আব্দুল হাকিম
১০ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:০৫ পিএম
* নির্বিঘ্নে ফুটপাতে হাঁটছেন পথচারীরা, সড়কেও কমেছে চাপ
* সাম্প্রতিক অভিযানে মিলেছে সাময়িক স্বস্তি
* বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করতে হবে
* সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা ছাড়া সুফল মিলবে না
* বাধা সৃষ্টি করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে: ডিএনসিসি প্রশাসক
একসময় মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরের পাশের পথটুকু পেরোতে ২০ থেকে ২৫ মিনিট পর্যন্ত লেগে যেত। ফুটপাতজুড়ে দোকানপাট, ক্রেতাদের ভিড় আর সড়কে যানবাহনের জটলায় হাঁটার জায়গা খুঁজে পাওয়াই ছিল দুষ্কর। এখন সেই পথ পেরোতে লাগছে মাত্র তিন থেকে চার মিনিট।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) উচ্ছেদ অভিযানে ফুটপাত দখলমুক্ত করার পর বদলেছে এলাকার চিরচেনা দৃশ্যপট। এখন স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারছেন পথচারীরা, সড়কেও কমেছে চাপ। দীর্ঘদিনের ভোগান্তি কাটিয়ে ফুটপাত ফিরে পাওয়ায় স্বস্তি ফিরেছে মিরপুর-১০ এলাকায়।
গোলচত্বর এলাকা ঘুরে দেখা যায়, আগের মতো দোকানের সারি নেই। ফুটপাতের বড় অংশ এখন পথচারীদের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে। কেউ যাচ্ছেন মেট্রোরেল স্টেশনের দিকে, কেউ ফিরছেন কর্মস্থল থেকে, আবার কেউ সন্তানদের নিয়ে যাচ্ছেন বিদ্যালয়ে।
শায়মা ও আরিফুল দম্পতির ফুটপাত ধরে হাঁটছিলেন। তাদের সঙ্গে দুই সন্তান। কিছুদিন আগেও এই পথে সন্তানদের নিয়ে হাঁটতে গিয়ে বারবার থমকে দাঁড়াতে হতো। ফুটপাতজুড়ে দোকানপাট, ক্রেতাদের ভিড় আর হকারদের হাঁকডাকে স্বাভাবিকভাবে চলাচল করাই ছিল কঠিন। এখন সেই চিত্র বদলেছে। ফুটপাতের দখল সরিয়ে দেওয়ায় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নির্বিঘ্নে হাঁটতে পারছেন তারা।
শায়মা জাহান নীলা বলেন, আগে সন্তানদের নিয়ে এই ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে গেলে বারবার থামতে হতো। কোথাও দোকানের সামনে ক্রেতাদের ভিড়, কোথাও পণ্য সাজিয়ে রাখার কারণে চলাচলের জায়গা থাকত না। বাধ্য হয়ে কখনো কখনো সড়কের পাশ দিয়ে হাঁটতে হতো। এতে ছোট দুই সন্তানকে নিয়ে সব সময় সতর্ক থাকতে হতো। এখন ফুটপাত খোলা থাকায় স্বাচ্ছন্দ্যে হাঁটতে পারছি। সন্তানদের নিয়ে এমন পরিবেশে চলাচল করতে পেরে ভালো লাগছে। ফুটপাত যেন সব সময় পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে এমনটাই প্রত্যাশা করি।
শায়মার সঙ্গে সুর মিলিয়ে স্বামী আরিফুল হক বলেন, আগে মিরপুর-১০ এলাকায় হাঁটতে বের হলে দোকানপাট আর মানুষের ভিড় পেরোতেই অনেক সময় চলে যেত। ফুটপাত থাকলেও সেটি দিয়ে স্বাভাবিকভাবে চলাচলের সুযোগ ছিল না। বিশেষ করে সন্তানদের নিয়ে বের হলে বাড়তি সতর্ক থাকতে হতো। এখন সেই ভোগান্তি অনেকটাই কমেছে। তবে উচ্ছেদ অভিযানের পর তৈরি হওয়া এই পরিবেশ যেন ধরে রাখা হয় এবং নতুন করে কেউ ফুটপাত দখল করে পথচারীদের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করতে না পারে এটাই চাওয়া।
শুধু এই দম্পত্তিই নয়, মিরপুর-১০ এলাকায় চলাচল করা অনেক মানুষের অভিজ্ঞতাই এখন এমন। দীর্ঘদিনের ভোগান্তি কাটিয়ে ফুটপাত ফিরে পাওয়ায় স্বস্তি ফিরেছে পথচারীদের মধ্যে। তবে এই পরিবর্তন কত দিন স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করছে ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার ধারাবাহিক উদ্যোগের ওপর।
