাবাসকে কোনো তথ্য না জানিয়ে সৌদি আরব ভিয়েনা কনভেনশন লঙ্ঘন করেছে কি না।

এ বিষয়ে বাংলাদেশের কাছে ব্যাখ্যা দিতে সৌদি আরব আইনগতভাবে কতটা বাধ্য, ওই দুই বাংলাদেশির মরদেহ কী প্রক্রিয়ায় দেশে আনা হবে কিংবা আদৌ আনা হবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

জেদ্দায় বাংলাদেশ দূতাবাসের সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, ওই দুই বাংলাদেশির আটক, বিচার ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ দূতাবাসকে কোনো তথ্য জানায়নি।

তবে সংবাদমাধ্যম থেকে বিষয়টি জানার পর বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চাওয়া ব্যাখ্যা সৌদি আরব দিতে বাধ্য কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেন, কোনো নাগরিক বিদেশে এমন পরিস্থিতির মুখে পড়লে তিনি নিজ দেশের কনস্যুলার সুবিধা চাইতে পারেন।

তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, কিন্তু এ ক্ষেত্রে কী ঘটেছে, তা জানা নেই। বিচারটি সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ আইনি প্রক্রিয়ায় হওয়ায় বাংলাদেশকে জানানোর ক্ষেত্রে দেশটির কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। তবে বাংলাদেশ জানতে চাইলে সৌদি আরব জবাব দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুই বাংলাদেশির পরিবার ও বাংলাদেশ দূতাবাসকে না জানিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার মাধ্যমে সৌদি আরব ভিয়েনা কনভেনশন লঙ্ঘন করেছে।

সৌদি আরব ভিয়েনা কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশ। ১৯৮১ সালে দেশটি কূটনৈতিক সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা কনভেনশনে স্বাক্ষর করে।

ওই কনভেনশনের ৩৬ অনুচ্ছেদে বিদেশি কোনো নাগরিককে আটক বা বন্দি করা হলে তাঁর অনুরোধে বিলম্ব না করে নিজ দেশের কনস্যুলার বিভাগ বা দূতাবাসকে জানানোর কথা বলা হয়েছে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ রায়হান রশীদ বলেন, প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে আপিলের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। অর্থাৎ, ঘটনাটি হঠাৎ করে ঘটেনি।

তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, বিষয়টি বাংলাদেশ দূতাবাসের জানা উচিত ছিল। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা সৌদি কর্তৃপক্ষ কিছু না জানালে দূতাবাস কিছুই জানবে না, তা গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, পুরো প্রক্রিয়াটি এক দিনে সম্পন্ন হয়নি। ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী, ওই দুই ব্যক্তিকে তাঁদের কনস্যুলার সুবিধা নেওয়ার বিষয়ে বারবার জানানোর কথা। তাঁরা সেই সুবিধা নিতে না চাইলে সৌদি কর্তৃপক্ষের দায় থাকে না।

ঘটনা নিয়ে কী জানা যাচ্ছে

সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ) দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে গত বুধবার দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর জানায়।

ওই খবরে বলা হয়, মক্কার একটি মসজিদে অনৈতিক ও অশালীন কাজে লিপ্ত থাকার অভিযোগে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী তাঁদের আটক করে।

খবরটি জানাজানি হওয়ার পর বৃহস্পতিবার জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট থেকে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে ঘটনার বিস্তারিত জানাতে অনুরোধ করা হয়।

জেদ্দায় বাংলাদেশ দূতাবাসের সূত্রগুলো বলছে, দুই বাংলাদেশিকে আটক, তাঁদের বিচার ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ দূতাবাসকে কোনো তথ্য জানায়নি।

সূত্রগুলোর ভাষ্য, ওই দুই ব্যক্তি বাংলাদেশের নাগরিক কি না, তা-ও দূতাবাসের মাধ্যমে যাচাই করেনি সৌদি কর্তৃপক্ষ। অথচ বিদেশি কোনো নাগরিক আটক বা বন্দি হলে ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী তাঁর দেশের দূতাবাসকে অবহিত করার কথা।

ব্র্যাকের অভিবাসন বিভাগের প্রধান শরীফুল হাসান বলেন, পুরো প্রক্রিয়ায় সৌদি আরব ভিয়েনা কনভেনশন লঙ্ঘন করেছে।

