নিজস্ব প্রতিবেদক
১১ অক্টোবর ২০২৬, ০১:১৩ পিএম
গত ১৬ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার। বিকেল ৫টা ৩ মিনিটে রংপুরের শাবেরীন সিদ্দিকীর মুঠোফোনে ইংরেজিতে লেখা একটি এসএমএস আসে। তাতে বলা হয়, সিজিপিএর ভিত্তিতে তিনি ‘ব্র্যাক স্কুল’-এ প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। শিগগিরই তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে, পরে ৩৫০ টাকা রেজিস্ট্রেশন ফি দিতে হবে।
কিন্তু এ সংক্রান্ত কোনো নিয়োগ পরীক্ষাতেই বসেননি শাবেরীন। গত বছর অনলাইনে একটি বিজ্ঞপ্তি দেখে আবেদন করেছিলেন, সঙ্গে জমা দিয়েছিলেন সব সনদের স্ক্যান কপি। এরপর অনেক দিন কোনো খবর ছিল না। তাই এসএমএসটি পেয়ে তিনি ধরে নিয়েছিলেন, চাকরিটা বোধহয় পেয়ে যাচ্ছেন।
পরের ১৭ দিনে চার দফায় তার কাছ থেকে নেওয়া হয় প্রায় ১৩ হাজার টাকা। কখনো রেজিস্ট্রেশন, কখনো পুলিশ ভেরিফিকেশন, কখনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা ল্যাপটপের নামে। প্রতিবার টাকা দেওয়ার আগে বা পরে তার হাতে এসেছে দাফতরিক চেহারার কোনো না কোনো কাগজ। পঞ্চম দফায় বলা হয়, ল্যাপটপ কাস্টমসে আটকে আছে, ছাড়াতে আরও ৯ হাজার টাকা লাগবে। এবার সন্দেহ হলে শাবেরীন নিজেই ব্র্যাকের একটি কার্যালয়ে যান। সেখানে গিয়ে জানতে পারেন, পুরো নিয়োগপ্রক্রিয়াটাই ভুয়া।
রিউমর স্ক্যানার ইনভেস্টিগেশন ইউনিটের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শাবেরীন যে বিজ্ঞপ্তি দেখে আবেদন করেছিলেন, সেটি প্রকাশ করা হয়েছে school.bracedu.net নামের একটি ওয়েবসাইটে। ব্র্যাকের নাম, লোগো ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের ছবি ব্যবহার করে বানানো এই সাইটে তিনটি পদে ১ হাজার ১৯০ জনকে নিয়োগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। আবেদন ফরমে চাওয়া হয়েছে জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর, মা-বাবার নাম, ঠিকানা আর সব সনদের স্ক্যান কপি। ব্র্যাক বলছে, এই সাইটের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই এবং নিয়োগের কোনো ধাপেই তারা টাকা নেয় না।
অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, সাইটের ‘ডোনেট’ পেজে অনুদানের জন্য যে নগদ নম্বর দেওয়া আছে, শাবেরীনের চার দফার টাকা গেছে সেই নম্বরেই। একই পেজে বিদেশি অনুদানের জন্য দেওয়া হয়েছে হংকংভিত্তিক একটি ক্রিপ্টো পেমেন্ট সেবার কার্ড নম্বর, পাশে ব্র্যাক ব্যাংকের সুইফট কোডের আদলে বানানো একটি কোড। আর শাবেরীনের কাছে আসা এসএমএসটি হুবহু একই ভাষায় সেপ্টেম্বরেও অন্য নম্বর থেকে চাকরিপ্রার্থীদের কাছে গেছে। ব্র্যাকের সতর্কবার্তার পরও এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সাইটটি সচল রয়েছে।
‘আরাফাত স্যার’ এর ফোন
