Dhaka Mail Logo

জাতীয়

ভূমি ও কৃষিতে নারীর অধিকার নিশ্চিতে নীতিমালা পরিবর্তনের দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক

১১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:০২ পিএম

নারীর ভূমির অধিকার, কৃষিতে প্রবেশাধিকার, কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি এবং সমকাজে সমমজুরি নিশ্চিত করতে বিদ্যমান নীতিমালা পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছেন নাগরিক সমাজের নেতারা। তারা বলেছেন, শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও কৃষিতে তাদের অবদান যথাযথ স্বীকৃতি পাচ্ছে না। উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া ও জমির মালিকানা না থাকায় অনেক নারী কৃষিঋণ, প্রশিক্ষণ, কৃষি কার্ড, ভর্তুকি ও সরকারি প্রণোদনা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।

রোববার (১১ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস ও বিশ্ব খাদ্য দিবস উপলক্ষে রাজধানীতে আয়োজিত এক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (এএলআরডি) উদ্যোগে ‘ভূমি ও কৃষিতে নারী কৃষকের অধিকার এবং খাদ্যনিরাপত্তা: আমাদের করণীয়’ শীর্ষক এ সেমিনারের আয়োজন করা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন সংস্থাটির চেয়ারপারসন খুশী কবির।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এএলআরডির উপনির্বাহী পরিচালক রওশন জাহান মনি। তিনি বলেন, দেশে খাদ্য উৎপাদন বাড়লেও সবার কাছে স্বাস্থ্যকর খাবার পৌঁছাচ্ছে না। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থাসহ পাঁচটি সংস্থার যৌথ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষের স্বাস্থ্যকর খাবার কেনার সামর্থ্য নেই। খাদ্যনিরাপত্তা শুধু উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে না; খাদ্যের দাম, প্রাপ্যতা ও সুষম বণ্টনও এর সঙ্গে জড়িত।

মূল প্রবন্ধে বলা হয়, গ্রামীণ কৃষিশ্রমশক্তির প্রায় ৫৮ শতাংশ নারী হলেও কার্যকর ভূমির মালিকানায় তাদের অংশ মাত্র ৪ থেকে ৫ শতাংশ। উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া এবং জমির মালিকানা না থাকায় অনেক নারী কৃষিঋণ, প্রশিক্ষণ, কৃষি কার্ড, ভর্তুকি ও সরকারি প্রণোদনা পাওয়ার সুযোগ থেকে বাদ পড়ছেন। ফলে কৃষিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও উৎপাদন ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীরা পিছিয়ে থাকছেন।

আলোচনায় অংশ নিয়ে সংসদ সদস্য আন্না মিনজ বলেন, পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে নারীরা সিদ্ধান্ত গ্রহণে পিছিয়ে রয়েছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতেও নারীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কৃষিতে নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ থাকলেও কৃষক হিসেবে তাদের স্বীকৃতি দেওয়া হয় না। নারীর বিপুল শ্রম এখনো অবৈতনিক থেকে যাচ্ছে। এসব বিষয়ে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

সভাপতির বক্তব্যে খুশী কবির বলেন, কৃষি উৎপাদন ও বিপণনে নারীর অবদান উপেক্ষা করে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। নারী কৃষকের অধিকার নিশ্চিত করতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। নারীর ভূমির অধিকার নিশ্চিত করতে খাসজমি বিতরণ কার্যক্রম চালুর পাশাপাশি প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট নীতিমালা পরিবর্তন করতে হবে। কৃষকের কাছে উন্নত বীজ ও প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।

সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন রিসার্চ ইনিশিয়েটিভস বাংলাদেশের পরিচালক সুরাইয়া বেগম, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. নাজিম উদ্দীন, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. রেজিয়া খাতুন এবং এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা।

সেমিনার থেকে নারী কৃষকদের সরকারি সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করা, কৃষি কার্ডে তাদের নাম নিশ্চিত করা, খাসজমি বন্দোবস্তে অগ্রাধিকার দেওয়া, সহজ শর্তে কৃষিঋণ প্রদান এবং কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি নারী কৃষকদের জন্য কৃষিবিমা, সমকাজে সমমজুরি, নারীবান্ধব কৃষিপ্রযুক্তি এবং স্থানীয় বাজারে সরাসরি পণ্য বিক্রির সুযোগ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়।

বক্তারা বলেন, কৃষি ও স্থানীয় সরকারবিষয়ক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও নারী কৃষকদের প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে হবে। শুধু কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; তাদের শ্রমের স্বীকৃতি, সম্পদের ওপর অধিকার এবং উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাও জরুরি। এ জন্য নীতিগত সংস্কারের পাশাপাশি পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার পরিবর্তন ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন।

এএইচ/এআর