Dhaka Mail Logo

জাতীয়

কেএনএফের পোশাক তৈরিতে অর্থায়ন, নাথান বমসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা

একে সালমান

০৮ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০০ পিএম

নিষিদ্ধ সশস্ত্র সংগঠন কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) জন্য বিপুল পরিমাণ সামরিক পোশাক তৈরিতে অর্থের জোগান দেওয়ার অভিযোগে সংগঠনটির প্রধান নাথান বমসহ নয়জনের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং আইনে মামলা করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। মামলার তদন্তে কেএনএফের ৪০ হাজার সেট ক্যামোফ্লেজ ইউনিফর্ম তৈরির জন্য ১ কোটি ৬২ লাখ ৫৯ হাজার ৫০০ টাকা লেনদেনের তথ্য পেয়েছে সংস্থাটি।

সিআইডি সূত্রে জানা যায়, কেএনএফের কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে ইউনিফর্ম তৈরিতে অর্থের হস্তান্তর, স্থানান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে অর্থের প্রকৃত উৎস গোপন করার চেষ্টা করা হয়েছে। এর মধ্যে পোশাকের কাপড় তৈরিতে ব্যয় হয়েছে ৯০ লাখ ৫৯ হাজার ৫০০ টাকা। আর শার্ট-প্যান্ট সেলাইয়ের জন্য দেওয়া হয়েছে আরও ৭২ লাখ টাকা। ব্যাংক হিসাব, চেক ও নগদ অর্থে এসব লেনদেনের তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে সিআইডি।

কেএনএফ প্রধানসহ আসামি যারা

কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) প্রধান নাথানা লনচেও ওরফে নাথান বমকে মানিলন্ডারিং মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া মামলায় তার সহযোগী হিসেবে সংগঠনটির সদস্য মংহলাসিন মারমা ওরফে মং, নিয়াজ হায়দার, মো. গোলাম আজম, সাহেদুল ইসলাম, মোহাম্মদ কামরুজ্জামান, জামালুল ইসলাম, মো. তৌহিদুল ইসলাম ও মো. মতিউর রহমানকে আসামি করা হয়েছে।

২০২৫ সালের ১৮ মে রাত আড়াইটার দিকে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) একটি বিশেষ দল বায়েজিদ বোস্তামীর মোজাফফরনগর আবাসিক এলাকায় অভিযান চালিয়ে কেএনএফের পোশাক তৈরির সঙ্গে জড়িত একজনকে আটক করে। জিজ্ঞাসাবাদে আটক ব্যক্তির দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরে হালিশহর থানাধীন ছোটপুল এলাকার দুটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে আরও দুজনকে আটক করা হয়।

তাদের দেওয়া তথ্য যাচাই করে বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন একটি গোডাউন ও একটি গার্মেন্টস কারখানা থেকে মোট ২০ হাজার ৩০০ সেট চার রঙের ক্যামোফ্লেজ কেএনএফের ইউনিফর্ম উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে একটি গোডাউন থেকে ১১ হাজার ২০০ সেট এবং একটি কারখানা থেকে ৯ হাজার ১০০ সেট ইউনিফর্ম জব্দ করা হয়। প্রতি সেট পোশাকে ছিল একটি শার্ট ও একটি প্যান্ট। এসব পোশাক নিষিদ্ধ সংগঠন কেএনএফের সদস্যদের জন্য তৈরি করা হচ্ছিল। এ ঘটনায় বায়েজিদ বোস্তামী থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করে পুলিশ।

এরপর কেএনএফের ইউনিফর্ম তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করে সিআইডি। শুধু ইউনিফর্ম তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান শনাক্ত নয়, ব্যাংক হিসাব, চেক, নগদ অর্থ প্রদান, ক্রয়াদেশ, ব্যবসায়িক পরিচয় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পারস্পরিক যোগাযোগ ও আর্থিক লেনদেন বিশ্লেষণের মাধ্যমে অর্থের উৎস, ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে অর্থ প্রবাহের চিত্র অনুসরণ করে সিআইডি।

যেসব প্রতিষ্ঠান তৈরি করছিল পোশাক

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) বিশেষ পুলিশ সুপার মো. ছুফি উল্লাহ ঢাকা মেইলকে জানান, অনুসন্ধানে পাওয়া রেকর্ডপত্র ও সাক্ষীদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, কেএনএফের প্রতিনিধি হিসেবে মংহলাসিন মারমা ওরফে মং প্রথমে নিয়াজ হায়দারের সঙ্গে এবং পরে নিয়াজ হায়দারের মাধ্যমে গোলাম আজমের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এরপর তারা ওয়েল কম্পোজিট নিট লিমিটেডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে কেএনএফের ইউনিফর্মের ক্যামোফ্লেজ প্রিন্টের ফ্যাব্রিক তৈরির ব্যবস্থা করেন।

মংহলাসিন মারমা নিজেকে এমআই এন্টারপ্রাইজের সহকারী কমার্শিয়াল ম্যানেজার হিসেবে পরিচয় দিয়ে ২০২৪ সালের ২০ নভেম্বর ও ২০২৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি দুটি পারচেজ অর্ডার দাখিল করেন। এসব কাজের বিপরীতে ওয়েল কম্পোজিট নিট লিমিটেডকে মোট ৯০ লাখ ৫৯ হাজার ৫০০ টাকা দেওয়া হয়।

