নিজস্ব প্রতিবেদক
১৩ অক্টোবর ২০২৬, ১০:১৬ পিএম
রাজনৈতিক পরিবর্তন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও ন্যায়বিচারের আন্দোলনে নারীরা সামনের সারিতে থাকলেও পরবর্তী সময়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সংবিধান প্রণয়ন ও নতুন প্রতিষ্ঠান গঠনের প্রক্রিয়ায় প্রায়ই তাদের উপেক্ষা করা হয়। রাজনৈতিক রূপান্তরের সময় নারীদের নেতৃত্ব ও অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন দেশি-বিদেশি শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, রাজনীতিক ও অধিকারকর্মীরা।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে ‘উইমেন, পাওয়ার অ্যান্ড পলিটিক্যাল অর্ডারস ইন মুসলিম সোসাইটি কনটেক্সটস’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বক্তারা এসব কথা বলেন। ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি), ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় এবং উইমেন লিভিং আন্ডার মুসলিম লজ যৌথভাবে এ সম্মেলনের আয়োজন করে। বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, পাকিস্তান, ফিলিস্তিন ও সিরিয়ার শিক্ষাবিদ, অধিকারকর্মী, আইনপ্রণেতা, আইনজীবী ও নীতি বিশেষজ্ঞরা এতে অংশ নেন।
বক্তারা বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও পরিবর্তনের সময়ে নারীরা আন্দোলন সংগঠিত করা, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং ন্যায়বিচারের দাবিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। কিন্তু নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা গঠন, সংবিধান প্রণয়ন ও নীতিনির্ধারণের সময় তাঁদের অংশগ্রহণ অনেক ক্ষেত্রেই সীমিত থাকে। ফলে আন্দোলনের সময় অর্জিত সুযোগ ও অধিকার দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
বিআইজিডি ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাহী পরিচালক ড. ইমরান মতিন বলেন, রাজনৈতিক রূপান্তরের সময়ে নারীরা একদিকে পরিবর্তনের চালিকাশক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখেন, অন্যদিকে নতুন শক্তির উত্থানের কারণে ক্ষতিগ্রস্তও হন। এই পরিসরকে সুসংগঠিত করা গেলে নারীরা পরিবর্তনের শক্তিশালী কারিগর হয়ে উঠতে পারবেন।
কনকর্ডিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও উইমেন লিভিং আন্ডার মুসলিম লজের নির্বাহী পর্ষদের সদস্য ড. হোমা হুদফার বলেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় নারীদের অর্জিত অধিকার প্রায়ই খর্ব হয়। নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার নিয়মকানুন প্রণয়নের সময় নারীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার পাশাপাশি সংবিধানে সমতার স্বীকৃতি এবং তা কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক ও সংগঠনটির নির্বাহী পর্ষদের সদস্য ড. মোনা তাজালি বলেন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলেই জেন্ডারসমতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিষ্ঠা পাবে, এমন ধারণা ঠিক নয়। রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময়ে ক্ষমতায় কিছু নারীকে দেখা গেলেও তাঁদের অবস্থান সাময়িক ও নাজুক হতে পারে।
বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের অনারারি নির্বাহী পরিচালক ব্যারিস্টার সারা হোসেন ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর নারীদের অধিকার নিয়ে শুরু হওয়া আলোচনা থেকে বাস্তবে কতটা পরিবর্তন এসেছে, সেই প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, সমাজে নারীর অবস্থান নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। তা না হলে একই পরিস্থিতি চলতে থাকবে। নারী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও বিভিন্ন দলের সঙ্গে জোট ও সহযোগিতা গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
রাজনৈতিক ক্ষমতায় নারীদের অংশগ্রহণের পথ আরও স্বচ্ছ ও দৃশ্যমান করার ওপর গুরুত্ব দেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মারদিয়া মুমতাজ। তিনি বলেন, পেশিশক্তির ব্যবহার ছাড়াই নারীরা যাতে রাজনীতিতে অংশ নিতে পারেন, সে জন্য কার্যকর সুযোগ তৈরি করতে হবে। নারী ও পুরুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণে রাজনৈতিক ক্ষমতা গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, শুধু জামায়াতে ইসলামী নয়, সব রাজনৈতিক দলেই এমন অংশগ্রহণ দেখতে চান তিনি।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার শাইখ মাহদি গুমবিরোধী আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, গুমের শিকার ব্যক্তিদের মা, মেয়ে ও স্ত্রীরাই রাষ্ট্রীয় সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। নারীপক্ষের সাফিয়া আজিম বীরাঙ্গনাদের স্বীকৃতি এবং নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় চলমান লড়াইয়ের বিষয়টি তুলে ধরেন।
সমাপনী বক্তব্যে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব জেনারেল এডুকেশনের ডিন ড. সামিয়া হক মুসলিম সমাজে নারীর অগ্রগতির জন্য আন্তর্জাতিক সীমানা পেরিয়ে সংহতি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, নারীদের ব্যক্তিসত্তার বৈচিত্র্য বিবেচনায় নিতে হবে। তাঁদের নিয়ন্ত্রণ করতে চাওয়া রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক শক্তির প্রভাব কাটিয়ে ওঠার সুযোগ দিতে হবে। নারীদের নিজস্ব পছন্দ ও আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হলে মুসলিম সমাজে নারী ও পুরুষের বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতাও যথাযথভাবে তুলে ধরা সম্ভব হবে।
সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ও মানবিক বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ড. ফিরদৌস আজিম, বিআইজিডির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ শাহান, বিআইজিডির সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট তাহরিমা বিনতে তারিক, প্রোগ্রাম অ্যাসিস্ট্যান্ট জিনাত খান মধ্যমা, নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ও বিআইজিডির সিনিয়র ফেলো অব প্র্যাকটিস মাহীন সুলতান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সদস্য উমামা ফাতেমা এবং ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের সেন্টার ফর সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের পরিচালক অবন্তী হারুন প্রমুখ।
এএইচ/এআর