কূটনীতিকদের আচরণবিষয়ক ১৯৬১ সালে জাতিসংঘের উদ্যোগে বিভিন্ন দেশের অংশগ্রহণে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এটি ভিয়েনা কনভেনশন অন ডিপ্লোম্যাটিক রিলেশনস নামে পরিচিত। এই কনভেনশনে উল্লেখিত নীতিমালার ভিত্তিতে বিভিন্ন দেশে অন্য দেশের কূটনৈতিক মিশন ও প্রতিনিধিরা দায়িত্ব পালন করেন।

বিশ্বের ১৮০টিরও বেশি দেশ এই চুক্তি অনুসমর্থন করেছে। এটি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্ক ও কনস্যুলার অধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত।

এই কনভেনশনের ৩৬ অনুচ্ছেদে বিদেশি কোনো দেশে আটক বা গ্রেপ্তার হওয়া নাগরিকের নিজ দেশের দূতাবাস বা কনস্যুলেটের সঙ্গে যোগাযোগ এবং আইনি সহায়তা পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।

এর আওতায় কনস্যুলার কর্মকর্তারা আটক ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাৎ, কথা বলা ও যোগাযোগ করতে পারেন। পাশাপাশি ওই ব্যক্তি চাইলে তাঁর আইনি প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থাও করতে পারেন।

রায়হান রশীদ বলেন, বাংলাদেশ ও সৌদি আরব ভিয়েনা কনভেনশনে স্বাক্ষর করেছে। ফলে বিদেশি নাগরিক আটক হলে এ-সংক্রান্ত বিধান মানার বাধ্যবাধকতা দুই দেশেরই রয়েছে।

তিনি বলেন, আটক ব্যক্তিরা কনস্যুলার সুবিধা নিতে চান কি না, সে বিষয়ে তাঁদের জানাতে হবে। এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে কি না, তার প্রমাণ সৌদি আরবের কাছে থাকার কথা।

মূলত ভিয়েনা কনভেনশনের ৩৬ অনুচ্ছেদে বিদেশি নাগরিকদের কনস্যুলার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। অর্থাৎ, বিদেশি কোনো নাগরিককে আটক করা হলে তাঁর দেশের কনস্যুলার বিভাগকে জানাতে হবে। এরপর কনস্যুলার কর্মকর্তারা ওই নাগরিকের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তার ব্যবস্থা করতে পারেন।

শরীফুল হাসান বলেন, এ ক্ষেত্রে কিছুই করা হয়নি। সৌদি আরব এর আগেও বাংলাদেশি নাগরিকদের সঙ্গে এমন আচরণ করেছে। তাঁর প্রশ্ন, এই দুই ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হলে সৌদি আরব কি একই কাজ করতে পারত?

তবে রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেন, কোনো দেশে বিদেশি নাগরিক অপরাধে জড়ালে সেই দেশের অভ্যন্তরীণ আইনি প্রক্রিয়ায় বিচার করতে বাধা নেই। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষ বিদেশি নাগরিকের দূতাবাসকে জানাতে আইনগতভাবে বাধ্য নয়।

তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, অনেক দেশের কর্তৃপক্ষ বিদেশি নাগরিককে আটক করলে তাঁর দূতাবাসকে অবহিত করে। আবার কোনো দেশ নিজের নাগরিকের আটক হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট দেশ তথ্য দিয়ে থাকে। তবে এ ক্ষেত্রে আইনি বাধ্যবাধকতা নেই।

মরদেহ আসবে কবে

ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জেদ্দায় বাংলাদেশ মিশনের কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ এখনো বাংলাদেশকে কোনো তথ্য জানায়নি।

ফলে ওই দুই ব্যক্তির মরদেহ কোথায় রয়েছে, তা জানা যায়নি। কবে নাগাদ মরদেহ বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হবে, সে বিষয়েও নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই।

বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে না জানানোর কারণে ওই দুই বাংলাদেশির পরিবারকেও দূতাবাসের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য দেওয়া বা তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না।

পরিবারের পক্ষ থেকে আবেদন করা হলে দূতাবাস সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মৃত ব্যক্তির মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করে থাকে।

শরীফুল হাসান বলেন, এ ক্ষেত্রে পরিবার বা দূতাবাস—কারও সঙ্গেই সৌদি কর্তৃপক্ষ যোগাযোগ করেনি। এমনকি ওই দুই ব্যক্তি আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পেয়েছিলেন কি না, তা-ও নিশ্চিত নয়। বিদেশি নাগরিক হিসেবে তাঁরা কনস্যুলার সুবিধার আওতায় দূতাবাসের মাধ্যমে আইনি সহায়তা পাওয়ার অধিকারী ছিলেন। কিন্তু সৌদি আরব এ ক্ষেত্রে সবাইকে অন্ধকারে রেখেছে।

এআর