শাবেরীনের খোঁজ মেলে ওই নগদ নম্বর ধরেই। ভুয়া সাইটের ডোনেট পেজে নম্বরটি দেওয়া আছে, ০১৭৮৭-৮০৯৫৯৬। এটি দিয়ে ফেসবুকে খুঁজতে গিয়ে পাওয়া যায় শাহারিয়া সিদ্দিকী নামের একজনের গত ৫ মে’র একটি পোস্ট। নম্বরটি উল্লেখ করে তিনি লিখেছিলেন, আরাফাত নামের এক ব্যক্তি ব্র্যাক স্কুলের সার্কুলারের কথা বলে অনেকের কাছ থেকে ধাপে ধাপে টাকা নিয়েছেন। সঙ্গে ছিল কয়েকটি লেনদেনের স্ক্রিনশট। শাহারিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা যায়, প্রতারণার শিকার হয়েছেন তার বড় বোন শাবেরীন।
শাবেরীন রিউমর স্ক্যানারকে জানান, এসএমএস যখন আসে, তখন বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টা পেরিয়ে গেছে, পরদিন শুক্রবার ছুটি। তাই তিনি আর যোগাযোগ করেননি।

শনিবার ১৮ এপ্রিল তার কাছে ফোন আসে। শাবেরীন বলেন, ‘শনিবার হঠাৎ তারা কল করে বলে যে তিনি আরাফাত এবং তার নম্বরটি আরাফাত নামে সেভ করতে বলে।’ তার কল লগে নম্বরটি এখনো ‘আরাফাত স্যার’ নামে সেভ করা।
পরীক্ষা না দিয়ে কীভাবে নির্বাচিত হলেন, জানতে চাইলে শাবেরীনকে বলা হয়, এই প্রকল্পে ফলাফলের ভিত্তিতে নিয়োগ হয়, তবে পুলিশ ভেরিফিকেশন হবে। এরপর রেজিস্ট্রেশন ফি বাবদ ৩৫০ টাকা চাওয়া হয়। বিজ্ঞপ্তিতেও এই ফির কথা লেখা ছিল। শাবেরীন ৩৫০ টাকাই পাঠান। নগদ অ্যাপের খরচসহ লেনদেনটিতে অঙ্ক দেখায় ৩৫৫ টাকা ২৫ পয়সা। টাকা পাঠানোর পর ইমেইলে তার কাছে নিয়োগপত্র আসে।
দুই দিন পর চাওয়া হয় পুলিশ ভেরিফিকেশনের টাকা। শাবেরীন বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পুলিশ এলে টাকা দিতে হয় ভেবে আমি ১৫০০ টাকা পাঠাই।’ কিন্তু কোনো পুলিশ তার বাড়িতে আসেনি। এ নিয়ে জানতে চাইলে তাকে বলা হয়, তার নামে কোনো অপরাধের রেকর্ড আছে কিনা, তা এলাকা থেকে খোঁজ নেওয়া হয়েছে।
তৃতীয় দফায় টাকা নেওয়া হয় তার নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার কথা বলে। এরপর আসে ল্যাপটপের প্রসঙ্গ। শাবেরীনকে বলা হয়, কাজের জন্য তাকে একটি ল্যাপটপ দেওয়া হবে, আর প্রশিক্ষণ শেষে এ পর্যন্ত দেওয়া সব টাকা তার অ্যাকাউন্টে ফেরত যাবে। অঙ্কটা বড় হওয়ায় বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে পাঠান তিনি।
দুই-তিন দিন পর নতুন দাবি আসে। ল্যাপটপ নাকি কাস্টমসে আটকে আছে, ছাড়াতে আরও ৯ হাজার টাকা লাগবে। শাবেরীন বলেন, ‘আমার আগে থেকেই সন্দেহ হওয়ায় এবার সরাসরি ব্র্যাক লার্নিং সেন্টারে চলে যাই।’
চার দফায় ১২ হাজার ৯৩৬ টাকা
শাবেরীনের সংরক্ষণ করা স্ক্রিনশট অনুযায়ী, চার দফার টাকাই নগদের মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে ০১৭৮৭-৮০৯৫৯৬ নম্বরে। লেনদেন খরচ বাদে শাবেরীন মোট পাঠিয়েছেন ১২ হাজার ৯৩৬ টাকা। কল লগ বলছে, ২৭ এপ্রিল থেকে ৩ মের মধ্যে ‘আরাফাত স্যার’ এর সঙ্গে তার একাধিকবার কথা হয়েছে, এর মধ্যে শুধু ২৭ এপ্রিলেই কয়েকবার।
