নিজস্ব প্রতিবেদক
১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৫০ পিএম
আগুন নিয়ন্ত্রণে এসেছে প্রায় নয় ঘণ্টা আগে। কিন্তু মঙ্গলবার দুপুরেও রাজধানীর পুরান ঢাকার চকবাজারের মনসুর খান প্লাজা থেকে বের হচ্ছিল ধোঁয়া। ভবনের ভেতরে কোথাও কোথাও তখনো আগুন জ্বলতে দেখা যায়। ওপর থেকে ভেঙে পড়ছিল কাঁচের টুকরা। এমন পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার কারণে ভবনে ঢুকতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা।
ফলে আগুনে কার কত টাকার মালামাল পুড়েছে, সেই হিসাবও করতে পারছেন না কেউ। বাইরে দাঁড়িয়ে নিজেদের দোকান ও গোডাউনের পরিণতি জানার অপেক্ষায় রয়েছেন তারা।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) দুপুরে পুরান ঢাকার চকবাজারের ছোট কাটারা গলিতে অবস্থিত সাততলা ভবনটির সামনে গিয়ে এমন পরিস্থিতি দেখা যায়।
আগের দিন বিকেলে ভবনটিতে আগুন লাগে। প্রায় ১২ ঘণ্টা পর মঙ্গলবার ভোরে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে ফায়ার সার্ভিস। তবে সকালেও ভবন থেকে ধোঁয়া বের হতে থাকায় ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ কাটেনি।
ভবনটির নিচের তলাগুলোতে ব্যাগ ও প্রসাধনসামগ্রীর দোকান। ওপরের তিনটি তলায় রয়েছে এসব পণ্যের গোডাউন। ব্যবসায়ীদের হিসাবে, পঞ্চম থেকে সপ্তম তলা পর্যন্ত ৫০টির বেশি গোডাউন রয়েছে। একেকটি গোডাউনে কয়েক লাখ থেকে কয়েক দশ লাখ টাকার মালামাল মজুত ছিল। সব মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ কয়েক কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। তবে ভেতরে প্রবেশ করতে না পারায় কেউই নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছেন না।
কামাল নামে পাঁচতলার এক কাপড়ের গোডাউনের মালিক ঢাকা মেইলকে বলেন, তার গোডাউনে প্রায় ৩০ লাখ টাকার মালামাল ছিল। আগুন লাগার পর থেকে একবারও ভেতরে যেতে পারেননি। ফলে মালামালের কতটা পুড়েছে কিংবা কিছু অবশিষ্ট আছে কি না, তা জানার সুযোগ হয়নি।
ওই ব্যবসায়ী বলেন, আগুনের সূত্রপাত হয়েছে যে তলায়, তার গোডাউনও তার নিচতলায়। ফলে ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা বেশি। গোডাউনের সব মালামাল পুড়ে গেলে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে তার জন্য।
ব্যবসায়ীরা জানান, ভবনের ওপরের তলাগুলো মূলত পণ্য মজুতের কাজে ব্যবহার করা হয়। সেখানে নিয়মিত লোকজন থাকেন না। প্রয়োজন অনুযায়ী দোকানের মালামাল আনা-নেওয়া করা হয়। সোমবার বিকেল ৫টার দিকে নিচের দোকানগুলোর কর্মচারীদের মাধ্যমে আগুন লাগার খবর পান অনেকে। এরপর দ্রুত ঘটনাস্থলে এলেও নিজেদের মালামাল সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাননি।
আগুনে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত গোডাউনগুলোর পাশাপাশি নিচতলার দোকানমালিকেরাও বিপাকে পড়েছেন। আগুন লাগার পর থেকে ব্যবসা বন্ধ রয়েছে। ভবনে প্রবেশের সুযোগ না থাকায় দোকানের মালামালও সরাতে পারছেন না তারা। এতে আগুনে পণ্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কার পাশাপাশি ব্যবসা বন্ধ থাকার ক্ষতিও বাড়ছে।
নিচতলার এক ব্যাগ ব্যবসায়ী বলেন, ভবনের ভেতরে কোটি কোটি টাকার মালামাল রয়েছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসতে দীর্ঘ সময় লাগায় অনেকের পুঁজি শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অথচ সকাল পর্যন্ত ধোঁয়া বের হতে থাকায় কেউ নিজের দোকান বা গোডাউনের অবস্থা দেখতে পারছেন না।
আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ভূমিকা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন কয়েকজন ব্যবসায়ী। তাদের অভিযোগ, আগুন নেভাতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার মতো আধুনিক সরঞ্জাম ও পর্যাপ্ত সক্ষমতা থাকলে ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব হতো।
তবে ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, পুরান ঢাকার সরু রাস্তা ও ভবনটির কাঠামোগত জটিলতার কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে বেগ পেতে হয়েছে।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, সোমবার বিকেল ৫টা ৪ মিনিটে চকবাজারের ছোট কাটারা গলির মনসুর খান প্লাজায় আগুন লাগার খবর পাওয়া যায়। খবর পেয়ে পর্যায়ক্রমে ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। দীর্ঘ চেষ্টার পর মঙ্গলবার ভোর ৫টা ২০ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।
ফায়ার সার্ভিসের সদরদপ্তরের মিডিয়া সেলের কর্মকর্তা তালহা বিন জসিম জানান, আগুন নিয়ন্ত্রণে ১০টি ইউনিট কাজ করেছে। আগুনে ভবনটির ছয়তলায় থাকা সব মালামাল পুড়ে গেছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। আগুন নেভানোর সময় তীব্র ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়েন ফায়ার সার্ভিসের দুই কর্মী।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ঢাকা বিভাগের সহকারী পরিচালক কাজী নজমুজ্জামান জানান, আগুনের ঘটনায় ভবনের ভেতরে এখন আর আগুন নেই। আগুনের কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে তদন্ত কমিটি কাজ করছে। তদন্ত শেষে আগুন লাগার প্রকৃত কারণ এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানা যাবে।
এদিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পরও ভবনের ভেতরে প্রবেশ করতে না পারায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কারও গোডাউনে কয়েক ১০ লাখ টাকার পণ্য, কারও আবার দীর্ঘদিনের ব্যবসার পুঁজি আটকে রয়েছে। কিন্তু ধোঁয়া ও ভেঙে পড়া কাঁচের কারণে ভেতরের পরিস্থিতি জানার সুযোগ নেই।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, আগুনে ক্ষতির পরিমাণ সম্পর্কে ধারণা থাকলেও প্রকৃত হিসাব পাওয়া যাবে ভবনে প্রবেশের পর। ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। কেউ জানেন না, গোডাউনের দরজা খুলে কতটুকু মালামাল অক্ষত পাওয়া যাবে।
এমএইচ/এমআইকে/এএইচ