ফুটপাতজুড়ে দোকানপাটের দখল না থাকায় চলাচলে তৈরি হয়েছে স্বস্তি। সড়কের পাশেও আগের তুলনায় কমেছে মানুষের জটলা। পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সড়ক ও ফুটপাত পরিষ্কার করতে দেখা গেছে। গোলচত্বরের ফুটওভার ব্রিজের নিচের অংশে গাছ লাগিয়ে পরিবেশ সুন্দর করার উদ্যোগও নিয়েছে ডিএনসিসি।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর ও হোপ স্কুল রোডের ফুটপাতের অবৈধ দখল উচ্ছেদে অভিযান চালায় ডিএনসিসি।
এদিকে ফুটপাত খালি হওয়ায় ভোগান্তি অনেকটাই কমেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তারা জানান, ফুটপাত দিয়ে হাঁটার সুযোগ তৈরি হওয়ায় শুধু সময়ই বাঁচছে না, চলাচলের নিরাপত্তাও বাড়ছে। বিশেষ করে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, বয়স্ক ব্যক্তি এবং শিশুদের নিয়ে চলাচল করা অভিভাবকেরা আগের তুলনায় স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন।
পথচারী শামসুল আলম বলেন, আগে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরের এই পথটুকু পার হতে দীর্ঘ সময় লাগত। ফুটপাতজুড়ে দোকানপাট আর মানুষের ভিড় থাকায় স্বাভাবিক গতিতে হাঁটার সুযোগ ছিল না। অনেক সময় বাধ্য হয়ে সড়ক দিয়ে চলাচল করতে হতো। এতে যেমন সময় নষ্ট হতো, তেমনি যানবাহনের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে গিয়ে নিরাপত্তার ঝুঁকিও তৈরি হতো। এখন ফুটপাত খোলা থাকায় সহজেই গন্তব্যে পৌঁছানো যাচ্ছে। ফুটপাত পথচারীদের চলাচলের জন্যই রাখা উচিত। নিয়মিত নজরদারি থাকলে এই পরিবেশ ধরে রাখা সম্ভব হবে।
মিরপুর-১০ এলাকায় দায়িত্ব পালন করা এক ট্রাফিক সার্জেন্ট জানান, আগে ফুটপাত দখল থাকায় মানুষ বাধ্য হয়ে সড়ক দিয়ে হাঁটত। এতে যানজট তৈরি হতো। এখন রাস্তা অনেকটা ফাঁকা থাকছে। গাড়ি সড়ক দিয়ে চলছে, মানুষ ফুটপাত দিয়ে হাঁটছে। এতে ট্রাফিক পুলিশের কাজের চাপও কমেছে।
ফুটপাত দখলমুক্ত হওয়ার সুফল পাচ্ছেন শিক্ষার্থীরাও। মিরপুর থেকে নিয়মিত মেট্রোরেলে যাতায়াত করা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আফসানা ফাইজা বলেন, আগে বাসা থেকে বের হয়ে দোকানপাট ও মানুষের ভিড় ঠেলে স্টেশনে পৌঁছাতে অনেক সময় লাগত। কখনো কখনো ক্লাসেও দেরি হয়ে যেত। এখন খোলা ফুটপাত দিয়ে কয়েক মিনিটেই স্টেশনে পৌঁছানো যায়।
ফুটপাত দখলমুক্ত হওয়ায় আশপাশের স্থায়ী ব্যবসায়ীরাও উপকৃত হচ্ছেন বলে জানিয়ে শাহ আলী প্লাজার বিক্রেতা আল আমিন বিশ্বাস বলেন, উচ্ছেদ অভিযানের পর রাস্তাঘাট পরিষ্কার হয়েছে। আগে যারা ফুটপাতের দোকান থেকে কেনাকাটা করতেন, তাদের অনেকে এখন বিপণিবিতানে আসছেন। এতে দীর্ঘদিন ধরে দোকান নিয়ে ব্যবসা করা আমাদের বেচাকেনা বাড়ছে।
মিরপুরের বাসিন্দা আলাল মিয়া বলেন, প্রায় ২৫ বছর ধরে এই এলাকায় বসবাস করছি। একসময় ফুটপাত দিয়ে স্বাভাবিকভাবে চলাচল করা যেত। পরে দোকানপাট বাড়তে থাকায় সেই সুযোগ কমে যায়। ফুটপাতের দোকানের কারণে পথচারীদের যেমন ভোগান্তি হতো, তেমনি আশপাশের স্থায়ী দোকানেও ব্যবসায়িক প্রভাব পড়ত। এখন সড়ক ও ফুটপাত খোলা থাকায় এলাকার পরিবেশে পরিবর্তন এসেছে।
ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার উদ্যোগ শুধু মিরপুর-১০-এ সীমাবদ্ধ থাকবে না। উত্তর সিটির বিভিন্ন এলাকার ফুটপাত থেকে অবৈধ দোকানপাট সরানো হবে। উচ্ছেদের পর কেউ আবার দোকান বসিয়ে মানুষের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করলে জরিমানা ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