শাবেরীন মুখে ১৫০০, ৩০০০ ও ৭০০০ টাকার কথা বললেও পরের তিন দফার স্ক্রিনশটে অঙ্কগুলো একটু আলাদা। মূল টাকার সঙ্গে লেনদেন খরচ বা ফি যুক্ত থাকায় প্রতিটি অঙ্কের পরিমাণ নির্দিষ্ট পরিমাণের চেয়ে ঠিক দেড় শতাংশ বেশি হয়েছে। ১ হাজার ৫৫০ টাকার জায়গায় গেছে ১ হাজার ৫৭৩ টাকা ২৫ পয়সা, ৩ হাজার ৫৫০ টাকার জায়গায় ৩ হাজার ৬০৩ টাকা ২৫ পয়সা। ল্যাপটপের মানি রিসিটে ‘সফটওয়্যার ফি’ লেখা ছিল ৭ হাজার ৩০০ টাকা, অথচ পাঠানো হয়েছে ৭ হাজার ৪০৯ টাকা ৫০ পয়সা। এই হিসাব থেকে ধারণা করা যায়, এসব দফায় প্রাপকের টাকা তোলার খরচও শাবেরীনকে দিয়েই পরিশোধ করানো হয়েছে।
ব্র্যাক ব্যাংকের নামে ওটিপি
যেদিন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার কথা বলে টাকা নেওয়া হয়, সেদিন শাবেরীনের ফোনে আরেকটি বার্তা আসে। ২৭ এপ্রিল দুপুর ১২টা ১২ মিনিটে ‘BRACBANK’ নামের প্রেরক থেকে আসা ওই এসএমএসে একটি ওটিপি দিয়ে বলা হয়, কোডটি ব্র্যাক ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য, কাউকে জানানো যাবে না। এর ১৮ মিনিট পর শাবেরীন ৩ হাজার ৬০৩ টাকা ২৫ পয়সা পাঠান।
ওটিপিটি প্রতারকদের হাতে গেছে কি না, কিংবা শাবেরীনের নামে সত্যিই কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে কি না, রিউমর স্ক্যানার ইনভেস্টিগেশন ইউনিট তা নিশ্চিত হতে পারেনি। তবে আবেদনের সময় তিনি জাতীয় পরিচয়পত্রসহ যেসব তথ্য ও নথি জমা দিয়েছিলেন, তা দিয়ে তার পরিচয় ব্যবহার করে অন্য কাজ করাও সম্ভব।
নিয়োগপত্র, ইমেইল আর মানি রিসিট
প্রতারণার প্রায় প্রতিটি ধাপে শাবেরীনের কাছে কোনো না কোনো নথি পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে নিয়োগপত্র, ইমেইল ও মানি রিসিট পর্যালোচনা করে দেখেছে রিউমর স্ক্যানার।
নিয়োগপত্র
১৮ এপ্রিল তারিখে দুই পৃষ্ঠার নিয়োগপত্রে শাবেরীনকে ‘রিজিওনাল এডুকেশন অফিসার’ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। যোগদানের তারিখ ১০ মে, কর্মস্থল তার নিজের জেলা রংপুরের কোতোয়ালি। মাসিক বেতন ২৩ হাজার ৩৬৫ টাকা। ভুয়া সাইটের ক্যারিয়ার পেজে এই পদের পাশে বেতন হিসেবে হুবহু এই অঙ্কই লেখা।
চিঠিতে চাকরির শর্তগুলো সাজানো হয়েছে একটি আসল নিয়োগপত্রের ধাঁচে। রবি থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত অফিস, ছয় মাসের শিক্ষানবিশকাল, চাকরি স্থায়ী হলে ১০ শতাংশ কন্ট্রিবিউটরি প্রভিডেন্ট ফান্ড, এক বছর পর উৎসব ভাতা। শেষে ‘জেনারেল ম্যানেজার (অ্যাডমিন অ্যান্ড এইচআর)’ পদবিসহ একটি সই ও সিল আছে। আছে ‘স্ক্যান টু ভেরিফাই’ লেখা একটি কিউআর কোডও। কিউআর কোডটি স্ক্যান করলে ওই ভুয়া ওয়েবসাইটেই নিয়ে যায়।
চিঠির ১৩ নম্বর শর্তে বলা হয়েছে, নিয়োগ সন্তোষজনক পুলিশ ভেরিফিকেশনের ওপর নির্ভর করবে। এই চিঠির তারিখের দুই দিন পরই পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে শাবেরীনের কাছে টাকা চাওয়া হয়।
