নিজস্ব প্রতিবেদক
১৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৪৩ পিএম
জলবায়ু পরিবর্তন দেশের অর্থনীতি, কৃষি, শিল্প ও জনজীবনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, বন্যা, অনাবৃষ্টি ও লবণাক্ততার কারণে উৎপাদনশীলতা কমছে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় অর্থনীতিকে আরও সহনশীল করা, আগাম প্রস্তুতি নেওয়া এবং অভিযোজন ও প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলের গ্র্যান্ড বলরুমে দৈনিক বণিক বার্তা আয়োজিত ‘গ্রিন ডায়ালগ: জলবায়ু পরিবর্তন ও অর্থনীতির পুনর্বিন্যাস’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
পরিবেশমন্ত্রী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন অর্থনৈতিক খাতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অতিরিক্ত গরমে কারখানার শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা কমছে। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ায় কৃষিজমি ও সুপেয় পানির ওপর চাপ বাড়ছে। অন্যদিকে অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি ও বন্যার কারণে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সড়ক ও যোগাযোগ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে পরিবহন ব্যয় বাড়ছে। শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ব্যাহত হলে রপ্তানি ও কর্মসংস্থানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে প্রবৃদ্ধির শ্লথগতি, মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতা এবং জ্বালানি খাতের চাপসহ নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে। এটি চূড়ান্ত হিসাব নয়। তবে বিদ্যমান পরিস্থিতি অর্থনীতির সহনশীলতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতি অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কার্যক্রমে জলবায়ু ঝুঁকিকে গুরুত্ব দিতে হবে।
কৃষি খাতের গুরুত্ব তুলে ধরে পরিবেশমন্ত্রী বলেন, কৃষি দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, গ্রামীণ কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য হ্রাস, বাজারের স্থিতিশীলতা ও সামাজিক নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি। দেশে সেচব্যবস্থার উন্নয়ন হলেও কৃষি এখনো অনেকাংশে আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। ফলে অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, বন্যা ও লবণাক্ততা বৃদ্ধির মতো জলবায়ুজনিত পরিবর্তন কৃষি উৎপাদনের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। এসব ঝুঁকি কমাতে সময়োপযোগী অভিযোজন কৌশল ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
তিনি বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলেও যথাযথ প্রস্তুতি, পরিকল্পনা ও কার্যকর অভিযোজনের মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমানো যায়। বন্যায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া কিংবা শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগাম ব্যবস্থা নিতে হবে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন টেকসই করতে জলবায়ু সহনশীলতা বাড়ানোর বিকল্প নেই।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. মো. সাইমুম পারভেজ বলেন, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের অবদান তুলনামূলকভাবে কম হলেও এর বিরূপ প্রভাবে দেশটি অত্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর অর্থনীতি থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর অর্থনীতিতে বৈশ্বিক রূপান্তরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

বণিক বার্তার সম্পাদক ও প্রকাশক দেওয়ান হানিফ মাহমুদের সঞ্চালনায় প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল, টিকে গ্রুপের গ্রুপ ডিরেক্টর মোহাম্মাদ মুস্তাফা হায়দার, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান ও অনন্ত গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শরীফ জহীর, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল কাদের, হ্যামস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী শফিকুর রহমান, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন এবং ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস. এম. মনিরুল ইসলাম।
প্যানেল আলোচনায় বক্তারা পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ, জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি, জলবায়ু অর্থায়ন, টেকসই কৃষি এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন। জলবায়ু পরিবর্তনের অর্থনৈতিক ক্ষতি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কার্যকর নীতিসহায়তার প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেন তারা।
অনুষ্ঠানে পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন ও জলবায়ু অর্থায়নে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ হ্যামস গার্মেন্টস লিমিটেড ও ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডকে সম্মাননা দেওয়া হয়। হ্যামস গার্মেন্টস আন্তর্জাতিক লিড প্লাটিনাম সনদে ১১০-এর মধ্যে ১০৮ স্কোর অর্জন করে বিশ্বসেরা অবস্থান অর্জন করেছে বলে অনুষ্ঠানে জানানো হয়। অন্যদিকে, সৌর হোম সিস্টেমের মাধ্যমে কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের বিপরীতে ২৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার কার্বন রাজস্ব দেশে আনার স্বীকৃতি পায় ইডকল। পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টুসহ আমন্ত্রিত অতিথিরা প্রতিষ্ঠান দুটির প্রতিনিধিদের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন।
অনুষ্ঠানে সরকারের নীতিনির্ধারক, অর্থনীতিবিদ, শিল্পোদ্যোক্তা, পরিবেশ ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ এবং সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের চার শতাধিক প্রতিনিধি অংশ নেন।
এএইচ/এআরএম