মোস্তফা ইমরুল কায়েস
১১ অক্টোবর ২০২৬, ১০:২২ পিএম
সমুদ্র, পাহাড়, দ্বীপ আর নৈসর্গিক সৌন্দর্য—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের পর্যটনের অন্যতম বড় আকর্ষণ কক্সবাজার। এবার এই অঞ্চলকে শুধু দেশীয় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে নয়, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন হাব হিসেবে গড়ে তুলতে চায় সরকার। এ লক্ষ্যে নেওয়া হচ্ছে সমন্বিত মহাপরিকল্পনা। উন্নত করার উদ্যোগ রয়েছে রেল ও বিমান যোগাযোগের, বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ। একই সঙ্গে গুরুত্ব পাচ্ছে স্পোর্টস, মেরিন, ইকো ও কনভেনশন ট্যুরিজম। তবে এসব পরিকল্পনা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
সরকারের নতুন পরিকল্পনায় বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের পরিবর্তে সমন্বিত কাঠামোর আওতায় কক্সবাজারের পর্যটন উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে। পর্যটন অবকাঠামোর পাশাপাশি পরিবেশ, নগর ব্যবস্থাপনা, পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশন, যোগাযোগ ও বিনিয়োগকে একই পরিকল্পনার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ২০২৬ সালের মধ্যে কক্সবাজারের জন্য নতুন সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পরিকল্পনায় মেরিন ড্রাইভ, পর্যটকদের সুযোগ-সুবিধা, পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ এবং বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানোর বিষয় রয়েছে।
তবে কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক পর্যটন হাব হিসেবে গড়ে তোলার পথে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সারা বছর পর্যটক আকৃষ্ট করা, আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগ সম্প্রসারণ, সড়ক যোগাযোগ ও নিরাপত্তার উন্নয়ন, উপকূল সংরক্ষণ এবং অতীতের পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নে ধীরগতির অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া।
আন্তর্জাতিক প্রচারণা ও বিমান যোগাযোগ বাড়ানোর তাগিদ
ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টোয়াব)-এর সাবেক সভাপতি শিবলুল আযম কোরেশী ঢাকা মেইলকে বলেন, কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিতে হবে।
তার মতে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক প্রচারণা চালানো জরুরি। কক্সবাজারের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ এর দীর্ঘ, অবিচ্ছিন্ন প্রায় ১২০ কিলোমিটার সমুদ্রসৈকত। এ ধরনের প্রাকৃতিক আকর্ষণ বিশ্বে খুবই বিরল। এই বৈশিষ্ট্য যথাযথভাবে তুলে ধরতে পারলে বিদেশি পর্যটকদের আগ্রহ ও আগমন বাড়ানো সম্ভব।
বর্তমানে কক্সবাজারের পর্যটন মূলত দেশীয় পর্যটকদের ওপর নির্ভরশীল। বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে আন্তর্জাতিক বাজারে কক্সবাজারের পরিচিতি বাড়াতে হবে। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পর্যটন সংস্থা, ট্রাভেল এজেন্সি ও বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমকে কাজে লাগানো যেতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
শিবলুল আযম কোরেশী আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগ সম্প্রসারণের জন্য পর্যাপ্ত চাহিদা তৈরি করতে হবে। কক্সবাজারের সঙ্গে সরাসরি আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগ গড়ে তোলার সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে আগে বিদেশি পর্যটকদের মধ্যে ভ্রমণের আগ্রহ সৃষ্টি করতে হবে। বিশেষ করে ব্যাংকককে কেন্দ্র করে কক্সবাজারের পর্যটন প্রচারণা জোরদার করা যেতে পারে।
ব্যাংকক ও কক্সবাজারের মধ্যে সরাসরি বিমান যোগাযোগ চালুর যে উদ্যোগ সরকারের রয়েছে, তা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট দেশ ও অঞ্চলে ব্যাপক প্রচারণা চালানো জরুরি। পর্যটকের চাহিদা তৈরি হলে এয়ারলাইনগুলোও ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়াতে আগ্রহী হবে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পর্যটন মৌসুমে কক্সবাজারে প্রতিদিন প্রায় ২০টি ফ্লাইট চলাচল করে। এ থেকে বিমান যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটি ভিত্তি তৈরির ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এখন প্রয়োজন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানো এবং সেই চাহিদাকে কাজে লাগানো।
সড়ক যোগাযোগ ও নিরাপত্তার উন্নয়ন জরুরি
টোয়াবের বর্তমান প্রচার সম্পাদক মো. ইউনুস ঢাকা মেইলকে বলেন, কক্সবাজারকে পর্যটন হাব হিসেবে গড়ে তুলতে কয়েকটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। এর মধ্যে প্রথমেই সড়ক যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন প্রয়োজন। কক্সবাজারে রেল যোগাযোগ চালু হয়েছে এবং বিমান যোগাযোগও আগের তুলনায় উন্নত হয়েছে। তবে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সড়ক যোগাযোগ আরও সহজ, দ্রুত ও নিরাপদ করা দরকার।
পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তার মতে, বিশ্বের অন্যান্য পর্যটনকেন্দ্রের তুলনায় কক্সবাজারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে সামগ্রিকভাবে খারাপ বলার সুযোগ নেই। তবে পর্যটকদের নিরাপত্তা আরও জোরদার করতে নিয়মিত নজরদারি, পর্যাপ্ত নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন এবং দ্রুত অভিযোগ গ্রহণ ও প্রতিকারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