চিঠির নিচের দিকে ‘ইন কোঅপারেশন’ অংশে সরকারের শিক্ষা প্রকল্প ‘রিচিং আউট অব স্কুল চিলড্রেন (রস্ক)’ আর যুক্তরাষ্ট্রের একটি সংস্থার নাম-ঠিকানা দেওয়া হয়েছে। এই নিয়োগের সঙ্গে এসব প্রকল্প বা সংস্থার কোনো সম্পর্কের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ইমেইল
নিয়োগপত্রটি আসে ‘Appointment Letter’ শিরোনামের একটি ইমেইলে। প্রেরকের নাম ‘BRAC School’। ইমেইলের শেষে ‘সিনিয়র অফিসার, অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ পরিচয়ে একজনের নাম আর admin@bracedu.net ঠিকানা। ভুয়া সাইটের যোগাযোগ পেজে এই ইমেইল ঠিকানাটি বসানো হয়েছে ব্র্যাকের প্রধান কার্যালয় ‘ব্র্যাক সেন্টার, ৭৫ মহাখালী’ এর ঠিকানার ঠিক নিচে।
নিয়োগপত্রের ইমেইলের শেষে ‘সিনিয়র অফিসার, অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ পরিচয়ে যে নাম দেওয়া ছিল, সেটি ‘আহসান হাবিব’। একই নামের একটি অ্যাকাউন্টের খোঁজ মিলেছে হোস্টিং প্ল্যাটফর্ম নেটলিফাইয়ের সহায়তা ফোরামে। গত ৩ মার্চ ‘AhsanHabib’ নামের ওই অ্যাকাউন্ট থেকে লেখা হয়, bracedu.net ডোমেইন ও careers.bracedu.net সাবডোমেইনটি তিনি নিজের সাইটে যুক্ত করতে চান, কিন্তু ডোমেইনটি আরেকটি অ্যাকাউন্টের অধীনে আটকে আছে। নিজের সাইট হিসেবে উল্লেখ করা হয় bracschoolcareers.netlify.app, যা এখন আর সচল নেই। অর্থাৎ ইমেইলে ব্যবহৃত নামেই কেউ ডোমেইনটির নিয়ন্ত্রণ দাবি করেছিলেন। নামটি আসল কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
৯৭ হাজার টাকার ল্যাপটপ
৩ মে শাবেরীনের কাছে একটি মানি রিসিট পাঠানো হয়। তাতে লেখা, তাকে ৯৭ হাজার টাকা দামের ডেল কোম্পানির একটি ল্যাপটপ দেওয়া হবে। পুরো দাম দেখানো হয়েছে ‘চ্যারিটি ফান্ড পেয়েবল’ হিসেবে, অর্থাৎ ল্যাপটপের খরচ দেবে প্রতিষ্ঠান। প্রার্থীকে দিতে হবে শুধু ৭ হাজার ৩০০ টাকা ‘সফটওয়্যার ফি’। পরিশোধের মাধ্যম হিসেবে লেখা ‘নগদ’।
রিসিটে রেফারেন্স নম্বর লেখা ‘HR-12873’। নিয়োগপত্রে একই নম্বর লেখা ছিল ‘PIN-12873’ হিসেবে।
গোছানো সাইট, গুগল সার্চেও শীর্ষে
ব্র্যাকের ওয়েবসাইটের ঠিকানা brac.net। ভুয়া সাইটে এর সঙ্গে ‘edu’ জুড়ে বানানো হয়েছে bracedu.net, যাতে একে ব্র্যাকের শিক্ষা কার্যক্রমের আলাদা কোনো সাইট মনে হয়। ব্র্যাকের উপানুষ্ঠানিক প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো ‘ব্র্যাক স্কুল’ নামেই পরিচিত, ভুয়া সাইটটিও নিজেকে এই নামেই পরিচয় দিচ্ছে। গোলাপি রং, ব্র্যাকের লোগো আর শিশুদের ছবি দিয়ে সাজানো সাইটটি প্রথম দেখায় বেশ গোছানো। গুগলে ‘brac education’ লিখে সার্চ করলে ব্র্যাকের দুইটি অফিশিয়াল ফলাফলের পরেই তৃতীয় অবস্থানে আসে এই ভুয়া ডোমেইনের মূল ঠিকানা www.bracedu.net। ফলে ব্র্যাকের শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে কেউ গুগলে খুঁজলেও সহজেই এই সাইটে পৌঁছে যেতে পারছেন।