হকারদের জীবিকার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখার কথা জানিয়ে ডিএনসিসি প্রশাসক বলেন, হকারদের ব্যবসা করার সুযোগ থাকবে, তবে তা জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে নয়। সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত স্থানে তাদের ব্যবসা পরিচালনা করতে হবে। অর্থাৎ ফুটপাত পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত রাখার পাশাপাশি হকারদের ব্যবসার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে নিয়মিত অভিযান যথেষ্ট নয়। পথচারীদের চলাচল নিশ্চিত করার পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য বিকল্প জায়গার ব্যবস্থা এবং ফুটপাত ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন। সমন্বিত পরিকল্পনা ছাড়া উচ্ছেদের মাধ্যমে সাময়িক স্বস্তি মিললেও কিছুদিন পর আবার ফুটপাত দখলের পুরোনো চিত্র ফিরে আসতে পারে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাবেক সভাপতি ও পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ বলেন, হকার উচ্ছেদের বিষয়টি শুধু কোনো নির্দিষ্ট এলাকার সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না, বরং জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এর সমাধান করতে হবে। সমন্বিত পরিকল্পনা ছাড়া উচ্ছেদ অভিযান চালালে সাময়িকভাবে পরিস্থিতির উন্নতি হলেও দীর্ঘমেয়াদে সেই সুফল ধরে রাখা সম্ভব হবে না। তাই সমস্যার সামগ্রিক চিত্র বিশ্লেষণ করে স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
এদিকে ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) সতর্ক করে বলেছে, নগর দারিদ্র্য মোকাবিলা এবং অবৈধ ফুটপাতের ব্যবসা থেকে মুনাফা করা প্রভাবশালী সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে ঢাকার ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদের সাম্প্রতিক অভিযান দীর্ঘমেয়াদি সুফল বয়ে আনবে না। এসব অভিযানে পথচারীরা সাময়িক স্বস্তি পেলেও কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এ উদ্যোগ টেকসই হবে না।
ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, হকার ব্যবস্থাপনায় সুস্পষ্ট নীতিমালা ও আইন প্রণয়নসহ সমন্বিত পরিকল্পনা ছাড়া উচ্ছেদ অভিযান টেকসই হবে না। সাম্প্রতিক অভিযানগুলোতে সাময়িক স্বস্তি মিললেও দীর্ঘমেয়াদি সুফল পেতে বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন এবং ফুটপাতের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণকারী সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজির নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
তিনি আরও বলেন, সমস্যার মূল কারণগুলো সমাধান না করলে এসব অভিযান দীর্ঘমেয়াদে সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম। এজন্য হকারদের পুনর্বাসন, বিকল্প কর্মসংস্থান এবং নগরের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারকে দ্রুত সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
আইপিডি’র নির্বাহী পরিচালক বলেন, ঢাকায় এখনো হকার ব্যবস্থাপনার কার্যকর আইনি কাঠামো নেই। এ সুযোগে আড়ালে থেকে বিভিন্ন সিন্ডিকেট তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। অবৈধভাবে ফুটপাতে ব্যবসা পরিচালনায় সহায়তাকারী লাইনম্যান, প্রভাবশালী গোষ্ঠী এবং চাঁদাবাজির মাধ্যমে লাভবান ব্যক্তিদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।
এএইচ/এফএ