মো. ইউনুস মনে করেন, কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার মতো প্রাকৃতিক আকর্ষণ ও সম্ভাবনা বাংলাদেশের রয়েছে। এ জন্য সমন্বিত পরিকল্পনা, আন্তর্জাতিক প্রচারণা, সরাসরি বিমান যোগাযোগ সম্প্রসারণ, উপকূল সংরক্ষণ, উন্নত সড়ক যোগাযোগ এবং পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এসব উদ্যোগ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে কক্সবাজার আন্তর্জাতিক পর্যায়েও গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে পারে।
পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আন্তর্জাতিক পর্যটন হাব হতে হলে সহজ যোগাযোগব্যবস্থা অন্যতম প্রধান শর্ত। এ ক্ষেত্রে কক্সবাজার আগের চেয়ে অনেক এগিয়েছে। তবে শুধু যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন হলেই বিদেশি পর্যটক আসবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই। আন্তর্জাতিক পর্যটকদের জন্য ভিসা সুবিধা, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, পর্যটনবিষয়ক তথ্য, গাইড, বহুভাষিক সেবা এবং আন্তর্জাতিক মানের বিনোদন ও অবকাশ সুবিধাও নিশ্চিত করতে হবে।
সারা বছর পর্যটক আকৃষ্ট করাই বড় চ্যালেঞ্জ
কক্সবাজারে পর্যটকের অভাব নেই। বিশেষ করে ঈদ, শীতকাল ও বিভিন্ন সরকারি ছুটিতে হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টে ব্যাপক চাপ তৈরি হয়। কিন্তু এই চাহিদার বড় অংশই মৌসুমি। ছুটির সময়ে বিপুলসংখ্যক পর্যটক এলেও বছরের অন্যান্য সময়ে অনেক হোটেল ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পর্যটকের উপস্থিতি কমে যায়। ফলে পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে বছরের বাকি সময় তুলনামূলক কম পর্যটক নিয়ে চলতে হয়। সারা বছর পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে না পারা কক্সবাজারকে পর্যটন হাব হিসেবে গড়ে তোলার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
কক্সবাজার পর্যটন সমিতির সাধারণ সম্পাদক বেলাল আবেদীন ভূট্টো বলেন, সরকার যে পরিকল্পনাই নিক না কেন, তাতে স্থানীয় মানুষের সম্পৃক্ততা থাকতে হবে। স্থানীয় জনগণকে সঙ্গে নিয়েই এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। তা না হলে পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে। অতীতের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করাও প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, সৈকতকেন্দ্রিক পর্যটনের বাইরে কক্সবাজারকে এমন একটি গন্তব্যে পরিণত করতে হবে, যেখানে পর্যটকেরা শুধু দুই দিন সৈকতে ঘুরে ফিরে যাবেন না; বরং তিন থেকে সাত দিন অবস্থান করার মতো পর্যটন পণ্য ও কার্যক্রম থাকবে।
তার মতে, কক্সবাজারে স্পোর্টস ট্যুরিজম, মেরিন ট্যুরিজম, দ্বীপভিত্তিক পর্যটন, অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজম, ইকো-ট্যুরিজম ও সাংস্কৃতিক পর্যটনের সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজনের মাধ্যমেও পর্যটনের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।
পুরোনো পরিকল্পনার অভিজ্ঞতা নতুন উদ্যোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ
বেলাল আবেদীন ভূট্টো জানান, কক্সবাজারকে পর্যটন হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নতুন নয়। এর আগে টেকনাফ ও মহেশখালীতে বড় আকারের পর্যটন পার্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সেগুলোর অনেকটাই প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি।
বিশেষ করে সাবরাং ট্যুরিজম পার্কের অভিজ্ঞতা প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বছরের পর বছর ধরে ভূমি উন্নয়ন, সড়ক, ড্রেনেজ ও অন্যান্য মৌলিক অবকাঠামোর কাজ অসম্পূর্ণ থাকায় বিনিয়োগকারীরাও প্রত্যাশিতভাবে এগিয়ে আসতে পারেননি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এমন পরিস্থিতিতে নতুন মাস্টারপ্ল্যান কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করছে পরিকল্পনার বাস্তবায়ন, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয় এবং অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার ওপর।
পর্যটন হাব গড়ার পরিকল্পনা নিয়ে যা বলছে পর্যটন বোর্ড
এ বিষয়ে বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ডের চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার মোতাসিম বিল্লাহ ফারুকী ঢাকা মেইলকে বলেন, এই এলাকাই দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ ও শক্তির জায়গা। কক্সবাজারকে বিমান পরিবহনের একটি আঞ্চলিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার চিন্তা করা হচ্ছে। এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পর্যটন খাতের উন্নয়ন এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ও বিদেশি যাত্রীদের যাতায়াত বাড়লে এখানকার পর্যটনকেন্দ্রগুলোকে বিশ্বমানের করে তোলা জরুরি হয়ে পড়বে। জাতীয় পর্যটন মহাপরিকল্পনার সঙ্গেও এই পরিকল্পনার সামঞ্জস্য রয়েছে।
ব্যারিস্টার মোতাসিম বিল্লাহ ফারুকী আরও বলেন, বিদেশি পর্যটক ও সম্মানিত অতিথিদের জন্য বিশেষ পর্যটন অঞ্চল গড়ে তোলাসহ পুরো এলাকাকে পর্যটনের মূল হাব হিসেবে গড়ে তোলার মহাপরিকল্পনা রয়েছে। সরকার বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। আশা করছি, খুব শিগগিরই আমরা জাতিকে একটি ভালো খবর দিতে পারব।
এমআইকে/এআর