ব্লগারে বানানো ‘শিক্ষা পোর্টাল’
ভুয়া এই সাইটের পেজগুলোর সোর্স কোডে নির্মাণ-প্ল্যাটফর্মের নাম লেখা ‘blogger’। অর্থাৎ এটি বানানো হয়েছে গুগলের বিনামূল্যের ব্লগিং সেবা ব্লগারে। পেজের নিচে একটি বাণিজ্যিক ব্লগার থিম নির্মাতার নামও রয়ে গেছে। পেজের ঠিকানার কাঠামোও ব্লগারের মতো। যেমন ডোনেট পেজের ঠিকানা শেষ হয়েছে ‘/p/donate.html’ দিয়ে।
১ হাজার ১৯০ পদের বিজ্ঞপ্তি
সাইটের ক্যারিয়ার পেজে তিনটি পদের বিজ্ঞপ্তি আছে। সব পদেই কর্মস্থল লেখা ‘নিজ জেলা’, আবেদনের শেষ তারিখ ছিল ১ অক্টোবর ২০২৬। এখন প্রতিটি পদের পাশে লেখা ‘অ্যাপ্লিকেশন ক্লোজড’।
সাইটের আবেদন ফরমে জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধন নম্বর, জন্মতারিখ, মোবাইল নম্বর, মা-বাবার নাম এবং স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা দিতে হয়। আপলোড করতে হয় পাসপোর্ট আকারের ছবি, জাতীয় পরিচয়পত্র ও সব শিক্ষাগত সনদের স্ক্যান কপি। ফরমের নিচে বাংলায় লেখা, নির্বাচিত প্রার্থীদের পরে ৩৫০ টাকা রেজিস্ট্রেশন ফি জমা দিতে হবে। ফলে কেউ টাকা না দিলেও আবেদন করা মাত্র তার এসব তথ্য চক্রটির হাতে চলে যাচ্ছে।
ব্র্যাক কর্মকর্তাদের ছবি ব্যবহার করে ভুয়া উক্তি
সাইটের একাধিক পেজের নিচে পাঁচজনের ছবি আর প্রত্যেকের নামে একটি করে উক্তি দেওয়া আছে। প্রথম ছবিটি ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদের, যিনি মারা গেছেন ২০১৯ সালে। বাকিদের মধ্যে আছেন ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ, ব্র্যাক ইন্টারন্যাশনালের নির্বাহী পরিচালক শামেরান আবেদ এবং তামারা হাসান আবেদ। আসিফ সালেহ নিজেই জানিয়েছেন, তার ও সহকর্মীদের নামে এসব উক্তি বানানো।
এক সাইটে চার রকম হিসাব
সাইটের বিভিন্ন পেজে ‘ব্র্যাক স্কুল’-এর যে পরিসংখ্যান দেওয়া হয়েছে, সেগুলো একটি আরেকটির সঙ্গে মেলে না।
একই সাইটে স্কুলের সংখ্যা কোথাও ২০০, কোথাও ৩২ হাজার। প্রতিষ্ঠার সাল এক পেজে ২০১০, আরেক পেজে ১৯৮৫। দুটি কার্যালয়ের জন্য বিভিন্ন পেজে অন্তত পাঁচটি আলাদা ফোন নম্বর দেওয়া আছে।
ডোনেট পেজে নগদ নম্বর আর ক্রিপ্টো কার্ড
ডোনেট পেজে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে অনুদানের জন্য দেওয়া নগদ নম্বরটি হলো— ০১৭৮৭-৮০৯৫৯৬। শাবেরীনের চার দফার টাকাই গেছে এই নম্বরে। সাইটের সঙ্গে শাবেরীনের কাছ থেকে টাকা নেওয়া ব্যক্তির সরাসরি যোগসূত্র এই নম্বরটিই।
বিদেশ থেকে অনুদানের জন্য দেওয়া হয়েছে রেডটপে নামের একটি সেবার কার্ড নম্বর। রেডটপে হংকংভিত্তিক একটি ক্রিপ্টোকারেন্সি পেমেন্ট গেটওয়ে, যার কার্ডে ক্রিপ্টো মুদ্রা দিয়ে লেনদেন হয়। কার্ড নম্বরের পাশে সুইফট কোড লেখা ‘BRACBDDH’। ব্র্যাক ব্যাংকের আসল সুইফট কোড ‘BRAKBDDH’। একটি অক্ষর বদলে কোডটিকে ব্যাংকের কোডের মতো দেখানো হয়েছে, যদিও রেডটপে কার্ডে টাকা পাঠাতে সুইফট কোড লাগে না।