অনুসন্ধানে আরও পাওয়া যায়, কেএনএফের ৪০ হাজার সেট ইউনিফর্মের প্যান্ট ও শার্ট সেলাইয়ের জন্য মংহলাসিন মারমার নির্দেশনায় নিয়াজ হায়দার ও গোলাম আজম তাদের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে রিংভো অ্যাপারেলস, এনএন ফ্যাশন ও নূর ফ্যাশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। অভিযুক্তরা পারস্পরিক যোগসাজশে কুকি-চিনের ৪০ হাজার সেট চার রঙের ক্যামোফ্লেজ ইউনিফর্মের ফ্যাব্রিক তৈরির কাজ বাবদ ২০২৪ সালের ২০ নভেম্বর ও ২০২৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ওয়েল কম্পোজিট নিট লিমিটেডের অনুকূলে দুটি পারচেজ অর্ডার দাখিল করে ৯০ লাখ ৫৯ হাজার ৫০০ টাকা এবং ইউনিফর্ম সেলাই বাবদ রিংভো অ্যাপারেলস, এনএন ফ্যাশন ও নূর ফ্যাশনকে ৭২ লাখ টাকা প্রদান করে।

তিনি জানান, সিআইডির আর্থিক অনুসন্ধানে কেএনএফের ইউনিফর্ম তৈরির পুরো প্রক্রিয়ায় অর্থের একটি সুস্পষ্ট প্রবাহ শনাক্ত করা হয়েছে। কেএনএফের প্রতিনিধি মংহলাসিন মারমার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ব্যাংক হিসাব, চেক ও নগদ অর্থ ব্যবহার করে মোট ১ কোটি ৬২ লাখ ৫৯ হাজার ৫০০ টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায়। এর মধ্যে ৯০ লাখ ৫৯ হাজার ৫০০ টাকা ফ্যাব্রিক তৈরির জন্য এবং ৭২ লাখ টাকা ইউনিফর্ম সেলাইয়ের জন্য দেওয়া হয়।

সিআইডির অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য ও নথিপত্র পর্যালোচনায় কেএনএফের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নাথান বমের নির্দেশনায় মংহলাসিন মারমাসহ অন্যান্য অভিযুক্তরা পারস্পরিক যোগসাজশে কেএনএফের জন্য বিপুল পরিমাণ ইউনিফর্ম তৈরির উদ্যোগ ও অর্থায়ন করেছেন—এমন প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। যে সংগঠনটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি হয়ে ওঠা একটি সন্ত্রাসী সংগঠনের কার্যক্রমে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে এসব ইউনিফর্ম তৈরিতে অর্থের হস্তান্তর, স্থানান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে অর্থের প্রকৃত উৎস গোপন করার চেষ্টা করা হয়েছে।

অর্থের উৎস খুঁজছে সিআইডি

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মো. ছুফি উল্লাহ ঢাকা মেইলকে বলেন, পোশাক উদ্ধারের মামলার পরই বিষয়টি শুধু সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। কেএনএফের পোশাক তৈরির পেছনে কারা অর্থ দিয়েছে, অর্থ কোথা থেকে এসেছে এবং কীভাবে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তা স্থানান্তর হয়েছে—এসব বিষয়েও অনুসন্ধান শুরু করে সিআইডি।

এ ছাড়া কেএনএফের জন্য তৈরি ইউনিফর্মের এই ঘটনা শুধু পোশাক তৈরির অভিযোগে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর সঙ্গে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন, অর্থের উৎস গোপন এবং একটি সম্ভাব্য আর্থিক নেটওয়ার্কের অনুসন্ধানও জড়িয়ে পড়ছে।

পাশাপাশি ব্যাংক হিসাব, চেক, নগদ লেনদেন, পারচেজ অর্ডার, ব্যবসায়িক পরিচয় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পারস্পরিক যোগাযোগ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এসব নথির ভিত্তিতে কেএনএফের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পোশাক ব্যবসায়ী ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের যোগাযোগের একটি আর্থিক চিত্র তৈরি করেছে তদন্ত সংস্থা।

অর্থের উৎস শনাক্ত করাই গুরুত্বপূর্ণ

অপরাধবিজ্ঞানী, অপরাধ বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তৌহিদুল হক ঢাকা মেইলকে বলেন, কোনো সশস্ত্র সংগঠনের সক্ষমতা শুধু অস্ত্র বা জনবলের ওপর নির্ভর করে না। অর্থের জোগান, সরঞ্জাম সংগ্রহ এবং সরবরাহ ব্যবস্থাও তাদের কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

একটি নিষিদ্ধ সংগঠনের জন্য বিপুলসংখ্যক সামরিক পোশাক তৈরির ঘটনায় শুধু পোশাক জব্দ করলেই তদন্ত শেষ হওয়ার সুযোগ নেই। এই অর্থ কোথা থেকে এসেছে, কারা অর্থ দিয়েছে এবং কারা এর মাধ্যমে লাভবান হয়েছে—এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর বের করা জরুরি।

তিনি আরও বলেন, অর্থের উৎস শনাক্ত করা গেলে ভবিষ্যতে একই ধরনের অর্থায়ন ও সরবরাহ নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য সহজ হবে।

একেএস/এআর