পেজটিতে দাবি করা হয়েছে, অনুদানের ৯০ শতাংশ সরাসরি কর্মসূচিতে খরচ হয়। সেখানে ‘সিস্টেম ওভারলোড’ শিরোনামে একটি বার্তাও রাখা আছে, যাতে বলা হয়েছে, অতিরিক্ত চাপের কারণে লেনদেনে দেরি হচ্ছে।
আসল চ্যানেলের লিংক, নকল অ্যাকাউন্ট
সাইটের নিচের অংশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাঁচটি লিংক রয়েছে। এর মধ্যে লিংকডইন আর ইউটিউবের লিংক নিয়ে যায় ব্র্যাকের অফিশিয়াল পেজে। ফলে সন্দেহ হলে কেউ যাচাই করতে চাইলেও ক্লিক করে ব্র্যাকের আসল পেজই দেখতে পান। বাকি তিনটি, অর্থাৎ ফেসবুক, এক্স ও ইনস্টাগ্রামের অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে ‘ব্র্যাক স্কুল’ নামে। এর মধ্যে ফেসবুক পেজটি এই প্রতিবেদন তৈরির সময় হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়, লিংকে গেলে পেজটি এখন আর পাওয়া যাচ্ছে না।
যোগাযোগ পেজেও একই কৌশল। সেখানে ব্র্যাকের প্রধান কার্যালয়ের ঠিকানা আসল, কিন্তু তার নিচের ইমেইল ঠিকানাটি ভুয়া ডোমেইনের। সঙ্গে নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, উগান্ডাসহ কয়েকটি দেশের ‘ব্র্যাক কার্যালয়ের’ ঠিকানা জুড়ে দিয়ে সাইটটিকে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের চেহারা দেওয়া হয়েছে।
সাইটটি কবে থেকে চলছে, তা জানা যায় ডোমেইনের নিবন্ধন তথ্য থেকে। ডোমেইন যাচাইয়ের ওয়েবসাইট হুইজ ডট কম বলছে, bracedu.net নিবন্ধন করা হয় ২০২৫ সালের ২ আগস্ট। এক বছর পর চলতি বছরের ২ আগস্ট নিবন্ধন তথ্য হালনাগাদ করা হয়েছে, মেয়াদ রয়েছে ২০২৭ সালের ২ আগস্ট পর্যন্ত। শাবেরীন আবেদন করেছিলেন গত বছর। অর্থাৎ ডোমেইন কেনার কয়েক মাসের মধ্যেই এতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে আবেদন নেওয়া শুরু হয়। ডোমেইনটির নেম সার্ভার ‘নিয়ালা’ (Njalla) নামের প্ল্যাটফর্মের অধীনে পরিচালিত। গ্রাহকের পরিচয় গোপন রেখে ডোমেইন নিবন্ধনের জন্য সেবাটি পরিচিত, তাই এর পেছনে কে আছেন তা খুঁজে বের করা কঠিন।
পাঁচ মাস পরও একই এসএমএস
শাবেরীনের ঘটনার পরও বিজ্ঞপ্তিটি থেমে থাকেনি। গত ২৪ সেপ্টেম্বর চাকরির আবেদন বিষয়ক ফেসবুক পেজ ‘রক্তিম অনলাইন আবেদন জোন’ থেকে একটি এসএমএসের স্ক্রিনশট দিয়ে পোস্ট করা হয়। পোস্টদাতা লেখেন, সাইটটিতে যারা আবেদন করেছেন, তাদের কাছেই এমন বার্তা যাচ্ছে এবং ৩৫০ টাকা চাওয়া হচ্ছে। ব্র্যাক নিয়োগের আগে কোনো টাকা নেয় না বলে সতর্কও করেন তিনি।
স্ক্রিনশটের বার্তাটি শাবেরীনের কাছে আসা এসএমএসের সঙ্গে শব্দে শব্দে মিলে যায়। পার্থক্য শুধু নম্বরে।
শাহারিয়া সিদ্দিকী তার পোস্টে দাবি করেছিলেন, ‘আরাফাত’ পরিচয় দেওয়া ব্যক্তি অনেকের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন। তবে মোট কতজন এই ফাঁদে পড়েছেন, তা জানা যায়নি।
বিজ্ঞপ্তিটি ফেসবুকে বিভিন্ন প্রোফাইল ও পেজ থেকেও ছড়ানো হয়েছে। এমন অনেক পোস্ট পেয়েছে রিউমর স্ক্যানার। পোস্টদাতারা চক্রের সঙ্গে যুক্ত, নাকি না জেনে শেয়ার করেছেন, তা নিশ্চিত নয়।
দুই এসএমএসেই ঠিকানা দেওয়া ছিল www.bracedu.net, একই ডোমেইনের মূল ঠিকানা। সেখানেও একই উক্তি, একই ক্যারিয়ার পেজ আর একই নগদ নম্বর দিয়ে ডোনেট পেজ রয়েছে। ব্র্যাকের সতর্কবার্তার পরও এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সাইটটি সচল, সেপ্টেম্বরেও এতে নতুন লেখা প্রকাশ করা হয়েছে।
আগে আড়ং, এবার ‘ব্র্যাক স্কুল’
ব্র্যাকের নাম ব্যবহার করে প্রতারণা আগেও হয়েছে। ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠান আড়ংয়ের নামে নারী দিবসে ও রমজানে উপহার দেওয়ার ভুয়া প্রচারণা নিয়ে রিউমর স্ক্যানার এর আগে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেসব প্রচারণায় ব্যবহৃত সাইট ছিল সাদামাটা, একটু খেয়াল করলেই নকল বলে বোঝা যেত। উপহারের লোভ দেখিয়ে একটি লিংকে ক্লিক করানোই ছিল মূল কৌশল।
এবারের প্রতারণায় খাটুনি অনেক বেশি। পূর্ণাঙ্গ ওয়েবসাইট, প্রকৃত কর্মকর্তাদের ছবি, ব্র্যাকের আসল চ্যানেলের লিংক আর প্রতিটি ধাপের জন্য আলাদা নথি তৈরি করা হয়েছে। নিশানাও বদলেছে। উপহারপ্রত্যাশী সাধারণ মানুষের বদলে এবার লক্ষ্য চাকরিপ্রার্থীরা, যারা নিয়োগের নানা ধাপ আর খরচকে স্বাভাবিক বলেই ধরে নেন। টাকাও একবারে না চেয়ে নেওয়া হয়েছে কিস্তিতে, সঙ্গে প্রশিক্ষণ শেষে সব টাকা ফেরতের আশ্বাস।
ব্র্যাক যা বলছে
ব্র্যাক লার্নিং সেন্টারে যাওয়ার পর সেখানকার মানবসম্পদ বিভাগের এক কর্মকর্তা শাবেরীনকে জানান, বিষয়টি পুরোপুরি ভুয়া এবং ব্র্যাক নিয়োগের জন্য কোনো টাকা নেয় না। তাকে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
রিউমর স্ক্যানারের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে ব্র্যাক জানায়, নিয়োগের কোনো ধাপেই ব্র্যাক কখনো টাকা চায় না। এটিই আমাদের আনুষ্ঠানিক ও স্পষ্ট বার্তা। চাকরির প্রকৃত বিজ্ঞপ্তি পাওয়া যাবে কেবল careers.brac.net, ব্র্যাকের অফিশিয়াল লিংকডইন প্রোফাইল ও বিডিজবসে।”
রিউমর স্ক্যানার যোগাযোগ করার পর গত ২৩ সেপ্টেম্বর ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ ফেসবুকে একটি সতর্কবার্তা দেন। তিনি লেখেন, ভুয়া সাইটটির সঙ্গে ব্র্যাকের কোনো সম্পর্ক নেই, এটি সম্পূর্ণ প্রতারণা।
ভুয়া সাইটে তার ও সহকর্মীদের ছবি এবং বানানো উক্তি ব্যবহার করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
পরদিন ব্র্যাকের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে চাকরির প্রতারণা নিয়ে একটি সতর্কতামূলক ভিডিও প্রকাশ করা হয়। ভিডিওর মন্তব্যে ব্র্যাক চাকরির খবরের জন্য careers.brac.net/jobs দেখার পরামর্শ দেয়।
যেভাবে সতর্ক থাকবেন
চাকরির বিজ্ঞপ্তি দেখে আবেদনের আগে ওয়েবসাইটের ঠিকানা অক্ষর ধরে মিলিয়ে দেখা দরকার। ব্র্যাকের ওয়েবসাইট brac.net, আর চাকরির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হয় careers.brac.net-এ। নামের সঙ্গে বাড়তি শব্দ জুড়ে দেওয়া ঠিকানা দেখলে সন্দেহ করা উচিত। যাচাই না করা কোনো সাইটে জাতীয় পরিচয়পত্র, ছবি বা সনদ জমা দিলে সেগুলো অপব্যবহারের ঝুঁকি থাকে।
নিয়োগের যেকোনো ধাপে রেজিস্ট্রেশন, পুলিশ ভেরিফিকেশন, প্রশিক্ষণ বা যন্ত্রপাতির নামে টাকা চাওয়া হলে সেটিকে প্রতারণার লক্ষণ হিসেবেই ধরতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান কারও ব্যক্তিগত মোবাইল ওয়ালেট নম্বরে নিয়োগ ফি নেয় না। পরীক্ষা বা সাক্ষাৎকার ছাড়া ‘নির্বাচিত’ হওয়ার বার্তা পেলেও প্রতিষ্ঠানের অফিশিয়াল মাধ্যমে খোঁজ নেওয়া জরুরি।
ব্যাংক বা মোবাইল আর্থিক সেবার ওটিপি ও পিন কাউকে জানানো যাবে না। কেউ প্রতারণার শিকার হলে দেরি না করে নিকটস্থ থানায় জিডি করা, লেনদেনের স্ক্রিনশট ও কল লগ সংরক্ষণ করা এবং নিজের মোবাইল আর্থিক সেবাদাতাকে বিষয়টি জানানো উচিত।
অনুসন্ধানের পদ্ধতি ও সীমাবদ্ধতা
রিউমর স্ক্যানার ইনভেস্টিগেশন ইউনিট ভুয়া ওয়েবসাইটের ক্যারিয়ার, আবেদন, ডোনেট ও যোগাযোগসহ বিভিন্ন পেজ এবং সেগুলোর সোর্স কোডের তথ্য পরীক্ষা করেছে। সাইটে যুক্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টগুলোও পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। ডোনেট পেজের নগদ নম্বর ধরে ফেসবুকে খোঁজ চালিয়ে ভুক্তভোগীকে পাওয়া যায়। তার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে এবং তার দেওয়া এসএমএস, কল লগ, লেনদেনের স্ক্রিনশট, ইমেইল, নিয়োগপত্র ও মানি রিসিট বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বক্তব্য নেওয়া হয়েছে ব্র্যাকের। এ ছাড়া ডোমেইনের নিবন্ধন তথ্য, গুগল সার্চ ফলাফল এবং ওয়েব হোস্টিং সেবা নেটলিফাইয়ের সহায়তা ফোরামেও খোঁজ চালানো হয়েছে।
প্রতিবেদনটি মূলত একজন ভুক্তভোগীর অভিজ্ঞতা ও নথির ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। মোট কতজন প্রতারিত হয়েছেন বা মোট কত টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে, তা জানা যায়নি। চক্রটির পেছনে কারা আছেন, তাদের পরিচয়ও শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। ‘আরাফাত’ নামটি ভুক্তভোগীকে দেওয়া পরিচয়মাত্র। ব্র্যাক ব্যাংকের নামে আসা ওটিপি দিয়ে ভুক্তভোগীর নামে কোনো অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে কিনা, সেটিও যাচাই করা যায়নি।
সূত্র: রিউমর স্ক্যানার
এফএ